সহকারী অধ্যাপক
১০ জুলাই, ২০২৬ ০৪:২২ পূর্বাহ্ণ
হুতামার সতর্কবার্তা -মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
হুতামার সতর্কবার্তা
(জাহান্নামের একটি ভয়াবহ ও প্রজ্জ্বলিত অংশের নাম-হুতামা)
(সূরা আল-হুমাযাহর আলোকে)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
নিন্দার বিষে ভরে যে মন,
কলুষ তারই অন্তরক্ষণ;
সামনে হাসে, পেছনে কটু,
সত্যের পথে সে বড় শত্রু।
কথার আঘাত তীরের চেয়ে,
গভীর ক্ষত যে রেখে যায়;
গীবতের আগুন জ্বালিয়ে মানুষ,
ভালোবাসাও ছাই হয়ে যায়।
অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ানো,
নিজের ভুলকে ভুলে থাকা;
এমন হৃদয় অন্ধকারে
হারায় সত্য, হারায় দেখা।
হায়, সে মানুষ দুর্ভাগা বড়,
যে করে নিন্দা অবিরাম;
ভুলে যায় সে রবের বিচার,
ভুলে যায় কিয়ামতের নাম।
অঢেল ধন সে জমায় ঘরে,
গুনে গুনে দিন করে পার;
সিন্দুক ভরা সোনা-রুপা,
তবু অন্তর অন্ধকার।
আরও চাই, আরও চাই,
শেষ নেই তার লোভের পথ;
মানবতার কান্না শুনেও
জাগে না তার করুণ রথ।
ধনই যেন তার উপাস্য,
ধনই তার গর্বের সুর;
মানুষ নয়, সম্পদই যেন
তার জীবনের মূল সেতু।
মনে মনে সে ভেবে বসে,
"আমার ধনই রাখবে বাঁচিয়ে,
মৃত্যু বুঝি আসবে না আর,
চিরকালই থাকব হেসে।"
কিন্তু মৃত্যু নীরব পায়ে
এসে দাঁড়ায় দুয়ার ধরে;
রাজা-ভিখারি সবাই তখন
একই পথে যায় যে চলে।
ধন-সম্পদ সবই রয়ে
পৃথিবীরই বুকে পড়ে;
শুধু আমল সঙ্গী হয়,
মানুষ তখন কবরে ঝরে।
আল্লাহ বলেন—"কখনো নয়!
ভুল করেছে সেই অহংকার;
অবশ্যই সে নিক্ষিপ্ত হবে
ভয়ংকর সেই হুতামার।"
হুতামা কী? কে জানে তার
শাস্তির কত গভীর রূপ!
রব নিজেই দিলেন উত্তর—
এ আগুনে নেই কোনো ছুট।
এ আগুন কোনো দুনিয়ার
সাধারণ আগুন নয়;
আল্লাহরই প্রজ্বলিত শিখা,
ন্যায়বিচারের কঠোরময়।
সে আগুন শুধু দেহ পোড়ায়
এমন ভাবা মহাভুল;
হৃদয়ের গভীর অন্তঃস্থলে
পৌঁছে দেয় তার দহন-ফুল।
যেখানে ছিল হিংসা-ঘৃণা,
অহংকারের বিষের বাস;
সেই হৃদয়ের গভীর কোণে
জ্বলবে তখন বিচারের শ্বাস।
সেখানে নেই মুক্তির পথ,
নেই কোনো আশ্রয়স্থল;
চারদিক হতে বন্ধ হবে
প্রস্থান-পথ, জানালা-দ্বার সব।
অপরাধীরা থাকবে তখন
আবদ্ধ কঠিন শৃঙ্খলে;
কেউ পালাতে পারবে না আর
অগ্নির সেই প্রাচীর পেরোতে।
দীর্ঘ দীর্ঘ স্তম্ভ যেন
ঘিরে রাখে চারিপাশ;
কঠোর শাস্তির নিঃশব্দ ভাষা,
অসীম দুঃখ, অসীম হতাশ।
কেউ বলেন, বন্ধ দ্বারগুলো
অটল থামে রুদ্ধ হবে;
কেউ বলেন, অপরাধীরা
স্তম্ভে বাঁধা রবে তবে।
আবার কারো ব্যাখ্যাতে আছে—
স্তম্ভই হবে শাস্তির রূপ;
যেমন জানেন একমাত্র আল্লাহ,
তেমনই হবে বিচাররূপ।
তাই তো মানুষ, শোনো এবার,
নিন্দা থেকে দূরে চলো;
গীবতের আগুন নেভাও আগে,
সত্যের দীপটি হাতে জ্বালো।
অন্যের দোষ নয় যে দেখা,
নিজেকে আগে শুদ্ধ করি;
