Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৮ জুলাই, ২০২৬ ০৮:৫৩ পূর্বাহ্ণ

ক্যাথরিন মাসুদ ক্যাথরিন মাসুদ

টিএসসির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিধ্বস্ত মাইক্রোবাসটি আমরা অনেকেই দেখি। কিন্তু তার পেছনে লুকিয়ে থাকা হৃদয়বিদারক গল্পটি কতজন জানি? চলুন ফিরে যাই সেই গল্পে।


একুশ বছরের তরুণী ক্যাথরিন বাংলাদেশে এসেছিলেন নিজের পিএইচডি ডিগ্রির একটি কোর্স সম্পন্ন করতে। তাঁর বাবা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আর তিনিও স্বপ্ন দেখতেন শিক্ষক হওয়ার। তিনি পড়ছিলেন ডেভেলপমেন্ট ইকোনমি। কোর্সের অংশ হিসেবে এক বছরের জন্য কোনো উন্নয়নশীল দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সেই দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন নিয়ে থিসিস করতে হতো। ক্যাথরিন বেছে নিয়েছিলেন বাংলাদেশকে।


১৯৮৬ সালে ঢাকার বিমানে ওঠার সময় তাঁর কল্পনাতেও ছিল না, এই দেশ এবং এই দেশের মানুষের সঙ্গে এমন এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে, যা কোনোদিন ছিন্ন করা সম্ভব হবে না।


বাংলাদেশে এসে ঘটনাক্রমে তাঁর পরিচয় হয় আহমদ ছফার সঙ্গে। স্পষ্টভাষী, প্রখর বুদ্ধিমত্তার এই মানুষটির ব্যক্তিত্ব ও বাগ্মিতায় মুগ্ধ হয়ে যান ক্যাথরিন। ছফার বাসাকে আশপাশের মানুষ মজা করে বলত “পাগলের আড্ডা”। সারাদিন সেখানে নানা রকম মানুষের আনাগোনা, খাওয়া-দাওয়া, তর্ক আর আড্ডা চলত। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই আড্ডার নিয়মিত সদস্য হয়ে ওঠেন ক্যাথরিন।


ক্যাথরিনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা আমেরিকার শিকাগোতে। তাঁর পরিবার ছিল অত্যন্ত বনেদি ও শিক্ষিত। দাদার বাবা ছিলেন বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ, যিনি পেরুর ইনকা সভ্যতার অসংখ্য নিদর্শন আবিষ্কার করেছিলেন এবং আমাজনের গভীর রেইন ফরেস্টে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর জীবনকাহিনী অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ইন্ডিয়ানা জোন্স চলচ্চিত্রও। পরিবারের কেউ ছিলেন অধ্যাপক, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ চিকিৎসক, আবার কেউ গবেষণা ও আবিষ্কারে নিবেদিত। ক্যাথরিনও জানতেন, তাঁর জীবনও হবে পড়াশোনাকেন্দ্রিক। কিন্তু সেই পরিকল্পনার মাঝেই এসে দাঁড়াল বাংলাদেশ অধ্যায়।


একদিন আহমদ ছফা ক্যাথরিনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন এক লম্বা তরুণের।


“ক্যাথরিন, মিট মাই ফ্রেন্ড তারেক। হি ইজ এ ফিল্মমেকার।”


“নাইস টু মিট ইউ।”


সেদিন হাত মেলানোর সময় ক্যাথরিন ভাবতেও পারেননি, তারেক মাসুদ নামের এই মানুষটির সঙ্গে তাঁর জীবনের গল্প ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যাবে। সাত সাগর তেরো নদীর ওপারের এক অজানা তরুণকে তিনি হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে ভালোবেসে ফেলবেন।


ছোটবেলা থেকেই চিত্রাঙ্কনের প্রতি ক্যাথরিনের প্রবল আগ্রহ ছিল। তারেক মাসুদ তখন কিংবদন্তি শিল্পী এস এম সুলতানকে নিয়ে আদম সুরত ডকুমেন্টরি নির্মাণে ব্যস্ত। কখনো ঢাকা, কখনো নড়াইল ছুটে বেড়াচ্ছেন তিনি।


ঢাকায় ফিরলে ক্যাথরিনের সঙ্গে তাঁর দেখা হতো। আড্ডা জমত, রাত বাড়ত। তারেক মাসুদের হাতের রান্নাও ক্যাথরিনের খুব পছন্দ ছিল। আহমদ ছফা ধীরে ধীরে বিষয়টি বুঝতে পারলেন। নানা অজুহাতে তিনি আড্ডা থেকে উঠে যেতেন, যাতে দুজন নিজেদের আরও ভালোভাবে জানতে পারেন।


তবে ভিন্ন সংস্কৃতির কারণে ছফা চলে গেলে দুজনেই কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে যেতেন। বিষয়টি ছফার নজর এড়ায়নি। তিনি একদিন ক্যাথরিনকে বললেন,


“ডু ইউ নো, তারেক রিয়েলি লাইকস ইউ!”


