সিনিয়র শিক্ষক
১০ জুলাই, ২০২৬ ১১:৪১ অপরাহ্ণ
মেধা ও সমতার মেলবন্ধন: মডেল স্কুল নিয়ে একটি প্রস্তাবনা
মেধা ও সমতার মেলবন্ধন: মডেল স্কুল নিয়ে একটি প্রস্তাবনা
ভূমিকা
শিক্ষা কেবল অক্ষরজ্ঞান অর্জন নয়, বরং একজন মানুষের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করে তাকে রাষ্ট্রের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত ৬০০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগটি জাতীয় শিক্ষাকাঠামোয় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। তবে ক্যাডেট কলেজের আদলে গড়ে উঠতে যাওয়া এই প্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য ও কৌশল নির্ধারণে প্রয়োজন আধুনিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনের স্বার্থে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল জেলা বা উপজেলা সদরকেন্দ্রিক না রেখে, পিছিয়ে পড়া জনপদে স্থাপনের পাশাপাশি ভর্তি প্রক্রিয়া ও শিক্ষক নিয়োগে আমূল সংস্কারের প্রস্তাব করছি।
মেধার বৈভবের চেয়ে সামাজিক সমতা প্রাধান্য
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক সময় ‘মেধা ও বৈভবের দৌরাত্ম্য’ শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিযোগিতার নামে আমরা অনেক সময় প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করি। এই ৬০০টি প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে কেবল মেধার দোহাই না দিয়ে, সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিটি প্রশাসনিক ইউনিটের জনসংখ্যা অনুপাতে ভর্তি কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। এতে করে সুবিধাবঞ্চিত এলাকার শিক্ষার্থীরাও সমতার ভিত্তিতে মানসম্মত শিক্ষা পাওয়ার অধিকার পাবে। এটি প্রকৃত অর্থে শিক্ষাসেবার সমতা বিধান করবে এবং মেধার সুষম বণ্টনের পথ প্রশস্ত করবে।
নিসর্গ ও নির্মল পরিবেশে শিক্ষার সার্থকতা
শহরের যান্ত্রিকতা ও কৃত্রিম কোলাহল অনেক সময় শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রান্তিক ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিরিবিলি, ছায়াঘেরা, স্বাস্থ্যকর পরিবেশই হতে পারে শিক্ষার প্রকৃত কেন্দ্র। যান্ত্রিক জীবনের বিষাদ থেকে মুক্ত হয়ে শিক্ষার্থীরা যখন প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে উঠবে, তখন তাদের শারীরিক ও মানসিক গঠন হবে অনেক বেশি বলিষ্ঠ। তাই এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান যেন শহরের কেন্দ্রস্থলে না হয়ে প্রকৃতির খুব কাছে হয়, যেখানে খোলা মাঠ, মুক্ত বাতাস ও শান্ত পরিবেশ শিক্ষার্থীদের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করবে।
শিক্ষক নিয়োগ: অভিজ্ঞতার অগ্রাধিকার ও আত্মীকরণ
প্রতিষ্ঠানের মান নির্ধারণে শিক্ষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন বা প্রবেশিকা পর্যায়ের শিক্ষকদের ওপর নির্ভর না করে, আমাদের বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থায় যারা ইতিমধ্যে মেধা, সততা ও একনিষ্ঠতার প্রমাণ দিয়েছেন, সেইসব চৌকস ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের খুঁজে বের করতে হবে। বিদ্যমান সরকারি ও বেসরকারি স্কুলের মেধাবী ও প্রতিশ্রুতিশীল শিক্ষকদের বিশেষ প্রেষণে বা আত্মীকরণের মাধ্যমে এই নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ দিলে শুরু থেকেই শিক্ষার মান ও শৃঙ্খলা উচ্চপর্যায়ে থাকবে। অভিজ্ঞদের হাতে নতুন প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপিত হলে তা দ্রুত সাফল্যের মুখ দেখবে।
বাস্তবায়নের কৌশল ও চ্যালেঞ্জ উত্তরণ
৬৮ হাজার ৪৪২ কোটি টাকার এই বিশাল বাজেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে আমাদের কৌশলী হতে হবে।
ভৌত অবকাঠামো: দুর্গম এলাকায় অবকাঠামো নিশ্চিত করার সময় ডিজিটাল প্রযুক্তি ও আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপনে আপসহীন হতে হবে।
স্বচ্ছতা ও নজরদারি: প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের সমন্বয়ে একটি নজরদারি কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।
উপসংহার
শিক্ষা রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। একটি সমৃদ্ধ ও জ্ঞানভিত্তিক 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে শিক্ষার সমতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। মেধা ও বৈভবের প্রতিযোগিতার উর্ধ্বে উঠে, জনসংখ্যা অনুপাত ভিত্তিক ভর্তি নীতি এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানগুলোই হতে পারে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার নতুন দিগন্ত। ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে এবং যান্ত্রিকতা থেকে মুক্ত রেখে যখন প্রান্তিক মেধাবীদের আমরা গড়ে তুলব, তখনই সফল হবে এই প্রকল্প। আমাদের প্রত্যাশা, নীতিনির্ধারকরা এই মানবকেন্দ্রিক ও সমতাভিত্তিক মডেলটিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন।
-মুফিদুল আলম
রামু,কক্সবাজার
১০ জুলাই ২০২৬
৬৫
১০০ মন্তব্য