Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৪ জুলাই, ২০২৬ ০১:৩৭ অপরাহ্ণ

পরিকল্পনা, আত্মবিশ্বাস ও ষষ্ঠ শ্রেণীর ঐতিহাসিক জয়

সাগর কর্মকার
সহকারী শিক্ষক
বিয়াম ল্যাবরেটরী স্কুল
স্কুলের মাঠে সেদিন ছিল এক অন্যরকম সকাল। চারদিকে উৎসবের আমেজ। শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস, শিক্ষকদের ব্যস্ততা আর গ্যালারিতে জমে ওঠা কোলাহল সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল যেন ছোট্ট একটি বিশ্বকাপের ফাইনাল। আন্তঃমিনি ফুটবল প্রতিযোগিতার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছে ষষ্ঠ শ্রেণি ও সপ্তম শ্রেণি।
সপ্তম শ্রেণির দলটি ছিল সবার কাছে ভয়ের প্রতীক। তারা শারীরিকভাবে বড়, শক্তিশালী এবং অভিজ্ঞ। মাঠে তাদের পাসিং, বল কন্ট্রোল, রক্ষণ ও আক্রমণ ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। অনেকেই বলত, "ওদের হারানো প্রায় অসম্ভব।"
অন্যদিকে ষষ্ঠ শ্রেণির খেলোয়াড়রা ছিল ছোট। প্রতিভা ছিল, পরিশ্রমও ছিল, কিন্তু প্রতিপক্ষের নাম শুনেই তাদের চোখে ভয় নেমে আসত। তারা নিজেরাই বলতে শুরু করেছিল,
"স্যার, ওরা তো আমাদের চেয়ে অনেক ভালো খেলে।"
"আমরা কি সত্যিই জিততে পারব?"
আমি তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, তারা এখনও মাঠে নামেনি, অথচ মনের ভেতর অনেক আগেই হেরে গেছে।
আমি সবাইকে শ্রেণিকক্ষে ডেকে নিলাম। কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর ধীরে ধীরে বললাম,
"তোমরা কি জানো, ফুটবল শুধু পায়ের খেলা নয়; এটি মস্তিষ্কের খেলা। শুধু শক্তিশালী হলেই কেউ জয়ী হয় না। যে বেশি চিন্তা করতে পারে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, দলকে নিয়ে খেলতে পারে এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রাখে শেষ পর্যন্ত জয় তারই হয়। শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। আমি বোর্ডে দুটি বড় বৃত্ত ও ফুটবল মাঠ  আঁকলাম।
একটিতে লিখলাম 'প্রতিপক্ষ'
অন্যটিতে 'আমরা'
তারপর বললাম,
"এখন তোমরা বলো, সপ্তম শ্রেণির শক্তি কোথায়?"
একজন বলল, "ওদের গতি বেশি।"
আরেকজন বলল, "ওদের পাস খুব ভালো।"
তারপর প্রশ্ন করলাম,
"এবার বলো, ওদের দুর্বলতা কোথায়?"
অনেকক্ষণ নীরবতার পর একজন লাজুক কণ্ঠে বলল,
"স্যার, ওরা মাঝে মাঝে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে যায়।
আরেকজন বলল,"সবাই সামনে উঠে যায়, তখন পেছনে ফাঁকা জায়গা থাকে। আমি বললাম, দেখেছ? পৃথিবীর কোনো দলই দুর্বলতা ছাড়া নয়।
এরপর লিখলাম আমরা।
এরপর বোর্ডে  মাঠের একটি ছক আঁকিয়ে দিলাম।
"প্রথমে লিখো, তোমাদের শক্তি কোথায়? দুর্বলতা কোথায়? প্রতিপক্ষের শক্তি কী? তাদের দুর্বলতা কোথায়?প্রত্যেকে খাতায় লিখবে আমি কী ভালো পারি, কোথায় উন্নতি দরকার, আর দলকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি। তারপর মাঠের একটি ছক এঁকে দেখাও, কীভাবে পাস করবে, কোথায় দাঁড়াবে, কীভাবে আক্রমণ গড়বে।শিক্ষার্থীরা লিখতে শুরু করল।
কেউ লিখল, "আমি দ্রুত দৌড়াতে পারি।"
কেউ লিখল, "আমি ভালো পাস দিতে পারি।"
কেউ লিখল, "আমি ভয় পাই, কিন্তু চেষ্টা করব,অনেকে আবার খেলার পরিকল্পনা সাজালো । কিছুক্ষণ পর ছেলেদের চোখে ভয়ের জায়গায় চিন্তার আলো ফুটে উঠল।

আমি আবার বললাম, "আজ যারা মাঠে নামবে না, তারাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তোমাদের কণ্ঠই হবে দলের অতিরিক্ত শক্তি। এক মুহূর্তের জন্যও চুপ থাকবে না। আর চোখ বন্ধ করে কল্পনা করো শেষ বাঁশি বাজছে, তোমরাই ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে আছো।
ছেলেরা একসঙ্গে বলে উঠল, "স্যার, আমরা পারব!
আমি বললাম, না, 'পারব' নয়... বলো আমরা জিতব। মুহূর্তেই চারদিকে ধ্বনি উঠল,
আমরা জিতব! আমরা জিতব!

