সহকারী অধ্যাপক
০৪ জুলাই, ২০২৬ ০৪:২৪ পূর্বাহ্ণ
মাকামে ইবরাহিম -মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
মাকামে ইবরাহিম
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
যখন ছিল মরুর বুকে
নিস্তব্ধতার দেশ,
সূর্য যেন অগ্নি ছড়ায়
অসীম রৌদ্র-রেশ।
বালুর ঢেউয়ে আগুন জ্বলে,
বয়ে তপ্ত বায়,
চোখের সীমানা জুড়ে শুধু
ধূসর মরু ছায়।
নেই কোনো নদী,
নেই সবুজের হাসি,
তবু সেখানে জন্ম নিল
অনন্ত আশ্বাসই।
কারণ সেই মরুর বুকে
রবের ছিল ডাক,
মানবজাতির মুক্তিপথের
সেখানেই প্রথম পাক।
সেখানে এলেন মহামানব
ইবরাহিম মহান,
হৃদয়ভরা তাওহীদেরই
অমল দীপ্তি-জ্ঞান।
জীবনভর তিনি ছিলেন
সত্যের এক সৈনিক,
মিথ্যা যত দেবমূর্তি
করলেন সব পরিত্যাগ।
অগ্নিশিখা দগ্ধ করতে
পারল না তাঁর প্রাণ,
আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন,
কে করবে অপমান?
যেখানে ছিল তাঁর পদ,
সেখানে নেমে নূর,
অন্ধকারে ফুটে উঠল
আলোর নতুন সুর।
সময়েরই এক প্রহরে
এলো পবিত্র ক্ষণ,
কাবার ঘর নির্মাণ হবে—
রবেরই নির্দেশণ।
পুত্র তখন ইসমাইল,
নম্র, ধৈর্যবান,
পিতার সাথে কাঁধ মিলিয়ে
করেন শ্রমদান।
একজন তোলেন পাথর,
আরেকজন গাঁথেন,
ইটের পরে ইট বসিয়ে
ঘরটি গড়ে ওঠে।
যতই দেয়াল উঠতে থাকে
ততই বাড়ে উচ্চ,
হাতে পৌঁছায় না যে স্থান,
হয় কাজটি কঠিন।
তখন এল এক আশ্চর্য
অলৌকিক দান,
একটি পাথর এগিয়ে এলো
রহমতেরই নিদান।
সেই পাথরের ওপর উঠে
দাঁড়ালেন নবী,
রবের নামে তুললেন গাঁথা
প্রতিটি নির্মাণখানি।
ইসমাইল দেন পাথর তুলে,
পিতা করেন স্থাপন,
দুই হৃদয়ে একই ধ্বনি—
আল্লাহরই স্মরণ।
মুখে তাঁদের বিনয়ভরা
অমর সেই দোয়া,
"হে আমাদের পরম রব,
এই কাজ কবুল কোরো।"
"তুমি তো সব শোনো সদা,
সবই জানো তুমি,
তোমারই পথে জীবন হোক,
তোমারই আনুগামী।"
দোয়ার সুরে ভরে উঠল
মক্কার আকাশপথ,
ফেরেশতারা শুনল নতশিরে
সেই ইবাদতের রথ।
যে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে
গড়লেন কাবাঘর,
রবের কুদরতে তাতে রইল
দুই পায়েরই স্বর।
কঠিন শিলা নরম হলো,
মোমের মতো ক্ষণ,
অমর হয়ে রয়ে গেল
পবিত্র পদচিহ্ন।
সহস্র বছরের ঝড়-বৃষ্টি,
সূর্যের দহন,
কিছুই পারেনি মুছে দিতে
সেই পবিত্র চিহ্ন।
যুগের পরে যুগ এসেছে,
রাজা গেছে হারিয়ে,
সেই চিহ্ন আজও দাঁড়িয়ে আছে
বিশ্বাসকে জাগিয়ে।
