সহকারী অধ্যাপক
০৮ জুলাই, ২০২৬ ০৩:৫৪ পূর্বাহ্ণ
বিজয়ের পরে বিনয়ের গান - মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
বিজয়ের পরে বিনয়ের গান
(সূরা আন-নাসরের আলোকে)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
যখন নামে আসমান ভরে
রহমতেরই নূর,
যখন সত্য জাগায় পৃথিবী,
মুছে মিথ্যার সুর।
যখন আসে আল্লাহর সাহায্য,
বিজয় হাসে দ্বারে,
ভেঙে পড়ে অন্যায় যত
সত্যের দীপ্তিধারে।
যখন দেখি মানুষেরা সব
দলে দলে আসে,
আল্লাহরই দীনের ছায়ায়
বিশ্বাসেরই পাশে।
কেউ আর থাকে না বিভ্রান্ত,
মুছে যায় অন্ধকার,
ঈমানেরই আলো জ্বলে
ঘরে ঘরে অপার।
তখন কি আর অহংকারে
উঁচু হবে শির?
তখন কি আর বলবে মানুষ—
"আমিই সবচেয়ে বীর?"
না, তখনই তো মাথা নত
রবের দরবারে,
বিজয় যাঁর দানে আসে,
তাঁরই অনুগ্রহে।
যে সফলতা মানুষের নয়,
যে কীর্তি তাঁর দান,
সেই কৃতজ্ঞ হৃদয় ভরে
হোক তাসবীহের গান।
বলো তবে—
সুবহানাল্লাহ!
সকল দোষের ঊর্ধ্বে তিনি।
আলহামদুলিল্লাহ!
সব প্রশংসা কেবল তিনি।
ক্ষমতার সব উৎস তিনি,
জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলো,
তাঁরই দয়ায় জীবন জাগে,
তাঁরই কৃপায় ভালো।
যে জয় এল আজ আমাদের,
তাঁরই ছিল দান,
একটি কণাও নিজের নয়,
তাঁরই অনুগ্রহ মহান।
জয় যদি হয় বিনয়হীন,
সে তো ভয়ের পথ,
অহংকারে ভেঙে যায় যে
সৌভাগ্যের রথ।
ইবলিসও তো হারিয়েছিল
অহমিকার তরে,
নম্র হৃদয় রক্ষা পায়
রবের স্নেহঘরে।
তাই বিজয়ের শিখর ছুঁয়েও
নম্র হও নিরন্তর,
বুক ভরে বল—
হে আল্লাহ!
তুমিই আমার কর্ণধার।
ক্ষমা চাই আমি
হাজার ভুলের,
হাজার অজানা পাপ,
ক্ষমা চাই আমি
অবহেলার,
অহংকারের চাপ।
যে আমলেতে ছিল ত্রুটি,
যে কথাতে ক্ষতি,
ক্ষমা করো, হে দয়াময়,
তুমিই পরম গতি।
বিজয়ের দিনে ভুলে যেও না
শেষের সেই ডাক,
প্রতিটি প্রাণকেই ফিরতে হবে
মৃত্যুর অনিবার্য ফাঁক।
এই দুনিয়া কর্মের ক্ষেত্র,
চিরবাস নয় কভু,
যাত্রাপথের শেষ প্রান্তে
ডাকবেন মহান রব।
নবীজীরও এল সে ক্ষণ,
পূর্ণ হলো দায়,
দীনের বাণী পৌঁছে দিয়ে
ফিরলেন আপন ঠাঁই।
তখন নেমে এল নির্দেশ
করো তাসবীহ আরও,
ইস্তিগফারে ভরিয়ে দাও
দিনের প্রতিটি প্রহর।
সালাত শেষে অশ্রুভেজা
দোয়ার কোমল সুর,
ক্ষমা চেয়ে কাটত তাঁর
রাতের নিঃশব্দ নূর।
উঠতে বসতে জপতেন তিনি
রবের পবিত্র নাম,
ক্ষমার আশায় নত হৃদয়ে
জ্বলত প্রেমের ধাম।
এই তো শিক্ষা,
জীবনভর
কর্মে থেকো দৃঢ়,
শেষ প্রহরে
রবের পানে
হও আরও নিবিড়।
যে যত বড় জয়ই পাক,
