সহকারী অধ্যাপক
০৭ জুলাই, ২০২৬ ০৬:২৯ অপরাহ্ণ
মানুষের আসল পরিচয় (অহংকার নয়, মানবতার জয়গান) - মোঃ মুজিবুর রহমান
মানুষের আসল পরিচয়
(অহংকার নয়, মানবতার জয়গান)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
চকমকে পোশাক দেখে
মানুষটাকে মাপো না কখনো;
হাসির আড়ালে কত কান্না থাকে,
চোখে তা ধরা পড়ে না।
উঁচু অট্টালিকার জানালায়
সব সময় সুখের আলো জ্বলে না;
কুঁড়েঘরের প্রদীপও কখনো
আকাশভরা নক্ষত্রের মতো দীপ্ত হয়।
অর্থের ঝলকানিতে
মানুষের মর্যাদা মাপা যায় না;
সোনার আংটি আঙুলে থাকলেই
হৃদয় সোনার হয়ে ওঠে না।
যে মানুষ বিনয়ে নত,
ক্ষমায় যার হৃদয় ভরা,
সত্যকে যে ভালোবাসে,
অন্যের দুঃখে যে কাঁদে—
সেই তো প্রকৃত ধনী।
অহংকারের প্রাসাদ
একদিন ধুলোর সঙ্গে মিশে যায়;
বিনয়ের ছোট্ট ঘরটি
যুগের পর যুগ মানুষের মনে থাকে।
কারও মুখের ভাষা সরল,
তাই বলে তাকে ছোট ভেবো না;
অল্প কথার মানুষও
গভীর প্রজ্ঞার আধার হতে পারে।
যে কৃষক রোদে পুড়ে
ধানের শীষে স্বপ্ন ফলায়,
তার ঘামের প্রতিটি বিন্দুতে
একটি জাতির ভবিষ্যৎ লুকিয়ে থাকে।
যে শ্রমিক ভোরের আলোয়
ইটের পর ইট সাজায়,
তার হাতেই গড়ে ওঠে
সভ্যতার দৃঢ় ভিত্তি।
যে শিক্ষক নীরবে
অক্ষরের প্রদীপ জ্বালান,
তার হাতে তৈরি হয়
আগামীর আলোকিত মানুষ।
যে মা সন্তানের জন্য
নিঃশব্দে রাত জাগেন,
তার ত্যাগের মূল্য
কোনো মুদ্রায় মাপা যায় না।
যে বাবা নিজের স্বপ্ন ভেঙে
সন্তানের স্বপ্ন গড়েন,
তিনি নীরব বটবৃক্ষ—
ছায়া দেন, দাবি করেন না কিছুই।
মানুষকে দেখো তার ব্যবহারে,
তার দৃষ্টির কোমলতায়;
তার কথার সততায়,
তার প্রতিশ্রুতির দৃঢ়তায়।
বাহ্যিক রূপ বদলে যায়,
যৌবন একদিন ফুরিয়ে যায়;
অর্থ আসে, অর্থ যায়,
ক্ষমতার আসনও স্থায়ী নয়।
কিন্তু চরিত্র—
সেটিই মানুষের প্রকৃত পরিচয়;
সততা—
সেটিই তার অমল অলংকার।
কাউকে হেয় করলে
নিজে বড় হওয়া যায় না;
অন্যকে সম্মান দিলে
নিজের সম্মানই বৃদ্ধি পায়।
তুচ্ছ করার ভাষা
হৃদয়ের দরজা বন্ধ করে;
ভালোবাসার ভাষা
অচেনাকেও আপন করে।
যে নিজেকে সবচেয়ে বড় ভাবে,
সে শেখার পথ হারিয়ে ফেলে;
যে নিজেকে মানুষ ভাবে,
সে প্রতিদিন নতুন আলো খুঁজে পায়।
মেঘ যতই উঁচুতে উঠুক,
শেষে তাকে বৃষ্টি হয়ে নামতেই হয়;
গাছ যত ফলবান হয়,
ততই মাথা নত করে।
প্রকৃতি প্রতিদিন শেখায়—
বিনয়েই সৌন্দর্য,
নম্রতাতেই মহিমা,
সেবাতেই শ্রেষ্ঠত্ব।
ধনী হও,
কিন্তু হৃদয়ে অহংকার রেখো না।
জ্ঞানী হও,
কিন্তু কাউকে অজ্ঞ ভেবে অপমান করো না।
শক্তিমান হও,
কিন্তু দুর্বলকে পদদলিত করো না।
সম্মানিত হও,
কিন্তু সম্মান কেড়ে নিয়ে নয়—
সম্মান দিয়ে।
একদিন পৃথিবীর সব পরিচয়
পিছনে পড়ে থাকবে;
থেকে যাবে শুধু কর্ম,
থেকে যাবে শুধু চরিত্র।
যে মানুষ অন্যের মুখে
হাসি ফোটায়,
সে পৃথিবীর বুকে
অমর হয়ে থাকে।
যে মানুষ বিভেদ নয়,
সম্প্রীতির বীজ বোনে,
সে-ই আগামী দিনের
সত্যিকার নির্মাতা।
চল আমরা এমন মানুষ হই—
যে কাউকে অবহেলা করে না,
দারিদ্র্য দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয় না,
পোশাক দেখে বিচার করে না,
পদমর্যাদা দেখে সম্মান দেয় না।
সম্মান দেব মানুষকে,
কারণ সে মানুষ।
ভালোবাসব মানুষকে,
কারণ সে আল্লাহর সৃষ্টি।
