সহকারী শিক্ষক
৩১ জুলাই, ২০২৬ ০৬:১৯ পূর্বাহ্ণ
কিশোরগঞ্জের আদি নাম ‘হয়বতনগর’ ও আমাদের শহরের উৎপত্তির গল্প
বর্তমান কিশোরগঞ্জ শহরটি আঠারো শতকের শেষভাগে এবং উনিশ শতকের প্রথমার্ধেও সমগ্র উপমহাদেশে ‘হয়বতনগর’ নামে পরিচিত ছিল। তখনো এই জনপদে ‘কিশোরগঞ্জ’ নামের কোনো অস্তিত্বই তৈরি হয়নি!
আসুন জেনে নেওয়া যাক আমাদের প্রিয় শহরের নামের পেছনের সেই রোমাঞ্চকর ইতিহাস:
১. জেমস রেনেলের মানচিত্রে ‘Hobitnagar’
১৭৬৪ থেকে ১৭৭৬ সালের মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম সার্ভেয়ার জেনারেল মেজর জেমস রেনেল (James Rennell) বাংলার যে ঐতিহাসিক মানচিত্র (Bengal Atlas) তৈরি করেন, সেখানে হোসেনপুর (Ossunpour) এবং জঙ্গলবাড়ি (Junglebary)-এর মধ্যবর্তী স্থানটিকে পরিষ্কারভাবে 'Hobitnagar' (হয়বতনগর) হিসেবে দেখানো হয়েছে। (সংযুক্ত মানচিত্রে লাল দাগ চিহ্নিত অংশটি দেখলেই তা বোঝা যায়)।
২. বীর ঈসা খাঁর বংশধর ও হয়বতনগর 🏰
বাংলার বারো ভূঁইয়াদের প্রধান মসনদ-ই-আলা ঈসা খাঁর প্রপৌত্র (নাতির ছেলে) দেওয়ান হয়বত খাঁ এই অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর নামানুসারেই এই লোকালয়ের নাম হয় ‘হয়বতনগর’।
ঐ সময়কালে এই স্থানটি জোয়ার হোসেনপুর পরগনার অংশ ছিল, যার জমিদার ছিলেন হয়বত খাঁর পুত্র দেওয়ান আব্দুল্লাহ খাঁ। উল্লেখ্য, এই আব্দুল্লাহ খাঁ-ই হচ্ছেন কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক 'পাগলা মসজিদের' সাথে জড়িত জিলকদর খাঁ (পাগলা সাহেব)-এর দাদা।
৩. 'হয়বতনগর' যেভাবে 'কিশোরগঞ্জ' হলো 🏪
পলাশীর যুদ্ধের পর ফরাসিরা (French) এদেশ থেকে বিতাড়িত হলে এই অঞ্চলের ফরাসি কুঠি ও ব্যবসা কিনে নেন এক ধনী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী—ব্রজকিশোর প্রামাণিক।
ধীরে ধীরে কাটাখাল ও একরামপুর সংলগ্ন এই কুঠিবাড়ির চারপাশ জুড়ে একটি বাজার বা গঞ্জ গড়ে ওঠে। ব্রজকিশোর প্রামাণিকের নামানুসারেই এই বাজারের নাম হয় ‘ব্রজকিশোরগঞ্জ’, যা কালক্রমে সংক্ষেপে ‘কিশোরগঞ্জ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
৪. প্রশাসনিক থানা ও মহকুমা প্রতিষ্ঠা ⚖️
১৮৪০-এর দশকে ইংরেজরা তাদের প্রশাসনিক থানাটি হয়বতনগর থেকে সামান্য দূরে এই উদীয়মান বাণিজ্যিক কেন্দ্র ‘কিশোরগঞ্জ’ বাজারে স্থানান্তর করে। পরবর্তীতে, ১৮৬০ সালের ১ মে ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কিশোরগঞ্জ মহকুমা’ (Sub-division) প্রতিষ্ঠা করে। ঠিক একইভাবে, স্থানীয় করিম খানের বাজার থেকে আজকের ‘করিমগঞ্জ’ উপজেলার সৃষ্টি হয়েছিল।
ইতিহাসের শেষ কথা...
কিশোরগঞ্জ শহরের একদম কোল ঘেঁষেই অবস্থিত করিমগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক ‘জঙ্গলবাড়ি’, যা ছিল বীর ঈসা খাঁর দুর্গ ও বাসস্থান। ঈসা খাঁর পরবর্তী বংশধরেরা আজও জঙ্গলবাড়ি, হয়বতনগর জমিদার বাড়ি এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন।
📝 তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা: জেমস রেনেলের বেঙ্গল অ্যাটলাস (১৭৭৮-৮০), স্থানীয় ইতিহাস ও ওয়াকফ্ রেকর্ড।
১৪
২১ মন্তব্য