সিনিয়র শিক্ষক
২৯ জুলাই, ২০২৬ ০৫:৪০ অপরাহ্ণ
#মহাপ্রাণের_মহাপ্রয়াণে
#মহাপ্রাণের_মহাপ্রয়াণে
লেখক: মুহাম্মদ আব্দুস সালাম, যুগ্ম-সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও প্রাক্তন ছাত্র, শিক্ষাবর্ষ: ১৯৯২-৯৩, শৈলকুপা সরকারি ডিগ্রী কলেজ
👉 মনে পড়ে, কলেজের প্রথম দিন। সেদিন স্কুলের লালরঙা পরিচিত আঙিনা ছেড়ে জীবনের অস্থির সময়ে কলেজের খোলা ময়দানে এসে দাঁডালাম। বুকে অজানা কম্পন, মনে শংকা। দুইতলার হলরুম ছাত্রশিক্ষকে পরিপূর্ণ। এরই মধ্যে রাজার চলনে প্রিন্সিপাল শমসের আলী স্যারের শুভাগমন। সাথে বাংলা, ইংরেজি খ্যাতিমান শিক্ষকবৃন্দ। ক্লাসে পিনপতন নীরবতা। শুরু হলো কাপা কাপা গলায় সুমিষ্ট কন্ঠে বাংলার ফরিদ স্যারের বয়ান। মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমরা শুনলাম। করণীয় - বর্জনীয়, ভাষা-সাহিত্য সব নিয়েই তিনি সংক্ষেপে জানিয়ে গেলেন।
স্যারের সাথে কলেজে ওইটুকুই। প্রতিষ্ঠানের নিয়মে ক্লাস ভাগ হয়ে যাওয়ায় আমরা আর তাকে পাইনি। কলেজ পেরিয়ে কর্মে আসলে তার সাথে যোগাযোগ বাডে। স্যারের বড় ছেলে শাহিন ভাই আর মেঝো ছেলে তুহিন লন্ডনে, ছোট ছেলে আসলাম দেশে। লন্ডনে শাহিন ভাই কিম্বা তুহিনের বাসায় বসেও ফোনে আলাপ হয়েছে।
মো. ফরিদ উদ্দিন বিশ্বাস স্যার ছিলেন একজন সত্যিকারের শিক্ষাগুরু। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তার দরদ ছিল সীমাহীন। তাঁর ক্লাস ছিল প্রাণবন্ত, চিন্তাশীল এবং অনুপ্রেরণামূলক। তিনি পাঠদানকে কখনো কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি ; বরং বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করে তোলার চেষ্টা করতেন। তাঁর কথার ভংগি ব্যাখ্যার গভীরতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিকতা তাঁকে একজন অনন্য শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়- এটি মানুষের চিন্তা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের বাহক। তাই তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা এবং সাহিত্যচর্চার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিতে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর সৌম্য ব্যবহার, উদার মনোভাব এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি পিতৃতুল্য স্নেহ তাঁকে সকলের কাছে অত্যন্ত প্রিয় করে তুলেছিল।
আমাদের নিকটতম পড়শি সদর ভাই। জমিন চষা তার পেশা। সখের বশে কবিরাজি করতেন। সাধারণ কোনো রোগ নয়; অতি জটিল দুরারোগ্যে সে ছিল সবার সহায়। মানুষ বাদে আর কেবল গাভিন গরুর চিকিৎসা দিতেন। কোনো টাকাপয়সা নিতেন না। টাকাপয়সা গ্রহণে ওস্তাদের নিষেধ ছিল। তবে ফলমূল, ক্ষেতের ফসল, মিষ্টি, গাভির দুধ- এগুলো নিতেন। এ সদর ভাইয়ের নিকট প্রথমে শুনি আলিম স্যারের নাম।
আমাদের গ্রাম থেকে যে রাস্তা থানা হয়ে বাজারে ঠেকেছে, তারই সাথে আলিম স্যারের বাড়ি। দূরত্ব কিলোমিটার ছাড়াবে না। একদিন, সদর ভাইয়ের বাড়িতে একঘড়া দুধ এলো।শুনলাম, আলিম স্যারের সদ্য কেনা রোগাক্রান্ত গাভির রোগমুক্তি হয়েছে। আলিম স্যার দায় পরিশোধে কোনো সময় নেন নি। দুধ পেয়ে গ্রামীণ সদর ভাইয়ের বিশ্বজয়ের যে হাসি, চোখ বন্ধ করলে আমি এখনো তা টের পাই।
