সহকারী শিক্ষক
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ
আধুনিক শিক্ষায় ট্যাবলেট এর ব্যবহার ও উপকারিতা
আধুনিক শিক্ষায় ট্যাবলেট এর ব্যবহার ও উপকারিতা
মনিরুল হক, পড়াশোনার ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি এখন শিক্ষার্থীদের পিডিএফ পড়তে হয়, অনলাইন ক্লাস করতে হয়, ভিডিও থেকে কোনো বিষয় বুঝতে হয় এবং ডিজিটালভাবে অ্যাসাইনমেন্ট বা প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে হয়। এসব কাজ স্মার্টফোনে করা সম্ভব হলেও ছোট স্ক্রিনে দীর্ঘ সময় পড়া বা লেখা বেশ অস্বস্তিকর। আবার ল্যাপটপ সব বয়সের শিক্ষার্থীর জন্য সহজে বহনযোগ্য বা ব্যবহারযোগ্য নয়।
এই জায়গায় ট্যাবলেট একটি কার্যকর শিক্ষাসহায়ক ডিভাইস হতে পারে। বড় টাচস্ক্রিন, ইজি ব্যবহার এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক অ্যাপ ব্যবহারের সুবিধা থাকায় একই ডিভাইসে পড়া, নোট নেওয়া, অনলাইন ক্লাস করা ও সৃজনশীল কাজ করা যায়।
তবে শুধু ট্যাবলেট কিনে দিলেই একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ভালো হয়ে যাবে না। ডিভাইসটি কোন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, কী ধরনের অ্যাপ চালানো হচ্ছে এবং শিক্ষক ও অভিভাবক ব্যবহারটি কীভাবে পরিচালনা করছেন, তার ওপরই প্রকৃত উপকার নির্ভর করে।
যদিও ট্যাবলেটকে বই, শিক্ষক বা শ্রেণিকক্ষের বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এটি শেখার প্রক্রিয়াকে সহজ অংশগ্রহণমূলক করার একটি মাধ্যম।কোনো কঠিন বিষয় ভিডিও বা অ্যানিমেশনের মাধ্যমে বোঝা, বড় পিডিএফ পড়া, ক্লাসের নোট গুছিয়ে রাখা অথবা একটি প্রজেক্ট তৈরি করার ক্ষেত্রে ট্যাবলেট সহায়তা করতে পারে। তবে শিক্ষকের ব্যাখ্যা, বই পড়ার অভ্যাস, হাতে লেখার চর্চা এবং সরাসরি আলোচনার গুরুত্ব আগের মতোই থাকবে।
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার মানে শুধু স্ক্রিনে কনটেন্ট দেখা নয়। শেখা তথ্য নিজের ভাষায় লেখা, নতুন কিছু তৈরি করা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজে লাগানোও এর অংশ।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ট্যাবলেটের ব্যবহারঃ
ই-বুক, পিডিএফ ও রেফারেন্স বই পড়াঃ
অনেক পাঠ্যবই, সহায়ক বই, প্রশ্নব্যাংক এবং শিক্ষা উপকরণ এখন ডিজিটালভাবে পাওয়া যায়। ট্যাবলেটের বড় স্ক্রিনে এসব ফাইল পড়া স্মার্টফোনের তুলনায় আরামদায়ক। শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় অংশ চিহ্নিত করতে, পৃষ্ঠায় মন্তব্য লিখতে এবং বিষয়ভিত্তিক ফোল্ডারে ফাইল সংরক্ষণ করতে পারে। এতে প্রয়োজনের সময় বই বা নোট খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।
তবে সব পড়াশোনা স্ক্রিনে করা উচিত নয়। গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, অঙ্ক বা সংজ্ঞা খাতায় লেখার অভ্যাসও চালু রাখতে হবে।
অনলাইন ক্লাস ও ক্লাস এর ভিডিও রেকর্ড করাঃ
অনলাইন ক্লাস, কোচিংয়ের ভিডিও বা শিক্ষকের রেকর্ড করা ক্লাস দেখার জন্য ১০ থেকে ১১ ইঞ্চি স্ক্রিন বেশ সুবিধাজনক। বড় স্ক্রিনে শিক্ষক, স্লাইড এবং বোর্ডের লেখা ভালোভাবে দেখা যায়। কিছু ট্যাবলেটে একই সঙ্গে দুইটি অ্যাপ ব্যবহারের সুবিধা থাকে। এতে এক পাশে ক্লাসের ভিডিও চালিয়ে অন্য পাশে নোট লেখা যায়। অনলাইন ক্লাসের জন্য ভালো ফ্রন্ট ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, স্পিকার এবং স্থিতিশীল ইন্টারনেট গুরুত্বপূর্ণ।
