সিনিয়র শিক্ষক
১৭ জুলাই, ২০২৬ ০৯:২২ অপরাহ্ণ
শিক্ষার বিভাজন ও অজ্ঞতা: একটি পর্যালোচনা
শিক্ষার বিভাজন ও অজ্ঞতা: একটি পর্যালোচনা
‘মাদ্রাসা বনাম স্কুল’—এই কৃত্রিম বিভাজনের অবসান হোক
১. ভূমিকা: শিক্ষার লক্ষ্য বিভাজন নয়, বোধের বিকাশ
সাম্প্রতিক সময়ে সাধারণ শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে কিছু মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনপরিসরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দুঃখজনক হলো, এসব মন্তব্যের অনেকগুলোই শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার পরিবর্তে পূর্বধারণা ও আবেগের প্রতিফলন। অথচ শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কোনো একটি ধারাকে শ্রেষ্ঠ বা অন্যটিকে হেয় প্রতিপন্ন করা নয়; বরং মানবিক মূল্যবোধ, সমালোচনামূলক চিন্তা, যুক্তিবোধ ও বৈজ্ঞানিক মনন গড়ে তোলা। তাই শিক্ষাকে বিভাজনের নয়, সমন্বয়ের দৃষ্টিতে দেখাই সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য।
২. ‘মাদ্রাসায় পড়াশোনা নেই’—ধারণা না বাস্তবতা?
বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষা মূলত দুই ধারায় পরিচালিত হয়—আলিয়া ও কওমি। এই দুই ধারার উদ্দেশ্য ও পাঠ্যক্রমে কিছু পার্থক্য থাকলেও উভয় ক্ষেত্রেই জ্ঞানার্জনই মূল লক্ষ্য।
আলিয়া মাদ্রাসা বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হয়। এখানে কুরআন, হাদিস ও ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তিসহ আধুনিক বিষয়সমূহ বাধ্যতামূলকভাবে পড়ানো হয়। দাখিল ও আলিম স্তরের বহু বিষয়ের পাঠ্যক্রম সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অন্যদিকে, কওমি মাদ্রাসা ঐতিহ্যগতভাবে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চাকেই প্রধান গুরুত্ব দেয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক কওমি মাদ্রাসা বাংলা, ইংরেজি, গণিত, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য সাধারণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে ধর্মীয় শিক্ষা ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়ের একটি ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
অতএব, "মাদ্রাসায় পড়াশোনা হয় না"—এ ধরনের মন্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং তা পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে একপাক্ষিকভাবে বিচার করার শামিল।
৩. ইতিহাসের আলোকে ভাষা, জ্ঞান ও বিজ্ঞান
ইসলামের স্বর্ণযুগ (অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী) প্রমাণ করে যে জ্ঞান কখনো ভাষার সংকীর্ণ সীমায় আবদ্ধ ছিল না।
ইবনে সিনা, আল-খোয়ারিজমি, আল-বিরুনি, ইবনে হাইসামসহ বহু মনীষীর মাতৃভাষা আরবি ছিল না। তবুও তাঁরা তাঁদের গবেষণাগ্রন্থ আরবিতে রচনা করেছিলেন, কারণ সে সময় আরবি ছিল আন্তর্জাতিক জ্ঞানচর্চার ভাষা।
অন্যদিকে আল-বিরুনি প্রয়োজনে ফার্সি ভাষাতেও লিখেছিলেন, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে জ্ঞান সহজে পৌঁছাতে পারে।
আজকের বিশ্বে ইংরেজি সেই আন্তর্জাতিক ভূমিকা পালন করছে। অতএব, কোনো ভাষা বা শিক্ষা-ধারাকে জ্ঞানের একমাত্র বাহক হিসেবে উপস্থাপন করা ইতিহাসসম্মত নয়। জ্ঞান বিকশিত হয় গবেষণা, অনুসন্ধিৎসা ও মুক্ত চিন্তার মাধ্যমে।
৪. বিভাজনের রাজনীতি নয়, সমন্বয়ের সংস্কৃতি
শিক্ষাব্যবস্থাকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থাপন করলে সমাজে অপ্রয়োজনীয় বিভাজন সৃষ্টি হয়। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অহেতুক শ্রেষ্ঠত্ববোধ জন্ম নিতে পারে।
মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাধারণভাবে শৃঙ্খলা, শিক্ষক-শ্রদ্ধা ও নৈতিক শিক্ষার চর্চা লক্ষ করা যায়, যা সমাজের জন্য ইতিবাচক। আবার সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য বিস্তৃত সুযোগ সৃষ্টি করে।
এ দুটি ধারাকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে দেখাই অধিক যুক্তিযুক্ত। বাস্তবতাও তা-ই নির্দেশ করে। দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য সাফল্য প্রমাণ করে যে, উপযুক্ত সুযোগ ও দিকনির্দেশনা পেলে তারা যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রে সফল হতে পারে।
৫. আমাদের করণীয়
শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে পাঠ্যক্রম, গবেষণা, প্রযুক্তি, ভাষাদক্ষতা ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়ের মাধ্যমে—পরস্পরকে হেয় করার মাধ্যমে নয়।
জাতীয় শিক্ষানীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সমন্বিত শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী সমালোচনামূলক চিন্তা, বৈজ্ঞানিক মনন, নৈতিক মূল্যবোধ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং মানবিক চেতনার সমন্বয়ে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে।
উপসংহার
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে একজন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, আইনজীবী, উদ্যোক্তা কিংবা আলেম—সবারই প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষার প্রতিটি ধারার নিজস্ব শক্তি ও অবদান আছে। তাই কৃত্রিম বিভাজন নয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, তথ্যভিত্তিক আলোচনা এবং সমন্বিত শিক্ষাদর্শই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কারণ, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি কোনো একক শিক্ষাব্যবস্থায় নয়; বরং জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতার সম্মিলিত বিকাশে নিহিত।
- মুফিদুল আলম
১৭ জুলাই ২০২৬
১৩
১৮ মন্তব্য