আবার তারেককে বললেন,


“ক্যাথরিন তো তোমার প্রেমে হাবুডুবু খাইতেছে মিয়া, কী জাদু করলা!”


দুজনেই লজ্জা পেয়ে প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যেতেন।


একদিন আহমদ ছফা প্রস্তাব দিলেন, “আর্টের প্রতি তোমার এত আগ্রহ, তুমি তো তারেকের ডকুমেন্টরিতে কাজ করতে পারো।”


ক্যাথরিন অবাক হয়ে গেলেন। চলচ্চিত্র সম্পর্কে তাঁর কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তখন তারেক বললেন,


“আমাদের এডিটিং শুরু হয়েছে। চাইলে তুমি সাবটাইটেলের কাজে আমাকে সাহায্য করতে পারো।”


সানন্দে রাজি হলেন ক্যাথরিন। শুরু হলো তাঁর এক নতুন জগতে প্রবেশ। আদম সুরত নির্মাণের কাজ করতে করতেই তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি শুধু চলচ্চিত্র নয়, তারেক মাসুদের প্রেমেও পড়ে গেছেন।


অবশেষে নিজের অনুভূতির কথা জানালেন তারেককে। তারেকও জানালেন, তিনিও তাঁকে বন্ধুর চেয়ে বেশি কিছু ভাবেন। শুরু হলো তাদের ভালোবাসার পথচলা।


১৯৮৮ সালে ক্যাথরিনের বাংলাদেশে আসার দুই বছর পূর্ণ হলো। এ সময়ের মধ্যে তাঁর ভিসার মেয়াদ দুবার শেষ হয়েছিল এবং নবায়নও হয়েছিল। কিন্তু তৃতীয়বার আর অনুমতি মিলল না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস না করায় প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পাওয়া যায়নি।


উপায় না দেখে তারেক বললেন,


“তোমার যদি আপত্তি না থাকে, চলো আমরা বিয়ে করে ফেলি। তাহলে ভিসা-পাসপোর্টের ঝামেলায় আর যেতে হবে না। আমার স্ত্রী হিসেবে বৈধভাবেই তুমি বাংলাদেশে থাকতে পারবে।”


ক্যাথরিন এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন।


পরিবারকে কিছু না জানিয়ে এক দুপুরে রিকশায় চড়ে তাঁরা চলে গেলেন পল্টনের একটি ম্যারেজ রেজিস্ট্রার অফিসে। সেখানে গিয়ে জানা গেল, ছবি লাগবে। স্টুডিও খুঁজে ছবি তুলে, তা ওয়াশ করিয়ে ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে গেল। কোনো আয়োজন ছিল না, কোনো পরিকল্পনাও নয়। এক কাপ চাও কাউকে খাওয়ানো হয়নি সেদিন। এতটাই অনাড়ম্বর ছিল সেই বিয়ে।


তারেক মাসুদও তখন নিজের পরিবারকে কিছু জানাননি। পরে ক্যাথরিন চিঠি লিখে নিজের পরিবারকে খবর দেন। তারেকের পরিবারও প্রথমে মন খারাপ করলেও সময়ের সঙ্গে সব মেনে নেয়।


পরবর্তী দুই যুগ তারা হাতে হাত রেখে ঘুরে বেড়িয়েছেন সারা বাংলাদেশ। ডকুমেন্টরি বানিয়েছেন, চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, গল্পের খোঁজে ও লোকেশন দেখতে ছুটেছেন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া।


ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রকে বুঝতে শিখেছেন ক্যাথরিন। যোগাযোগের প্রয়োজনে নিজের উদ্যোগেই শিখে ফেলেছেন বাংলা ভাষা, যাতে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কেউ অস্বস্তিতে না পড়ে।


শীতপ্রধান দেশের মানুষ হয়েও ঢাকার গরম, গ্রামের কষ্ট, রোদ, শুটিংয়ের দুর্ভোগ—সবকিছুই তিনি হাসিমুখে মেনে নিয়েছেন। কোনো দিন অভিযোগ করেননি।


একটি সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এত দূরে পরিবার ছেড়ে থাকতে খারাপ লাগে না?


