Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৩ জুলাই, ২০২৬ ১১:১৫ অপরাহ্ণ

দলভিত্তিক শিখন (Group-based Learning) পদ্ধতি

 

দলভিত্তিক শিখন (Group-based Learning) পদ্ধতি

 

দলভিত্তিক শিখন বা Group-based Learning (GBL) হলো এমন একটি শিক্ষাদান পদ্ধতি, যেখানে শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট দলে বা গ্রুপে ভাগ করে কোনো নির্দিষ্ট কাজ, সমস্যা সমাধান বা আলোচনা করতে দেওয়া হয়। এটি প্রথাগত "শিক্ষক-কেন্দ্রিক" (Teacher-centered) শিক্ষাব্যবস্থার বিপরীতে একটি "শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক" (Student-centered) আধুনিক পদ্ধতি।

নিচে দলগত শিক্ষার বিভিন্ন দিক, এর প্রকারভেদ, সুবিধা এবং সফলভাবে বাস্তবায়নের উপায় বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


১. দলগত শিক্ষার মূল প্রকারভেদ (Types of Group Learning)

ক্লাসের উদ্দেশ্য এবং সময়ের ওপর ভিত্তি করে গ্রুপ লার্নিং বিভিন্ন রকমের হতে পারে:

  •     অনানুষ্ঠানিক গ্রুপ (Informal Groups): এটি ক্লাসের মাঝখানে হঠাৎ করা হয়। যেমন: শিক্ষক একটি লেকচার দেওয়ার পর বললেন, "পাশের জনের সাথে ২ মিনিট আলোচনা করে এই প্রশ্নের         উত্তর দাও" (যাকে Think-Pair-Share বলা হয়)।

  •     আনুষ্ঠানিক গ্রুপ (Formal Groups): এটি কোনো বড় অ্যাসাইনমেন্ট, প্রজেক্ট বা ল্যাব ওয়ার্কের জন্য তৈরি করা হয়। এই গ্রুপগুলো কয়েক সপ্তাহ বা পুরো সেমিস্টার জুড়ে একসাথে কাজ করতে         পারে।

  •     জিগসো পদ্ধতি (Jigsaw Method): এটি অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি। এখানে একটি বড় টপিককে কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতিটি গ্রুপের একজন সদস্য একটি নির্দিষ্ট ভাগ নিয়ে গবেষণা         করে অন্য গ্রুপের বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা করে আসে, তারপর নিজের গ্রুপে ফিরে এসে বাকিদের তা শেখায়।

২. দলগতভাবে ক্লাস পরিচালনার সুদূরপ্রসারী সুবিধা

এই পদ্ধতি শুধু পড়া মুখস্থ করার চেয়ে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক দক্ষতার বিকাশে বেশি ভূমিকা রাখে:

  •     যোগাযোগ দক্ষতার উন্নয়ন (Communication Skills): শিক্ষার্থীদের নিজের মতামত গুছিয়ে বলা এবং অন্যের মতামত মনোযোগ দিয়ে শোনার অভ্যাস তৈরি হয়, যা কর্মজীবনে অত্যন্ত         জরুরি।

  •     নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধের বিকাশ (Leadership & Responsibility): গ্রুপে কাজ করার সময় শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভিন্ন দায়িত্ব (যেমন: সময় নিয়ন্ত্রণ করা, তথ্য গুছানো, দলের হয়ে         কথা বলা) ভাগ করে নেয়।

  •     বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা (Respect for Diversity): একটি গ্রুপে বিভিন্ন মানসিকতা, ব্যাকগ্রাউন্ড ও মেধার শিক্ষার্থী থাকে। একসাথে কাজ করতে গিয়ে তারা একে অপরের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে         সম্মান করতে শেখে।

  •     দীর্ঘস্থায়ী জ্ঞান (Retention of Knowledge): এডগার ডেলের 'লার্নিং পিরামিড' অনুযায়ী, মানুষ কোনো বিষয় পড়ার চেয়ে অন্যকে শেখালে বা নিজেরা আলোচনা করলে তা ৭০% থেকে         ৯০% বেশি মনে রাখতে পারে

৩. গ্রুপ গঠনে শিক্ষকের কৌশল (How to Form Groups)