ভাঙা হৃদয় জোড়া লাগাই,
ক্ষমার ফুলটি বুকে ধরি।
ধন যদি থাকে, দানেও রাখো,
অসহায়ের পাশে দাঁড়াও;
সম্পদের নয়, সৎকর্ম দিয়ে
জীবনখানি আলোকিত গড়াও।
স্মরণ রেখো, ক্ষণিক দুনিয়া,
চিরস্থায়ী নয় এ বাস;
আজ যে শক্তি, কাল সে মাটি,
শেষে কেবল কর্মের আশ।
যে মুখ আজ নিন্দায় ব্যস্ত,
সেই মুখে আনো জিকিরধ্বনি;
যে হৃদয়ে লোভের আঁধার,
সেখানে জ্বালো ঈমান-বাণী।
সত্য বলো, ন্যায়কে ধরো,
অন্যের হক আদায় করো;
ক্ষমা, দয়া, বিনয় নিয়ে
জীবনপথে এগিয়ে চলো।
আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন,
সে তো বিনয়ী, সত্যবান;
মানুষের হক রক্ষা করে,
রাখে পবিত্র নিজের প্রাণ।
এসো সবাই করি প্রতিজ্ঞা—
নিন্দা নয়, হবে না গীবত;
মানবমনে ছড়াব ভালোবাসা,
করব না কারও অপমান।
হে পরম দয়াময় আল্লাহ,
রাখুন মোদের সৎপথে স্থির;
হুতামার সেই কঠিন শাস্তি
থেকে করুন চিরমুক্তির নীর।
শুদ্ধ করো অন্তর আমার,
লোভ-অহংকার দূরে যাক;
সত্য, আমানত, সৎকর্মে ভরে
জীবন আমার আলোক পাক।
যেদিন হবে মহাবিচার,
হিসাব হবে ক্ষুদ্র-বড়,
সেদিন যেন আপনার রহমতে
পাই জান্নাতের অনন্ত ঘর।
আমিন।
***
হুতামার আহ্বান
দুর্ভোগ তার, যে মুখের ভাষায়
ছড়ায় শুধু নিন্দার বিষ,
সামনে মধুর, পেছনে আঘাত—
প্রতিটি বাক্য প্রতারণার নিশ।
হৃদয় ভাঙে, সম্মান হরণ,
গীবতের আগুন জ্বলে নিরন্তর;
একটি কথার ক্ষত যে কত,
জানে কেবল আহত অন্তর।
মানুষকে হেয় করে যে সুখ পায়,
সে সুখ বিষেরই সমান;
অহংকারে অন্ধ সে মানুষ,
হারায় ঈমান, হারায় জ্ঞান।
অন্যের ত্রুটি খুঁজতে খুঁজতে
নিজের দোষে থাকে অন্ধ;
আয়নার সামনে দাঁড়ায় না সে,
অন্তর থাকে কলুষে বন্দী।
তারপর শুরু লোভের কাহিনি—
দিনরাত শুধু সম্পদের ধ্যান;
গুনে গুনে সে ধন রাখে,
বাড়ায় কেবল ভাণ্ডারের মান।
সিন্দুক ভরা সোনা-রুপা,
অগণিত জমি, অট্টালিকা;
তবু তার চোখে তৃপ্তি নেই,
লোভই যেন একমাত্র দিশা।
সে ভাবে—
"এই ধনই আমার রক্ষাকবচ,
এ আমায় রাখবে চিরকাল;
মৃত্যু বুঝি ভুলে যাবে,
আমার দুয়ারে আসবে না আর।"
কিন্তু মৃত্যু কারও আপন নয়,
কারও ধন দেখে থামে না;
সম্রাট, ফকির, জ্ঞানী, অজ্ঞান—
কারও জীবন রক্ষা পায় না।
একদিন থেমে যাবে শ্বাস,
নিভে যাবে জীবনের দীপ;
রয়ে যাবে সিন্দুকভরা ধন,
ফুরিয়ে যাবে অহংকার-রূপ।
যে হাত গুনেছে সোনা-রুপা,
সে হাত হবে নিথর একদিন;
যে চোখ দেখেছে সম্পদের গর্ব,
বন্ধ হবে তারও দৃষ্টিদিন।
তখন ধন নয়, সঙ্গী হবে
সৎকর্ম কিংবা পাপের ভার;
কবরের নীরব অন্ধকারে
সেই হবে জীবনের অধিকার।
তখন ধ্বনিত হবে মহান বাণী—
"কখনো নয়, নয় সে ধারণা;
ধন কোনো প্রাণকে অমর করে না,
অহংকার শুধু ডেকে আনে ক্ষয়।"
অবশেষে নিক্ষিপ্ত হবে
হুতামার ভয়ংকর আগুনে;
যেখানে ন্যায়ের বিচার চলে
রবের অটল বিধানগুণে।
হুতামা—সে কেমন স্থান?