তিনি উত্তর দিয়েছিলেন,


“খারাপ লাগবে কেন? আমি তো আমার ভালোবাসার মানুষটার সঙ্গে আছি। এদেশের কত মানুষ বিদেশে কাজ করে, একা থাকে, পাঁচ-সাত বছরে একবার দেশে আসে। তাদের বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান সবাই এখানে। তবুও তারা তো বিদেশে থাকে। আমি তো তাদের চেয়ে ভালো আছি। আমার স্বামী আমার পাশে আছেন। চাইলেই আমি আমেরিকায় বাবা-মায়ের কাছে যেতে পারি। খারাপ থাকার কারণ নেই।”


বাংলাদেশে আসার আগে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানতেন না ক্যাথরিন। তারেক মাসুদের কাছ থেকেই তিনি জানতে পারেন বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস।


মুক্তির গান, মুক্তির কথা, মাটির ময়না—এমন নানা কাজ করতে করতেই মুক্তিযুদ্ধ তাঁর নিজেরও হয়ে ওঠে। ভিনদেশ থেকে আসা এই তরুণী হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছিলেন ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ বীরাঙ্গনার আত্মত্যাগ।


তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের মধ্যে মিল ছিল অনেক। আবার অমিলও ছিল, আর সেই জায়গাগুলোতেই তারা হয়ে উঠেছিলেন একে অপরের পরিপূরক।


খেয়ালি ও আবেগপ্রবণ তারেক মাসুদকে সবসময় আগলে রেখেছিলেন ক্যাথরিন। সাহসী চলচ্চিত্র নির্মাণের কারণে যখন হু/মকি এসেছে, সিনেমা হল যখন তাঁর ছবি প্রদর্শন করতে চায়নি, তখন ক্যাথরিনই ছিলেন সবচেয়ে বড় শক্তি।


তারা যা আয় করেছেন, প্রায় সবই ব্যয় করেছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। বাসাভাড়া বাকি পড়েছে, পুরোনো কাপড় পরে থেকেছেন, কিন্তু চলচ্চিত্রের স্বপ্ন থেকে সরে যাননি। শহরে শহরে ঘুরে নিজেরাই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন, দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন তাঁদের সিনেমা।


রূপকথার মতোই এগোচ্ছিল তাদের জীবন।


তারপর এলো ১৩ আগস্ট।


কাগজের ফুল চলচ্চিত্রের শুটিং লোকেশন দেখতে মানিকগঞ্জ গিয়েছিলেন সবাই। ফেরার পথে তাঁদের মাইক্রোবাসের চালক একটি গাড়িকে ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সং/ঘ/র্ষে পড়েন।


মুহূর্তেই নেমে আসে অন্ধকার।


হাসপাতালে জ্ঞান ফিরে ক্যাথরিন জানতে পারেন, তাঁর ভালোবাসার মানুষটি আর নেই। তারেক মাসুদ মা/রা গেছেন।


মৃ/ত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে ফিরেছিলেন ক্যাথরিন। কারণ তাঁদের ছোট্ট সন্তানটির জন্য তাঁকে বেঁচে থাকতেই হয়েছিল।


বর্তমানে ক্যাথরিন আমেরিকায় থাকেন। তাঁদের সন্তানও সেখানে পড়াশোনা করছেন। কিন্তু প্রতি বছরই তিনি বাংলাদেশে আসেন।


যে মানুষটিকে তিনি সর্বস্ব উজাড় করে ভালোবেসেছিলেন, নিয়তি তাঁকে কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু তাঁর স্মৃতিগুলো কেড়ে নিতে পারেনি।


বাংলাদেশে এলে তিনি তারেক মাসুদের স্মৃতিবিজড়িত জায়গাগুলোতে যান, বন্ধুদের আড্ডায় যোগ দেন। তাঁর মনে হয়, যেন ছায়ার মতো তারেক মাসুদ এখনো তাঁর পাশে আছেন। যেন এই বুঝি হাত বাড়িয়ে সেই চিরচেনা হাসি নিয়ে দাঁড়াবেন। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত স্পর্শ আর ফিরে আসে না।


এই দেশ তারেক মাসুদের মতো একজন গুণী নির্মাতাকে হারিয়েছে। সেই শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। প্রতি বছরের ১৩ আগস্ট সবাই তাঁকে স্মরণ করে।


আজ স্মরণ করি ক্যাথরিন মাসুদকেও। যিনি আমাদের চেয়ে অনেক বড় একটি ক্ষতির ভার বহন করে চলেছেন। যিনি তাঁর ভালোবাসার মানুষটিকে চিরদিনের জন্য হারিয়েছেন।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সংরক্ষিত সেই বিধ্বস্ত মাইক্রোবাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যাথরিনের ছবিটি দেখলে মনে হয়, হয়তো তিনি মনে মনে আরণ্যক বসুর সেই পঙ্‌ক্তিটিই উচ্চারণ করছেন,


“এই জন্মের দূরত্বটা পরের জন্মে চুকিয়ে দেব…”


আমি তাঁর কষ্ট, শূন্যতা কিংবা যন্ত্রণা অনুভব করতে পারি না। তবুও হৃদয় অদ্ভুত এক হাহাকারে ভরে ওঠে।


ক্যাথরিন মাসুদ, এদেশের কেউ না হয়েও যিনি বাংলাদেশকে আমাদের মতোই ভালোবেসেছিলেন, আপন করে নিয়েছিলেন। সেই মানুষটির ব্যথায় মন খারাপ হওয়াটাই স্বাভাবিক।



মন্তব্য করুন