সিনিয়র শিক্ষক
০৬ জুলাই, ২০২৬ ০৫:০৪ পূর্বাহ্ণ
বই পড়ার আনন্দ ও প্রযুক্তির আসক্তি-১
বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ কেড়ে নিয়েছে আবেগ।
একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক যুগে বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন আমাদের জীবনযাত্রাকে করেছে অনেক সহজ, গতিময় ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। কিন্তু যেকোনো প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার মানবজীবনের স্বাভাবিক ছন্দকে ব্যাহত করে। বর্তমানে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার এক বড় সংকট হলো ‘ডিভাইস আসক্তি’ বা স্ক্রিন অ্যাডিকশন। শিক্ষার্থীরা তো বটেই, এমনকি অনেক অভিভাবকও আজ মোবাইল, ল্যাপটপ কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকছেন। প্রযুক্তির এই অপব্যবহারের ফলে সমাজ থেকে একসময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অভ্যাস হারিয়ে যেতে বসেছে—তা হলো বই পড়া। মানুষ এখন স্ক্রিন স্ক্রল করতে যত সময় ব্যয় করে, বইয়ের পাতা ওল্টাতে তার এক শতাংশ সময়ও দিতে চায় না। অথচ মানুষের চিন্তাশক্তি ও চেতনার বিকাশে বইয়ের কোনো বিকল্প নেই।
স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা আজ নতুন প্রজন্মের সামনে বিনোদনের এক কৃত্রিম জগৎ খুলে দিয়েছে। ফলে পড়াশোনা বা অবসর সময়ে শিক্ষার্থীরা বইয়ের চেয়ে বিভিন্ন গেম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। এই ক্ষতিকর অভ্যাসের প্রভাব পড়ছে অভিভাবকদের ওপরেও। যে পরিবারে বড়রা সারাক্ষণ মোবাইলে ব্যস্ত থাকেন, স্বাভাবিকভাবেই সেই পরিবারের সন্তানরাও বইয়ের চেয়ে ডিভাইসের প্রতি বেশি আসক্ত হয়ে পড়ে। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে যৌথ আড্ডায় বই নিয়ে আলোচনা কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে গল্প শোনার সুন্দর ঐতিহ্যগুলো। এই আসক্তি মানুষের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা (Attention Span) কমিয়ে দিচ্ছে এবং গভীর চিন্তাভাবনা করার সহজাত গুণকে ধ্বংস করছে।
বই পড়ার আনন্দ যেকোনো জাগতিক আনন্দের চেয়ে আলাদা এবং অনেক বেশি গভীর। প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন, "বই পড়ার শখটা মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ শখ হলেও আমি কাউকে বই পড়তে পরামর্শ দিতে চাইনে।" কারণ এই আনন্দ জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না, এটি ভেতর থেকে অনুভব করতে হয়। একটি চমৎকার বই পড়ার সময় পাঠক কেবল অলস সময় কাটায় না, বরং সে লেখকের ভাবনার সাথে একাত্ম হয়ে এক কাল্পনিক জগতে ঘুরে বেড়ায়। বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠা ওল্টানোর মধ্যে যে রোমাঞ্চ এবং কৌতূহল লুকিয়ে থাকে, তা কোনো স্ক্রিনের যান্ত্রিক স্ক্রলিংয়ে পাওয়া অসম্ভব। সাহিত্য, কবিতা কিংবা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর একেকটি বই মানুষকে সাময়িক সময়ের জন্য দৈনন্দিন জীবনের সব ক্লান্তি ও মানসিক চাপ থেকে দূরে রেখে এক অনাবিল প্রশান্তি দেয়। বই হলো জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার এক নীরব মহাসমুদ্র। যুগে যুগে শ্রেষ্ঠ মনীষী, বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদদের জীবনদর্শন এবং গবেষণার নির্যাস জমা হয়ে থাকে বইয়ের পাতায়। একটি ভালো বই পড়ার মাধ্যমে আমরা ঘরে বসেই অতীত ইতিহাস, ভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও মানব সভ্যতার বিবর্তন সম্পর্কে জানতে পারি। এটি মানুষের শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে, ভাষাগত দক্ষতা বাড়ায় এবং যেকোনো বিষয়কে যুক্তি দিয়ে বিচার করার ক্ষমতা তৈরি করে। প্রযুক্তির ছড়াছড়ি হয়তো আমাদের তাৎক্ষণিক তথ্য দিতে পারে, কিন্তু গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা কেবল বই পড়ার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব।
তাই তথ্য প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বর্জন করা সম্ভব নয় এবং তা যৌক্তিকও নয়। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন আসক্তিতে রূপ না নেয়, সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে পরিবারকে। অভিভাবকদের উচিত নিজেরা মোবাইলের ব্যবহার কমিয়ে সন্তানের সামনে বই পড়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। প্রযুক্তির এই যান্ত্রিক যুগে যদি আমরা আবার বই পড়ার আনন্দকে ফিরিয়ে আনতে পারি, তবেই একটি সংবেদনশীল, রুচিশীল ও প্রজ্ঞাবান সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এছাড়া বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষণীয় - এ ব্যাপারে লেখক অত্যন্ত সুচারুরূপে উপস্থাপন করেছেন-"প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে কিন্তু বইখানা এক অনন্ত যৌবনা যদি তেমন বই হয়"। তাই একটি ভালো বই মানুষের পরম বন্ধু, যা কখনো প্রতারণা করে না। রুশ কথা সাহিত্যিক তলস্তয় এর একটি উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করতে চাই মানুষের জীবনে তিনটি জিনিসের প্রয়োজন বই, বই এবং বই।
১৪
২৪ মন্তব্য