Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৯ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০৯ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার কারণ ও করণীয়

বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার কারণ করণীয়

মনিরুল হক,

        শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছেপ্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার প্রায় শতভাগে পৌঁছেছে, নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, উপবৃত্তি কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু এত অর্জনের পরও একটি সমস্যা রয়ে গেছে অত্যন্ত জটিল ও উদ্বেগজনক রূপেতা হলো শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া (Dropout)। প্রাথমিক স্তর পার হয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ছিটকে পড়ে। এই নিবন্ধে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রধান কারণগুলো এবং এর সম্ভাব্য প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করা হলো।

 

১. দারিদ্র্য ও আর্থ-সামাজিক সংকটঃ

বাংলাদেশে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো দারিদ্র্য। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর চেয়ে তাকে দিয়ে বাড়তি আয় করানো বা পারিবারিক কাজে সহায়তা নেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সন্তানরা মাঠে কাজ করা, রিকশা চালানো, দোকানে সহকারী হিসেবে কাজ করা কিংবা বাড়ির কাজে যুক্ত হয়ে পড়ে। শিক্ষার আনুষঙ্গিক খরচবই, খাতা, পোশাক, কোচিংদরিদ্র পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

 

২. বাল্যবিবাহঃ

মেয়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার একটি প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ। বাংলাদেশে এখনো গ্রামাঞ্চলে অনেক পরিবার আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক কুসংস্কার বা যৌতুকের ভয়ে অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়। ফলে মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই অনেক ছাত্রী শিক্ষাজীবনের ইতি টানতে বাধ্য হয়।

৩. শিশুশ্রমঃ

দারিদ্র্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আরেকটি সমস্যা শিশুশ্রম। পরিবারের আয় বাড়ানোর জন্য অনেক শিশুকে কর্মক্ষেত্রে পাঠানো হয়কারখানা, দোকান, পরিবহন খাত কিংবা গৃহকর্মে। এসব শিশু ধীরে ধীরে স্কুল থেকে দূরে সরে যায় এবং একসময় সম্পূর্ণভাবে ঝরে পড়ে।

 

৪. দূরবর্তী ও অপর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

বিশেষত প্রত্যন্ত অঞ্চল, চর এলাকা, হাওর ও পাহাড়ি জনপদে বিদ্যালয়ের দূরত্ব একটি বড় বাধা। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতে হয়, যা নিরাপত্তা ও শারীরিক পরিশ্রমের দিক থেকে অনেক পরিবারের জন্য অসুবিধাজনক।

 

৫. শিক্ষার মান ও পাঠদান পদ্ধতির দুর্বলতাঃ

অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে গিয়ে যথাযথ শিক্ষালাভ করতে ব্যর্থ হয়। শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের অসামঞ্জস্য, পুরনো ও একঘেয়ে পাঠদান পদ্ধতি, এবং ব্যবহারিক শিক্ষার অভাব শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ কমিয়ে দেয়। ফলাফল খারাপ হলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক উভয়ের মধ্যেই হতাশা তৈরি হয়, যা ঝরে পড়ার একটি পরোক্ষ কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

 

৬. পারিবারিক ও সামাজিক প্রভাবঃ

পরিবারে অভিভাবকের শিক্ষার অভাব, শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, পারিবারিক ভাঙন (বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, মৃত্যু বা অভিবাসন) শিশুর শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এছাড়া কিছু সামাজিক গোষ্ঠীতে মেয়েদের শিক্ষার প্রতি এখনো নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান, যা মেয়েশিশুদের ঝরে পড়ার হার বাড়িয়ে দেয়।

৭. প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন

বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যার কারণে অনেক পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়। এসব পরিবারের সন্তানরা প্রায়ই স্কুল বদল করতে বাধ্য হয় বা স্থায়ীভাবে শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

 

৮. প্রযুক্তি ও ডিজিটাল বৈষম্যঃ

বর্তমান যুগে অনলাইন শিক্ষা ও ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে, কিন্তু গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ইন্টারনেট সংযোগ ও স্মার্ট ডিভাইসের সহজলভ্যতা এখনো সীমিত। করোনাকালীন সময়ে এই ডিজিটাল বৈষম্যের কারণে বহু শিক্ষার্থী শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ছিটকে পড়ে, যাদের একটি বড় অংশ পরবর্তীতে আর বিদ্যালয়ে ফিরে আসেনি।

 

৯. মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রেষণার অভাবঃ

পরীক্ষার চাপ, প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়ন পদ্ধতি ও পারিবারিক প্রত্যাশার চাপে অনেক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ক্যারিয়ার নির্দেশনার অভাব ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝরে পড়ার কারণ হতে পারে।

করণীয়

ঝরে পড়া রোধে বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজনঃ

       উপবৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা, যাতে দরিদ্র পরিবার প্রকৃত সুবিধা পায়।

       বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা।

       প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যালয় ও পরিবহন সুবিধা সম্প্রসারণ করা, যাতে দূরত্ব বাধা না হয়।

       শিক্ষার মান উন্নয়নে আধুনিক ও আনন্দময় পাঠদান পদ্ধতি প্রবর্তন এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার করা।

       কাউন্সেলিং ও ক্যারিয়ার গাইডেন্স সেবা বিদ্যালয়ে চালু করা, যাতে শিক্ষার্থীরা মানসিক সহায়তা ও দিকনির্দেশনা পায়।

       ডিজিটাল অবকাঠামো প্রান্তিক অঞ্চলে সম্প্রসারণ করে শিক্ষায় প্রযুক্তির সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা।

       অভিভাবক সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা, যাতে পরিবারগুলো শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব উপলব্ধি করে।

 

শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া কোনো একক কারণে ঘটে নাএটি দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষাব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার এক জটিল সমন্বয়। একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়নের জন্য প্রতিটি শিশুকে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে দেওয়া যায় না। সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সমাজসবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার কার্যকরভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

 

মোঃ মনিরুল হক

সহকারী শিক্ষক

আমলাবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়

০১৭২২ ২৭৩২৭২

 

মন্তব্য করুন