Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩১ জুলাই, ২০২৬ ০৭:৩৬ পূর্বাহ্ণ

বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে পূর্ব বাংলার চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ এর কারণ কী?

বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১) ও পূর্ব বাংলার অসন্তোষ

১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা পূর্ব বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশের) বহু মানুষের মধ্যে গভীর হতাশা ও অসন্তোষ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের প্রশাসনিক, শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত তাদের উন্নয়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করবে।

১. প্রশাসনিক মর্যাদা ও উন্নয়নের গতি কমে যাওয়া

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ফলে ঢাকা নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হয়। রাজধানী হওয়ার কারণে ঢাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রম বৃদ্ধি পায় এবং সরকারি বিনিয়োগও বাড়ে।

এর ফলে—

  • নতুন সরকারি দপ্তর ও প্রশাসনিক অবকাঠামো গড়ে ওঠে।
  • যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নগর উন্নয়নে অগ্রগতি হয়।
  • বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়।

১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর ঢাকা রাজধানীর মর্যাদা হারায়। ফলে পূর্ব বাংলার অনেক মানুষ মনে করেন, তাদের অঞ্চলের উন্নয়নের গতি কমে যাবে এবং প্রশাসনিক গুরুত্ব আবার কলকাতাকেন্দ্রিক হয়ে পড়বে।

২. শিক্ষা সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগ

পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠনের পর শিক্ষার বিস্তারে সরকারি উদ্যোগ বৃদ্ধি পায়। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধির ফলে পূর্ব বাংলার মানুষ আশাবাদী হয়ে ওঠে।

বঙ্গভঙ্গ রদের পর অনেকের আশঙ্কা ছিল যে—

  • পূর্ব বাংলার শিক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব কমে যাবে।
  • শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ হ্রাস পাবে।
  • কলকাতাকেন্দ্রিক নীতির কারণে পূর্ব বাংলা আবার তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়বে।

৩. ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আস্থাহীনতা

ব্রিটিশ প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা বঙ্গভঙ্গকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন।

কিন্তু মাত্র ছয় বছরের মধ্যে তীব্র আন্দোলনের মুখে বঙ্গভঙ্গ বাতিল হওয়ায় পূর্ব বাংলার মানুষের একাংশ মনে করেন যে, ব্রিটিশ সরকার তাদের স্বার্থ যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে। এর ফলে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি তাদের আস্থা কমে যায়।

৪. রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে উদ্বেগ

নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নওয়াব আলী চৌধুরীসহ পূর্ব বাংলার অনেক নেতা মনে করেন যে, পৃথক প্রদেশ বিলুপ্ত হলে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক প্রভাব কমে যাবে এবং কলকাতাকেন্দ্রিক নেতৃত্বের প্রভাব আবার বৃদ্ধি পাবে।

তাদের মতে—

  • পূর্ব বাংলার প্রশাসনিক গুরুত্ব হ্রাস পাবে।
  • আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষা করা কঠিন হবে।
  • রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

ঐতিহাসিক প্রতিক্রিয়া

বঙ্গভঙ্গ রদের সিদ্ধান্তে নবাব স্যার সলিমুল্লাহসহ অনেক নেতা প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এই অসন্তোষ প্রশমিত করার লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার পূর্ব বাংলার জন্য কিছু নতুন উদ্যোগ গ্রহণের কথা ভাবতে শুরু করে।

১৯১২ সালে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফর করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ধারণা সরকারি পর্যায়ে সমর্থন লাভ করে, যদিও বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে। ইতিহাসবিদদের অনেকেই মনে করেন, পূর্ব বাংলার অসন্তোষ প্রশমিত করার ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ ছিল; তবে এটিকে কেবল "ক্ষতিপূরণ" হিসেবে ব্যাখ্যা করা ইতিহাসের সব গবেষকের সর্বসম্মত মত নয়।

উপসংহার

বঙ্গভঙ্গ রদ পশ্চিম বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলেও, পূর্ব বাংলার বহু মানুষের কাছে এটি ছিল প্রশাসনিক, শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক প্রত্যাশা ভঙ্গের প্রতীক। ফলে একই সিদ্ধান্ত এক অঞ্চলে বিজয়ের আনন্দ এবং অন্য অঞ্চলে হতাশা ও অসন্তোষের জন্ম দেয়—যা পরবর্তী সময়ে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

মন্তব্য করুন