সহকারী অধ্যাপক
২৩ জুলাই, ২০২৬ ০৮:১১ পূর্বাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
মুমিনের জীবন কখনোই কেবল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের নাম নয়। বরং ইমানের পথে চলতে গিয়ে তাকে নানা ধরনের পরীক্ষা ও কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় দোয়া কবুল হতে বিলম্ব হয়, কখনো প্রিয় মানুষ বা সম্পদ হারাতে হয়, আবার কখনো একাকীত্ব জীবনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। এসব পরিস্থিতি সবসময় আল্লাহর অসন্তুষ্টির নিদর্শন নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো বান্দার ইমান, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যম। কুরআন ও সহিহ হাদিস আমাদের শেখায়, প্রতিটি পরীক্ষার মধ্যেই একজন মুমিনের জন্য রয়েছে অগণিত কল্যাণ ও প্রতিদান।
১. দোয়া কবুল হতে দেরি হওয়া
অনেক সময় মানুষ আন্তরিকভাবে দোয়া করার পরও সঙ্গে সঙ্গে ফল দেখতে পায় না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সর্বজ্ঞ। তিনি জানেন, কখন, কীভাবে এবং কোন রূপে বান্দার জন্য দোয়া কবুল হওয়াই সর্বোত্তম। তাই দেরি মানেই দোয়া প্রত্যাখ্যাত নয়; বরং তা হতে পারে উত্তম সময়ের অপেক্ষা অথবা আরও বড় কল্যাণের প্রস্তুতি। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَعَسَىٰ أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ
‘হতে পারে তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২১৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
يُسْتَجَابُ لِأَحَدِكُمْ مَا لَمْ يَعْجَلْ، يَقُولُ: دَعَوْتُ فَلَمْ يُسْتَجَبْ لِي
‘তোমাদের প্রত্যেকের দোয়া কবুল হয়, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়ো করে বলে, আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হয়নি।’ (বুখারি ৬৩৪০, মুসলিম ২৭৩৫)
২. জীবনে বারবার পরীক্ষা আসা
একজন মুমিনের জীবনে দারিদ্র্য, অসুস্থতা, প্রিয়জন হারানো কিংবা নানা প্রতিকূলতা আসতে পারে। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার ইমান, ধৈর্য ও তাকওয়ার দৃঢ়তা প্রকাশ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
‘আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৫৫)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ عِظَمَ الْجَزَاءِ مَعَ عِظَمِ الْبَلَاءِ، وَإِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ قَوْمًا ابْتَلَاهُمْ
‘বড় প্রতিদান বড় পরীক্ষার সঙ্গেই আসে। আল্লাহ যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন, তখন তাদের পরীক্ষা করেন।’ (তিরমিজি ২৩৯৬)
৩. প্রিয় জিনিস হারানোর কষ্ট
মানুষ কখনো সম্পদ হারায়, কখনো চাকরি, কখনো প্রিয় মানুষ কিংবা পরিবারের কাউকে হারায়। এসব বিচ্ছেদ অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও একজন মুমিন বিশ্বাস করে— সবকিছুই আল্লাহর মালিকানাধীন এবং একদিন তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
‘যাদের ওপর বিপদ আসে, তারা বলে— নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৫৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ... حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ
‘মুসলিমের ওপর যে ক্লান্তি, অসুস্থতা, দুঃখ, কষ্ট, দুশ্চিন্তা কিংবা এমনকি কাঁটার আঘাতও আসে, আল্লাহ এর মাধ্যমে তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেন।’ (বুখারি ৫৬৪১, মুসলিম ২৫৭৩)
৪. একাকীত্ব
কখনো মানুষ নিজেকে খুব একা অনুভব করে। চারপাশে মানুষ থাকলেও অন্তরে শূন্যতা কাজ করে। এই সময়টিই আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ হতে পারে। যখন বান্দা একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শেখে, তখন তার হৃদয়ে প্রকৃত প্রশান্তি নেমে আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ
‘তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আল-হাদীদ: আয়াত ৪)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা আর-রা'দ: আয়াত ২৮)
জীবনের প্রতিটি কষ্ট একজন মুমিনের জন্য হতাশার কারণ নয়; বরং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি সুযোগ। দোয়া কবুল হতে বিলম্ব, বারবার পরীক্ষা, প্রিয় কিছু হারানো কিংবা একাকীত্ব—এসবই বান্দার ইমান, ধৈর্য ও তাওয়াক্কুলকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তাই বিপদের সময় নিরাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা, ধৈর্য ধারণ করা এবং ইবাদতে অটল থাকা একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে প্রতিটি পরীক্ষায় ধৈর্য ধারণ করার এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমিন।
১৩
১৫ মন্তব্য