Loading..

ব্লগ

রিসেট

২২ জুলাই, ২০২৬ ১১:১৪ অপরাহ্ণ

দুর্নীতি: আমরা কি শুধু ভুক্তভোগী, নাকি অংশীদার?

একটি সমাজকে ধ্বংস করতে সব সময় যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একটি সমাজ নিজের ভেতরেই ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে যখন সততা ব্যতিক্রম হয়ে যায়, আর অসততা হয়ে ওঠে স্বাভাবিক। যখন মানুষ আইন ভাঙাকে অপরাধ নয়, বরং "চালাকির পরিচয়" বলে মনে করতে শুরু করে। তখন দুর্নীতি আর কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ থাকে না; এটি সমাজের রক্তপ্রবাহে মিশে যাওয়া এক নীরব বিষে পরিণত হয়। হেলাল উদ্দিন আহমেদের "বাংলাদেশে দুর্নীতির দুষ্টচক্র" বইয়ে দেখানো হয়েছে যে দুর্নীতি কেবল ব্যক্তিগত লোভের ফল নয়; এটি প্রশাসনিক কাঠামো, দুর্বল জবাবদিহি এবং সামাজিক আচরণের সঙ্গে জড়িত একটি চক্র।


বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। সংবাদমাধ্যমে বড় বড় কেলেঙ্কারির খবর আসে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা হয়, চায়ের আড্ডায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন আমরা খুব কমই করি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা কি সত্যিই দাঁড়াই, নাকি শুধু তখনই প্রতিবাদ করি যখন সেই দুর্নীতির সুবিধাভোগী হতে পারি না?

এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ দুর্নীতি কেবল কিছু মানুষের অপরাধ নয়; এটি একটি সামাজিক সংস্কৃতি, একটি মানসিকতা এবং গভীর নৈতিক সংকটের প্রতিফলন।

সৎ মানুষ কেন অসৎ হয়ে যায়?

আমরা প্রায়ই ধরে নিই, দুর্নীতিবাজ মানুষ জন্মগতভাবেই অসৎ। বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। একজন নতুন কর্মকর্তা, শিক্ষক, ব্যবসায়ী বা কর্মচারী হয়তো সততা নিয়েই পথচলা শুরু করেন। কিন্তু চারপাশে যখন দেখেন, নিয়ম মেনে চলা মানুষ পিছিয়ে পড়ছে, আর অনিয়মকারীরা দ্রুত সফল হচ্ছে, তখন তাঁর ভেতরে প্রশ্ন জাগে "আমি একা সৎ থেকে কী লাভ?"

এর সঙ্গে যুক্ত হয় পারিবারিক প্রত্যাশা। সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়াতে হবে, পরিবারের জন্য বাড়ি-গাড়ি কিনতে হবে, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সামাজিক মর্যাদা ধরে রাখতে হবে। সহকর্মীরা যখন বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন, তখন সৎ মানুষটির ওপরও এক ধরনের অদৃশ্য চাপ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে আপস শুরু হয় প্রথমে ছোট, পরে বড়।এটি কোনো অজুহাত নয়; বরং একটি বাস্তব সামাজিক প্রক্রিয়া। তাই দুর্নীতিকে বোঝার জন্য শুধু ব্যক্তির চরিত্র নয়, তার চারপাশের পরিবেশও বিশ্লেষণ করতে হবে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা, নাকি শুধু অন্যের দুর্নীতির বিরুদ্ধে?

