Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩০ জুলাই, ২০২৬ ১০:২৩ অপরাহ্ণ

গারো অস্ত্র, ময়মনসিংহ জেলা

গারো অস্ত্র, ময়মনসিংহ জেলা (Garo Weapons, Mymensingh District)

গারো জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ইতিহাসে এই অস্ত্র ও সরঞ্জামগুলোর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এখানে গারোদের ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্র এর বর্ণনা দেওয়া হলো।

 

১. পেছনের দেওয়ালে ঝুলন্ত অস্ত্রসমূহ: মিলাম (Milam)

দেওয়ালে তিনটি লম্বা, অদ্ভুত গঠনের তলোয়ার দেখা যাচ্ছে। এগুলো গারোদের সবচেয়ে প্রধান ঐতিহ্যবাহী অস্ত্র।

অস্ত্রের নাম

ছবি (অংশবিশেষ)

বিস্তারিত বিবরণ

মিলাম (Milam)

[ছবিতে দেওয়ালে ঝুলন্ত তিনটি লম্বা তলোয়ার]

গঠন: মিলাম একটি একখণ্ড লোহা বা ইস্পাত দিয়ে তৈরি দু-ধারি তলোয়ার। এর হাতল (hilt) থেকে ফলা (blade) পর্যন্ত একটানা লোহা থাকে। এর হাতলটি কিছুটা বাঁকানো হয় এবং হাতলের গোড়ায় আড়াআড়িভাবে দুটো বাকানো লোহার গার্ড বা কাঁটা থাকে। এর আগা চওড়া ও ভোঁতা হয়। এর কোনো খাপ থাকে না।



ব্যবহার: আদি যুগে এটি যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র ছিল। গারোরা এটি দিয়ে দৈনন্দিন জঙ্গল পরিষ্কার এবং শিকারও করত। বর্তমানে এটি মূলত সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে গারোদের প্রধান উৎসব 'ওয়াঙ্গালা'-তে বীর যোদ্ধাদের নাচ (গ্রিকা dance)-এর সময় এটি অপরিহার্য। এটি গারো বীরত্বের প্রতীক।

 

 

 

 

 

২. পেছনের দেওয়ালে ডানদিকের বস্তু: দানিল (Danil)

তরবারিগুলোর ডান পাশে দেওয়ালে চারকোণা একটি চ্যাপ্টা বস্তু ঝুলছে। এটি গারোদের ঐতিহ্যবাহী ঢাল।

সরঞ্জামের নাম

ছবি (অংশবিশেষ)

বিস্তারিত বিবরণ

দানিল (Danil)

[ছবিতে দেওয়ালে ঝুলন্ত চারকোণা পাতের মতো বস্তু]

গঠন: দানিল মূলত পশুর চামড়া (যেমন: মহিষ বা হরিণ) দিয়ে তৈরি ঢাল। অনেক সময় শক্ত বাঁশ বা কাঠের বুননের উপর চামড়ার আবরণ দিয়ে এটি তৈরি করা হতো। ছবির ঢালটিতে নকশা করা ধাতব পাত লক্ষ্য করা যায়।



ব্যবহার: যুদ্ধে মিলাম (তরবারি) বা বর্শার আঘাত রুখতে এই ঢাল বাম হাতে ধরে ব্যবহার করা হতো।

 

 

৩. নিচের তাকে বামদিকের অস্ত্র: রুয়া (Rua)

নিচের তাকে একদম বামদিকে একটি লম্বা কাঠের হাতলযুক্ত কুড়াল রাখা আছে।

অস্ত্রের নাম

ছবি (অংশবিশেষ)

বিস্তারিত বিবরণ

রুয়া (Rua)

[ছবিতে নিচের তাকে বামদিকের কুড়াল]

গঠন: রুয়া হলো গারোদের কুড়াল বা টাঙ্গি। এটি একটি চওড়া ও ধারালো লোহার ফলাযুক্ত, যা লম্বা কাঠের হাতলে মজবুতভাবে আটকানো থাকে।



