Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৯ জুলাই, ২০২৬ ০১:৫৩ অপরাহ্ণ

শহরের ক্যানভাসে বৃষ্টির করুণ চিত্রকল্প

শহরের ক্যানভাসে বৃষ্টির করুণ চিত্রকল্প

বৃষ্টি এলেই এখন আর আমাদের চোখে পড়ে না খোলা জানালার গ্রামীণ সোঁদা গন্ধ। পড়ে না পুকুরের জলে টিপটিপ ফোঁটার মৃদু তরঙ্গায়িত ছন্দ। বর্ষা এখন আমাদের নগর চেতনায় এক ভয়ের নাম। আকাশ যদি কিছুক্ষণ ধরে অঝোরে ঝরতে শুরু করে, অমনি আমাদের মনের গভীরে বেজে ওঠে বিপদের সাইরেন। জলে ডুবে যাওয়া রাস্তা, থমকে দাঁড়ানো জীবন, আর অসহায় ফোন কলের আওয়াজ—এই হলো আধুনিক শহরের বর্ষার প্রতীকায়ন। কিন্তু থেমে থেমে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, এই জলাবদ্ধতার জন্য কে আসলে দায়ী?

উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা যেমন সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদের মতো আঙুল তুলি আকাশের দিকে। বলি, অতিবৃষ্টি। অথচ আমার পর্যবেক্ষণ একেবারেই ভিন্ন। বাংলার বর্ষা তার আপন মহিমায় আমাদের চিরায়ত অভ্যাস। একটানা দশ-পনেরো দিন বৃষ্টি হওয়া এ দেশের বুকে ঐতিহ্য। আজো আমরা সেই সীমা অতিক্রম করিনি। বৃষ্টি এখনো “অতি” পর্যায়ে পৌঁছায় নি। তাহলে কেন এই সর্বনাশ?

কারণ, এই নগরী তার নিজের মাটির বুক চিরে ফেলেছে। শহর এখন আর উর্বর ধাত্রী নয়; সে এক শক্ত, নির্দয়, পাষাণময়ী সভ্যতা। আমরা ইটের চাদর, পাথরের আস্তরণ আর ঢালাই সিমেন্টের প্রলেপ দিয়ে মাটির শ্বাসরোধ করেছি। একসময় বৃষ্টির জল মাটির কোলে গিয়ে আশ্রয় নিত, ভূগর্ভস্থ জলভাণ্ডারকে সঞ্জীবিত করত, প্রকৃতির সে অমৃতধারা আমরা নিজের হাতে বন্ধ করে দিয়েছি। একটি শহরের অন্তঃস্থল যদি স্পঞ্জের বদলে শিলায় পরিণত হয়, তবে সেই শহরের বুকে বৃষ্টি মানেই দুর্যোগ—এটাই স্বাভাবিক গণিত।

শুধু কী মাটি ঢেকে ফেলেছি? আমরা নগর পরিকল্পনার নামে যে জাফরি করেছি, তা আরও ভয়াবহ। নির্মাণের সময় আমাদের প্রকৌশলীদের কাছে যেমন নকশার সততা থাকে, তেমনই থাকে মানবিকতার অজুহাত। যাকে আমরা নমনীয়তা বলি, তা প্রকৃতপক্ষে নৈতিকতার দেউলিয়াত্ব। বাড়ির ঢাল কোথায় হবে, বৃষ্টির জল কোন পথে নিষ্কাশিত হবে—এই চিন্তাটা হয়ে পড়ে গৌণ। এর সাথে যোগ হয়েছে দখলবাজির সেই চিরায়ত কুসংস্কার। পাকা ড্রেনের এক ইঞ্চি জায়গা ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে সেটিকে দখল করে পাঁচ ফুট বাড়িয়ে ফেলা যেন বুদ্ধিমানের কাজ। খালগুলো ভরাট, নর্দমাগুলো সংকীর্ণ, স্বাভাবিক পানিপথগুলো আজ পঙ্গু।

এই দখলবাজির সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে প্লাস্টিকের বিষাক্ত সাম্রাজ্য। এই প্লাস্টিক শুধু ড্রেনের মুখ বন্ধ করে না, এটি মাটির গাঠনিক রন্ধ্রপথগুলোকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয়। মাটি আর পানি শোষণ করে না, কারণ মাটি এখন আর মাটি নেই—সে এক আবর্জনার স্তূপ। সামান্য পলিথিন, থার্মোকল আর প্লাস্টিকের বোতল মাটির সেই স্বাভাবিক স্পঞ্জের ক্ষমতা কেড়ে নেয় চিরদিনের জন্য। আমাদের দৃষ্টিতে বৃষ্টির ফোঁটা যখন পড়ে, তখন সেই জল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তার বুকে, যেন প্রকৃতি আমাদের অন্ধত্বের দিকে জোরালো আঙুল তুলে ধরে।