একটি অস্বস্তিকর সত্য হলো আমরা দুর্নীতিকে ঘৃণা করি, কিন্তু সব সময় দুর্নীতির নীতিকে নয়; অনেক সময় ঘৃণা করি সেই দুর্নীতিকে, যেখান থেকে আমরা বঞ্চিত হই।

চাকরি পেতে সুপারিশ চাই, দ্রুত কাজ করাতে "ম্যানেজ" করতে চাই, লাইনে না দাঁড়িয়ে পরিচয় ব্যবহার করতে চাই, কর ফাঁকি দিয়ে নিজেকে বুদ্ধিমান ভাবি। কিন্তু অন্য কেউ একই কাজ করলে আমরা তাকে দুর্নীতিবাজ বলি।

মানুষ নিজের অনিয়মকে প্রায়ই ভিন্ন নামে ডাকে "এটা তো সিস্টেম", "সবাই করছে", "এটা না করলে চলবে না", "এটা আমার অধিকার"। ভাষা বদলে যায়, কিন্তু কাজের প্রকৃতি বদলায় না। এই আত্মপ্রবঞ্চনাই দুর্নীতিকে টিকিয়ে রাখে।

তবে এটাও সত্য যে অনেক মানুষ কঠিন পরিস্থিতিতেও দুর্নীতিকে প্রত্যাখ্যান করেন। তাই "সবাই একই" এমন সিদ্ধান্তও সঠিক নয়। বরং বলা যায়, সমাজে সততা ও আপস দুই প্রবণতাই আছে; কোনটি শক্তিশালী হবে, তা নির্ভর করে আমাদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ওপর।

অবৈধ সম্পদের প্রতি সামাজিক শ্রদ্ধা: নীরব বিপর্যয়

একজন মানুষের আয়ের উৎস কী  এই প্রশ্নটি আমাদের সমাজে ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে। বরং মানুষ দেখছে বাড়ি কত বড়, গাড়ি কত দামি, অনুষ্ঠানে কত জাঁকজমক। যদি পরিবারের কোনো সদস্য অবৈধভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হন, অনেক ক্ষেত্রে পরিবার সেই সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। বরং সেটিকে সাফল্যের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে। সমাজও প্রায়ই সেই ব্যক্তিকে সম্মান করে, তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী হয়, কখনো কখনো ভয়ও পায়। ফলে তরুণ প্রজন্ম একটি বিপজ্জনক বার্তা পায় সততার চেয়ে সফলতার বাহ্যিক প্রদর্শনই বেশি মূল্যবান। এই মানসিকতা কেবল ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে।

ছোট অনিয়ম থেকেই বড় দুর্নীতির জন্ম

আমরা প্রায়ই মনে করি, দুর্নীতি মানেই কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ। কিন্তু বড় দুর্নীতির শিকড় থাকে ছোট ছোট দৈনন্দিন অনিয়মে। লাইনে কাটিয়ে আগে কাজ করানো, পরীক্ষায় নকল করা, মিথ্যা তথ্য দিয়ে সুবিধা নেওয়া, ঘুষ দিয়ে দ্রুত সেবা আদায়, সুপারিশের মাধ্যমে নিয়ম এড়িয়ে যাওয়া, কর ফাঁকি দেওয়া কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার এসবই সেই সংস্কৃতির অংশ, যা পরে বৃহত্তর দুর্নীতির ভিত্তি তৈরি করে।

শিশুরা পরিবার থেকেই শেখে নিয়ম মানা সম্মানের, নাকি নিয়ম ভাঙা বুদ্ধিমত্তার। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয় আদালতে নয়, পরিবারের ডাইনিং টেবিলে; শুরু হয় বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে; শুরু হয় আমাদের দৈনন্দিন সিদ্ধান্তে।

দুর্নীতির প্রকৃত মূল্য কে দেয়?

দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি মানুষের বিশ্বাস ধ্বংস করে। যখন মেধার পরিবর্তে অনিয়ম সফল হয়, তখন যোগ্য মানুষ হতাশ হয়। বিনিয়োগ কমে, কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান নেমে যায়, রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা দুর্বল হয়। ন্যায়বিচারের ওপর মানুষের বিশ্বাস কমতে থাকে।