নোট নেওয়া ও পড়া গুছিয়ে রাখাঃ
সাধারণ নোট অ্যাপ ব্যবহার করে বিষয়ভিত্তিক আলাদা ফোল্ডার তৈরি করা যায়। যেমন:
● বাংলা
● ইংরেজি
● গণিত
● বিজ্ঞান
● আইসিটি
● পরীক্ষার প্রস্তুতি
স্টাইলাস সাপোর্টেড ট্যাবলেটে হাতে লিখে নোট নেওয়া, অঙ্ক করা এবং পিডিএফে প্রয়োজনীয় অংশ চিহ্নিত করা যায়। স্টাইলাস না থাকলে অনস্ক্রিন কিবোর্ড বা আলাদা কিবোর্ড ব্যবহার করে লেখা সম্ভব।
ডিজিটাল নোটের বড় সুবিধা হলো, এগুলো সহজে সম্পাদনা, সংরক্ষণ এবং অন্য ডিভাইসে শেয়ার করা যায়। তবে হাতে লিখে শেখার অভ্যাস পুরোপুরি বাদ দেওয়া উচিত নয়।
অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রেজেন্টেশন তৈরিঃ
Google Docs, Microsoft Word, Google Slides বা PowerPoint-এর মতো অ্যাপ ব্যবহার করে ট্যাবলেটে অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রেজেন্টেশন তৈরি করা যায়।
একটি সাধারণ প্রেজেন্টেশন তৈরির ধাপঃ
Ø নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা।
Ø গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিজের ভাষায় লেখা।
Ø প্রয়োজনীয় ছবি বা চার্ট নির্বাচন করা।
Ø স্লাইডে সংক্ষিপ্তভাবে তথ্য সাজানো।
Ø ব্যবহৃত তথ্য ও ছবির উৎস উল্লেখ করা।
Ø ফাইলটি PDF বা PowerPoint হিসেবে সংরক্ষণ করা।
শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের কপি না করা, তথ্য যাচাই করা এবং উৎস উল্লেখ করার নিয়ম শেখাতে হবে।
শিক্ষামূলক অ্যাপ ও অনুশীলনঃ
ভাষা শেখা, গণিত অনুশীলন, বিজ্ঞানবিষয়ক অ্যানিমেশন, মানচিত্র দেখা এবং সাধারণ জ্ঞানচর্চার জন্য বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করা যায়। অ্যাপটি দেখতে সুন্দর হলেই সেটি শিক্ষামূলক, এমনটি ধরে নেওয়া উচিত নয়। ব্যবহারের আগে কয়েকটি বিষয় পরীক্ষা করা প্রয়োজন:
Ø কনটেন্টটি শিক্ষার্থীর বয়সের উপযোগী কি না
Ø অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন রয়েছে কি না
Ø ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়া হচ্ছে কি না
Ø অ্যাপের ভেতরে কেনাকাটার সুযোগ রয়েছে কি না
Ø শেখার উদ্দেশ্য পরিষ্কার কি না
ট্যাবলেট দিয়ে প্রেজেন্টেশন, পোস্টার ও ভিডিও তৈরিঃ
ট্যাবলেট শুধু পড়া বা ভিডিও দেখার জন্য নয়। এটি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীরা নিজেদের শিক্ষামূলক কনটেন্টও তৈরি করতে পারে।
Canva দিয়ে প্রেজেন্টেশন ও পোস্টারঃ
Canva ব্যবহার করে ক্লাস প্রেজেন্টেশন, পোস্টার, চার্ট এবং ইনফোগ্রাফিক তৈরি করা যায়।
ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থীকে বাংলাদেশের ছয় ঋতু নিয়ে প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে হবে। সে প্রথমে বিষয় অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করবে। এরপর প্রতিটি ঋতুর জন্য আলাদা স্লাইড তৈরি করে সংক্ষিপ্ত লেখা ও প্রাসঙ্গিক ছবি যোগ করবে। শেষে তথ্য ও ছবির উৎস উল্লেখ করে ফাইলটি সংরক্ষণ করবে।
এই কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থী তথ্য বাছাই, সংক্ষিপ্ত লেখা এবং সুন্দরভাবে উপস্থাপনের দক্ষতা অর্জন করতে পারে।
