Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩০ জুলাই, ২০২৬ ০১:৫৬ অপরাহ্ণ

প্রাণীপ্রেমে মানবিক নাগরিক গড়ার উদ্যোগ

একটি শিশুর হাতে যখন পোষ্য প্রাণীর খাবারের পাত্র তুলে দেওয়া হয়, তখন সে শুধু একটি প্রাণীর যত্ন নিতে শেখে না; শেখে দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, ধৈর্য ও জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা। সেই মানবিক মূল্যবোধ শৈশব থেকেই গড়ে তুলতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম ও ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পোষ্য প্রাণী পালনে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। হাঁস, মুরগি ও অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণীর পরিচর্যায় বাবা-মাকে সহযোগিতা, প্রাণীর প্রতি সদয় আচরণ এবং অন্যদেরও এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে নির্দেশনা দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু প্রাণী কল্যাণের নয়; ভবিষ্যতের দায়িত্বশীল, সহনশীল ও মানবিক নাগরিক গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।

ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নেওয়া ‘১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায়’ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম ও ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পোষ্য প্রাণী পালনে উৎসাহিত করার নির্দেশনা দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রাণীর প্রতি সদয় আচরণ করতে এবং অন্যদেরও এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে বলা হয়েছে। সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক চিঠিতে এ নির্দেশনা দিয়ে তা সব বিভাগীয় উপপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

ডিপিইর নির্দেশনায় বলা হয়, শিক্ষার্থীরা যেন বাড়িতে হাঁস, মুরগি ও অন্য গৃহপালিত পশু-পাখি পালনে বাবা-মাকে সহযোগিতা করে। পাশাপাশি সব ধরনের পোষ্য প্রাণীর প্রতি মানবিক আচরণ করে এবং আশপাশের মানুষকেও একই আচরণে উৎসাহিত করে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট দল গঠন করে প্রতিবেশীর গৃহপালিত প্রাণী পালনে উৎসাহিত করতে বলা হয়েছে। কাব স্কাউট, হলদে পাখি সমাবেশ, মা সমাবেশ, উঠান বৈঠক ও বিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্মুক্ত আলোচনায় প্রাণীর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের বিষয়টি নিয়মিত আলোচনারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কেন প্রয়োজন এই উদ্যোগ : সংশ্লিষ্টরা জানান, শিশু মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা শেখা শিশুর মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটি প্রাণীর খাবার, পরিচর্যা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে গিয়ে শিশুর মধ্যে দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, ধৈর্য, সহানুভূতি এবং নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত হয়।

এ প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদ ড. মোজাম্মেল হক চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, যে শিশু ছোটবেলা থেকেই প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধ শেখে, সে বড় হয়ে মানুষ, পরিবেশ ও সমাজের প্রতিও দায়িত্বশীল আচরণ করতে শেখে। স্কুলে নৈতিক শিক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাস্তব জীবনে প্রাণীর প্রতি সদয় আচরণের চর্চাও মানবিক শিক্ষা অর্জনের একটি কার্যকর উপায়।

সমাজ ও দেশের কী লাভ হবে? প্রসঙ্গে ড. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, প্রাণীর প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষ সাধারণত সহিংসতা, নিষ্ঠুরতা ও বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে দূরে থাকে। ফলে পরিবার ও সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে।

অন্যদিকে হাঁস, মুরগি, কবুতর বা খরগোশের মতো গৃহপালিত প্রাণী পালনের অভ্যাস শিশুদের কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও খাদ্য উৎপাদন সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দেয়। গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে তাদের সম্পর্কও গভীর হয়। ভবিষ্যতে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহও তৈরি হতে পারে।

প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বের অনেক দেশেই বিদ্যালয় পর্যায়ে প্রাণী কল্যাণ ও মানবিক আচরণ শিক্ষার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যেমন জাপানে অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষ বা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে খরগোশ, মাছ কিংবা ছোট পাখির যত্ন নেয়। এর মাধ্যমে তারা দায়িত্ববোধ, দলগত কাজ এবং জীবনের প্রতি সম্মান শেখে।

যুক্তরাজ্যের বহু স্কুলে প্রাণী কল্যাণ সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের প্রাণীর অধিকার, দায়িত্বশীল পোষ্য পালন এবং প্রাণীর প্রতি সদয় আচরণ বিষয়ে কর্মশালা আয়োজন করা হয়।

এ ছাড়া, অস্ট্রেলিয়ার কিছু অঙ্গরাজ্যে পেট এডুকেশন কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের শেখানো হয়Ñ প্রাণীকেও একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে সম্মান করতে হবে এবং তারও নিরাপত্তা ও যত্নের প্রয়োজন রয়েছে।

শিক্ষাবিদের মতে, বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে শিশুদের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে সংযোগ কমে যাচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগ শিশুদের বাস্তব জীবন, প্রকৃতি এবং পরিবেশের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেবে।

আরও যেসব উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে : বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে; বিদ্যালয়ে ‘প্রাণী কল্যাণ সপ্তাহ’ পালন করা। স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের নিয়ে সচেতনতামূলক ক্লাসের আয়োজন করা। প্রাণীর প্রতি সদয় আচরণ নিয়ে গল্প, চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন। পথপ্রাণী ও গৃহপালিত প্রাণীর যত্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারিক কর্মশালা। বিদ্যালয়ে ছোট ‘অ্যানিমেল কেয়ার কর্নার’ বা প্রকৃতি ক্লাব গঠন। প্রাণী নির্যাতন রোধ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়ে সহশিক্ষা কার্যক্রম চালু করা। অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করে পরিবারভিত্তিক প্রাণী পরিচর্যা কার্যক্রম উৎসাহিত করা।




মন্তব্য করুন

ব্লগ