সহকারী অধ্যাপক
০৬ জুলাই, ২০২৬ ০৪:৩১ পূর্বাহ্ণ
ইবলিস মালউন: অহংকারের অভিশাপ -মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
ইবলিস মালউন: অহংকারের অভিশাপ
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
সৃষ্টি যখন নীরব ছিল,
আকাশ ছিল স্তব্ধ,
আরশ জুড়ে জ্বলে উঠেছিল
করুণারই শব্দ।
আল্লাহ তখন আপন ইচ্ছায়
গড়লেন মানুষখানি,
মাটির বুকে প্রাণের শিখা,
রহমতেরই বাণী।
মাটি, পানি, বায়ু, আগুন—
সবই তাঁর দান,
তাঁরই আদেশে জাগল প্রাণ,
জাগল নতুন গান।
আদম নামে প্রথম মানব,
সম্মানিত সৃষ্টি,
জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর বিবেক দিয়ে
করলেন তাঁকে দৃষ্টি।
শিখিয়ে দিলেন নামসমূহ,
অজানার সব দ্বার,
জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিল
সকল সৃষ্টির পার।
ফেরেশতারা বিনয় ভরে
নমিলেন সেদিন,
আদেশ ছিল প্রভুর পক্ষ থেকে—
সিজদা করো এখনই।
সকলেই তাই মাথা নোয়ায়,
ভরে ভক্তি-প্রাণ,
একজন শুধু দাঁড়িয়ে রইল,
বুক ভরা অভিমান।
সে ইবলিস—
ইবাদতে যার
ছিল দীর্ঘ পরিচয়,
কিন্তু অন্তর ভরে রেখেছিল
অহংকারের ভয়।
বলল সে—
"আগুন আমার
সৃষ্টির প্রথম রূপ,
মাটির গড়া মানুষের কাছে
নত হব কেন কূপ?"
"আমি শ্রেষ্ঠ,
সে তো কেবল
মাটির তৈরি দেহ।"
নিজের চোখে নিজের গৌরব,
সত্যকে দিল গেহ।
ভুলে গেল সে,
আগুন-মাটি
সবই প্রভুর সৃষ্টি,
যার যা মর্যাদা, তিনিই দেন,
তাঁরই অমল দৃষ্টি।
শ্রেষ্ঠত্ব কভু উপাদানে নয়,
নয় বাহ্যিক রূপ,
আল্লাহ যাকে সম্মান দেন,
তিনিই মহান সুদূর।
কিন্তু অহংকারের কালো মেঘে
ঢেকে গেল মন,
আদেশ পেলেও মানল না সে,
হারাল চিরধন।
অবাধ্যতার সেই মুহূর্তে
কেঁপে উঠল কাল,
একটি হৃদয় পতন হলো,
নিভে গেল জ্যোতিজাল।
আল্লাহ বললেন,
"নেমে যা আজ,
রইল না আর স্থান,
তুই অভিশপ্ত,
রহমত হতে
চিরদিন নির্বাসন।"
সেদিন হতে ইবলিস হলো
মালউন, অভিশপ্ত,
নিজের দোষে নিজেই হলো
অন্ধকারে লিপ্ত।
সে বলেনি—
"প্রভু, আমি
ভুল করেছি আজ।"
বরং দোষের আগুন জ্বেলে
বাড়াল শুধু লাজ।
অহংকারে কঠিন হৃদয়
ক্ষমা চাইল না,
নিজের পাপের ভার যে ছিল
স্বীকারও করল না।
বরং বলল,
"যেহেতু আমায়
করেছ পথচ্যুত,
মানুষদেরও বিভ্রান্ত করব,
করব তাদের ভ্রষ্ট।"
শপথ নিল সে,
পথের ধারে
পাতবে কত ফাঁদ,
লোভ, প্রতারণা, হিংসা, ক্রোধ—
সবই হবে সাধ।
ডান দিক হতে,
বাম দিক হতে,
সামনে কিংবা পিছে,
মানুষ যেন ভুলে যায়
প্রভুর বাণী মিছে।
কিন্তু পারে না ইবলিস কভু
বলপ্রয়োগে টানতে,
