Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৬ জুলাই, ২০২৬ ০১:৪৯ অপরাহ্ণ

ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর অপেক্ষায়: জাতির কারিগরের শেষবেলা

ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর অপেক্ষায়: জাতির কারিগরের শেষবেলা


ইদানিং আমাদের সামনে কেউ যদি বলে, "শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর" বা "শিক্ষক শিক্ষার মেরুদণ্ড," অথবা "শিক্ষকতা সম্মানী পেশা"—আমার বড্ড হাসি পায়। কেননা, যার হাত ধরে তৈরি হয় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রশাসক ও রাষ্ট্রনায়ক; সেই শিক্ষকের জীবনের শেষ প্রান্ত এসে যখন সফিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত হরেন্দ্র নাথের মতো ছয় বছর পেনশনের অপেক্ষায় প্রাণান্তকর ঘুরতে হয়, অথবা ঈদগাহ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছলিম উল্লাহর মতো একই অবহেলায় মৃত্যুবরণ করতে হয়, তখন তা কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং তা একটি রাষ্ট্রের ও সমাজের জন্য গভীর লজ্জার।

পেনশন নামক প্রহসন ও মৃত্যুর ফাইল

একজন সরকারি বা এমপিওভুক্ত শিক্ষক যখন তাঁর কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় পাঠদানে উৎসর্গ করেন, তখন অবসর জীবনে পেনশন তাঁর একমাত্র সম্বল। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রাপ্যটুকু পাওয়ার জন্য যে দৌড়ঝাঁপ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর অদৃশ্য ঘুষের শিকার হতে হয়, তা এক কথায় অমানবিক। 

শুধু হরেন্দ্র নাথ কেন? আমার বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক জহির আহমদ দীর্ঘ ১০ বছর পেনশনের ফাইল নিয়ে ছুটেছেন। অবশেষে ফাইল নিষ্পত্তি না হয়েই তিনি ফিরে এসেছেন শূন্য হাতে—শুধু মৃত্যুবরণ করেছেন। ছলিম উল্লাহও সেই একই পথের যাত্রী। জীবন সায়াহ্নে যখন ঔষধ কেনার টাকা বা দুই বেলা অন্ন জোগানোর লড়াই, তখন প্রাপ্যটুকু আটকে রাখা মানে এই বৃদ্ধ মানুষের মৃত্যুকেই ত্বরান্বিত করা। ৬ বছর, ১০ বছর—এ যেন পেনশন বঞ্চনার নতুন রেকর্ড, যেখানে জয়ী হয় মৃত্যু, পরাজিত হয় শিক্ষক।

পারিবারিক নির্জনতা ও সামাজিক পাশকাটানো

হরেন্দ্র নাথের জীবনের আরও বেদনাদায়ক দিক হলো—তিনি এক মেয়ে ও দুই ছেলেকে পরম মমতায় বড় করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন; কিন্তু আজ বৃদ্ধ বয়সে পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। সন্তানরা নিজেদের সংসারে এতটাই ব্যস্ত যে পিতার খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজনটুকুও যেন তাদের থাকে না। এই একাকীত্ব ও মানসিক যন্ত্রণা তাদের শারীরিক অসুস্থতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সমাজ আজ সেই শিক্ষকের প্রতিও উদাসীন, যিনি একসময় গ্রামের আলোকবর্তিকা ছিলেন।

রাষ্ট্রের উদাসীনতা: যেখানে ফাইল মানেই ফাঁসি

ডিজিটাল বাংলাদেশের জোয়ার বয়ে গেলেও, তৃণমূলের এই শিক্ষকরা যখন পেনশনের জন্য অফিসে পড়ে থাকেন, তখন উন্নয়নের বুলি বিদ্রূপের শোনায়। জহির আহমদের ফাইল কেন ১০ বছর আটকে ছিল? ছলিম উল্লাহর ফাইল কে থামিয়েছিল? হরেন্দ্র নাথ এখনো কেনো প্রাপ্য টাকা পাননি?—এই জবাবদিহিতার অভাবই প্রমাণ করে, রাষ্ট্রীয় নীতিমালা কেবল কাগজে-কলমে সাজানো শোপিস।

আমাদের করণীয়: এখনই সময় সচেতন হওয়ার

১. পেনশন প্রক্রিয়ার অটোমেশন: অবসরের ৬ মাস আগেই সকল ডকুমেন্ট ডিজিটাল পোর্টালে আপলোড বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পেনশন না দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জরিমানার বিধান রাখতে হবে।

২. জরুরি তহবিল: যেসব শিক্ষকের পেনশন আটকে আছে এবং যারা অসুস্থ বা নিঃস্ব, তাদের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা চালু করতে হবে।

৩. সামাজিক দায়বদ্ধতা: নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের সঙ্গে সময় কাটানো আমাদের নৈতিক কর্তব্য। সন্তানদেরও মনে করিয়ে দিতে হবে—যে ব্যক্তি তোমাকে মানুষ করেছে, তার প্রতি অবহেলা পরকালীন শাস্তি ডেকে আনে।

উপসংহার

হরেন্দ্র নাথের ফাইল যদি আজও আটকে থাকে, জহির আহমদ যদি পেনশন না পেয়েই মারা যান, ছলিম উল্লাহ যদি অবহেলায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন—তবে এই রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত কতটা পোকায় ধরা, তা বুঝতে আর কষ্ট হয় না। শিক্ষক সমাজকে অবহেলা করে কোনো জাতি প্রকৃত সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না। ফাইল নিষ্পত্তি নয়, আজ এখানে মানুষের মর্যাদা নিষ্পত্তির প্রশ্ন।

আমাদের বিবেককে বলতে হবে—যে জাতি তার কারিগরকে বুড়ো বয়সে ফুটপাথে ফেলে দেয়, সেই জাতির ভবিষ্যৎ কখনোই উজ্জ্বল হয় না। এখনই সময় সোচ্চার হওয়ার।


- মুফিদুল আলম 

রামু,কক্সবাজার।

১২ জুলাই ২০২৬

মন্তব্য করুন

ব্লগ