ব্যবহার: এটি মূলত জুম চাষের সময় বড় বড় গাছ ও বনজঙ্গল কাটার কাজে ব্যবহৃত হয়। শিকার করতে এবং আদি যুগে যুদ্ধের সময় এটিকে সমরাস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করা হতো।

 

৪. নিচের তাকে মধ্যভাগের অস্ত্রসমূহ: দা বা আতে (Ate)

নিচের তাকে মেঝের মাঝখানে বেশ কিছু ছোট-বড় দা সাজানো রয়েছে। গারো ভাষায় দা-কে আতে বলা হয়।

অস্ত্রের নাম

ছবি (অংশবিশেষ)

বিস্তারিত বিবরণ

আতে (Ate) বা দা/রামদা

[ছবিতে নিচের তাকে সাজানো বিভিন্ন দা]

গঠন: ছবিতে বিভিন্ন আকারের লোহার ফলা ও কাঠের হাতলযুক্ত দা দেখা যাচ্ছে। কোনোটির ফলা সোজা, কোনোটি বাকানো বা রামদা সদৃশ।



ব্যবহার: জুম চাষে জমি প্রস্তুত, গৃহস্থালির দৈনন্দিন কাজ, পশু বলি এবং প্রয়োজনে আত্মরক্ষার জন্য এগুলি ব্যবহার করা হয়।

 

 

 

 

 

 

৫. নিচের তাকে ডানদিকের বস্তুসমূহ: সেপি (Sepi) বা বেতের ঢাল

নিচে একদম ডান কোণে বেত ও বাঁশ দিয়ে বোনা একটি চ্যাপ্টা কাঠামো দেখা যাচ্ছে।

সরঞ্জামের নাম

ছবি (অংশবিশেষ)

বিস্তারিত বিবরণ

সেপি (Sepi) বা বেতের ঢাল

[ছবিতে নিচের তাকে ডান কোণে বেতের বুনন]

গঠন: এটি বাঁশ ও বেতের শক্ত বুনন দিয়ে তৈরি এক ধরণের স্থানীয় প্রতিরক্ষা ঢাল বা ঝুড়ি-জাতীয় বর্ম। এটি দানিল-এর তুলনায় কম শক্তিশালী।



ব্যবহার: আদি যুগে এটি তীর বা ছোট অস্ত্রের আঘাত রুখতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

 

 

 

 

৬. নিচের দিকে শুইয়ে রাখা বস্তুসমূহ: সেলু (Silu) বা বর্শা

নিচের মেঝের মধ্যভাগে আতে-র পেছনে এবং নিচে লম্বা শুইয়ে রাখা বস্তুগুলো হলো বর্শা।

অস্ত্রের নাম

ছবি (অংশবিশেষ)

বিস্তারিত বিবরণ

সেলু (Sil-u) বা বল্লম/বর্শা

[ছবিতে নিচের দিকে শুইয়ে রাখা লম্বা লাঠিসদৃশ বস্তু]

গঠন: এটি একটি লম্বা বাঁশ বা কাঠের দণ্ডের মাথায় अत्यंत ধারালো লোহার ফলা যুক্ত করে তৈরি করা হয়।



ব্যবহার: দূর থেকে ছুড়ে মেরে অথবা সামনাসামনি যুদ্ধে এবং বন্যপ্রাণী (যেমন: বুনো শুকর, হরিণ) শিকার করতে এটি ব্যবহৃত হতো।

গারোদের এই ঐতিহ্যবাহী অস্ত্র ও সরঞ্জামগুলো মূলত জুম চাষ, দৈনন্দিন জীবিকা এবং আদি যুগে আত্মরক্ষার প্রয়োজন থেকেই বিকশিত হয়েছিল, যা পরবর্তীতে তাদের সংস্কৃতি ও বীরত্বের প্রতীকে পরিণত হয়।

 

মন্তব্য করুন