মানুষ দেখে বিস্ময়ভরে
রবের মহাশক্তি,
যেখানে মিশে আছে আজও
নবুয়তের ভক্তি।
এ শুধু কোনো পাথর নয়,
ইতিহাসের গান,
ঈমান ভরা এক অধ্যায়,
আল্লাহরই দান।
যে চিহ্ন দেখে জাগে মনে
তাওহীদেরই ডাক,
মানুষ যেন ফিরে আসে
সত্যের সোজা পাক।
কাবার পাশে আজও আছে
সেই মহান নিদর্শন,
যেখানে লেখা যুগে যুগে
আনুগত্যের জীবন।
এ যেন শুধু পদচিহ্ন নয়,
বিশ্বাসেরই শপথ,
মানুষ যত রবকে মানে
ততই খুলে পথ।
অহংকারের উচ্চ মিনার
ভেঙে যায় একদিন,
বিনয়েরই ক্ষুদ্র পাথর
থাকে যুগে অমলিন।
মাকামে ইবরাহিম তাই
ইতিহাস নয় শুধু,
আল্লাহমুখী জীবনেরই
চিরন্তন এক সেতু।
যে সেখানে দাঁড়িয়ে ভাবে,
নীরব হৃদয় ভরে,
সে বুঝে নেয়—মানুষ বড়
হয় না ধন-গৌরবে।
রবের ডাকে সাড়া দিয়ে
যে করে আত্মদান,
তারই স্মৃতি যুগে যুগে
রয় অম্লান, মহান।
মাকামে ইবরাহিম
মরুর বুকে উঠল ধীরে
পবিত্র সেই ঘর,
প্রতিটি পাথর সাক্ষী হয়ে
জাগায় নব-অন্তর।
দিনের শেষে সূর্য যখন
পশ্চিম আকাশে ঢলে,
শ্রমের ঘামে ভিজে ওঠে
পিতা-পুত্রের গলে।
নেই অভিযোগ, নেই ক্লান্তি,
নেই কোনো অহংকার,
রবের নামে প্রতিটি ক্ষণ
হয়ে ওঠে অমর।
ইসমাইল আনেন পাথর,
পিতা করেন গাঁথা,
ভালোবাসার বন্ধন যেন
ঈমানেরই কথা।
যতই দেয়াল ঊর্ধ্বে ওঠে,
ততই বাড়ে কাজ,
তবু তাঁদের অন্তরে ছিল
রবেরই মহারাজ।
উঁচু প্রাচীর গড়তে গিয়ে
হলো যখন দেরি,
রহমতেরই নিদর্শন হয়ে
এলো পাথর ফেরই।
সেই পাথরের বক্ষে তখন
দাঁড়ালেন খলিল,
স্রষ্টার নামে গড়লেন ঘর,
হৃদয় ছিল স্থির।
অলৌকিক সে মুহূর্তখানি
দেখল ধরা-ধাম,
শক্ত শিলা কোমল হলো
রবের মহাকাম।
যে দুটি পা সিজদায় নত,
সত্যে ছিল অটল,
সেই পদচিহ্ন রয়ে গেল
পাথরেরই তল।
না ছিল তাতে মানুষেরই
ক্ষমতার পরিচয়,
সবই ছিল প্রভুর দান,
অসীম করুণাময়।
চিহ্ন দুটি নীরব হলেও
বলে অনন্ত বাণী—
"যে নত হয় আল্লাহর কাছে,
সেই হয় মহাজ্ঞানী।"
বছর গেল, যুগও গেল,
রাজ্য হলো লয়,
তবু সেই চিহ্ন আজও যেন
অবিনশ্বরময়।
ধূলিঝড় আর তপ্ত রোদ,
বর্ষার অশ্রুধারা,
মুছতে পারেনি এক বিন্দুও
স্মৃতির দীপ্তি সারা।
অগণিত হজযাত্রী আজ
দেখে ভরা নয়নে,
সেই পদচিহ্ন শেখায় শুধু
চলতে সত্যপথে।
কেউ দেখে শুধু পাথরখানি,
কেউ দেখে ইতিহাস,
কেউবা খুঁজে বিনয়েরই
চিরন্তন সুবাস।
কেউ আবার নীরব মনে
উচ্চারণ করে দোয়া,
"হে পরম রব, ইবরাহিমের