গাঁয়ের প্রাইমারি ছেড়ে মাধ্যমিকে ভর্তি হলাম। প্রতিদিন গা ছমছমে অন্ধকার সকালে প্রাইভেট আর স্কুলে যাওয়া-আসা চলতে থাকলো। যাওয়ার পথে দেখতাম, সকাল-সন্ধ্যা দু'বেলা স্যারের ঘরের রাস্তা সংলগ্ন বারান্দায় সব ছাত্ররূপী তারারমেলা। বারান্দার চারিপাশে দাঁড়ানো থাকতো নানাকিসিমের বাইসাইকেল। আমাদের শৈশবে বাইসাইকেল ছিল আরাধ্য। দামী কিন্তু ভারী চাইনিজ ছিল সবার পছন্দ। পরে দামে সস্তা আর হালকা হারকুলেস,হিরো মানুষের মন জয় করে নেয়।
এ বারান্দায় ছাত্রছাত্রীরা স্যারের চারপাশ ঘিরে বসত। স্যার সীমাহীন ধৈর্য, গভীর প্রত্যয় আর সমুদ্রসম স্নেহ নিয়ে প্রতিদিন, প্রতি সেশন শেষ করতেন।আমরা ছোটরা তখন একে প্রাইভেট হিসেবে জানতাম। আমাদের কালে আমরা যখন শুরু করলাম, তখন বুঝলাম এ নিছক প্রাইভেট নয়; এ ছিল সাধনা, মহাযজ্ঞ।
আমার দুই ক্লাস উপরে পড়তেন আমাদের সহোদর, নাসিমা আপা। চৈত্রমাসের আগুন ঝরা স্কুলছুটির এক বিকেলে ঘরে পড়ছিলাম। মা দোকান থেকে চানাচুর, বিস্কুট আনতে বলল। এনে দেখি অচেনা দুটোমুখ। আপা বলল, আলিম স্যারের মেয়ে তার ক্লাসমেট। সেদিন মুক্তি আপাকে প্রথম দেখি। আপার সাথে দুক্লাস নিচে পড়ুয়ারত ছোট বোন তৃপ্তি।
মাধ্যমিকের পরীক্ষ শেষ হল। ভাবলাম, আরাম-আয়েশে কিছুদিন ঘুরবো, ঘুমাব; সমাজবিপ্লবের দীক্ষাটিক্ষা নেব। পরিচিত হলাম উপজেলা পরিষদের সামনে বসা হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার হাবিব খান ভাইয়ের সাথে। মোটা কালো গোপের সাথে ছোট করে ছাটা চুল আর উজ্জ্বল বর্ণের লোকটার মধ্যে ছিল দারুণ ব্যক্তিত্ব। উনি এক বিকেলে চা সিঙারা খাইয়ে, উৎপাদনের সমতার শিক্ষা দিয়ে দিলেন। সদ্য গড়ে ঊঠা শৈলকুপা পাবলিক লাইব্রেরি আর এখান-সেখানের মার্ক্সিজমের বই হলো প্রিয় পাঠ। আস্তে আস্তে উপন্যাসের পোঁকাও মাথায় ঢুকল। ঠাকুরমার ঝুলি, বিষাদসিন্ধু, কি পাইনি, অবাঞ্চিতা,পথের দাবি,গৃহদাহ যা পাই পড়ে ফেলি।
* সেই বিকেলেই দেখা হলো বন্ধু আফরোজ আল মামুন রিপনের সাথে।ও এখন পাইল্টের শিক্ষক। সে জানাল, তারা আলিম স্যারের নিকট পড়া শুরু করেছে।প্রথম ব্যাচ পূর্ণ। পাছে পিছিয়ে পড়ি আর বন্ধুদের নিকট লজ্জার ভয়ে দুদিন পরে আমিও গেলাম স্যারের নিকট। আমি সুযোগ পেলাম ২য় ব্যাচে। দিন কতক পরে স্যার ব্যাচ পুনর্গঠন করে দিলেন।আমাকে তিনি ১ম ব্যাচে সুযোগ দিলেন। বহুকাল আগে দেখা স্যারের মেয়ে তৃপ্তি সে ও আমাদের ১ম ব্যাচের ছাত্রী।*
আলিম উদ্দিন স্যার ছিলেন মুলত পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক, কিন্তু ম্যাথ করাতেন দারুণ মুনশিয়ানায়। তার দক্ষতায় দুই মাসে ১ম বর্ষের ম্যাথ শেষ করলাম। পদার্থবিজ্ঞানের মতো অতি কঠিন বিষয় সাহিত্যের মতো আয়ত্ত্বে আনলাম মাত্র মাস দেড়েকের মধ্যে। দক্ষ কারিগর আর কাকে বলে।
স্যার ছিলেন স্বল্পভাষী। বলতেন, গণিতবিদরা ভাষা পছন্দ করেন না। আবার বলতেন, যে অংক জানেনা, সে লজিক্যাল হয় না।
স্যারের সাথে বহুদিন দেখা হয়নি।বিভিন্ন বিষয়ে মাঝেমধ্যে কথা হয়েছে। সর্বশেষ স্যার তার ছেলে বঊয়ের পদায়ন নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন। স্যারের ছেলে লিটন ফোন ধরায়ে দিলেন। অল্পকথায় স্যার প্রয়োজনটা বললেন।বুঝলাম, স্যার বেশিক্ষণ কথা বলতে অপারগ। লিটনকে বলেছিলাম স্যার ঢাকায় আসলে আমাকে যেন জানানো হয়। জীবনের অন্তিম সময়ে তাকে ঢাকায় আনা হলো। আমি সেদিন অফিসের কাজে সিলেট। দুদিন পর ঢাকায় ফিরলাম।আর তিনি ফিরে গেলেন অনন্তর সন্ধানে। ইন্না-লিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন। [ কীর্তিমান থেকে সংগৃহিত ]
১
২ মন্তব্য