সহকারী শিক্ষক
২৭ জুলাই, ২০২৬ ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ
শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও দায়িত্বশীল স্মার্টফোন ব্যবহার।
শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও দায়িত্বশীল স্মার্টফোন ব্যবহার
বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে একটি পর্যালোচনা আর্টিকেল।
মনিরুল হক
বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও এর প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রাম, প্রায় সব জায়গাতেই এখন শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে স্মার্টফোন দেখা যায়। করোনা মহামারির সময় অনলাইন ক্লাসের প্রয়োজনে যে প্রবণতা শুরু হয়েছিল, তা এখন আরও বিস্তৃত রূপ নিয়েছে। স্মার্ট বাংলাদেশ ভিশন ২০৪১ এর লক্ষ্য অনুযায়ী দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার যে উদ্যোগ চলছে, তাতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট এখন শিক্ষার একটি স্বাভাবিক অনুষঙ্গ। তবে এই প্রযুক্তি যেমন শিক্ষার্থীদের জন্য অসংখ্য সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিও। তাই শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীলতার বিষয়টি এখন সময়ের একটি জরুরি দাবি।
শিক্ষায় স্মার্টফোনের ইতিবাচক ভূমিকাঃ
স্মার্টফোন শিক্ষার্থীদের জ্ঞান আহরণের পরিধি অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। পাঠ্যবইয়ের বাইরেও ইন্টারনেট ঘেঁটে যেকোনো বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানার সুযোগ এখন হাতের মুঠোয়। ইউটিউবে শিক্ষামূলক ভিডিও দেখে জটিল বিষয় সহজে বোঝা যায়, বিভিন্ন শিক্ষামূলক অ্যাপ ব্যবহার করে নিজে নিজে অনুশীলন করা যায়, আর প্রয়োজনে শিক্ষকের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগও রাখা যায়। এনসিটিবির নতুন কারিকুলামে যে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে, তাতে তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতা অর্জনও একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর বিভিন্ন টুল এখন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা তাদের নিজে নিজে শেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করছে। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে স্মার্টফোন একজন শিক্ষার্থীর শেখার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করে তুলতে পারে।
যেসব ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে শিক্ষার্থীরাঃ
তবে এই সুযোগের পাশাপাশি বেশ কিছু ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। প্রথমত, পড়াশোনায় মনোযোগ নষ্ট হওয়া একটি বড় সমস্যা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গেমস আর বিনোদনমূলক কনটেন্টের প্রতি আকর্ষণে অনেক শিক্ষার্থী পড়ার সময় ফোনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, ফলে মনোযোগ ভেঙে যায় এবং পড়াশোনার মান কমে যায়। দ্বিতীয়ত, স্মার্টফোন আসক্তির প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। রাত জেগে ফোন ব্যবহারের কারণে ঘুমের ঘাটতি হয়, যা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তৃতীয়ত, সাইবার বুলিং বা অনলাইনে হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে। চতুর্থত, ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিড়ে সঠিক তথ্য চেনার দক্ষতার অভাবে অনেক শিক্ষার্থী বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এছাড়া ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে গুরুতর ঝুঁকি, কেননা অনেক শিক্ষার্থী না বুঝেই নিজের ব্যক্তিগত ছবি, অবস্থান বা তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করে ফেলে।
নিরাপদ ব্যবহারের জন্য শিক্ষার্থীদের করণীয়ঃ
শিক্ষার্থীদের নিজেদের কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন যাতে স্মার্টফোন তাদের জন্য ক্ষতির কারণ না হয়ে সহায়ক শক্তি হয়ে থাকে। পড়াশোনার নির্দিষ্ট সময়ে ফোন দূরে সরিয়ে রাখার অভ্যাস করা উচিত, যাতে মনোযোগ অটুট থাকে। প্রতিদিন স্ক্রিনের সামনে কতটা সময় কাটানো হচ্ছে সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি, এবং ঘুমানোর আগে অন্তত এক ঘণ্টা ফোন থেকে দূরে থাকার অভ্যাস স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। অপরিচিত ব্যক্তির অনুরোধ গ্রহণ না করা, ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি প্রকাশে সতর্ক থাকা এবং কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়লে তা লুকিয়ে না রেখে অভিভাবক বা শিক্ষকের সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা প্রয়োজন। ইন্টারনেটে পাওয়া যেকোনো তথ্য যাচাই না করে বিশ্বাস না করার অভ্যাস, তথা সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার দক্ষতা গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পাসওয়ার্ড নিরাপদ রাখা, অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের অনুমতি না দেওয়া এবং নিয়মিত প্রাইভেসি সেটিংস পরীক্ষা করার অভ্যাসও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