ঈমান দিও ছোঁয়া।"
এই তো শুধু স্মৃতি নয়,
আদর্শেরই দীপ,
মানবহৃদয় আলোকিত করে
যুগে যুগে অনুপম রূপ।
কাবার পাশে দাঁড়িয়ে আছে
শান্ত মহিমান্বিত,
মাকামে ইবরাহিম যেন
ঈমানে সমুজ্জ্বল চিত্ত।
যে পদচিহ্ন পাথরে রইল,
হৃদয়ে তার ছাপ,
সত্যের পথে অবিচল হও—
এই তার অনুরাগ।
নয় সে কেবল অতীত কাহন,
নয় বিস্ময়ের রেশ,
আল্লাহভীরু মানুষেরই
চিরন্তন পরিবেশ।
যে দাঁড়ায় তার সামনে এসে
নম্র অন্তর নিয়ে,
সে অনুভব করে ইতিহাস
বর্তমানের বুকে গিয়ে।
পদচিহ্ন নয়—পথের দিশা,
আলোকিত আহ্বান,
বিশ্বাস, ধৈর্য, ত্যাগের মাঝে
লুকায় মহাগান।
তাই আজও সেই পাথরখানি
নীরব থেকেও কয়—
"রবের সন্তোষই জীবনের
সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয়।"
আসুক যত কালবৈশাখী,
আসুক দুঃসময়,
সত্যের পথে অবিচল জন
পরাজিত না হয়।
মাকামে ইবরাহিম তাই
আলোকিত ইতিহাস,
মানবতার অন্তরজুড়ে
জাগায় পবিত্র সুবাস।
যতদিন এই পৃথিবীতে
ধ্বনিত হবে আজান,
ততদিন এই পদচিহ্ন
জাগাবে ঈমান।
আর কিয়ামতের প্রভাত পর্যন্ত
রবের ইচ্ছায় ধরে,
থাকবে এই নিদর্শনখানি
বিশ্বাসীদের তরে।
মাকামে ইবরাহিম
আকাশ জুড়ে প্রভাত তখন
ছড়ায় সোনার রং,
নতুন দিনের আহ্বানে জাগে
মরুর নিস্তরঙ্গ।
নীরব বুকে মক্কার প্রান্তর,
জাগে পবিত্র প্রাণ,
রবের ঘর গড়ার কাজে
নিবিষ্ট দুই মহান।
ইবরাহিমের কপালজুড়ে
শ্রমের স্বচ্ছ ঘাম,
ইসমাইলের দুটি হাতে
জাগে সেবার নাম।
একজন দেন পাথর তুলে,
একজন করেন গাঁথা,
দুজনারই হৃদয়জুড়ে
একই ঈমান-কথা।
দেয়াল যত ওপরে ওঠে,
ততই বাড়ে টান,
তবু তাঁদের মুখে ছিল
শুকরিয়ারই গান।
নেই বিরক্তি, নেই অভিযোগ,
নেই ক্লান্তির ছাপ,
রবের প্রেমে নিবেদিত প্রাণ,
অটুট তাঁদের তাপ।
পাথরখানি এগিয়ে আসে
রহমতেরই ছলে,
তারই বুকে দাঁড়িয়ে নবী
গড়েন ঘর অবহেলে।
যে পাথরে ছিল তাঁর পা,
সেটি হলো ধন্য,
মানবজাতির ইতিহাসে
পেল অমরত্ব গৌরবময়।
তারপর তাঁরা হাত তুলিলেন
বিনয়ভরা মনে,
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠ মিলল
আকুল প্রার্থনায় সনে—
"হে আমাদের পরম পালনকর্তা!
আমাদের এই সেবা কবুল করো;
নিশ্চয় তুমি সর্বশ্রোতা,
সর্বজ্ঞ, পরম দয়াময়।"
দোয়ার সুরে কেঁপে উঠল
নিস্তব্ধ মরুভূমি,
ফেরেশতারা আমীন বলে
ভরাল আসমানি ভূমি।
আবার বললেন বিনয় ভরে—
হে মহান প্রতিপালক!
