Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০৬ অপরাহ্ণ

ই পর্চা খতিয়ান অনুসন্ধান: ঘরে বসে নিয়ম জেনে নিন (eporcha gov bd)

জমির মালিকানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো খতিয়ান বা পর্চা। আগে এই খতিয়ান দেখতে হলে ভূমি অফিসে গিয়ে দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়াতে হতো। এখন সেই ঝামেলা নেই — সরকারের ই পর্চা সেবার মাধ্যমে ঘরে বসে মোবাইল বা কম্পিউটার দিয়েই কয়েক মিনিটে খতিয়ান অনুসন্ধান করা যায়।

এই পোস্টে ই পর্চা কী, বর্তমানে কোন ওয়েবসাইটে এই সেবা পাওয়া যায় এবং ধাপে ধাপে কীভাবে খতিয়ান অনুসন্ধান করবেন — সবকিছু সহজ ভাষায় দেখানো হলো।

ই পর্চা কি?

ই পর্চা হলো বাংলাদেশ ভূমি মন্ত্রণালয়ের একটি ডিজিটাল সেবা, যার মাধ্যমে দেশের যেকোনো জমির খতিয়ান, দাগ নম্বর, মালিকানার তথ্য এবং মৌজা ম্যাপ অনলাইনে যাচাই করা যায়। এই সেবা পরিচালিত হয় ডিজিটাল ল্যান্ড রেকর্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (DLRMS) নামের সফটওয়্যারের মাধ্যমে।

এখানে অনুসন্ধান করে জানা যায়:

  • জমির প্রকৃত মালিক কে
  • জমির পরিমাণ ও দাগ নম্বর
  • খতিয়ানের ধরন ও বিস্তারিত তথ্য
  • মৌজা ম্যাপ

একটি জরুরি তথ্য: ওয়েবসাইট বদলে গেছে

আগে এই সেবার জন্য eporcha gov bd ওয়েবসাইট ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয় সব সেবা একটি ওয়েবসাইটের আওতায় নিয়ে এসেছে। এখন ই পর্চা খতিয়ান অনুসন্ধান করতে হয় dlrms.land.gov.bd ওয়েবসাইট থেকে, অথবা ভূমি মন্ত্রণালয়ের মূল ওয়েবসাইট land.gov.bd থেকেও এই সেবায় প্রবেশ করা যায়। কেউ যদি পুরনো লিংক ব্যবহার করেন, সেখান থেকেও নতুন সাইটে যাওয়ার নির্দেশনা পাবেন।

খতিয়ানের ধরন কী কী

ই পর্চায় দুই রকমের খতিয়ান অনুসন্ধান করা যায় — এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি, কারণ অনুসন্ধানের সময় ঠিক ধরনটি বেছে নিতে হয়।

১. সার্ভে খতিয়ান — এটি বিভিন্ন সময়ে হওয়া ভূমি জরিপ অনুযায়ী তৈরি খতিয়ান। এর মধ্যে রয়েছে:

  • সি এস (CS) খতিয়ান
  • এস এ (SA) খতিয়ান
  • আর এস (RS) খতিয়ান
  • বি আর এস (BRS) খতিয়ান
  • বি এস (BS) খতিয়ান
  • এছাড়া পেটি খতিয়ান, দিয়ারা খতিয়ানও রয়েছে

২. নামজারি খতিয়ান — জমি হাত বদল বা উত্তরাধিকারের কারণে নতুন মালিকের নামে যে খতিয়ান তৈরি হয়, তাকে নামজারি বা খারিজ খতিয়ান বলা হয়। এই খতিয়ানের নাম্বার সার্ভে খতিয়ানের চেয়ে ভিন্ন হয়।

ই পর্চা খতিয়ান অনুসন্ধান করার নিয়ম (ধাপে ধাপে)

নিচে dlrms.land.gov.bd ওয়েবসাইট দিয়ে খতিয়ান অনুসন্ধানের সম্পূর্ণ পদ্ধতি দেখানো হলো।