ভুলে যেও না তাই—
জয়ের মালিক মহান আল্লাহ,
মানুষ কেবল ভাই।
ক্ষমা চাও,
প্রশংসা করো,
ভালোবাসো সত্য,
এই তিনটিতেই লুকিয়ে আছে
জীবনের মহত্ত্ব।
বৃদ্ধ হলে,
শক্তি ক্ষীণ হলে,
থেমে যেও না আর,
জিকিরে ভরাও নিশিদিন,
কুরআনেরই দ্বার।
শিশুকে শেখাও
বিজয় মানে
অহংকার নয় মোটে,
বিজয় মানে
সিজদা ভরা
কৃতজ্ঞ হৃদয় হতে।
যুবক শিখুক
ক্ষমা চেয়ে
নম্রতারই গান,
বৃদ্ধ শিখুক
হাসিমুখে
আখিরাতের টান।
নেতা শিখুক
ক্ষমতা পেয়ে
ন্যায়ের পথে চলা,
ধনী শিখুক
সম্পদ পেয়ে
দরিদ্রকে আপন বলা।
শিক্ষক শিখুক
জ্ঞান বিলিয়ে
নিজে হও বিনয়ী,
ছাত্র শিখুক
সফল হয়েও
না হও আত্মগর্বী।
পরিবারে
শান্তি ফুটুক,
ভালোবাসার ফুল,
ক্ষমা চেয়ে
ক্ষমা দিয়ে
মুছে যাক সব ভুল।
সমাজজুড়ে
ছড়িয়ে পড়ুক
ইস্তিগফারের ডাক,
তাসবীহ ভরা
জীবন গড়ুক
প্রতিটি মানবহৃদয় পাক।
হে পরম দয়ালু,
যেদিন তুমি
ডাকবে শেষবার,
সেদিন যেন
ঠোঁটে থাকে
তোমারই জিকিরধার।
শেষ নিশ্বাসে
হৃদয় ভরে
ক্ষমা চাই নির্ভয়,
তোমার রহমতেই হোক
আমার চূড়ান্ত জয়।
জীবন শেষে
আমলনামায়
রহমতেরই ছাপ,
তোমার কৃপায়
মুছে যাক সব
অগণিত পাপ।
বিজয় শেষে
তাসবীহ হোক,
ইস্তিগফার সাথি,
নম্র হৃদয়
চিরদিন থাক
রবের ভালোবাসাতে।
যখন আসবে
আল্লাহর সাহায্য,
খুলবে বিজয়দ্বার,
তখন যেন
প্রথম উচ্চারণ—
"সকল প্রশংসা আমার রবের!"
যখন পূর্ণ হবে
জীবনের কাজ,
শেষ হবে কর্মযাত্রা,
তখন যেন
হৃদয় জুড়ে বাজে—
"হে আল্লাহ!
ক্ষমা করো,
তুমিই তো পরম তাওবা কবুলকারী।"
এই হোক আমাদের জীবন,
এই হোক অন্তিম গান,
তাসবীহ, হামদ ও ইস্তিগফারে
আলোকিত হোক প্রাণ।
রবের সন্তুষ্টি
হোক চিরলক্ষ্য,
বিনয়ে ভরে মন,
বিজয়ের চেয়েও বড় যে দান—
রবের ক্ষমা ও অনুগ্রহণ।
***
নাসরের আহ্বান
যখন নামে নাসরের বাণী আসমানের নীল দুয়ারে,
রহমতেরই সুবাতাস বই বিশ্বজগতের কূলে কূলে;
অন্ধকারের দীর্ঘ রাত্রি বিদায় নেয় নীরব সুরে,
সত্য তখন সূর্য হয়ে ওঠে মানবহৃদয়-মূলে।
আল্লাহরই সাহায্য যখন নেমে আসে বিজয়রথে,
মিথ্যার যত দুর্গপ্রাচীর ধুলোর সাথে মিশে যায়;
অত্যাচারের কালো মেঘে বিদ্যুতেরই দীপ্তি ফেলে
হকের পতাকা দিগন্তজোড়া নব আলোর গান গায়।
দেখো তখন মানবসমুদ্র দলে দলে ছুটে আসে,
এক আল্লাহর দীনের ডাকে জেগে ওঠে বিশ্বপ্রাণ;
ভাঙে বিভেদ, মুছে যায় সব কুসংস্কারের শৃঙ্খল,
ঈমান যেন প্রস্ফুটিত এক অফুরন্ত ফুলবাগান।
এই কি তবে অহংকারের বিজয়মালা পরার ক্ষণ?
এই কি তবে আত্মগর্বে বুক উঁচিয়ে চলার দিন?
