সহকারী শিক্ষক
২৬ জুলাই, ২০২৬ ১১:২২ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
সাইবার সিকিউরিটির দুনিয়ায় বায়োমেট্রিক অথেন্টিকেশন বা পরিচয় শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে এক নতুন বিপ্লবের নাম ‘ব্রেইনপ্রিন্ট’ (Brainprint)। পাসওয়ার্ড, ফিঙ্গারপ্রিন্ট (আঙুলের ছাপ) কিংবা ফেস আইডি (মুখের স্ক্যান)-এর যুগ পেরিয়ে ভবিষ্যতের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রবেশ করতে যাচ্ছে মানুষের মস্তিষ্কের ভেতরে।
নিচে ব্রেইনপ্রিন্ট এবং সাইবার সিকিউরিটিতে এর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
আমাদের শরীরের প্রতিটি মানুষের আঙুলের ছাপ যেমন আলাদা, তেমনি প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্কের গঠন এবং চিন্তা করার প্রক্রিয়া বা বৈদ্যুতিক তরঙ্গও সম্পূর্ণ আলাদা ও ইউনিক। মানুষ যখন কোনো নির্দিষ্ট শব্দ, ছবি বা উদ্দীপকের মুখোমুখি হয়, তখন তার মস্তিষ্ক যে অনন্য বৈদ্যুতিক সংকেত (Electrical Signal/EEG) তৈরি করে, তাকেই বলা হয় ‘ব্রেইনপ্রিন্ট’ বা মস্তিষ্কের ছাপ।
সাইবার সিকিউরিটির গবেষকদের মতে, এই মস্তিষ্কের সংকেত বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সম্ভব।
ইইজি (EEG) প্রযুক্তি: সাধারণত ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফি (EEG) প্রযুক্তির মাধ্যমে মাথার স্ক্যাল্পে সেন্সর বা ইলেক্ট্রোড যুক্ত করে মস্তিষ্কের এই বৈদ্যুতিক তরঙ্গ মাপা হয়।
উদ্দীপকের ব্যবহার: গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো ব্যক্তিকে বিশেষ কিছু শব্দ বা সংক্ষিপ্ত রূপ (Acronyms) দেখানোর পর তার মস্তিষ্ক যেভাবে সাড়া দেয়, তা একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়।
ডিজিটাল টেস্টিং: কম্পিউটার সিস্টেম এই অনন্য স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া বা ব্রেইনপ্রিন্ট রিড করে ব্যবহারকারীর পরিচয় নিশ্চিত করে।
চুরি করা অসম্ভব: পাসওয়ার্ড হ্যাক হতে পারে, ফেস আইডি বা ফিঙ্গারপ্রিন্টও আধুনিক প্রযুক্তিতে নকল করা সম্ভব। কিন্তু মানুষের জীবন্ত মস্তিষ্কের তরঙ্গ বা চিন্তা সরাসরি নকল করা প্রায় অসম্ভব।
পরিবর্তনযোগ্য (Cancellable): ফিঙ্গারপ্রিন্ট চুরি হলে তা বদলানো যায় না, কারণ মানুষ নতুন আঙুল গজাতে পারে না। কিন্তু ব্রেইনপ্রিন্টের ক্ষেত্রে কোনো নিরাপত্তা লঙ্ঘন হলে মস্তিষ্কের নতুন কোনো উদ্দীপক বা পাসফ্রেজ ব্যবহার করে নতুন ব্রেইনপ্রিন্ট সেট বা রিসেট করা সম্ভব।
অটো-লগআউট: ব্যবহারকারী যখনই ব্রেইনপ্রিন্ট রিডার বা হেডসেট খুলে ফেলবেন কিংবা তার মনোযোগ সরে যাবে বা সিস্টেম থেকে দূরে চলে যাবেন, সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাকাউন্ট বা সিস্টেম লক হয়ে যাবে।
ব্রেইনপ্রিন্ট সাইবার সুরক্ষার ভবিষ্যৎ হলেও এর কিছু বাস্তবভিত্তিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে:
জটিল হার্ডওয়্যার: বর্তমানের ইইজি ডিভাইসগুলো বেশ বড় এবং ল্যাবরেটরি-ভিত্তিক। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য এগুলোকে আরও ছোট ও সহজলভ্য করা সময়ের ব্যাপার।
মস্তিষ্কের পরিবর্তনশীলতা: মানুষের মানসিক অবস্থা, ক্লান্তি, কিংবা মেজাজের ওপর ভিত্তি করে মস্তিষ্কের তরঙ্গে কিছুটা তারতম্য হতে পারে। ফলে বিভ্রান্তি এড়াতে সিস্টেমকে আরও বেশি বুদ্ধিমান হতে হবে।
গোপনীয়তা ও নৈতিক প্রশ্ন: মানুষের মন বা মস্তিষ্কের ডেটা সরাসরি সাইবার সিকিউরিটির সাথে যুক্ত হলে তা চরম গোপনীয়তার লঙ্ঘন বা মানসিক নজরদারির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
পাসওয়ার্ডের দুর্বলতা এবং প্রচলিত বায়োমেট্রিকের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে ব্রেইনপ্রিন্ট সাইবার সিকিউরিটির দুনিয়ায় এক অচেনা দিগন্তের উন্মোচন করেছে। যদিও প্রযুক্তিটি এখনো মূলত গবেষণাগার ও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে অদূর ভবিষ্যতে অতি সংবেদনশীল এবং উচ্চ নিরাপত্তার ক্ষেত্রগুলোতে (যেমন- সামরিক স্থাপনা বা অত্যন্ত গোপনীয় ডাটা সেন্টার) পাসওয়ার্ডের বিকল্প হিসেবে মস্তিষ্কের এই অনন্য স্বাক্ষরই হয়ে উঠতে পারে ডিজিটাল সুরক্ষার শেষ দুর্গ।
১৩
১৫ মন্তব্য