সার্ভে খতিয়ান (CS/SA/RS/BS) অনুসন্ধান করার নিয়ম

  1. মোবাইল বা কম্পিউটার থেকে dlrms.land.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন।
  2. হোমপেজে সার্ভে খতিয়ান অপশনটি নির্বাচন করুন (সাধারণত এটি ডিফল্টভাবে সিলেক্ট থাকে)।
  3. এবার ধাপে ধাপে জমির ঠিকানা দিন — প্রথমে বিভাগ, তারপর জেলা, তারপর উপজেলা/থানা নির্বাচন করুন।
  4. খতিয়ানের ধরন থেকে আপনার খতিয়ান কোন সার্ভের (CS/SA/RS/BS) তা নির্বাচন করুন।
  5. এরপর মৌজা অপশন থেকে আপনার জমির মৌজা খুঁজে নির্বাচন করুন। মৌজা নাম না জানলে জেএল নম্বর দিয়েও খুঁজতে পারেন।
  6. খতিয়ান নং এর ঘরে খতিয়ান নম্বরটি লিখুন এবং খুঁজুন বাটনে ক্লিক করুন।
  7. খতিয়ান নম্বর না জানলে খতিয়ানের তালিকা থেকে মালিকের নাম ও পিতার নাম দেখে খুঁজে নিয়ে দুইবার ক্লিক করুন।
  8. সঠিক তথ্য দিলে স্ক্রিনে জমির মালিকানা, দাগ নম্বর ও পরিমাণসহ খতিয়ানের সম্পূর্ণ বিবরণ দেখতে পাবেন।

নামজারি খতিয়ান অনুসন্ধান করার নিয়ম

  1. dlrms.land.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে নামজারি খতিয়ান সেকশনটি নির্বাচন করুন।
  2. বিভাগ, জেলা, উপজেলা/থানা এবং মৌজা ধাপে ধাপে নির্বাচন করুন।
  3. খতিয়ানের তালিকা থেকে খতিয়ান নং লিখে খুঁজুন বাটনে ক্লিক করুন, বা তালিকা স্ক্রল করে খুঁজুন।
  4. খতিয়ান পেলে তার ওপর দুইবার ক্লিক করলে বিস্তারিত তথ্য দেখতে পারবেন।

নাম বা দাগ নম্বর দিয়ে খতিয়ান অনুসন্ধান করার নিয়ম (অধিকতর অনুসন্ধান)

খতিয়ান নম্বর জানা না থাকলেও অনুসন্ধান করা সম্ভব। এজন্য:

  1. বিভাগ, জেলা, উপজেলা, মৌজা এবং খতিয়ানের ধরন নির্বাচন করার পর অধিকতর অনুসন্ধান বাটনে ক্লিক করুন।
  2. প্রথম ঘরে জমির দাগ নম্বর লিখে সার্চ করতে পারেন — এটি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি, কারণ একই নামে একাধিক ব্যক্তি থাকতে পারে।
  3. দ্বিতীয় ঘরে জমির মালিকের পূর্ণ নাম লিখেও অনুসন্ধান করতে পারেন।
  4. সঠিক তথ্য দিলে সেই ব্যক্তির নামে জমি থাকলে তা স্ক্রিনে দেখানো হবে।

মনে রাখবেন: নাম দিয়ে সার্চ করে কিছু না পেলে বানান ভুল বা রেকর্ডে গরমিল থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে দাগ নম্বর দিয়ে চেষ্টা করুন।

খতিয়ানের অনলাইন কপি বা সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করার নিয়ম

অনুসন্ধান করে খতিয়ান খুঁজে পাওয়ার পর প্রয়োজনে কপি সংগ্রহের জন্য আবেদন করা যায়:

  1. খতিয়ানের বিস্তারিত পেজে থাকা আবেদন অপশনে ক্লিক করুন।
  2. QR কোডসহ তাৎক্ষণিক অনলাইন কপি বা সত্যায়িত/সার্টিফাইড কপি — দুই ধরনের কপির জন্য আবেদন করা যায়।
  3. নির্ধারিত ফি অনলাইনে পরিশোধ করুন (উভয় ধরনের কপির মূল্য বর্তমানে ১২০ টাকা)।
  4. আবেদন সম্পন্ন হলে কপি ডাউনলোড করতে পারবেন বা প্রয়োজনে ডাকযোগে/অফিস থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন।

উল্লেখ্য, শুধু খতিয়ান অনুসন্ধান করতে কোনো টাকা লাগে না। ফি লাগে কেবল কপি সংগ্রহের আবেদন করলে।

খতিয়ান অনুসন্ধান করতে কী কী তথ্য লাগবে

অনুসন্ধান শুরু করার আগে হাতের কাছে এই তথ্যগুলো রাখুন, তাহলে দ্রুত কাজ শেষ হবে:

