Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০১ অপরাহ্ণ

ইংরেজি ভীতি: আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এক অদৃশ্য সংকট

আমাদের দেশে প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণি (এমনকি প্লে-নার্সারি) থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত—দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ইংরেজি একটি আবশ্যিক বিষয় হিসেবে পড়ানো হয়। এত বছর পড়ার পরও দেখা যায়, উচ্চশিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে গিয়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে কথা বলতে বা শুদ্ধভাবে লিখতে গিয়ে মারাত্মক সমস্যায় পড়েন। বিশ্বায়নের এই যুগে ইংরেজি জানা যেখানে সবচেয়ে বড় যোগ্যতা, সেখানে আমাদের শিক্ষার্থীরা কেন এই ব্যাকরণগত ও ব্যবহারিক দুর্বলতায় ভুগছেন?

এর পেছনে বেশ কিছু পদ্ধতিগত, সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। চলুন, কারণগুলো একটু গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করা যাক।

১. মুখস্থনির্ভরতা এবং পরীক্ষার জিপিএ-কেন্দ্রিক মানসিকতা

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় গলদ হলো—আমরা ইংরেজিকে একটি 'ভাষা' হিসেবে না দেখে, কেবল একটি 'বিষয়' হিসেবে দেখি। শিক্ষার্থীদের মূল লক্ষ্য থাকে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া বা জিপিএ-৫ পাওয়া।

  • পরীক্ষায় কমন পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীরা প্যারাগ্রাফ, রচনা বা লেটার মুখস্থ করে।

  • শিক্ষকেরাও অনেক সময় সৃজনশীল উপায়ে ভাষা শেখানোর চেয়ে পরীক্ষায় কীভাবে বেশি নম্বর পাওয়া যাবে, সেই কৌশল শেখাতে ব্যস্ত থাকেন। ফলে পরীক্ষার খাতায় জিপিএ-৫ আসলেও, বাস্তব জীবনে তারা দুই লাইন ইংরেজি বানিয়ে লিখতে বা বলতে পারেন না।

২. শুধু গ্রামার চর্চা, প্রয়োগের অভাব

আমাদের স্কুল-কলেজগুলোতে বছরের পর বছর ধরে ভয়েস চেঞ্জ, ন্যারেশন, রাইট ফর্ম অফ ভার্বস-এর মতো জটিল সব গ্রামারের নিয়ম মুখস্থ করানো হয়। কিন্তু সেই গ্রামার ব্যবহার করে কীভাবে বাস্তব জীবনে কথা বলতে হবে বা ফ্রি-হ্যান্ড রাইটিং লিখতে হবে, তা শেখানো হয় না। ভাষা শেখার স্বাভাবিক নিয়ম হলো—শোনা (Listening), বলা (Speaking), পড়া (Reading) এবং লেখা (Writing)। অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রথম দুটি (শোনা ও বলা) একেবারেই উপেক্ষিত থাকে।

৩. যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকের অভাব

বিশেষ করে মফস্বল, গ্রাম বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে দক্ষ ইংরেজি শিক্ষকের ব্যাপক অভাব রয়েছে। অনেক স্কুলেই অন্য বিষয়ের শিক্ষকেরা ইংরেজি ক্লাস নেন। ফলে শিক্ষকেরা নিজেরাও অনেক সময় ভুল উচ্চারণে কথা বলেন কিংবা ক্লাসে পুরোপুরি বাংলায় লেকচার দেন। শিক্ষকের নিজের ভিত দুর্বল হলে শিক্ষার্থীদের সঠিক ভিত্তি গড়ে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

৪. ইংরেজি বলতে চাওয়ার ভয় ও সামাজিক সংকোচ

আমাদের সমাজে কেউ একটু ইংরেজিতে কথা বলতে গেলে তাকে নিয়ে উপহাস করার একটি বাজে প্রবণতা রয়েছে। "বেশি ভাব মারছে" বা "ইংরেজ সাহেব হয়ে গেছে"—এমন মন্তব্যের ভয়ে শিক্ষার্থীরা ভুল বা শুদ্ধ কোনোভাবেই ইংরেজি বলার সাহস পায় না। এছাড়া "ভুল হলে লোকে হাসবে"—এই মনস্তাত্ত্বিক ভয় শিক্ষার্থীদের মুখের জড়তা কাটিয়ে উঠতে দেয় না।

৫. পাঠ্যবই এবং বাস্তব জীবনের দূরত্বের অভাব

জাতীয় শিক্ষাক্রমের বইগুলোতে (NCTB) চমৎকার সব বিষয়বস্তু থাকে, কিন্তু ক্লাসরুমে তার সঠিক মূল্যায়ন হয় না। শিক্ষকেরা গাইড বই দেখে ক্লাসে উত্তর দাগিয়ে দেন, যা শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও শব্দভাণ্ডার (Vocabulary) বৃদ্ধির পথ বন্ধ করে দেয়। তাছাড়া ইংরেজি পত্রিকা পড়া বা ইংরেজি সিনেমা/ডকুমেন্টারি দেখার মতো কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ আমাদের স্কুলগুলোতে প্রায় দেখাই যায় না।

এই দুর্বলতা কাটানোর উপায় কী?

পরিস্থিতি রাতারাতি বদলানো সম্ভব নয়, তবে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিলে এই চিত্র অবশ্যই পরিবর্তন করা সম্ভব:

  • যোগাযোগভিত্তিক শিখন (Communicative Learning): ক্লাসরুমে শুধু শিক্ষকের একমুখী লেকচার নয়, শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কথা বলার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

  • মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন: পরীক্ষায় শুধু লেখার ওপর নম্বর না রেখে, লিসেনিং (শোনা) এবং স্পিকিং (বলা)-এর ওপর একটি নির্দিষ্ট নম্বর বরাদ্দ রাখা উচিত (যা নতুন শিক্ষাক্রমে কিছুটা যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে)।

  • শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ: ইংরেজি শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত ব্রিটিশ কাউন্সিল বা সমমানের প্রতিষ্ঠান দ্বারা আধুনিক টিচিং মেথডের ওপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

  • ভয়ের সংস্কৃতি দূর করা: ভুল করেই মানুষ শেখে—এই মানসিকতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। ভুল ইংরেজি বললেও তাকে নিরুৎসাহিত না করে সাহস দিতে হবে।

শেষ কথা

ইংরেজি কেবল একটি ভাষা নয়, বর্তমান সময়ে এটি আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার এবং ক্যারিয়ার গড়ার চাবিকাঠি। আমাদের তরুণ প্রজন্ম অত্যন্ত মেধাবী। সঠিক গাইডলাইন, মুখস্থ বিদ্যার বৃত্ত থেকে বের হওয়া এবং নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ পেলে এই ইংরেজি ভীতি দূর করা মোটেও অসম্ভব কিছু নয়।


মন্তব্য করুন