শিখব বিনয়,
ত্যাগ করব অহংকার।
সত্যকে করব আপন,
মিথ্যা গৌরবকে করব পরিত্যাগ।
হৃদয় হবে নির্মল নদী,
বাক্য হবে শীতল বাতাস,
আচরণ হবে প্রস্ফুটিত ফুলের মতো,
চরিত্র হবে সুবাসিত চন্দনের মতো।
তখনই পৃথিবী হবে সুন্দর,
মানুষ মানুষকে আপন বলবে;
বিদ্বেষের দেয়াল ভেঙে
ভ্রাতৃত্বের সেতু গড়ে উঠবে।
মর্যাদার মুকুট মাথায় নয়,
থাকে মানুষের হৃদয়ে।
শ্রেষ্ঠত্বের আসন সম্পদে নয়,
থাকে সৎকর্মের মহিমায়।
মানুষের আসল পরিচয়
তার রূপে নয়, রক্তে নয়, বংশে নয়—
তার বিবেকে, তার চরিত্রে,
তার বিনয়ে, তার মানবতায়।
এই হোক আমাদের অঙ্গীকার—
কাউকে তুচ্ছ করব না,
নিজেকে বড় ভাবব না;
মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসব,
সত্য, ন্যায়, দয়া ও বিনয়ের পথে চলব।
কারণ মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়—
সে মানুষ;
আর মানুষের সবচেয়ে বড় অলংকার—
তার সুন্দর চরিত্র।
***
মানুষের মহিমা
(অহংকারের অবসান, বিনয়ের জয়গান)
মানুষকে মানুষ বলে দেখো,
পোশাক দেখে নয়;
হৃদয়ের দীপ জ্বেলে দেখো,
রূপের মোহে নয়।
দালান যত আকাশ ছোঁয়,
মন কি তত উঁচু হয়?
অহংকারের রাজমুকুট
ক্ষণেই ধুলায় লুটিয়ে রয়।
সোনার অলংকারে কখনো
সোনার হৃদয় গড়ে না;
মধুর ভাষা, সৎ আচরণ—
তাই মানুষকে বড় করে।
যার চোখ ভরা দয়া-মায়া,
যার কণ্ঠ সত্যে দীপ্ত,
যার হাতে সেবার অঞ্জলি,
সেই মানুষ সত্যে পূত।
কৃষকের ঘামে ফসল ফলে,
শ্রমিক গড়ে নগর;
শিক্ষকের হাতে জ্বলে ওঠে
জাতির আলোকঘর।
মায়ের নিঃশব্দ ত্যাগের কাছে
ম্লান হয় রাজমুকুট;
বাবার ঘামে লেখা থাকে
সন্তানের ভবিষ্যৎ।
দেখো না কার গায়ে কী আছে,
দেখো তার হৃদয়খানি;
বাহিরেতে যে সাধারণ,
ভেতরে সে রত্নভাণ্ডারই।
বংশের গৌরব ক্ষণস্থায়ী,
ধনের দম্ভও ক্ষয়;
চরিত্র যদি অটল থাকে,
মানুষ অমর হয়।
অহংকারের আগুন জ্বেলে
জয় কখনো আসে না;
বিনয়ের শিশিরবিন্দু
শুষ্ক প্রাণকে হাসায় না?
ফলভরা বৃক্ষ নত হয়ে
নীরব শিক্ষা দেয়;
যে যত বড়, সে তত বেশি
বিনয় বুকে নেয়।
নদী কখনো উচ্চস্বরে
নিজের কথা কয় না;
সাগরের বুক ভরিয়ে দিয়ে
নিঃশব্দেই বয়ে যায়।
সূর্য প্রতিদিন আলো বিলায়,
চায় না কোনো মান;
মানুষ যদি তেমনি হতো,
আলোকিত হতো প্রাণ।
হে মানুষ, মানুষকে ভালোবাসো,
ঘৃণার দেয়াল ভাঙো;
অপরের সুখে হাসতে শেখো,
দুঃখে কাঁধটি দাও।
শ্রেষ্ঠ সে নয়, ধনে যে বড়,
শ্রেষ্ঠ সে নয়, রূপে;
শ্রেষ্ঠ সেই, যে সত্য আঁকড়ে
চলে জীবনের রূপে।
যে ক্ষমা করে, সে-ই বীর;
যে দয়া করে, সে মহান;
যে বিনয়ে নত হতে জানে,
তারই জয়গান।
চোখে যদি থাকে করুণা,
মুখে যদি থাকে সত্য,
আচরণে যদি ফুটে ওঠে
মানবতার মহত্ত্ব—
তবেই মানুষ মানুষ হবে,
মুছে যাবে বিভেদ;
ভ্রাতৃত্ব হবে জীবনের গান,
মিটে যাবে সব ভেদ।
মর্যাদা নয় সিংহাসনে,
মর্যাদা সৎকাজে;
অলংকার নয় বাহিরেতে,
অলংকার অন্তর-মাঝে।
এসো তবে শপথ করি—
কাউকে করব না হেয়;
প্রত্যেক প্রাণে দেখব আমরা
স্রষ্টার দানের ঔজ্জ্বল্য।
চরিত্র হবে জীবনের দীপ,
বিনয় হবে পথ;
মানবতা হবে পরিচয়,
সত্য হবে রথ।
যে মানুষ মানুষকে ভালোবাসে,
সে-ই সত্য মহীয়ান;
অহংকার নয়, বিনয়ই হোক
জীবনের চিরজয়গান।Top of
FormBottom of Form
২
৪ মন্তব্য