Loading..

ব্লগ

রিসেট

১০ জুলাই, ২০২৬ ০৭:৫১ অপরাহ্ণ

নীলদর্পণ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ: শোষণের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক দলিল

নীলদর্পণ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ: শোষণের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক দলিল


​রবিউল রানা 

১০ জুলাই, ২০২৬

​ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার সমাজ ও রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কয়েকটি সাহিত্যকর্ম গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, তার মধ্যে দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ (১৮৬০) অন্যতম। তবে এই নাটকটি কেবল বাংলা ভাষার পাঠকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর ইংরেজি অনুবাদ তৎকালীন ব্রিটিশ রাজদরবার থেকে শুরু করে ইউরোপের সুশীল সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। শোষিত বাঙালি কৃষকদের কান্না বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার পেছনে এই অনুবাদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

​অনুবাদের প্রেক্ষাপট ও নেপথ্য নায়ক

​১৮৬০ সালে ঢাকা থেকে ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি প্রথম প্রকাশিত হয়। নীলকরদের অমানুষিক নির্যাতন ও অত্যাচারের নিখুঁত চিত্রনাট্য পড়ে বাংলার মানুষের পাশাপাশি কিছু সহমর্মী ইংরেজও স্তম্ভিত হন। তাদেরই একজন ছিলেন খ্রিস্টান মিশনারি পাদ্রি রেভারেন্ড জেমস লং। তিনি চাইলেন এই অত্যাচারের কাহিনী যেন কলকাতার উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ কর্মকর্তা এবং খোদ ব্রিটেনের পার্লামেন্ট পর্যন্ত পৌঁছায়।

​জেমস লং-এর অনুরোধে কবি ও নাট্যকার মাইকেল মধুসূদন দত্ত অত্যন্ত গোপনে নাটকটির ইংরেজি অনুবাদ সম্পন্ন করেন। ১৮৬১ সালে অনুবাদটি "Nil Darpan; or, The Indigo Planting Mirror" নামে প্রকাশিত হয়।

​নাম গোপন রাখার কারণ ও ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি

​মাইকেল মধুসূদন দত্ত তখন সরকারি দপ্তরে দোভাষী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে যায় এমন একটি স্পর্শকাতর নাটকের অনুবাদক হিসেবে নিজের নাম প্রকাশ করা তাঁর চাকরির জন্য ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই অনুবাদক হিসেবে তাঁর নাম সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয় এবং জেমস লং নিজের নামে এটি প্রকাশ করেন।

​অনুবাদটি প্রকাশিত হওয়ার পর নীলকর সাহেবরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং রেভারেন্ড জেমস লং ও এর প্রকাশকের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা ঠুকে দেয়। পক্ষপাতদুষ্ট ব্রিটিশ আদালতে জেমস লং-এর এক মাসের কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পরবর্তীতে মহৎপ্রাণ ব্যক্তিত্ব কালীপ্রসন্ন সিংহ আদালতে সেই জরিমানার টাকা পরিশোধ করে জেমস লং-কে মুক্ত করেন। এই ঘটনাটি তৎকালীন বাংলায় ব্রিটিশ বিচার ব্যবস্থার এক চরম প্রহসন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

​ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রভাব

​‘নীলদর্পণ’-এর এই ইংরেজি অনুবাদটি কেবল একটি সাহিত্যকর্ম ছিল না, এটি ছিল নীল চাষীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। এই অনুবাদের ফলে ব্রিটেনের পার্লামেন্টে নীলকরদের অত্যাচার নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সরকার ‘নীল কমিশন’ (Indigo Commission) গঠন করতে বাধ্য হয়। ফলশ্রুতিতে বাংলায় জোরপূর্বক নীল চাষের অবসান ঘটে।

​মহাত্মা গান্ধী পরবর্তীতে চম্পারণের নীল আন্দোলন নিয়ে বলেছিলেন, ‘নীলদর্পণ’ যেভাবে জনমত তৈরি করেছিল, তা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর। মাইকেল মধুসূদন দত্তের শক্তিশালী লেখনী এবং জেমস লং-এর আত্মত্যাগ ‘নীলদর্পণ’কে বাংলা সাহিত্যের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক মানবাধিকারের ইতিহাসে এক অমর আসনে বসিয়েছে।

​প্রতিবেদনের উৎস:

​বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত — অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।

​নীলবিদ্রোহ ও বাঙালি সমাজ — প্রমোদরঞ্জন সেনগুপ্ত।

​সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান — সাহিত্য সংসদ।

মন্তব্য করুন