অভিভাবকের দায়িত্বঃ
সন্তানের স্মার্টফোন ব্যবহারে অভিভাবকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কড়াকড়ি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার চেয়ে সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা বেশি ফলপ্রসূ। ফোন ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া, কোন কোন অ্যাপ বা ওয়েবসাইট ব্যবহার করা যাবে তা নিয়ে সন্তানের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নিজে উদাহরণ হয়ে ওঠা অভিভাবকের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা নিজেরাও দিনের অনেকটা সময় ফোনে ব্যস্ত থাকেন, যা সন্তানের অভ্যাসকেও প্রভাবিত করে। তাই পরিবারে একসঙ্গে সময় কাটানোর কিছু মুহূর্তে ফোনমুক্ত থাকার নিয়ম চালু করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি সন্তান অনলাইনে কী দেখছে বা কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা, তবে তা যেন অতিরিক্ত নজরদারিতে পরিণত না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
বিদ্যালয় ও শিক্ষকের ভূমিকাঃ
বিদ্যালয়ে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক ক্লাস বা কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। শিক্ষকেরা শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহারিক ও নৈতিক দিক নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, যাতে শিক্ষার্থীরা কেবল প্রযুক্তি ব্যবহার করতেই নয়, বরং দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতেও শিখে। ক্লাস চলাকালে ফোন ব্যবহারের একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা এবং তা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য রাখা শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়ক হয়। একই সঙ্গে শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে দিলে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারবে যে প্রযুক্তি শুধু বিনোদনের জন্য নয়, শেখার জন্যও একটি কার্যকর মাধ্যম। বিদ্যালয় পর্যায়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে শিক্ষার্থীর অনলাইন আচরণ সম্পর্কে সামগ্রিক একটা ধারণা পাওয়া সহজ হয়।
নীতিগত প্রেক্ষাপটঃ
বাংলাদেশে ডিজিটাল শিক্ষা ও প্রযুক্তি নীতির কাঠামো ক্রমেই স্পষ্ট রূপ নিচ্ছে। খসড়া জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা ২০২৬-২০৩০ এ শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তির নৈতিক ও নিরাপদ ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এনসিটিবির শিক্ষাক্রম কাঠামোতেও ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের ধারণা অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। এই নীতিগত উদ্যোগগুলো তখনই কার্যকর হবে যখন তা বিদ্যালয় পর্যায়ে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপান্তরিত হবে, অর্থাৎ শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অভিভাবক সচেতনতা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী নির্দেশিকা তৈরির মধ্য দিয়ে।
স্মার্টফোন কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের শত্রু নয়, বরং সঠিক ব্যবহারে তা শেখার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। প্রয়োজন কেবল সচেতনতা, শৃঙ্খলা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও নীতিনির্ধারক, সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই গড়ে উঠতে পারে একটি নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল শিক্ষা পরিবেশ। বাংলাদেশ যখন স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পথে এগিয়ে চলেছে, তখন প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্কটিকেও একইভাবে পরিণত ও দায়িত্বশীল করে তোলা এখন সময়ের দাবি।
মোঃ মনিরুল হক
সহকারী শিক্ষক
আমলাবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়
০১৭২২ ২৭৩২৭২
১
১ মন্তব্য