না, এ সময় সিজদাভরা বিনয়মাখা অশ্রুনয়ন,
রবের নামে নত কপালে জাগে অনন্ত কৃতজ্ঞ ঋণ।
যিনি দিলেন শক্তি, সাহস, যিনি দিলেন জয়ের আলো,
তাঁরই নামে উচ্চারিত হোক প্রশংসার অফুরান সুর;
তাঁরই নামে কম্পিত হোক হৃদয়ভরা প্রতিটি স্পন্দন,
তাঁরই নামে পবিত্র হোক জীবনের প্রতিটি নূর।
বল—
সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি।
পবিত্র তিনি, প্রশংসা তাঁর;
বল—
আস্তাগফিরুল্লাহ ওয়া আতূবু ইলাইহ।
ক্ষমাই আমার চির-অলংকার।
বিজয় যত বড়ই হোক, মানুষ তত ক্ষুদ্র হয়,
যদি না সে চিনতে শেখে অনুগ্রহের উৎসধারা;
ফুলে ওঠা শস্যদানা যেমন নত হয়ে থাকে,
পূর্ণ হৃদয় তেমনি নত হয় রবের দরবারে সারা।
খালি শীষই মাথা তোলে অহংকারের ঝড়ে,
পূর্ণ শীষ নত হয়ে দেয় বিনয়ের পরিচয়;
জ্ঞানী হৃদয় নত হয় যত, ততই সে মহীয়ান,
বিনয়হীন সাফল্য কভু আনে না সত্য জয়।
রাসূলের সেই পবিত্র জীবন শেখায় অমল পাঠ—
দায়িত্ব যখন পূর্ণ হবে, শেষ হবে কর্মধারা,
তখন নয় উল্লাসধ্বনি, নয় গর্বের অট্টহাসি,
তখন শুধু তাসবীহধ্বনি, ইস্তিগফারের অশ্রুধারা।
সালাত শেষে নীরব কণ্ঠে কেঁদে কেঁদে বলতেন তিনি,
“হে আমার রব! ক্ষমা করো, তুমিই দয়াময় মহান।”
শেষ বয়সের প্রতিটি ক্ষণে বাড়িয়েছেন ইবাদত,
শিখিয়েছেন—শেষ যাত্রাতেই চাই সর্বোচ্চ অবদান।
জীবন একটি আমানত মাত্র, কর্ম একটি সোপান,
সময় নদীর স্রোত বয়ে যায় ফিরে আসে না আর;
আজ যে শক্তি, কাল সে স্মৃতি; আজ যে হাসি, কাল নীরব,
চিরস্থায়ী কেবল রবের রহমতের অবারিত দ্বার।
হে মানুষ!
সফল হলে ভুলো না কৃতজ্ঞতার ভাষা,
ক্ষমতাবান হলে ভুলো না দুর্বলের অশ্রুবিন্দু;
জ্ঞানী হলে ভুলো না সেই অজ্ঞতার প্রারম্ভকাল,
ধনী হলে ভুলো না ক্ষুধার্ত শিশুর করুণ সিন্ধু।
হে শিক্ষক!
জ্ঞানকে করো আলোর প্রদীপ, অহংকারের নয়;
হে ছাত্র!
সাফল্যের শিখরে গিয়েও থেকো বিনয়ময়।
হে নেতা!
ন্যায়ের পথে চল, ক্ষমতাকে করো আমানত;
হে মুমিন!
প্রতিটি শ্বাসে জপো—রবই আমার একমাত্র আশ্রয়।
যেদিন শেষ বিকেলের আলো নিভে যাবে নীরবতায়,
যেদিন জীবনপুস্তকের শেষ পৃষ্ঠা খুলবে ধীরে,
সেদিন যেন ঠোঁটে থাকে তাসবীহের মধুর ধ্বনি,
ক্ষমাপ্রার্থনার অশ্রুবিন্দু গড়ায় নিবিড় নীরব নীড়ে।
আমাদের শেষ পরিচয় হোক বিনয়ের সুশোভন চাদর,
আমাদের শেষ সম্পদ হোক ইস্তিগফারের অফুরান ধন;
আমাদের শেষ উচ্চারণ হোক রবের পবিত্র মহিমা,
আমাদের শেষ আশ্রয় হোক তাঁর অসীম ক্ষমার চরণ।
হে তাওবা কবুলকারী!
