সহকারী শিক্ষক
০৫ জুলাই, ২০২৬ ০৮:২২ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পাবলিক পরীক্ষাগুলো শিক্ষার্থীদের মেধা ও যোগ্যতার চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়। দীর্ঘকাল ধরে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণের ফলে যে কাঠামোগত ও মানগত বৈষম্য তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনে অবশেষে সরকার এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রবর্তনের মাধ্যমে সেই দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ভাষ্যমতে, এক বাংলাদেশে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণ আর যৌক্তিক নয়। তার মতে, কোনো বোর্ড প্রশ্ন সহজ আবার কোনোটি কঠিন করলে একই দেশের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, তা দূর করাই এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য। ও লেভেল বা এ লেভেলের মতো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আদলে অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রবর্তন নিঃসন্দেহে একটি আধুনিক ও সাহসী পদক্ষেপ।
প্রথম দৃষ্টিতে সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত যৌক্তিক, আধুনিক এবং সময়োপযোগী বলে মনে হয়। শিক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দু যেহেতু শিক্ষার্থী, তাই তাদের জন্য একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে স্বস্তিদায়ক মূল্যায়নব্যবস্থা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রবর্তনের মাধ্যমে সারা দেশে শিক্ষার মান সমানভাবে মূল্যায়ন করা এবং মেধার সঠিক যাচাইয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। এটি বিভিন্ন বোর্ডের মধ্যে যে অঘোষিত বৈষম্য ছিল, তা দূর করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের যে সমতার লড়াই, সেখানে এই অভিন্ন মূল্যায়ন পদ্ধতি একটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।
তবে যেকোনো বড় শিক্ষানীতির মতো এই সিদ্ধান্তেরও রয়েছে অপার সম্ভাবনা এবং একই সঙ্গে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ, যা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে। এই উদ্যোগের সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করবে যথাযথ প্রস্তুতি এবং প্রশ্নপত্রের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর। সারা দেশে একই সময়ে প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা রক্ষা এবং সুশৃঙ্খলভাবে পরীক্ষা পরিচালনা একটি বিশাল প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। অতীতের বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন ফাঁসের যে তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে, তা মাথায় রেখে এই ব্যবস্থাকে নিশ্ছিদ্র করা অপরিহার্য। এছাড়া, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো শহর ও প্রান্তিক অঞ্চলের স্কুলগুলোর মধ্যে অবকাঠামোগত ও মানগত পার্থক্য বিদ্যমান। পাঠ্যক্রম একই হলেও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের গুণগত মান সব জায়গায় সমান নয়। ফলে প্রশ্নপত্র অভিন্ন হলেও, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির স্তরে যে ভিন্নতা রয়েছে—তা কীভাবে এই মূল্যায়ন ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হবে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন।
পাবলিক পরীক্ষায় এই রূপান্তর কেবল প্রশ্নপত্রের পরিবর্তন নয়, বরং এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও জবাবদিহিমূলক করার একটি সুযোগ। যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন অভিন্ন প্রশ্নপত্র শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো বাড়তি মানসিক চাপের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। পরীক্ষার্থীদের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা আতঙ্কের পরিবর্তে আত্মবিশ্বাসের সাথে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। এজন্য পরীক্ষার পদ্ধতিগত সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা আবশ্যক।
পরিশেষে বলা যায়, পাবলিক পরীক্ষায় অভিন্ন প্রশ্নপত্রের উদ্যোগ শিক্ষাব্যবস্থায় সমতা, স্বচ্ছতা এবং ন্যায়ভিত্তিক মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই সিদ্ধান্তের পেছনের উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এর স্থায়িত্ব ও সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা এবং চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় আমাদের সক্ষমতার ওপর। যদি আমরা পরীক্ষাসংক্রান্ত এই পরিবর্তনকে একটি সামগ্রিক শিক্ষাসুযোগের সমতা তৈরির অংশ হিসেবে গণ্য করতে পারি, তবেই এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। শিক্ষার্থীরাই আমাদের ভবিষ্যৎ, আর তাদের মূল্যায়নে এমন একটি ন্যায্য ও স্বচ্ছ ব্যবস্থার প্রবর্তন অবশ্যই ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ উন্মোচন করবে।
এম. আরিফুজ্জামান, সিনিয়র শিক্ষক,
মেহেউদ্দিন মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, জিয়ানগর, পিরোজপুর।
৬৪
১০০ মন্তব্য