Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ জুলাই, ২০২৬ ০২:১২ অপরাহ্ণ

অনলাইন ক্লাস ও শিক্ষা কনটেন্ট তৈরিতে স্মার্টফোনের ভূমিকা

অনলাইন ক্লাস ও শিক্ষা কনটেন্ট তৈরিতে স্মার্টফোনের ভূমিকা

মনিরুল হক,

             করোনা মহামারির পর বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি ছোট্ট যন্ত্র, স্মার্টফোন। যে ফোনটি একসময় শুধু কথা বলা বা বিনোদনের মাধ্যম ছিল, আজ সেটি হয়ে উঠেছে শ্রেণিকক্ষের সম্প্রসারিত রূপ। শহরের অভিজাত স্কুল থেকে শুরু করে কুষ্টিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত, স্মার্টফোন এখন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের জন্যই একটি অপরিহার্য হাতিয়ার। এই লেখায় আমরা দেখব কীভাবে স্মার্টফোন অনলাইন ক্লাস পরিচালনায় এবং শিক্ষা কনটেন্ট তৈরিতে ভূমিকা রাখছে, এর সুযোগ কোথায়, চ্যালেঞ্জ কী এবং আমাদের দেশের বাস্তবতায় এর ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে।

করোনাকালীন সময়ের উত্তরাধিকারঃ

                                          ২০২০ সালে যখন দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, তখন লাখো শিক্ষার্থী প্রথমবারের মতো পড়াশোনার জন্য স্মার্টফোনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সংসদ টিভির মাধ্যমে ক্লাস সম্প্রচার শুরু হলেও বাস্তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী তা দেখেছে বাবা মায়ের হাতের ফোনেই। পরবর্তীতে জুম, গুগল মিট এবং ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে অসংখ্য স্কুল ও কলেজ নিয়মিত ক্লাস নেওয়া শুরু করে। সেই সময়টা কষ্টের হলেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস তৈরি করে দিয়ে গেছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই বুঝতে শেখেন যে চার দেয়ালের বাইরেও শিক্ষা চলতে পারে, আর এর প্রধান বাহন হতে পারে হাতের মুঠোয় থাকা একটি স্মার্টফোন। আজ মহামারি অতীত হলেও সেই অভ্যাস রয়ে গেছে, বরং তা আরও পরিণত রূপ নিয়েছে।

অনলাইন ক্লাসে স্মার্টফোনের বাস্তব ব্যবহারঃ

                                                    বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ল্যাপটপ বা কম্পিউটার এখনো অনেক পরিবারের কাছে বিলাসিতার নামান্তর, কিন্তু স্মার্টফোন প্রায় প্রতিটি পরিবারেই কোনো না কোনোভাবে পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের হিসাব অনুযায়ী দেশে মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা কোটি কোটি ছাড়িয়েছে, আর এর বড় অংশই স্মার্টফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। ফলে যখন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেটি এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হয় যাতে একটি সাধারণ অ্যান্ড্রয়েড ফোন দিয়েও শিক্ষার্থী তাতে অংশ নিতে পারে।

গ্রামীণ এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে বিশেষ করে দেখা যায়, শিক্ষকরা ফেসবুক গ্রুপ বা পেজের মাধ্যমে রেকর্ড করা লেকচার আপলোড করেন, যা শিক্ষার্থীরা তাদের সুবিধামতো সময়ে দেখে নিতে পারে। এতে ইন্টারনেট খরচ কম হয় এবং নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে সরাসরি সম্প্রচারে যে বিঘ্ন ঘটে তাও এড়ানো যায়। আবার শহরাঞ্চলের কোচিং সেন্টার ও কিছু বিদ্যালয় হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে নোট, প্রশ্নপত্র এবং ভিডিও লিংক শেয়ার করে থাকে, যা সম্পূর্ণভাবেই স্মার্টফোন কেন্দ্রিক একটি ব্যবস্থা।

শিক্ষক হিসেবে কনটেন্ট তৈরিতে স্মার্টফোনের অবদানঃ

                                                                      শুধু ক্লাস নেওয়াই নয়, শিক্ষা কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রেও স্মার্টফোন এখন একটি সম্পূর্ণ স্টুডিওর কাজ করে দিচ্ছে। আমাদের দেশের অনেক শিক্ষক এখন নিজের ফোনেই ভিডিও ধারণ করে, তাতে সম্পাদনা করে ইউটিউব বা ফেসবুক পেজে আপলোড করছেন। ক্যাপকাট বা ইনশট এর মতো মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে জটিল সম্পাদনার কাজও এখন হাতের মুঠোয়। ক্যানভার মোবাইল সংস্করণ দিয়ে আকর্ষণীয় থাম্বনেইল, ইনফোগ্রাফিক বা উপস্থাপনার স্লাইড তৈরি করা যাচ্ছে খুব সহজেই, কোনো গ্রাফিক ডিজাইনারের সাহায্য ছাড়াই।