আমাদের দুজনকে
তোমারই অনুগত রেখো,
আমাদের বংশধরদের মধ্যেও
জাগিয়ে রেখো আত্মসমর্পণ।
দেখিয়ে দাও ইবাদতের পথ,
শিখিয়ে দাও বিধান,
ক্ষমা দিয়ে ভরিয়ে দিও
আমাদের প্রতিপ্রাণ।
কত যে গভীর সেই প্রার্থনা,
কত যে নির্মল সুর,
মানবতার ইতিহাসজুড়ে
ছড়ায় তারই নূর।
কাবার প্রতিটি প্রস্তর যেন
সেই দোয়ার সাক্ষী,
প্রতিটি ইটের ফাঁকে ফাঁকে
রয়েছে প্রেম আঁকি।
মাকামে সেই পাথরখানি
নীরব থেকেও কয়—
শ্রমের শেষে দোয়াই শুধু
মানুষকে পূর্ণ করে।
যে কর্ম করে অহংকারে,
সে হারায় ফল,
যে কর্ম করে আল্লাহর তরে,
তার জীবন সফল।
তাই তো নবীর পদচিহ্ন
শুধু স্মৃতির রেশ নয়,
বিনয়েরই জীবন্ত শিক্ষা,
ঈমানের পরিচয়।
হাজার বছরের পথ পেরিয়ে
আজও মানুষ আসে,
দাঁড়িয়ে থাকে শ্রদ্ধাভরে
কাবার পবিত্র পাশে।
কেউ নীরবে দোয়া করে,
কেউ ফেলে অশ্রুধারা,
কেউবা মনে প্রতিজ্ঞা করে—
সত্যই হবে সারা।
মাকামে ইবরাহিম যেন
এক উজ্জ্বল মিনার,
যেখানে মানুষ শিখে নেয়
আত্মসমর্পণের দ্বার।
সত্যের পথে দাঁড়িয়ে থাকো,
যতই আসুক ঝড়,
রবের ভরসা যার হৃদয়ে,
তারই জয় অবিরত।
ত্যাগের চেয়ে মহৎ কিছু
পৃথিবীতে আর কী?
রবের প্রেমে নিবেদিত প্রাণ
চিরদিনই অক্ষয় থাকি।
তাই এই পাথর স্মরণ করায়
প্রতিটি বিশ্বাসী প্রাণ—
কর্মের আগে নিয়ত শুদ্ধ,
তারপর প্রার্থনাগান।
ইবরাহিমের জীবন তাই
চিরন্তন আদর্শ,
মাকামে তাঁর পদচিহ্ন
ঈমানের মহাবর্ষ।
যতদিন কাবার চারিধারে
তাওয়াফ হবে ধীর,
ততদিন জাগবে মানুষের প্রাণে
ইবরাহিমের নূর-নদীর।
আর যতদিন আকাশ জুড়ে
ধ্বনিত হবে আজান,
ততদিন এই পাথর বয়ে
চলবে ঈমানের গান।
মাকামে ইবরাহিম
মরুর বুকে প্রখর রবি,
অগ্নি-জ্বলা দিন,
বালুকারাশির বুকের মাঝে
নিস্তব্ধ পৃথিবী বিন।
নেই সবুজের মৃদু ছায়া,
নেই ঝরনার গান,
দিগন্তজোড়া শূন্য প্রান্তর,
নেই জনপদের প্রাণ।
সেই নির্জনেই আল্লাহ দিলেন
এক মহান পরীক্ষা,
যেখানে লুকায় ভবিষ্যতের
ঈমানভরা দিশা।
আদেশ পেয়ে খলিলুল্লাহ
চললেন নতশির,
সঙ্গে তাঁর স্নেহের পরিবার—
হাজেরা, শিশু অধীর।
কোলে তখন ইসমাইল,
নিষ্পাপ কোমল প্রাণ,
অজানা সেই মরুভূমিতে
লেখা নতুন গান।
চারদিকে শুধু বালুর ঢেউ,
নেই কোনো বসতি,
তবু সেখানে আল্লাহরই
অদৃশ্য অনুগ্রহ জাগতি।
বিদায়বেলায় থামল পা,
চোখে নীরব জল,
হাজেরা বললেন বিনয়ভরে—
"কেন এই পথ চল?"
বারবার তিনি জানতে চাইলেন,
মেলেনি কোনো বাণী,
শেষে যখন প্রশ্ন উঠল—
"এ কি প্রভুরই আদেশখানি?"
ইবরাহিমের নত দৃষ্টি
জবাব দিল ধীরে,
"হ্যাঁ, মহান রবই নির্দেশ দিয়েছেন
এই পথ ধরতে নীরবে।"
হাজেরার মুখে ফুটল তখন
অটল বিশ্বাসের হাসি,
"তবে তিনি আমাদের কখনোই
নষ্ট হতে দেবেন না—ভাসি।"
কত মহৎ সেই ঈমানখানি!
কত গভীর ধৈর্য!