মানববুদ্ধি যার সীমা ছোঁয় না;
আল্লাহ নিজেই পরিচয় দেন—
এ আগুন পৃথিবীর আগুন না।
এ আগুন প্রজ্বলিত করেন
সকল সৃষ্টির মহান রব;
অন্যায়কারীর জন্য প্রস্তুত
বিচারের সেই কঠোর সব।
তার শিখা শুধু দেহে নয়,
অন্তরের গভীরেও পৌঁছে যায়;
যেখানে জন্মেছিল হিংসা,
সেই হৃদয়েই দহন জাগায়।
যেখানে লোভের বীজ বোনা,
যেখানে ছিল গর্বের আসন;
সেই অন্তরে আগুন ছুঁয়ে
জাগে বিচারের কঠিন স্পন্দন।
তারপর বন্ধ হবে সব পথ,
নেই কোনো মুক্তির দ্বার;
চারদিক ঘিরে অগ্নিপ্রাচীর,
নেই কোনো ফেরার অধিকার।
মুওসাদাহ—বন্ধ সে স্থান,
প্রস্থানপথ সব রুদ্ধ হয়;
সেখানে কারও শক্তি, ক্ষমতা
এক মুহূর্তও কাজে নয়।
দীর্ঘায়িত অটল স্তম্ভ
উঁচু হয়ে দাঁড়ায় চারিধার;
কেউ বলেন—বন্ধ দ্বারের প্রহরী,
কেউ বলেন—বন্দিত্বের ভার।
কেউ বলেন—অপরাধীরা
সেই স্তম্ভে বাঁধা থাকবে;
কেউ বলেন—স্তম্ভ দিয়েই
শাস্তির বিধান কার্যকর হবে।
কিন্তু প্রকৃত রূপটি জানেন
শুধু মহান আল্লাহ তাআলা;
মানুষ জানে যতটুকু তিনি
করেছেন কুরআনে প্রকাশ।
তাই হে মানুষ, থামো এবার,
নিন্দার পথ আজই ছাড়ো;
গীবতের বদলে সত্য বলো,
অন্যের মর্যাদা আগলে রাখো।
ধন জমাও, যদি প্রয়োজন,
কিন্তু রেখো না হৃদয়ের সিংহাসনে;
দান, যাকাত, সদকা দিয়ে
বরকত খোঁজো জীবনের প্রাঙ্গণে।
অহংকার নয়—বিনয় ধারণ,
ঘৃণা নয়—ভালোবাসা দাও;
মানুষের হক আদায় করে
রবের সন্তুষ্টি অর্জন করো।
মনে রেখো—
চিরস্থায়ী ধন নয় সোনা,
চিরস্থায়ী ঘরও নয় এ ভুবন;
চিরস্থায়ী কেবল সেই প্রতিদান,
যা রব দেবেন বিচার-দিবসক্ষণ।
হে পরম দয়াময়,
আমাদের জিহ্বা করুন সত্যময়,
অন্তর করুন গীবতমুক্ত,
চোখ করুন বিনয়ময়।
লোভের আগুন নিভিয়ে দিন,
ঈমানের আলো দিন হৃদয়ে;
হুতামার কঠিন শাস্তি থেকে
রক্ষা করুন আপনার রহমতে।
আমাদের আমল করুন কবুল,
অধিকার রক্ষায় দিন দৃঢ়তা;
আপনার সন্তুষ্টিই হোক
জীবনের শ্রেষ্ঠ সফলতা।
আমিন।
১৪
২৪ মন্তব্য