CapCut দিয়ে শিক্ষামূলক ভিডিওঃ
CapCut বা অন্য কোনো সহজ ভিডিও সম্পাদনার অ্যাপ ব্যবহার করে ছোট শিক্ষামূলক ভিডিও তৈরি করা যায়। যেমন:
Ø বিজ্ঞান পরীক্ষার ধাপ
Ø ইংরেজি শব্দের উচ্চারণ
Ø ঐতিহাসিক স্থানের পরিচিতি
Ø গণিতের সূত্রের ব্যাখ্যা
Ø পরিবেশ সচেতনতামূলক ভিডিও
ভিডিও তৈরির আগে কী বলা হবে, তা সংক্ষিপ্তভাবে লিখে নেওয়া ভালো। এরপর প্রয়োজনীয় ছবি বা ভিডিও ধারণ করে অপ্রয়োজনীয় অংশ কেটে দিতে হবে। শিরোনাম ও প্রয়োজনীয় লেখা যোগ করার পর শব্দ ও তথ্য ঠিক আছে কি না পরীক্ষা করতে হবে। অন্যের ছবি, ভিডিও বা গান ব্যবহার করলে অনুমতি ও কপিরাইটের বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি।
শিক্ষকের কাজে ট্যাবলেটঃ
পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করলে ট্যাবলেট একজন শিক্ষকের দৈনন্দিন কাজও সহজ করতে পারে।
পাঠ পরিকল্পনা ও ডিজিটাল উপকরণ তৈরিঃ
শিক্ষক ট্যাবলেটে পাঠ পরিকল্পনা লিখতে, স্লাইড তৈরি করতে এবং ক্লাসের জন্য ছবি, ভিডিও বা মানচিত্র সংগ্রহ করতে পারেন। বিজ্ঞানের কোনো বিষয় অ্যানিমেশনের মাধ্যমে অথবা ভূগোলের কোনো বিষয় ইন্টারএকটিভ মানচিত্র দিয়ে বোঝানো যেতে পারে।
তবে প্রযুক্তি যেন পাঠের মূল বিষয়কে আড়াল না করে। ডিজিটাল কনটেন্টের উদ্দেশ্য হবে শিক্ষার্থীর বোঝার প্রক্রিয়াকে সহজ করা।
শিক্ষার্থীর কাজ দেখাঃ
শিক্ষার্থীরা ডিজিটালভাবে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিলে শিক্ষক ট্যাবলেট থেকে সেগুলো পড়তে এবং মন্তব্য দিতে পারেন। পিডিএফে ভুল অংশ চিহ্নিত করা, সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া এবং ভালো কাজ আলাদা করে দেখানোও সহজ হয়।
শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহঃ
শিক্ষক বাতায়নসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম থেকে পাঠ পরিকল্পনা, ভিডিও, ছবি এবং ডিজিটাল কনটেন্ট পাওয়া যায়। শিক্ষক প্রয়োজন অনুযায়ী এসব উপকরণ ডাউনলোড করে নিজের ক্লাসের জন্য সাজিয়ে নিতে পারেন।
অভিভাবকের দায়িত্ব ও নিরাপদ ব্যবহারঃ
শিশু বা কিশোরের হাতে ট্যাবলেট দেওয়ার আগে পরিবারের কিছু সাধারণ নিয়ম ঠিক করা প্রয়োজন।
পড়াশোনা ও বিনোদনের সময় আলাদা করুনঃ
কোন সময় পড়াশোনা হবে এবং কখন বিনোদনের জন্য ডিভাইস ব্যবহার করা যাবে, তা আগে থেকেই নির্ধারণ করা ভালো। পড়াশোনার সময় গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা যেতে পারে।
শুধু কত ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহার করা হয়েছে, সেটিই দেখার বিষয় নয়। শিশুটি কী দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে ঘুম, খেলাধুলা বা পারিবারিক সময় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না, সেটিও খেয়াল রাখতে হবে।
আলাদা ব্যবহারকারী প্রোফাইল রাখুনঃ
একই ট্যাবলেট পরিবারের একাধিক সদস্য ব্যবহার করলে শিশুর জন্য আলাদা প্রোফাইল রাখা ভালো। এতে ব্যক্তিগত ই-মেইল, অফিসের ফাইল, অনলাইন পেমেন্ট তথ্য এবং বয়সের অনুপযোগী অ্যাপ থেকে শিশুকে দূরে রাখা সহজ হয়।
প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ব্যবহার করুনঃ
ডিভাইসভেদে Parental Control, Kids Mode, Safe Search এবং App Permission-এর মতো সুবিধা পাওয়া যায়। এগুলোর মাধ্যমে:
Ø নতুন অ্যাপ ইনস্টল নিয়ন্ত্রণ করা
Ø বয়সের অনুপযোগী কনটেন্ট সীমিত রাখা
Ø অনলাইন কেনাকাটা বন্ধ করা
Ø দৈনিক ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করা
Ø ওয়েব ব্রাউজিং পর্যবেক্ষণ করা
সম্ভব।
শিশুকে নিজের পূর্ণ নাম, ছবি, অবস্থান, স্কুলের তথ্য এবং পাসওয়ার্ড অপরিচিত ব্যক্তি বা অনির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইটে না দেওয়ার নিয়ম শেখাতে হবে।
শিক্ষার জন্য ট্যাবলেট বাছাইয়ের সময় কী দেখবেনঃ
বাংলাদেশের বাজারে বিভিন্ন সাইজ, RAM, Storage এবং নেটওয়ার্ক সুবিধার ট্যাবলেট পাওয়া যায়। তাই শুধু ব্র্যান্ড বা দাম দেখে নির্বাচন না করে শিক্ষার্থীর কাজের সঙ্গে স্পেসিফিকেশন মিলিয়ে দেখা উচিত।
Ryans এর রেগুলার ট্যাবলেট ক্যাটাগরিতে ছোট ৮.৭ ইঞ্চি মডেল থেকে শুরু করে ১০, ১১ এবং আরও বড় ডিসপ্লের বিভিন্ন ট্যাবলেট দেখা যায়। Wi-Fi ও LTE সংস্করণের পাশাপাশি RAM এবং Storage-এর ক্ষেত্রেও ভিন্নতা রয়েছে।
ডিসপ্লের আকার
৮ থেকে ৯ ইঞ্চি:
সহজে বহন করা যায়। ই-বুক পড়া,
হালকা ব্রাউজিং এবং ভিডিও দেখার জন্য উপযোগী। তবে দীর্ঘ অ্যাসাইনমেন্ট বা বড় প্রেজেন্টেশনের
জন্য স্ক্রিন ছোট মনে হতে পারে।
১০ থেকে ১১ ইঞ্চি:
বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর জন্য ভারসাম্যপূর্ণ
আকার। অনলাইন ক্লাস, পিডিএফ, নোট, ভিডিও এবং প্রেজেন্টেশনের কাজে সুবিধা পাওয়া যায়।
১২ ইঞ্চি বা বড়:
দুইটি অ্যাপ পাশাপাশি ব্যবহার,
বড় ডকুমেন্ট দেখা এবং ডিজাইনের কাজে সুবিধা দেয়। তবে বড় ট্যাবলেট বহন করা তুলনামূলক
কঠিন।
RAM ও Storage:
সাধারণ অনলাইন ক্লাস, ই-বুক, ব্রাউজিং এবং ডকুমেন্টের জন্য ৪GB RAM ব্যবহারযোগ্য হতে পারে। Canva, ভিডিও কল এবং একাধিক অ্যাপ নিয়মিত ব্যবহার করলে ৬GB বা বেশি RAM সুবিধা দেবে।
Storage-এর ক্ষেত্রে ৬৪GB দ্রুত পূর্ণ হয়ে যেতে পারে। সাধারণ শিক্ষামূলক ব্যবহারে ১২৮GB বেশি স্বস্তিদায়ক। অনেক ভিডিও, অফলাইন ক্লাস বা বড় অ্যাপ রাখতে হলে ২৫৬GB Storage অথবা Memory Card Support দেখা যেতে পারে।
Wi-Fi নাকি LTE
বাসা, স্কুল বা কোচিংয়ে নির্ভরযোগ্য Wi-Fi থাকলে Wi-Fi ট্যাবলেট যথেষ্ট হতে পারে।
শিক্ষার্থীকে নিয়মিত বাইরে ব্যবহার করতে হলে অথবা সব জায়গায় Wi-Fi না থাকলে SIM বা LTE সমর্থিত মডেল সুবিধাজনক। তবে SIM Slot থাকলেই সাধারণ মোবাইল ফোনের মতো সব ধরনের কল করা যাবে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রতিটি মডেলের নেটওয়ার্ক ও কল করার সুবিধা আলাদাভাবে দেখতে হবে।
ব্যাটারি ও চার্জিংঃ
দীর্ঘ অনলাইন ক্লাস, ভিডিও এবং বাইরে ব্যবহারের জন্য ভালো ব্যাটারি প্রয়োজন। তবে শুধু ব্যাটারির mAh দেখে প্রকৃত ব্যবহারকাল বোঝা যায় না। স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা, নেটওয়ার্ক এবং চলমান অ্যাপও ব্যাটারি ব্যাকআপে প্রভাব ফেলে।
চার্জারের ধরন, দ্রুত চার্জিংয়ের সুবিধা এবং চার্জারটি বক্সে দেওয়া আছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা উচিত।
ক্যামেরা, মাইক্রোফোন ও স্পিকারঃ