ফলে আজ আমরা সেই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে যেখানে দশ মিনিটের বৃষ্টিতেই চারপাশ জলময়। কিন্তু আমি বলি, এই দৃশ্য আমাদের ব্যর্থতার শিল্পিত রূপ। এখানে প্রকৃতির কোনো দোষ নেই। প্রকৃতির নিয়ম অত্যন্ত সরল—সে সমতল খুঁজে নেয়, সে নিচু ভূমি খুঁজে নেয়। আমরা সেই স্বাভাবিক ঢালকে বিকৃত করেছি বলেই স্রোত ফিরে এসে আমাদের দ্বারপ্রান্তে আঘাত হানে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কিন্তু অনিবার্য। আমাদের আবারও মাটিকে তার শোষণ ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে হবে। শহরের প্রতিটি ইমারতকে নিজস্ব জলাধার সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে বৃষ্টির জল ধরে রেখে মাটির বুকে ফিরিয়ে দেওয়া যায়।

প্রাকৃতিক খালগুলোকে জিআইএস মানচিত্রের সাহায্যে পুনরুদ্ধার করে তাদের স্বাভাবিক গতিপথ ফিরিয়ে দিতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ড্রেন ও নর্দমা যেন নাগরিকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি না হয়ে ওঠে—সেখানে শতভাগ আইনের কঠোরতা প্রয়োগ করতে হবে।

ভবন মালিকদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি ভবনের ড্রেনেজ ব্যবস্থা যদি মানসম্মত না হয়, তবে তার ভবনের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। প্লাস্টিক বর্জ্যকে উৎসস্থলেই পৃথক করে ফেলতে হবে, এবং পচনশীল বিকল্পে অভ্যস্ত হতে হবে। সেটা পাটের তৈরি ব্যাগ হোক, অথবা বায়োডিগ্রেডেবল পলিমার—আমাদের ভোক্তা অভ্যাসেই বয়ে আনতে হবে আমূল পরিবর্তন।

প্রথম স্তরে প্রশাসনকে মানচিত্র উদ্ধার করতে হবে, দ্বিতীয় স্তরে নাগরিকদের স্ব-উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে, আর তৃতীয় স্তরে গণসচেতনতার সেই অগ্নিস্পর্শ লাগাতে হবে যা একদিন প্লাস্টিকের এই কালো ছায়াকে দূর করে দেবে।

আমরা সাধারণত দায় এড়িয়ে চলতে অভ্যস্ত। কিন্তু বারবার যখন বর্ষার জল আমাদের ঘরের গায়ে আছড়ে পড়ে, তখন সেই জলের প্রতিটি ফোঁটা যেন আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে। পানি তার নিজস্ব পথ খুঁজে পায়। আমরা যদি সেই পথকে বাধাগ্রস্ত করি, সেই পানি একদিন আমাদের নিজেদেরই পথ আটকে দেবে। অতএব, প্রকৃতিকে দোষ না দিয়ে আমাদের অপরিকল্পিত অহংকারের প্রতিফলন দেখতে হবে এই জলাবদ্ধতার মধ্যে।

আমার বিশ্বাস, সময় এখন আর শুধু ড্রেন খোঁড়ার নয়; সময় এখন মাটির সাথে পুনর্মিলনের। শহরের বুকে আবারও যেন ফিরে আসে সোঁদা গন্ধ, আবারও যেন বর্ষার জল মাটির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায়।

সেদিন হয়তো আমরা শান্ত চিত্তে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখতে পাব—এ বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতা নয়, এ বৃষ্টি এক অপার্থিব স্নানের উৎসব। যতদিন না সেই দিন আসে, ততদিন এই প্রতিটি বর্ষার অঝোর ধারা আমাদের ব্যর্থতার প্রমাণ বহন করে চলবে, আমাদের কর্ণমূলে ফিসফিস করে জানিয়ে দেবে—প্রকৃতি কখনো অপরাধী নয়, অপরাধী আমরা, আমাদের অন্ধত্ব, আমাদের লোভ, আর আমাদের দায়বদ্ধতাহীন স্বাধীনতা।

মুফিদুল আলম
৯ জুলাই ২০২৬

মন্তব্য করুন