অদেখা ভবিষ্যৎ সঁপে দিলেন
রবেরই করুণার বৈরাগ্যে।
চলে গেলেন খলিল নবী,
রইল মা আর শিশু,
মরুর বুকে নিঃসঙ্গতার
অশেষ নীরব বিষণ্ন রেশ।
দিন গড়ায়, ক্ষয় হয় জল,
শেষ হয় খাদ্যভাণ্ডার,
তৃষ্ণার জ্বালায় কাঁদে শিশু,
কাঁপে মাতৃহৃদয় অপার।
কোলে নেন, সান্ত্বনা দেন,
চুম্বনে ভরান মুখ,
তবু শিশুর শুকনো ওষ্ঠে
অসহ্য তৃষ্ণার দুঃখ।
দিগন্তপানে চেয়ে চেয়ে
উঠলেন সাফা শিখরে,
কোথাও কি আছে জীবনের চিহ্ন
দূরের কোনো নীড়ে?
নেই কোনো কাফেলা দেখা,
নেই মানুষের সাড়া,
তবু আশাকে বুকে নিয়ে
দৌড়ান আবার।
সাফা হতে মারওয়াতে,
মারওয়া হতে ফের,
মায়ের প্রাণে আশার আলো
নেভে না কোনো ফের।
একবার নয়, দুইবার নয়,
সাতটি বার পথ,
মায়ের সেই অদম্য সাধনা
হল ইবাদতের রথ।
ঘামে ভেজে পর্দার আঁচল,
ক্লান্ত দুটি পা,
তবু তাঁর বিশ্বাস বলে—
"রব আছেন সাথেই, মা।"
ঠিক তখনই করুণাধারা
নামল আলোর মতো,
শিশুর পায়ের কাছে ফুটল
রহমতের নব স্রোত।
শুষ্ক মাটির অন্তর ভেদে
উঠল নির্মল জল,
মরুর বুকে জেগে উঠল
জীবনের অনল।
হাজেরা ছুটে এলেন তখন,
চোখে আনন্দধারা,
দুই হাতে বাঁধলেন উৎসধারা,
ভেসে গেল সব হাহাকারা।
বললেন স্নেহে—"জম্ জম্"
থেমে থাকো ধীর,
করুণাধারার সেই আহ্বান
রইল যুগে স্থির।
সেই জলধারা আজও বয়ে
তৃষ্ণা করে দূর,
রহমতের সেই অফুরন্ত স্রোত
জাগায় আলোর নূর।
যেখানে ছিল মৃত্যুভয়,
সেখানে জাগে প্রাণ,
আল্লাহ যাকে রক্ষা করেন,
অমর হয় সে স্থান।
পাখিরা এল আকাশ ভেঙে,
দেখল জলের রেখা,
কাফেলারা বিস্ময়ে বুঝল—
এখানে জীবনের দেখা।
ধীরে ধীরে গড়ে উঠল
মক্কার প্রথম ঘর,
মানবপদে মুখর হলো
নীরব মরুপ্রান্তর।
শিশু ইসমাইল বেড়ে উঠল
সত্যের আলো পেয়ে,
মায়ের ধৈর্য, পিতার ঈমান
হৃদয়ে ধারণ করে।
একদিন সেই তরুণ হবে
পিতার কর্মসাথি,
কাবার ঘর নির্মাণে দেবে
শ্রমের অমল গাঁথি।
যে জমজমের কলধ্বনি
জাগাল মরুর প্রাণ,
সেই স্রোতেরই স্নিগ্ধ সুরে
রচিত হলো ইতিহাসগান।
হাজেরার সেই ধৈর্যের কথা
যুগে যুগে দীপ্যমান,
মাতৃত্ব যখন ঈমানে দীপ্ত,
জয়ী হয় প্রতিক্ষণ।
যে বিশ্বাসে ছিল না ভয়,
ছিল না কোনো ক্ষয়,
সেই বিশ্বাসেই মরুভূমি
চিরসবুজময়।
আজও যখন হজযাত্রীরা
সাফা-মারওয়া যায়,
হাজেরার সেই অবিচল ধৈর্য
হৃদয়জুড়ে গায়।
আজও যখন জমজমজল
স্পর্শ করে প্রাণ,
মনে পড়ে সেই জননীর
অটল ঈমানগান।
মরুর বুকের প্রতিটি বালু
সাক্ষী হয়ে রয়—
রবের প্রতি পূর্ণ ভরসাই
মানবজীবনের জয়।
এই ধৈর্যেরই উর্বর মাটিতে
ফুটল ভবিষ্যৎ ফুল,
যেখানে পরে উঠবে কাবা—
মানবজাতির কূল।
আর সেই কাবার পাশে একদিন
রইবে অমর চিহ্নধারী,
মাকামে ইবরাহিম—বিশ্বাসের পাথর,
ইতিহাসের মহাপ্রহরী।
৪
৪ মন্তব্য