এর চেয়েও বড় ক্ষতি হয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের। তারা যদি দেখে যে সততার মূল্য নেই, তবে তারা নৈতিকতার পরিবর্তে শর্টকাটের পথকেই স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করবে। তখন দুর্নীতি আর ব্যতিক্রম থাকবে না; সেটিই হয়ে উঠবে নতুন সামাজিক নিয়ম।
যখন প্রহরীই দেয়াল ভাঙে
একটি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি তখনই ঘটে, যখন দুর্নীতি প্রতিরোধের দায়িত্ব যাদের কাঁধে, জনগণের চোখে তারাই দুর্নীতির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন শুধু কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, মানুষের আস্থাও ভেঙে যায়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজ তাঁর "ভয়ের সংস্কৃতি: বাংলাদেশে রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ ও ব্যক্তিজীবন" গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেছেন, যখন মানুষ মনে করে ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তখন নীরবতা একটি সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়। এই নীরবতা জবাবদিহিকে দুর্বল করে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ কমিয়ে দেয়।

আমরা প্রায়ই দুর্নীতিবিরোধী স্লোগান শুনি, শুদ্ধতার অঙ্গীকার দেখি, কঠোর বক্তব্য শুনি। কিন্তু সমাজে একটি তীব্র হতাশা তৈরি হয়, যখন মানুষ মনে করে মুখে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা হলেও বাস্তবে একই অনিয়ম, একই ক্ষমতার অপব্যবহার এবং একই স্বার্থের চর্চা চলতে থাকে। নীতির ভাষণ আর বাস্তবতার ব্যবধান যত বাড়ে, নাগরিকের বিশ্বাস তত কমে।
এই বৈপরীত্যই সবচেয়ে বিপজ্জনক। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন আইন ব্যক্তি, পদ, ক্ষমতা বা পরিচয় দেখে নয়; প্রমাণ ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সমানভাবে প্রয়োগ হবে। কারণ দুর্নীতিবিরোধী সংগ্রামের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু কঠোর বক্তব্য নয়, বরং নিজের আচরণের সততা।

সমাধানের দায় কার?

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু সরকারের কাজ নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো আইন প্রয়োগ, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা। কিন্তু নাগরিক যদি নিজে অনিয়মে অংশ নেন, তবে শুধু কঠোর আইন যথেষ্ট হবে না।

পরিবারকে সন্তানকে শেখাতে হবে অবৈধ অর্থ কখনো গর্বের বিষয় নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শুধু পরীক্ষার ফল নয়, নৈতিক শিক্ষাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বকে সততা ও জবাবদিহির মূল্যবোধ শক্তিশালী করতে হবে। গণমাধ্যমকে তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। আর নাগরিককে প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তে সততার চর্চা করতে হবে।

দুর্নীতি কেবল কোনো দপ্তরের ফাইলে, আদালতের মামলায় বা সংবাদপত্রের শিরোনামে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের দৈনন্দিন আচরণ, মূল্যবোধ এবং নীরব সমর্থনের মধ্যেও বাস করে।

তাই প্রশ্নটি শুধু এই নয় দেশে দুর্নীতি কেন আছে? বরং আরও কঠিন প্রশ্ন হলো আমার কোনো সিদ্ধান্ত, কোনো নীরবতা বা কোনো সুবিধা কি এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে?

একটি সমাজ বদলায় তখনই, যখন মানুষ অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজের দিকে তাকাতে শেখে। রাষ্ট্রকে সৎ হতে হবে, প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছ হতে হবে এটি যেমন সত্য, তেমনি আরেকটি সত্য হলো, একজন নাগরিকের বিবেকও একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

যেদিন আমরা অবৈধ সম্পদের চাকচিক্যের চেয়ে সৎ মানুষের সম্মানকে বড় করে দেখব, যেদিন সন্তানদের বলব "অসৎভাবে ধনী হওয়ার চেয়ে সৎভাবে সাধারণ থাকা শ্রেয়" সেদিনই দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের প্রকৃত লড়াই শুরু হবে। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র কোনো আইন নয়; সেটি হলো একটি জাগ্রত বিবেক।


সাগর কর্মকার

সহকারী শিক্ষক

বিয়াম ল্যাবরেটরী স্কুল, হবিগঞ্জ 

মন্তব্য করুন

ব্লগ