গ্রুপ কীভাবে তৈরি হচ্ছে, তার ওপর কাজের সফলতা অর্ধেক নির্ভর করে। শিক্ষক হিসেবে ৩টি পদ্ধতিতে গ্রুপ করা যায়:

পদ্ধতির নাম

বিবরণ

সুবিধা/অসুবিধা

শিক্ষার্থীর পছন্দ (Student-Selected)

শিক্ষার্থীরা নিজেরা বন্ধু বেছে নেয়।

সুবিধা: স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করে।

অসুবিধা: ক্লিশে বা গ্রুপ তৈরি হয়, পিছিয়ে পড়ারা একা হয়ে যায়।

এলোমেলো বা র‍্যান্ডম (Random)

রোল নম্বর বা লটারি করে গ্রুপ করা।

সুবিধা: কোনো পক্ষপাতিত্ব থাকে না। নতুনদের সাথে মেশার সুযোগ হয়।

পরিকল্পিত মিশ্র গ্রুপ (Heterogeneous)

শিক্ষক নিজে মেধা, জেন্ডার ও দক্ষতার ভারসাম্য রেখে গ্রুপ করেন।

সুবিধা: সবচেয়ে কার্যকর। ভালো শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়াদের সাহায্য করার সুযোগ পায়।

 

৪. সফল বাস্তবায়নে শিক্ষকের ভূমিকা: "গাইড অন দ্য সাইড"

গ্রুপ ওয়ার্কে শিক্ষকের ভূমিকা "স্টেজ কাঁপানো বক্তা" (Sage on the stage) থেকে বদলে গিয়ে হয় "পথপ্রদর্শক" (Guide on the side)। শিক্ষককে নিচের বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে:

  •     ভূমিকা স্পষ্ট করা (Role Assignment): গ্রুপে 'ফ্রি-রাইডিং' বা ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে ভূমিকা ভাগ করে দিন:

    •     ফ্যাসিলিটেটর/লিডার: সবাই যেন কথা বলার সুযোগ পায় তা নিশ্চিত করে।

    •     রেকর্ডার/নোট টেকার: গ্রুপের আলোচনার মূল পয়েন্টগুলো লেখে।

    •     টাইমকিপার: নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হচ্ছে কি না তা দেখে।

    •     প্রেজেন্টার: দলের হয়ে ক্লাসে সিদ্ধান্তটি উপস্থাপন করে।

  •     রুব্রিক্স বা মূল্যায়নের নিয়ম স্পষ্ট করা: শিক্ষার্থীরা কীভাবে নম্বর পাবে তা আগে থেকেই জানিয়ে দিতে হবে। যেমন: ৫০% নম্বর থাকবে দলগত চূড়ান্ত রিপোর্টের ওপর, আর ৫০% থাকবে দলের অন্য         সদস্যদের মূল্যায়নের (Peer Evaluation) ওপর।

৫. সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও তা মোকাবিলার উপায়

  •     অতিরিক্ত কোলাহল: দলগত কাজে কিছুটা শব্দ হওয়া স্বাভাবিক, একে "Productive Noise" বা ফলপ্রসূ শব্দ বলা হয়। তবে এটি যেন বিশৃঙ্খলায় রূপ না নেয়, সেজন্য শিক্ষককে ক্লাসে ঘুরে         ঘুরে নজরদারি করতে হবে।

  •     দ্বন্দ্ব বা মেজাজগত অমিল: কোনো গ্রুপে সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধ হলে শিক্ষক সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে তাদের নিজেদের মধ্যে সমস্যা সমাধানের (Conflict Resolution) সুযোগ         দেবেন। এতে তাদের সামাজিক বুদ্ধিমত্তা বাড়ে।

  • সারসংক্ষেপ: দলগতভাবে ক্লাস পরিচালনা করা কেবল সিলেবাস শেষ করার মাধ্যম নয়, বরং এটি শিক্ষার্থীদের বাস্তব পৃথিবীর জন্য তৈরি করার একটি চমৎকার হাতিয়ার। সঠিক পরিকল্পনা ও চমৎকার তদারকির মাধ্যমে এই পদ্ধতি যেকোনো ক্লাসরুমকে প্রাণবন্ত ও কার্যকর করে তুলতে পারে।
মন্তব্য করুন