বিজয়ের উল্লাসে যেন না ভুলি তোমার দরবার;
আমাদের অন্তর ভরে দাও হামদ, তাসবীহ ও ইস্তিগফারে,
আর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত রেখো তোমারই অনুগত বান্দার কাতারে।
***
নাসরের মহাকাব্য
যখন নেমে আসে নাসরের বাণী
আকাশভরা আলো হয়ে,
দিগন্ত জুড়ে সত্যের সূর্য
উদিত হয় নব প্রভাতে।
যখন খুলে যায় বিজয়দ্বার,
মুছে যায় সব ভয়ের রাত,
অত্যাচারের কালো মেঘে
জ্বলে ন্যায়ের দীপ্ত প্রভাত।
যখন মানুষ দলে দলে
ফিরে আসে সত্যপথে,
ঈমান যেন নদীর স্রোতে
বয়ে চলে হৃদয়রথে।
যখন মসজিদের মিনারে
ধ্বনিত হয় তাওহিদের গান,
পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে
রহমতেরই সুবাস-প্রাণ।
তখন নয় গর্বের ভাষণ,
নয় বিজয়ের অহংকার,
নত কপালে সিজদা হয়ে
উচ্চারিত হয় রবের নাম।
যিনি দিলেন শক্তির দান,
যিনি দিলেন ধৈর্যের বল,
যিনি দিলেন বিজয়ের সুখ,
তাঁরই কৃপায় সফল ফল।
সকল প্রশংসা তাঁরই প্রাপ্য,
তাঁরই নামে জাগে গান,
মানুষ কেবল কর্মের পথে
চলে তাঁরই দয়ার টান।
হে হৃদয়!
ভুলো না আজ,
জয় কখনো নিজের নয়;
রবের দানে জয় আসে,
রবের দানেই সত্য জয়।
নদী যেমন সাগরে মিশে
হারায় নিজের পরিচয়,
তেমনি মানুষ রবের কাছে
বিনয় শিখে পায় বিজয়।
যে বৃক্ষ ফলে নত হয়ে যায়,
সে-ই তো সত্য মহীয়ান,
অহংকারে শুকায় শাখা,
বিনয়ে ফলে জীবন-প্রাণ।
তাই বলো আজ—
সুবহানাল্লাহ।
সব অপূর্ণতার ঊর্ধ্বে তিনি।
আলহামদুলিল্লাহ।
সব প্রশংসা কেবল তিনি।
আর বলো—
আস্তাগফিরুল্লাহ।
ভুলের ভারে নত প্রাণ,
ক্ষমার সাগর খুলে দাও,
হে পরম দয়াময় মহান।
নবীজীর জীবনের শেষে
নেমে এলো নাসরের বাণী,
পূর্ণ হলো দাওয়াতের দায়,
শেষ হলো কর্মের কাহিনি।
তখন তিনি শিখিয়ে গেলেন—
বিজয়ের চেয়ে বড় যে ধন,
তাসবীহভরা কৃতজ্ঞ হৃদয়,
ইস্তিগফারে স্নিগ্ধ জীবন।
সালাত শেষে অশ্রুভেজা
কণ্ঠে উঠত বিনয়গান,
ক্ষমা চেয়ে জ্বলত অন্তর,
রবের প্রেমে অফুরান।
দিনের পথে, রাতের বুকে,
চলার মাঝে, নীরব ক্ষণে,
রবের জিকির ফুটত সদা
হৃদয়েরই গোপন বনে।
এই তো শিক্ষা,
জীবনভর
সফল হলেও নত হও;
শেষ প্রহরে
রবের ডাকে
অশ্রুভেজা মন দাও।
জীবন ক্ষণিক,
সময় নদী,
ফিরে আসে না একবার;
যে প্রভাত আজ
হাসি নিয়ে,
সন্ধ্যা নামে অচিরেই আর।
তাই হে মানুষ,
প্রতিটি ক্ষণ
করো সৎকর্ম অবিরাম,
শেষ নিশ্বাস
যেন ভরে
রবের পবিত্র নাম।
যখন আসবে বিদায়বেলা,
থামবে জীবনের অভিযাত্রা,
ঠোঁটে যেন থাকে হামদ,
হৃদয়ে থাকে ইস্তিগফার।
শেষ পরিচয় হোক বিনয়,
শেষ সম্পদ হোক ঈমান,
শেষ উচ্চারণ—
"হে আমার রব!
ক্ষমা করো,
তুমিই পরম তাওবা কবুলকারী মহান।"
বিজয়ের শিখর পেরিয়ে শেষে
ফিরে যেতে হয় মাটির ঘরে,
রবের সন্তুষ্টি যার সাথি,
সে-ই সফল দুই জগতে।
এই হোক প্রাণের অঙ্গীকার,
এই হোক জীবনের জয়—
তাসবীহ, হামদ ও ইস্তিগফারে
রবের সন্তুষ্টিই হোক চিরপরিচয়।
১
১ মন্তব্য