  • জমির বিভাগ, জেলা ও উপজেলা/থানার নাম
  • মৌজার নাম বা জেএল নম্বর
  • খতিয়ান নম্বর (জানা থাকলে)
  • জমির দাগ নম্বর (খতিয়ান নম্বর না জানলে)
  • মালিকের পূর্ণ নাম ও পিতার নাম (বিকল্প অনুসন্ধানের জন্য)

খতিয়ান খুঁজে না পেলে কী করবেন

ভূমি মন্ত্রণালয় ধীরে ধীরে সারা দেশের সব খতিয়ান অনলাইনে আনার কাজ করছে। কার্যক্রমটি এখনো চলমান থাকায় কিছু মৌজার খতিয়ান এখনো অনলাইনে না-ও পাওয়া যেতে পারে। এমন হলে:

  1. প্রথমে নিশ্চিত হোন বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও মৌজা ঠিকভাবে নির্বাচন করেছেন কি না।
  2. দাগ নম্বর ও মালিকের নাম দিয়েও একবার চেষ্টা করুন।
  3. তারপরও না পেলে আপনার সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিস বা সেটেলমেন্ট অফিসে সরাসরি যোগাযোগ করুন।
  4. প্রয়োজনে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কল সেন্টার ১৬১২২ নম্বরে ফোন করেও সহায়তা নিতে পারেন।

মোবাইলে ই পর্চা খতিয়ান অনুসন্ধান করার নিয়ম

কম্পিউটার না থাকলেও সমস্যা নেই। স্মার্টফোনের যেকোনো ব্রাউজার (Chrome, Firefox) থেকে dlrms.land.gov.bd ওয়েবসাইটে ঢুকে উপরে বলা একই ধাপ অনুসরণ করলে মোবাইল দিয়েও মাত্র কয়েক মিনিটে খতিয়ান অনুসন্ধান করা যায়। আলাদা কোনো অ্যাপ ইনস্টল করার প্রয়োজন নেই।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

ই পর্চা খতিয়ান অনুসন্ধানের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট কোনটি? ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই পর্চা সেবার বর্তমান অফিসিয়াল ওয়েবসাইট হলো dlrms.land.gov.bd। land.gov.bd থেকেও এই সেবায় প্রবেশ করা যায়।

eporcha.gov.bd ওয়েবসাইট কি এখনো চালু আছে? এই সেবা এখন dlrms.land.gov.bd ওয়েবসাইটের অধীনে নিয়ে আসা হয়েছে। তাই খতিয়ান অনুসন্ধানের জন্য বর্তমানে এই নতুন ওয়েবসাইটটি ব্যবহার করা উচিত।

খতিয়ান অনুসন্ধান করতে কোনো টাকা লাগে কি? না, শুধু অনুসন্ধান করতে কোনো ফি লাগে না। খতিয়ানের অনলাইন কপি বা সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করতে চাইলে নির্ধারিত ফি দিতে হয়।

খতিয়ান নম্বর না জানলে কীভাবে অনুসন্ধান করব? খতিয়ান নম্বর না জানলে জমির দাগ নম্বর বা মালিকের নাম দিয়ে "অধিকতর অনুসন্ধান" অপশন থেকে খুঁজতে পারবেন।

সব জমির খতিয়ান কি অনলাইনে পাওয়া যায়? এখনো সব মৌজার তথ্য সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাইজ হয়নি, তাই কিছু খতিয়ান অনলাইনে না পাওয়া স্বাভাবিক। এমন হলে স্থানীয় ভূমি বা সেটেলমেন্ট অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।

শেষ কথা

ই পর্চা খতিয়ান অনুসন্ধান এখন আর জটিল বা সময়সাপেক্ষ কোনো কাজ নয়। dlrms.land.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে বিভাগ, জেলা, উপজেলা, মৌজা ও খতিয়ানের ধরন ঠিকভাবে নির্বাচন করলে ঘরে বসেই যেকোনো জমির খতিয়ান, মালিকানা ও দাগ নম্বরের তথ্য কয়েক মিনিটে জানা সম্ভব। খতিয়ান অনলাইনে না পাওয়া গেলে ঘাবড়ে না গিয়ে স্থানীয় ভূমি অফিসে যোগাযোগ করুন বা ১৬১২২ নম্বরে কল করুন।

জমি কেনার আগে বা মালিকানা যাচাইয়ের প্রয়োজনে সবসময় সঠিক ওয়েবসাইট থেকে ই পর্চা অনুসন্ধান করুন, যাতে ভুল তথ্যে বিভ্রান্ত না হন।

মন্তব্য করুন

ব্লগ