সহকারী শিক্ষক
৩০ জুলাই, ২০২৬ ০১:০৯ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
হিসাববিজ্ঞানের জনক লুকা প্যাসিওলি (Luca Pacioli) কিন্তু কেবল একজন হিসাববিদ ছিলেন না! তিনি ছিলেন একাধারে গণিতবিদ, রেনেসাঁ যুগের পণ্ডিত এবং একজন ফ্রান্সিসকান সন্ন্যাসী।
তাঁকে নিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে চমৎকার ও মজার ঘটনাটি যুক্ত রয়েছে কালজয়ী চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি (Leonardo da Vinci)-র সাথে!
১৫ শতকের শেষের দিকে (১৪৯৬ সাল নাগাদ) মিলান শহরে প্যাসিওলি এবং লিওনার্দো দা ভিঞ্চির দেখা হয়। দুজন ছিলেন দুই জগতের মানুষ—প্যাসিওলি ছিলেন গণিত ও হিসাবের মাস্টার, আর দা ভিঞ্চি ছিলেন শিল্পকলার জাদুকর। তবে গণিতের জ্যামিতিক নকশার প্রতি দা ভিঞ্চির প্রচণ্ড কৌতুহল ছিল, কিন্তু তাঁর গাণিতিক ভিত্তি কিছুটা দুর্বল ছিল।
শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক: প্যাসিওলি দা ভিঞ্চিকে জ্যামিতি ও গণিতের জটিল নিয়মগুলো শেখাতেন। বিনিময়ে দা ভিঞ্চি প্যাসিওলিকে ছবি আঁকা ও দৃষ্টিভঙ্গি (perspective) নিয়ে জ্ঞান দিতেন।
দা ভিঞ্চির ইলাস্ট্রেশন: প্যাসিওলি যখন তাঁর বিখ্যাত জ্যামিতির বই ‘ডি ডিভিনা প্রোপোরসিওনে’ (De Divina Proportione) লেখেন, তখন সেই বইয়ের জ্যামিতিক চিত্রগুলো (যেমন—ত্রিমাত্রিক বহুতলক বা 3D Polyhedra) এঁকে দিয়েছিলেন স্বয়ং লিওনার্দো দা ভিঞ্চি!
‘দ্য লাস্ট সাপার’ চিত্রকর্ম: ইতিহাসবিদদের মতে, দা ভিঞ্চি তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘দ্য লাস্ট সাপার’ (The Last Supper) আঁকার সময় যে দৃষ্টিকোণ ও জ্যামিতিক অনুপাত ব্যবহার করেছিলেন, তা প্যাসিওলির কাছ থেকেই শেখা!
মজার তথ্য: একজন গণিতবিদ ও সন্ন্যাসী হয়েও তিনি যুগের শ্রেষ্ঠ শিল্পীকে গণিত শিখিয়েছিলেন এবং তাঁদের এই চমৎকার মেলবন্ধনে সৃষ্টি হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম সেরা শিল্পকর্ম।
যদিও দু-তরফা দাখিলা পদ্ধতি (Double-Entry Bookkeeping) তাঁর আগে থেকেই ইতালির ব্যবসায়ীরা কিছুটা ব্যবহার করতেন, তবে লুকা প্যাসিওলিই প্রথম ব্যক্তি যিনি একে আনুষ্ঠানিকভাবে সংকলিত, ব্যাখ্যা ও গ্রন্থভিত্তিক রূপ দেন।
১৪৯৪ সালে তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Summa de Arithmetica, Geometria, Proportioni et Proportionalita’ প্রকাশ করেন। এই বইয়ের একটি বিশেষ অধ্যায় ছিল ‘Particularis de Computis et Scripturis’, যেখানে তিনি দু-তরফা দাখিলা পদ্ধতির বিস্তারিত নীতি উপস্থাপন করেন।
তিনি প্রথম প্রকাশ্য নিয়মে লেখেন যে, "প্রতিটি লেনদেনের দুটি পক্ষ থাকবে—একটি ডেবিট (Debit) এবং অপরটি ক্রেডিট (Credit)। ডেবিট পাশ সবসময় ক্রেডিট পাশের সমান হতে হবে।"
তিনি লেনদেন সঠিকভাবে লিখে রাখার জন্য তিনটি প্রাথমিক বই ব্যবহারের নিয়ম দেখান:
মেমোর্যান্ডাম (Memorandum): প্রাথমিক নোট বা খসড়া বই।
জাবেদা (Journal): তারিখ অনুযায়ী ডেবিট-ক্রেডিট বিশ্লেষণ করে প্রতিদিনের লেনদেন লিপিবদ্ধকরণ।
খতিয়ান (Ledger): প্রতিটি হিসাবের পৃথক শ্রেণিবদ্ধ রূপ।
প্যাসিওলি তাঁর বইতে উল্লেখ করেছিলেন:
"কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো হিসাব পূর্ণাঙ্গভাবে শেষ না করে শান্তিতে ঘুমাতে যেতে পারে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত তার ডেবিট ও ক্রেডিট পাশ মিলে যাচ্ছে।"
লুকা প্যাসিওলি আধুনিক হিসাববিজ্ঞানের যে মূল ভিত্তি (A = L + OE বা ডেবিট = ক্রেডিট) ১৪৯৪ সালে স্থাপন করে গিয়েছিলেন, ৫০০ বছর পরেও আজ বিশ্বের প্রতিটি ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান সেই একই নীতিতে পরিচালিত হচ্ছে। তাই তাঁকে যথাযথভাবেই "হিসাববিজ্ঞানের জনক" বলা হয়।
১৩
১৮ মন্তব্য