সহকারী শিক্ষক
৩০ জুলাই, ২০২৬ ০৫:৩৬ অপরাহ্ণ
হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.): ন্যায়বিচারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত
হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.): ন্যায়বিচারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত
ভূমিকা
ইসলামের ইতিহাসে যে কয়েকজন ব্যক্তিত্ব তাঁদের ন্যায়পরায়ণতা, দৃঢ়তা ও প্রজ্ঞার জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম প্রিয় সাহাবি এবং ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে তাঁর শাসনামল ছিল ইসলামি ইতিহাসের এক স্বর্ণযুগ। কঠোর ন্যায়বিচার, সাধারণ জীবনযাপন আর প্রজাদের প্রতি অসীম দায়িত্ববোধের কারণে তিনি আজও মুসলিম বিশ্বে আদর্শ শাসকের প্রতীক।
ইসলাম গ্রহণের পূর্বে
মক্কার কুরাইশ বংশের বনু আদি গোত্রে জন্ম নেওয়া ওমর (রা.) ছিলেন প্রাক-ইসলামি যুগে একজন প্রভাবশালী ও দৃঢ়চেতা ব্যক্তি। শারীরিকভাবে বলিষ্ঠ, বাগ্মী এবং কূটনীতিতে পারদর্শী ওমর প্রথম দিকে ইসলামের ঘোর বিরোধী ছিলেন। মুসলমানদের প্রতি তাঁর কঠোরতা ছিল সর্বজনবিদিত। কথিত আছে, তিনি একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যা করার সংকল্প নিয়ে বের হয়েছিলেন, কিন্তু পথিমধ্যে নিজের বোনের ইসলাম গ্রহণের কথা জানতে পেরে তাঁর ঘরে যান। সেখানে কুরআনের আয়াত শুনে তাঁর হৃদয় গলে যায় এবং তিনি সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।
ইসলাম গ্রহণের প্রভাব
ওমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিল। এতদিন যে মুসলমানরা গোপনে ইবাদত করতেন, তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর তাঁরা প্রকাশ্যে কাবা শরিফে নামাজ আদায় করার সাহস পান। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে "ফারুক" উপাধিতে ভূষিত করেন, যার অর্থ ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্যকারী। এই নামটিই পরবর্তীতে তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে ওঠে।
খিলাফতের দায়িত্বভার
হযরত আবু বকর (রা.)-এর ইন্তেকালের পর ওমর (রা.) ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দে ইসলামি রাষ্ট্রের দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর প্রায় দশ বছরের শাসনামলে ইসলামি রাষ্ট্র বিস্তৃত হয়ে পারস্য সাম্রাজ্য ও পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের বিশাল অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করে। জেরুজালেম, দামেস্ক, মিসর ও ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো এই সময়েই ইসলামি শাসনের অধীনে আসে।
প্রশাসনিক সংস্কার
ওমর (রা.)-এর শাসনামলকে ইসলামি ইতিহাসে প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপনের যুগ হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি বেশ কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেন:
- বায়তুল মাল প্রতিষ্ঠা: রাষ্ট্রীয় কোষাগার গঠন করে জনকল্যাণমূলক কাজে তার সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করেন।
- প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা: বিশাল রাষ্ট্রকে প্রদেশে ভাগ করে দক্ষ গভর্নর নিয়োগ দেন এবং তাঁদের কর্মকাণ্ডের কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেন।
- হিজরি সন প্রবর্তন: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মদিনায় হিজরতের ঘটনাকে ভিত্তি করে ইসলামি বর্ষপঞ্জি চালু করেন।
- বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ: প্রশাসনিক ক্ষমতা থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করে ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে ভূমিকা রাখেন।
- জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম: দরিদ্র, অসহায় ও ভাতাপ্রাপ্তদের জন্য নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা করেন, এমনকি অমুসলিম প্রজাদের কল্যাণেও তিনি সমান মনোযোগী ছিলেন।
ন্যায়বিচারের অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত
ওমর (রা.)-এর ন্যায়বিচার নিয়ে অসংখ্য কাহিনি ইতিহাসে সংরক্ষিত আছে। তিনি নিজে রাতের বেলা ছদ্মবেশে মদিনার অলিগলি ঘুরে প্রজাদের অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করতেন। একবার এক বৃদ্ধা নারীর কষ্টের কথা শুনে নিজ হাতে তাঁর জন্য খাবার বহন করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা আজও ন্যায়পরায়ণ শাসনের প্রতীক হিসেবে বর্ণিত হয়। তিনি প্রায়ই বলতেন, ফোরাত নদীর তীরে একটি কুকুরও যদি না খেয়ে মারা যায়, তার জন্যও কিয়ামতের দিন তাঁকে জবাবদিহি করতে হবে।
নিজের এবং নিজ পরিবারের জন্য তিনি সাধারণ প্রজাদের চেয়ে ভিন্ন কোনো সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতেন না। খলিফা থাকা অবস্থায়ও তালি দেওয়া পোশাক পরতেন এবং অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও বিলাসিতাকে সম্পূর্ণ পরিহার করে তিনি শাসকদের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
শাহাদাত
৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দে ফজরের নামাজ আদায়রত অবস্থায় আবু লু'লু' নামক এক পারস্য দাসের ছুরিকাঘাতে ওমর (রা.) গুরুতর আহত হন এবং কয়েকদিন পর শাহাদাত বরণ করেন। মৃত্যুশয্যায়ও তিনি উম্মাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন এবং পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের জন্য ছয়জন বিশিষ্ট সাহাবিকে নিয়ে একটি পরামর্শ কমিটি (শূরা) গঠন করে যান।
উত্তরাধিকার
হযরত ওমর (রা.)-এর শাসনামল আজও ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রজাকল্যাণের এক আদর্শ মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়। ক্ষমতা যে বিনয় ও দায়িত্ববোধের সাথে চর্চা করা যায়, তাঁর জীবন তারই এক জীবন্ত প্রমাণ। শাসক হিসেবে তাঁর কঠোরতা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, কিন্তু প্রজাদের প্রতি তাঁর হৃদয় ছিল অসীম মমতায় পূর্ণ। এই দ্বৈত বৈশিষ্ট্যই তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে চিরস্থায়ী মর্যাদা দিয়েছে।
১৪
২১ মন্তব্য