গণিত বা বিজ্ঞানের শিক্ষকরা ফোনের ক্যামেরা দিয়ে হাতে লেখা সমাধান রেকর্ড করে সরাসরি শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। বাংলা বা ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষকরা কবিতা আবৃত্তি বা নাটকীয় পাঠের ভিডিও তৈরি করছেন, যা প্রথাগত ক্লাসরুমের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে শিক্ষার্থীদের কাছে। এমনকি প্রশ্নব্যাংক বা মডেল টেস্ট তৈরির কাজেও এখন অনেকে গুগল ফর্মস বা কুইজিজের মতো মোবাইল বান্ধব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন, যার মাধ্যমে মুহূর্তেই ফলাফল বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে।

 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্মার্টফোনের মেলবন্ধনঃ

                                  সাম্প্রতিক সময়ে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে, তা হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক অ্যাপের ব্যবহার। চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা ক্লডের মতো এআই টুল এখন মোবাইল অ্যাপ আকারেও ব্যবহার করা যাচ্ছে, যা দিয়ে শিক্ষকরা পাঠ পরিকল্পনা তৈরি, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন এবং এমনকি জটিল বিষয় সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করার কনটেন্ট লিখে ফেলতে পারছেন। স্মার্ট বাংলাদেশ ভিশন ২০৪১ এর আওতায় সরকারও শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে, আর এই লক্ষ্য অর্জনে স্মার্টফোন একটি বাস্তবসম্মত ও সাশ্রয়ী মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের শিক্ষক বাতায়ন প্ল্যাটফর্মেও এখন হাজার হাজার শিক্ষক তাদের তৈরি কনটেন্ট আপলোড করছেন, যার একটি বড় অংশ স্মার্টফোনেই ধারণ ও সম্পাদনা করা। এছাড়া a2i এর মুক্তপাঠ প্ল্যাটফর্মও মোবাইল বান্ধব করে সাজানো হয়েছে, যাতে দেশের যেকোনো প্রান্তের শিক্ষক বা শিক্ষার্থী সহজেই তা ব্যবহার করতে পারেন।

চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতাঃ

                       তবে এই পুরো চিত্রটি একেবারে গোলাপি নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্মার্টফোন নির্ভর শিক্ষার সবচেয়ে বড় বাধা হলো ডিজিটাল বৈষম্য। শহর ও গ্রামের মধ্যে ইন্টারনেট সংযোগের মান এবং গতিতে বিস্তর ফারাক রয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে অনেক সময় সরাসরি ক্লাসে অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একই পরিবারে একাধিক সন্তান থাকলে একটিমাত্র স্মার্টফোন ভাগাভাগি করে ক্লাস করার বাস্তবতাও অনেক জায়গায় দেখা যায়।

মোবাইল ডেটার উচ্চমূল্যও একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করে, বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য। এছাড়া দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের চোখের সমস্যা এবং মনোযোগ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কাও উপেক্ষা করার মতো নয়। অনেক অভিভাবক এই নিয়ে উদ্বিগ্ন যে স্মার্টফোন হাতে দেওয়ার পর শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গেমে বেশি সময় দিচ্ছে। ফলে শুধু প্রযুক্তি সরবরাহ করলেই হবে না, সঙ্গে দরকার সঠিক দিকনির্দেশনা এবং নজরদারির ব্যবস্থাও।

সম্ভাবনাময় পথঃ

               এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে এগিয়ে যাওয়ার পথও কিন্তু আমাদের সামনে খোলা আছে। স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মোবাইল কনটেন্ট তৈরির দক্ষতা বাড়ানো গেলে গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোও নিজস্ব মানসম্মত শিক্ষা উপকরণ তৈরি করতে পারবে। মোবাইল অপারেটরদের সাথে সমন্বয় করে শিক্ষামূলক কনটেন্টের জন্য বিশেষ ডেটা প্যাকেজ চালু করা গেলে খরচের চাপ কমানো সম্ভব। বিদ্যালয় পর্যায়ে ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টিও পাঠ্যক্রমে আরও গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

খসড়া জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা ২০২৬ থেকে ২০৩০ এর মতো উদ্যোগগুলো যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে আগামী দিনে স্মার্টফোন কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা আরও সংগঠিত ও কার্যকর রূপ পেতে পারে। বেসরকারি উদ্যোক্তা এবং শিক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যদি তারা কম দামের ফোন এবং সীমিত ডেটার বাস্তবতা মাথায় রেখে তাদের প্ল্যাটফর্ম ডিজাইন করে।

       স্মার্টফোন আজ আর শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়, বরং বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এটি একদিকে যেমন প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কাছে মানসম্মত শিক্ষা উপকরণ পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি শিক্ষকদের হাতে তুলে দিয়েছে নিজস্ব কনটেন্ট তৈরির স্বাধীনতা। তবে এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে অবকাঠামোগত বৈষম্য দূর করা, দায়িত্বশীল ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানো একান্ত জরুরি। সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তা পেলে স্মার্টফোন হয়ে উঠতে পারে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তরে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারগুলোর একটি।

 

 

 

মোঃ মনিরুল হক

সহকারী শিক্ষক

আমলাবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়

০১৭২২ ২৭৩২৭২

 

মন্তব্য করুন