Loading..

ব্লগ

রিসেট

১১ জুলাই, ২০২৬ ০৬:৫৭ পূর্বাহ্ণ

পাপ করেও যে মানুষ আল্লাহর প্রিয়


রাতে একা বসে আছেন। মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরছে। জীবনে অনেক ভুল হয়ে গেছে। এমন কিছু করেছেন, যা মনে পড়লে অনুশোচনায় মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে।

নামাজ ছেড়েছেন, হারাম কাজে জড়িয়েছেন, মানুষকে কষ্ট দিয়েছেন, আল্লাহর অবাধ্য হয়েছেন বারবার। আর এখন মনের গভীরে একটা ভয় বাসা বেঁধেছে—এত পাপের পর আল্লাহ কি আর আমাকে ক্ষমা করবেন?

পাপ করে যেই অপরাধ করেছেন, আল্লাহ ছাড়া সেই ক্ষমা কোথায় পাবেন? কার কাছে চাইবেন? পবিত্র কোরআন নিশ্চয়তাও দিয়েছে, ক্ষমার দরজা সব সময় সবার জন্যই উন্মুক্ত।

বিজ্ঞান কী বলছে

গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি অপরাধবোধ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এটি বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও আত্মবিশ্বাস হারানোর অন্যতম প্রধান কারণ।

তবে একই গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষমা চাওয়া এবং ক্ষমা পাওয়ার অনুভূতি মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয় এবং জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ফিরিয়ে আনে। 

কিন্তু পাপ করে যেই অপরাধ করেছেন, আল্লাহ ছাড়া সেই ক্ষমা কোথায় পাবেন? কার কাছে চাইবেন? পবিত্র কোরআন নিশ্চয়তাও দিয়েছে, ক্ষমার দরজা সব সময় সবার জন্যই উন্মুক্ত।

কোরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘বলো, হে আমার বান্দারা যারা নিজেদের ওপর অত্যাচার করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)

এই আয়াতের শব্দগুলোর প্রতি একটু খেয়াল করুন।

প্রথমত, আল্লাহ বলছেন ‘আমার বান্দারা’। যারা পাপ করেছে, ভুল করেছে, সীমা লঙ্ঘন করেছে, তাদেরও তিনি ‘আমার বান্দা’ বলে ডাকছেন। সম্পর্ক ছিন্ন করেননি।

দ্বিতীয়ত, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আরবিতে এখানে ‘কুনুত’ শব্দ আছে, যার অর্থ সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে যাওয়া, আশার সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া। আল্লাহ বলতে চেয়েছেন, কখনোই আশা হারিয়ো না।

তৃতীয়ত, আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করেন। এখানে ‘জামিয়া’ শব্দ আছে, যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জামিয়া মানে সব, সমগ্র। সুতরাং মন থেকে ক্ষমা চাইলে বান্দার হক ছাড়া আল্লাহ-তাআলা সব রকম পাপ ক্ষমা করেন।

নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদের ভালোবাসেন।

সুরা বাকারা, আয়াত: ২২২

এই আয়াটি পড়ে একজন সাহাবি বলেছিলেন, এটা কোরআনের সবচেয়ে আশার আয়াত।

কোরআনের শিক্ষা

১. তাওবা করলে পাপ শুধু মুছে যায় না, পুণ্যে রূপান্তরিত হয়। আল্লাহ বলেছেন, ‘তবে যে তওবা করে, ইমান আনে এবং সৎ কাজ করে, আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পুণ্যে পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৭০)

এখানে ‘তাবদিল’ শব্দ আছে, যার অর্থ রূপান্তর, প্রতিস্থাপন। মানে পাপের জায়গায় পুণ্য বসিয়ে দেওয়া। এটা শুধু ক্ষমা নয়, এটা রূপান্তর।

এই আয়াত শুনে এক সাহাবি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আল্লাহর রাসুল, এটা কি আমার জন্যও?’ মহানবী (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ, তোমার জন্যও।’ সাহাবি বললেন, ‘ব্যভিচার করলেও?’ মহানবী (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ।’ সাহাবি বললেন, ‘চুরি করলেও?’ মহানবী (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৭২৭)

২. আল্লাহ শুধু ক্ষমা করেন না, তওবাকারীকে ভালোবাসেন। আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদের ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২২২)

এখানে ‘তাওয়াবিন’ শব্দ আছে, যা বহুবচন এবং অতিমাত্রার রূপ। মানে যারা বারবার তওবা করেন। শুধু একবার নয়, বারবার ফিরে আসেন।