অনলাইন ক্লাসের জন্য সামনের ক্যামেরা, মাইক্রোফোন এবং স্পিকার গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বেশি Megapixel দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। আলো, ইন্টারনেট এবং অ্যাপের মানও ভিডিও কলের মানে প্রভাব ফেলে।
স্টাইলাস ও কিবোর্ডঃ
হাতে লেখা নোট, অঙ্ক, ছবি আঁকা এবং পিডিএফ চিহ্নিত করার জন্য Stylus Support উপকারী। তবে সব ট্যাবলেটে একই ধরনের স্টাইলাস কাজ করে না।
দীর্ঘ লেখা বা প্রেজেন্টেশন তৈরির জন্য আলাদা কিবোর্ড ব্যবহার করা যায়। তবে কিবোর্ড যুক্ত করলেই ট্যাবলেট পুরোপুরি ল্যাপটপের বিকল্প হয়ে যায় না। প্রোগ্রামিং, বিশেষ সফটওয়্যার বা জটিল অফিসের কাজের জন্য ল্যাপটপ বেশি উপযোগী হতে পারে।
একটি বাস্তব উদাহরণঃ
ধরা যাক, অষ্টম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীকে পানি দূষণ নিয়ে একটি প্রজেক্ট করতে বলা হয়েছে। সে ট্যাবলেট ব্যবহার করে:
Ø পাঠ্যবই ও নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট থেকে তথ্য সংগ্রহ করল
Ø গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নোট অ্যাপে লিখল
Ø নিজের এলাকার দূষিত পানির ছবি তুলল
Ø Canva দিয়ে পাঁচ স্লাইডের একটি প্রেজেন্টেশন বানাল
Ø CapCut দিয়ে এক মিনিটের সচেতনতামূলক ভিডিও তৈরি করল
Ø ব্যবহৃত তথ্য ও ছবির উৎস উল্লেখ করল
এই একটি কাজের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থী শুধু পানি দূষণ সম্পর্কে জানল না। সে তথ্য খোঁজা, নিজের ভাষায় লেখা, ছবি নির্বাচন, ডিজাইন, ভিডিও তৈরি এবং উপস্থাপনার অভিজ্ঞতাও অর্জন করল।
এভাবেই ট্যাবলেট শুধু কনটেন্ট দেখার ডিভাইস না থেকে শেখা ও সৃজনশীল কাজের একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
ট্যাবলেট ব্যবহারের সাধারণ নিয়মঃ
পরিবার ও শিক্ষার্থী মিলে কয়েকটি সহজ নিয়ম ঠিক করতে পারে:
1. পড়াশোনার সময় অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ থাকবে।
2. নতুন অ্যাপ ইনস্টল করার আগে অভিভাবকের অনুমতি নিতে হবে।
3. ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি ও পাসওয়ার্ড কাউকে দেওয়া যাবে না।
4. নির্দিষ্ট সময় পর স্ক্রিন থেকে বিরতি নিতে হবে।
5. রাতে ঘুমের আগে ট্যাবলেট আলাদা জায়গায় রাখা হবে।
6. অনলাইনে অস্বস্তিকর কিছু দেখলে শিক্ষক বা অভিভাবককে জানাতে হবে।
7. ট্যাবলেটের পাশাপাশি খেলাধুলা, বই পড়া এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে।
ট্যাবলেট একই ডিভাইসে পড়া, লেখা, অনলাইন ক্লাস, যোগাযোগ এবং কনটেন্ট তৈরির সুযোগ দেয়। তবে এর উপকার নির্ভর করে সঠিক ব্যবহার, উপযুক্ত অ্যাপ এবং শিক্ষক ও অভিভাবকের দিকনির্দেশনার ওপর।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল দক্ষতা গড়ে তুলতে শুধু ডিভাইস ব্যবহার শেখানো যথেষ্ট নয়। তথ্য যাচাই, নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার, নিজের ভাষায় লেখা এবং প্রযুক্তির সাহায্যে নতুন কিছু তৈরি করার অভ্যাসও গড়ে তুলতে হবে।
সঠিক পরিকল্পনায় ব্যবহার করা হলে ট্যাবলেট পড়াশোনা, সৃজনশীলতা এবং প্রয়োজনীয় ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের একটি কার্যকর সহায়ক হতে পারে।
মোঃ মনিরুল হক
সহকারী শিক্ষক
আমলাবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়
খোকসা, কুষ্টিয়া।
মোবাইলঃ ০১৭২২ ২৭৩২৭২
ইমেইলঃ [email protected]
১৪
২১ মন্তব্য