ফাইনালের দিন।
মাঠের এক পাশে সপ্তম শ্রেণির খেলোয়াড়রা আত্মবিশ্বাসে হাসছিল। তাদের চোখে ছিল সহজ জয়ের প্রত্যাশা।
অন্য পাশে ষষ্ঠ শ্রেণি নীরবে নিজেদের পরিকল্পনা শেষবারের মতো মনে করছিল। রেফারির বাঁশি বাজল।
খেলা শুরু হলো। প্রথম কয়েক মিনিটেই সবাই অবাক হয়ে গেল। ষষ্ঠ শ্রেণির খেলোয়াড়রা এলোমেলো দৌড়াচ্ছে না। তারা ছোট ছোট পাসে বল চালাচ্ছে। একজনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে বল যাচ্ছে। কেউ অযথা ড্রিবল করছে না।
সপ্তম শ্রেণির খেলোয়াড়রা প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা বুঝতে পারল আজকের প্রতিপক্ষ আগের মতো নেই।
হাসনাত, দলের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার, যেন রক্ষণের অদৃশ্য প্রাচীর। প্রতিটি আক্রমণ ঠান্ডা মাথায় ভেঙে দিচ্ছিল। কখনও ট্যাকল, কখনও নিখুঁত ক্লিয়ারেন্স, আবার কখনও দূরপাল্লার সঠিক পাসে আক্রমণের সূচনা করছিল। পুরো টুর্নামেন্টে তার অসাধারণ নৈপুণ্যের জন্য পরে সে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট নির্বাচিত হয়।
বাম প্রান্তে তাসরিফ দৌড়াচ্ছিল অক্লান্ত গতিতে। প্রতিপক্ষের উইঙ্গারদের একের পর এক আক্রমণ থামিয়ে দিচ্ছিল। আবার সুযোগ পেলেই সামনে উঠে আক্রমণে সহায়তা করছিল।
ডানদিকে স্যামা ছিল অসাধারণ দৃঢ়। তার সময়জ্ঞান, বল কেড়ে নেওয়ার দক্ষতা এবং নিখুঁত পাসে প্রতিপক্ষ বারবার হতাশ হচ্ছিল।
গোলবারের নিচে স্বাধীন ছিল অবিচল আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। সপ্তম শ্রেণির শক্তিশালী শটগুলো একের পর এক দারুণ দক্ষতায় রুখে দিচ্ছিল সে। প্রতিটি সেভের পর পুরো গ্যালারি করতালিতে ফেটে পড়ছিল।আর ইয়াসিন  সে যেন সুযোগের অপেক্ষায় থাকা এক যোদ্ধা।
সামনের সারিতে মাহি ছিল নিরন্তর পরিশ্রমী। কখনও বল ধরে রাখছে, কখনও ডিফেন্ডারদের টেনে নিয়ে সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করছে। তার প্রতিটি দৌড় প্রতিপক্ষকে অস্থির করে তুলছিল।ম্যাচের শেষ দিকে হাসনাতের দুর্দান্ত ট্যাকল থেকে বল যায় তাসরিফের কাছে। তাসরিফ নিখুঁত এক পাস বাড়িয়ে দেন মাহির উদ্দেশ্যে। মাহি অসাধারণ দক্ষতায় বল নিয়ন্ত্রণ করে একজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে এক মুহূর্তের স্থিরতা, তারপর ডান পায়ের দুর্দান্ত শট বল জড়িয়ে যায় জালে!
গো-ও-ও-ল!
মুহূর্তেই পুরো মাঠ করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।

ধীরে ধীরে সপ্তম শ্রেণির খেলোয়াড়রা চাপে পড়ে গেল। তাদের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে যেতে লাগল। ছোট ছোট পাস, শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ষষ্ঠ শ্রেণি পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল।

মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সহপাঠীদের কণ্ঠ যেন খেলোয়াড়দের পায়ে নতুন শক্তি ঢেলে দিচ্ছিল।
একসময় সপ্তম শ্রেণির খেলোয়াড়রা অস্থির হয়ে পড়ল। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তাদের ভুল করাতে শুরু করল।
শেষ কয়েক মিনিটে সপ্তম শ্রেণি মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালাল।
কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণির প্রতিটি খেলোয়াড় আজ শুধু নিজের জন্য খেলছিল না; তারা খেলছিল পুরো দলের স্বপ্ন নিয়ে।
শেষ বাঁশি বাজতেই সবাই ছুটে গেল মাঠের মাঝখানে।
কেউ আনন্দে কাঁদছে। কেউ একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে।
ছোট ছোট মুখে সেই হাসি ছিল বিজয়ের, বিশ্বাসের এবং পরিশ্রমের।
আমি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।
আমার মনে হচ্ছিল, আজ তারা শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ জেতেনি। তারা জয় করেছে নিজের ভয়কে। জয় করেছে আত্মসন্দেহকে। জয় করেছে সেই মানসিক পরাজয়কে, যা মানুষকে চেষ্টা করার আগেই থামিয়ে দেয়।
আমি ধীরে ধীরে তাদের কাছে গিয়ে শুধু একটি কথাই বললাম"আজ তোমরা প্রমাণ করলে, জয় আগে অর্জিত হয় মানুষের মনে, তারপর মাঠে।"
ট্রফি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা হয়তো বুঝতে পেরেছিলো তারা জীবনের একটি অমূল্য শিক্ষা  পরিকল্পনা, আত্মবিশ্বাস, দলগত ঐক্য এবং ইতিবাচক মনোভাব থাকলে অসম্ভব বলেও কিছু থাকে না।
মানুষের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ বাইরের কেউ নয়, নিজের ভয় এবং আত্মসন্দেহ। যে নিজেকে বিশ্বাস করতে শেখে, পরিকল্পনা করে এগিয়ে যায় এবং দলকে সঙ্গে নিয়ে লড়ে, তার কাছেই একদিন বিজয় ধরা দেয়।

মন্তব্য করুন