৩. আল্লাহর রহমত সবকিছুকে ঘিরে আছে। আল্লাহ বলেছেন, ‘আর আমার রহমত সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করে আছে।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৫৬)

এখানে ‘ওয়াসিআ’ শব্দ আছে, যার মানে বিস্তৃত হওয়া, ঘিরে রাখা। আল্লাহর রহমত এতটাই সুবিশাল যে সবকিছু তার ভেতরে। আকাশ, জমিন, সমুদ্র, পাহাড়, আপনার পাপ—সবকিছু। আপনার পাপ কখনোই আল্লাহর রহমতের চেয়ে বেশি হতে পারবে না।

ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেছেন, ‘আল্লাহর রহমতের বিপরীতে বান্দার পাপ হলো সমুদ্রে একটি লবণের দানার মতো।’ (মাদারিজুস সালিকিন, বৈরুত: দারুল কিতাব আল-আরাবি, ১/৩২৩)

৪. তওবার দরজা মৃত্যু পর্যন্ত উন্মুক্ত। আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে তওবা কবুল করা কেবল তাদের জন্য যারা না জেনে মন্দ কাজ করে, তারপর শিগগিরই তওবা করে। এদের তওবা আল্লাহ কবুল করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৭)

এখানে ‘কারিব’ শব্দ আছে, যার অর্থ শিগগিরই, দেরি না করা। আজ পাপ হয়েছে, আজই ফিরে আসুন। কাল পর্যন্ত অপেক্ষার সুযোগ নেই, কারণ কাল আসবে কি না, সেটি নিশ্চিত নয়।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ রাতে তাঁর হাত প্রসারিত করেন যেন দিনের পাপী তওবা করে, আর দিনে হাত প্রসারিত করেন যেন রাতের পাপী তওবা করে। এটা চলতে থাকে পশ্চিম দিক থেকে সূর্য ওঠা পর্যন্ত।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৫৯)

আল্লাহ তাঁর তওবাকারী বান্দার তওবায় এতটাই খুশি হন, যতটা খুশি তোমাদের কেউ মরুভূমিতে উট হারিয়ে তারপর খুঁজে পেলে হয়।’

সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৪৭

৫. আল্লাহ তওবা কবুল করেন, এটা তাঁর নিজস্ব পরিচয়। আল্লাহ বলেছেন, ‘আর তিনিই তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং পাপগুলো মাফ করেন এবং তোমরা যা করো তা জানেন।’ (সুরা শুরা, আয়াত: ২৫)

এখানে বলা হয়েছে ‘তিনিই’ মানে একমাত্র তিনি। তওবা কবুল করা আল্লাহর একটি গুণ, তিনি ‘আত-তাওয়াব’ মানে বারবার তওবা কবুলকারী। আপনি যতবারই ফিরে আসুন, তিনি ততবারই গ্রহণ করেন। ফিরিয়ে দেন না। তবে খাঁটি মনে তওবা করতে হবে।

৬. নিরাশ হওয়া মুমিনের কাজ নয়। আল্লাহ বলেছেন, ‘আর আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত থেকে কাফির সম্প্রদায় ছাড়া কেউ নিরাশ হয় না।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৮৭)

এখানে ‘রাওহ’ শব্দ আছে, যা অর্থ শুধু রহমত নয়, বাতাস, প্রশ্বাস। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া মানে নিজের শ্বাস নেওয়ার জায়গাটাই বন্ধ করে দেওয়া। মুমিনের পরিচয় হলো সে কখনো নিরাশ হয় না।

একটু থামুন

চোখ বন্ধ করুন। মনে করুন আপনি আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তারপর মন থেকে বলুন, ‘হে আল্লাহ, আমি অনেক পাপ করে অবশেষে তোমার কাছে ফিরে এসেছি।’ ব্যস। এটুকুই যথেষ্ট শুরু করার জন্য।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাঁর তওবাকারী বান্দার তওবায় এতটাই খুশি হন, যতটা খুশি তোমাদের কেউ মরুভূমিতে উট হারিয়ে তারপর খুঁজে পেলে হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৪৭)

আচ্ছা! ভাবুন তো একবার। আপনি ফিরে গেলে আল্লাহ খুশি হন। আপনার ফিরে আসাটা তাঁর কাছে কতটা প্রিয়। আপনার পাপের ভার যতই ভারী মনে হোক, আল্লাহর ক্ষমার দরজা তার চেয়েও বড়। আজই সেই দরজায় কড়া নাড়ুন। তিনি অপেক্ষা করছেন।

মন্তব্য করুন

ব্লগ