সে কেবলই আহ্বান করে,
মানুষ নিজেই মানতে।
যে হৃদয়ের মাঝে জাগে
আল্লাহভীতি দীপ,
সে হৃদয়ে শয়তানের তীর
হয় না কখনও স্থির।
যে জিহ্বাতে জিকির ঝরে,
চোখে লজ্জার নূর,
সেই অন্তরে ইবলিস থাকে
চিরদিনই দূর।
যে মানুষটি বিনয় শিখে,
ক্ষমা করে সবে,
তারই জীবন আলোকিত হয়
রবের রহমতে।
অহংকারে রাজা হারায়
রাজমুকুটের মান,
বিনয়ে ভিখারিও পায়
সম্মানের আসন।
উঁচু বৃক্ষ ঝড়ে ভাঙে,
নত ঘাস বেঁচে রয়,
নম্র হৃদয়ই শেষ পর্যন্ত
রবের সান্নিধ্য লয়।
জ্ঞান যদি হয় অহংকারে,
অন্ধকারই বাড়ে,
জ্ঞান যদি হয় বিনয়ময়,
মানবতার দ্বারে।
ধন যদি দেয় গর্বের ভাষা,
হারায় তার মূল্য,
দান যদি হয় আল্লাহর তরে,
তবেই জীবন ফুল।
ক্ষমতা যদি মানুষকে করে
অহংকারে মত্ত,
তবে সে পথ ধ্বংসের পথ,
অশান্তিতে রত।
যে বলে—
"আমি বড়",
সে বড় নয়,
বড় সে-ই মানুষ,
যে বিনয়ে মাথা নত করে
প্রভুর অশেষ আশিস।
আদম (আ.) ভুল করেছিলেন,
তবু করলেন তওবা,
ইবলিস ভুলে অনড় রইল,
করল না প্রত্যাবর্তন।
এই দুই পথে দুই ইতিহাস,
দুই জীবনের গান—
একটি শেখায় ক্ষমা পাওয়া,
অন্যটি অপমান।
পাপের চেয়ে ভয়ংকর হলো
পাপে গর্ব করা,
ভুলের পরে ফিরে না এসে
অহংকারে সরা।
তাই হে মানুষ,
নিজেকে কভু
শ্রেষ্ঠ ভেবো না,
সব মর্যাদা আল্লাহর দান,
এ সত্য ভুলো না।
মাটি থেকেই জন্ম আমাদের,
মাটিতেই অবসান,
মাঝের জীবন আমানত শুধু,
করো তার সম্মান।
অহংকারের আগুন নিভাও
বিনয়ের অশ্রুতে,
মানবতার ফুল ফুটুক
সত্যের সুগন্ধিতে।
যে হৃদয়ে কুরআনের আলো,
সুন্নাহ যার পথ,
তার জীবনেই শান্তির ধারা,
কল্যাণেরই রথ।
ইবলিস শুধু ইতিহাস নয়,
প্রতিদিনের শিক্ষা,
নিজের ভেতর অহংকারকে
করতে হবে নিঃশেষিকা।
হৃদয় যদি নির্মল থাকে,
জাগে যদি ঈমান,
তবে সকল পথ আলোকিত হয়
রহমানেরই দান।
চল সবাই বিনয়ের পথে,
সত্য হোক অবলম্বন,
আল্লাহর হুকুম মান্য করাই
জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।
কারণ অহংকার পতনের মূল,
বিনয় উন্নতির সোপান;
রবের সন্তুষ্টিই মানুষের
সর্বোচ্চ সম্মান।
হে পরম করুণাময় আল্লাহ,
রাখো আমাদের হেফাজতে,
ইবলিসের কুমন্ত্রণা হতে
রাখো চির নিরাপদে।
অহংকার নয়,
দাও বিনয়;
ঘৃণা নয়,
দাও প্রেম;
অবাধ্যতা নয়,
দাও আনুগত্য;
আর অন্তরে দাও
তাকওয়ার অমল হেম।
যেন শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত
সত্যেই থাকি অটল,
তোমার রহমতের ছায়াতলে
হই চির সফল।
***
ইবলিস মালউন : অহংকারের অভিশাপ
সর্গ : অহংকারের অগ্নি
