Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ জুলাই, ২০২৬ ০৭:৫৩ অপরাহ্ণ

রক্তের বাঁধন ও নীরব ঘাতক: বিশ্ব জুনোসিস দিবসের আলোয় মানুষ ও প্রকৃতি


​আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীতে মানুষ আর অন্য সব জীবজন্তু একে অপরের প্রতিবেশী। আদিমকাল থেকেই গ্রামীণ খামারে গবাদি পশুর নিবিড় সান্নিধ্য কিংবা আধুনিক নাগরিক জীবনে ঘরে পোষা বিড়াল-কুকুরের প্রতি ভালোবাসা—প্রাণিজগতের সাথে মানুষের এই সম্পর্ক বেশ গভীর। কিন্তু এই ভালোবাসার আড়ালেই কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে এক অদৃশ্য শত্রু। যখন কোনো রোগ বা জীবাণু প্রাকৃতিকভাবে পশুপাখির শরীর থেকে মানুষের দেহে ছড়িয়ে পড়ে, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলা হয় 'জুনোটিক ডিজিজ' বা জুনোসিস। আমাদের চেনা-অচেনা এই রোগগুলো সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতেই প্রতি বছরের ৬ই জুলাই বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব জুনোসিস দিবস।

​ইতিহাসের পাতা ওল্টালে আমরা দেখতে পাই, ১৮৮৫ সালের এই বিশেষ দিনটিতেই বিখ্যাত ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক স্থাপন করেছিলেন। তিনি প্রথমবারের মতো এক বালকের শরীরে সফলভাবে জলাতঙ্কের প্রতিষেধক বা টিকা প্রয়োগ করেন, যা তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়। সেই যুগান্তকারী আবিষ্কারের দিনটিকে স্মরণ করেই আজকের এই সচেতনতা উদ্যোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, মানুষের দেহে হওয়া মোট সংক্রামক রোগের অর্ধেকেরও বেশি আসে প্রাণিজগৎ থেকে। ইবোলা, বার্ড ফ্লু, অ্যানথ্রাক্স কিংবা আমাদের খুব পরিচিত জলাতঙ্কের মতো মারাত্মক সব ব্যাধি মূলত প্রাণীদের মাধ্যমেই মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এমনকি শীতের সকালে যে মধুর খেজুরের রস আমরা পরম তৃপ্তিতে পান করি, তাও বাদুড়ের লালা বা মলের মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাসের মতো প্রাণঘাতী রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

​এই রোগগুলো সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর সরাসরি সংস্পর্শে আসলে, তাদের লালা বা রক্তের মাধ্যমে, কিংবা ভালোভাবে সেদ্ধ না করা মাংস ও কাঁচা দুধ পানের মাধ্যমে ছড়ায়। তবে আশার কথা হলো, একটুখানি সতর্কতা এবং জীবনযাত্রায় সামান্য কিছু নিয়মানুবর্তিতা মেনে চললেই এই অদৃশ্য বিপদ থেকে নিজেদের পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। পশুপাখি বা খামারের সংস্পর্শে আসার পর সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধোয়ার অভ্যাস করা এবং ঘরের পোষা কুকুর-বিড়ালকে নিয়মিত সরকারি নিয়ম মেনে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে বন্যপ্রাণী থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং অবৈজ্ঞানিক উপায়ে সংগৃহীত কাঁচা ফলমূল বা রস খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। যদি কখনো কোনো প্রাণী কামড়ে বা আঁচড়ে দেয়, তবে অবহেলা না করে দ্রুত সাবান-পানি দিয়ে ক্ষতস্থান ধুয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন নেওয়া জীবনের জন্য সবচেয়ে বড় ঢাল হতে পারে।

​বিশ্ব জুনোসিস দিবসের মূল তাৎপর্য হলো এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের স্বাস্থ্য কখনোই একা সুরক্ষিত থাকতে পারে না। মানুষ, প্রকৃতি এবং প্রাণিজগৎ—সবাই একই সুতোয় গাঁথা। যেকোনো একটির ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব বাকিদের ওপরও পড়বে। তাই আসুন, জীবজগতের প্রতি নিষ্ঠুর না হয়ে তাদের সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করি, নিজে সচেতন হই এবং একটি সুস্থ ও রোগমুক্ত পৃথিবী গড়ে তুলি।

মন্তব্য করুন