অহংকারের আগুন যখন
জ্বলে অন্তর-মাঝে,
মানুষ তখন সত্যকে আর
দেখতে পারে না যে।
চোখে থাকে নিজের ছায়া,
মনে মিথ্যা গরব,
অন্য সবার মর্যাদা সে
করতে থাকে ক্ষরব।
ইবলিসও সেই আগুনে
হারাল জ্ঞানের দিশা,
ইবাদতের দীর্ঘ পথে
মুছে গেল সব নেশা।
যে ছিল একদিন আসমানে
ইবাদতে প্রসিদ্ধ,
অহংকারের একটিমাত্র
বীজে হলো নিঃস্ব।
সর্গ : পতনের ধ্বনি
সেদিন যেন আকাশ কাঁদে,
নীরব হয় দিশা,
একটি প্রাণ নিজ অহমে
হারায় আলোর নিশা।
রহমতের যে দরজা ছিল
খোলা দিবা-রাত,
নিজের দোষে নিজেই সে
করল তারে আঘাত।
অবাধ্যতার মূল্য যে কত,
জানে ইতিহাস,
একটি মুহূর্ত বদলে দেয়
জীবনের সর্বনাশ।
সর্গ : মানুষের শিক্ষা
হে মানুষ, শোনো ইতিহাসের
গভীর এই বাণী,
অহংকারে কেউ হয়নি কভু
চিরমহান ধনী।
জ্ঞান যদি দেয় বিনয়ের আলো,
তবে সে জ্ঞান পবিত্র,
গর্ব যদি ঢাকে হৃদয়খানি,
তবে সে জ্ঞানই বিষাক্ত।
ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতি—
সবই ক্ষণিক ধারা,
আজ আছে যে, কাল নাও থাকতে
পারে এই সংসারা।
সর্গ : বিনয়ের মহিমা
নম্র নদী সাগর পায়,
উঁচু ঢেউ ভাঙে,
নত হৃদয় রবের কাছে
সদা শান্তি টানে।
ফলভরা যে বৃক্ষ থাকে
নত হয়ে ধরণীতে,
জ্ঞানী মানুষ তেমনি থাকে
বিনয়েরই নীতিতে।
যে মাথা নত আল্লাহর তরে,
সে মাথা উচ্চ হয়,
দুনিয়া ও পরকালের পথে
সম্মান তার রয়।
সর্গ : আদম ও ইবলিস
আদম ভুলে ক্ষমা চাইলেন,
খুলল রহমতের দ্বার,
ইবলিস ভুলে অনড় রইল,
বাড়ল অন্ধকার।
একজন শেখায়—ভুলের পরে
ফিরে আসাই জয়,
অন্যজন শেখায়—অহংকারে
মানুষ ধ্বংস হয়।
পাপের চেয়ে ভয়ংকর হলো
পাপে গর্ব ধরা,
তওবার পথ ছেড়ে দিয়ে
নিজেকে বড় করা।
সর্গ : চিরন্তন সতর্কবার্তা
ইবলিস শুধু অতীত নয়,
আজও সে ফিসফিস করে,
হৃদয়ের ভেতর অহংকারের
বীজটি বপন করে।
কখনো বলে—“তুইই শ্রেষ্ঠ”,
কখনো বলে—“আমি”,
এই ‘আমি’ শব্দ মানুষকে
করেছে কত স্বামী।
তাই নিজেকে যাচাই করো
প্রতিদিন নিরবধি,
হৃদয়ে যেন অহমিকার
না জন্মে কোনো নদী।
সমাপনী প্রার্থনা
হে পরম দয়াময় আল্লাহ,
দাও বিনয়ের মন,
দাও সত্যের পথে চলার
অটল অনুপ্রেরণ।
ইবলিসের কুমন্ত্রণা হতে
রাখো সদা দূরে,
তাকওয়ার আলো জ্বালিয়ে দাও
আমাদের অন্তঃপুরে।
যেন শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত
থাকি তোমার পথে,
অহংকার নয়, বিনয় নিয়ে
ফিরি তোমার সত্ত্বে।
কারণ মানুষের শ্রেষ্ঠ গৌরব
ধন বা জ্ঞান নয়—
আল্লাহর কাছে বিনয়ী হওয়াই
সত্যিকারের জয়। ∎
৭
৭ মন্তব্য