Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩১ জুলাই, ২০২৬ ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ

আহারে শিক্ষকের রুচিবোধ!

আহারে শিক্ষকের রুচিবোধ!

—একজন শিক্ষকের আত্মসমীক্ষা

অবশেষে আমাকেও লিখতে বাধ্য করলো। সেই অনিবার্য মুহূর্ত এলো, যখন নির্বাক দর্শকের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে হয় কলম হাতে। NTRCA-এর আলোচিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি—যেখানে প্রধান ও সহকারী প্রধান পদে আবেদনের জন্য ৩৫০ টাকা ফি নির্ধারিত ছিল—সেই পুরো প্রক্রিয়াটি এখন বাতিলের তাম্রলিপি। আর বাতিলের এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই যেন খুলে গেল এক অভিনব মহাভারতের প্রথম অধ্যায়—শিক্ষক মহল জুড়ে এখন শুধু একটি প্রশ্নের মড়ক: ফিরবে কি না ফিরবে সেই ৩৫০ টাকা!

এখানে একটি আন্তরিক স্বীকারোক্তি দেওয়া আবশ্যক। আমি নিজেও এই নিয়োগের আবেদনকারী—দুইটি পদে আবেদন করেছিলাম।

ফেরত দেয়ার সরকারি ঘোষণার প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই।

কারণ আমি জানি, এই অর্থ কোনো ব্যক্তির পকেটে যায়নি, গেছে রাষ্ট্রের কোষাগারে, যা আমাদের সবার কল্যাণেই ব্যবহৃত হবে। আমি সেই হতাশ-আকুল জনতার দলে নেই, যে দল প্রতি পয়সা ফিরে পেতে গ্রামীণ সড়কে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্লোগান দেয়। 

আমার কাছে এই অর্থ ছিল একটি সম্ভাবনার মূল্য, ক্ষতির পরিমাণ নয়। আমি শিক্ষক, কেরানি নই—আমার দৃষ্টি থাকা উচিত উচ্চে, লেনদেনের নিচু হিসাবের ঊর্ধ্বে।

তবুও আশ্চর্য হয়ে দেখি, আমারই সহকর্মীরা, যাঁরা জাতির মেরুদণ্ড দাবী করেন, নিজেকে জাতিগড়ার কারিগর জাহির করেন, তাঁরা এখন হিসাবের খাতা নিয়ে বসে গেছেন। কৌতূহলী দৃষ্টিতে এক আবেদনকারীকে প্রশ্ন করলাম, "ভাই, আপনাদের এত মরিয়া হয়ে ওঠার কারণ কী? এই ৩৫০ টাকা কি পৃথিবীর শেষ সম্পদ?" উত্তরে তিনি একেবারে স্পষ্ট, প্রায় গাণিতিক নিষ্ঠার সঙ্গে বললেন, "আমার কাছে তো ৩৫০ টাকা কিছুই নয়, কিন্তু ধরুন—আশি হাজার আবেদনকারী। আশি হাজার গুণ ৩৫০ টাকা মানে দুই কোটি আশি লাখ টাকা! এত বিপুল অর্থ কি তারা হজম করে ফেলবে নিশ্চিহ্ন করে?"

এই উত্তরে আমি বিস্মিত না হয়ে পারলাম না। কিন্তু সেই বিস্ময় যেন এক সুচারু বাঁক নিয়ে অন্য দিকে মোড় নিল।

তাকে উল্টো প্রশ্ন করলাম, তাহলে আপনার টেনশান আপনার পকেটে নয়, আবেদন গ্রহীতার কোষাগারে?

তিনি উত্তর দিলেন, একদম ঠিক ধরেছেন।

আমার চিন্তার জালে ধরা পড়ল এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব—টাকাটা তো রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়েছে, সেখানে তার সুরক্ষিত থাকার কথা। অথচ কথকের উচ্চারণে মনে হলো, এই টাকা যেন কারও ব্যক্তিগত পেটে চলে গেছে, আর সেটা হজম করতে গিয়েই শিক্ষকসমাজের অন্ত্রে গ্যাসের মতো জমেছে এক বিষম অস্বস্তি! 

আমি আমার সাতশত টাকা হজম করিনি, বরং তা দেশের জন্যই উৎসর্গ করেছি মনে করি—যে মন মানসিকতা নিয়ে অন্যরা ফিরে পেতে মরিয়া, সেই মন থেকেই আমি বেরিয়ে এসেছি। 

প্রশ্ন জাগে—কোষাগারের টাকা কি কারও একার উদরস্থ জলযোগ? নাকি এই লোভের কুয়াশায় তাঁরা নিজেদের চোখেই দেখতে পান রাষ্ট্রকে এক দস্যুর দলে?

আমি শিক্ষকতাকে সবসময়ই জ্ঞানতাপসের তপোবন হিসেবে ভেবেছি। যে পেশায় ছাত্রের মনে আলো জ্বালানো, জীবন গড়ে দেওয়া—সেখানে ৩৫০ বা ৭০০ টাকা নিয়ে এত আন্দোলন কি শোভা পায়? ইংরেজি সাহিত্যের সেই অমর উক্তি মনে পড়ে—“The teacher is the architect of the nation.” আজ সেই স্থপতি যদি হিসাবি কেরানির মতো টাকার পিছু ছোটেন, তবে কীভাবে গড়বেন তিনি মনুষ্যত্বের ভিত্তি? তাঁদের কর্তব্যের প্রথম পাঠ হওয়া উচিত, “কোষাগারে জমা অর্থ আমার নয়, এ দেশের—এই গণতান্ত্রিক জনপদের প্রতিটি পথশিশুর।” আমি নিজে যদি সেই শিক্ষক হয়ে এই সাতশত টাকা নিয়ে কোনো আক্ষেপ না করি, তবে অন্য সহকর্মীদের ৩৫০ টাকা নিয়ে এই হা-হুতাশ দেখে আমার নিজের পেশার প্রতিই যেন আস্থা টলে যায়।

অথচ বাস্তব দৃশ্য তাই বৈরী। শিক্ষকের মুখে আজ আর শাস্ত্রচর্চা নেই, আছে শুধু ফেরতযোগ্য ফি-র গাণিতিক হিসাব। দশ জনে মিলে ক্যালকুলেটর নিয়ে বসেছেন—হাজার হাজার আবেদন, কত টাকা, কত সুদ, কত দাবি! যেন এটি কোনো শিক্ষাসংস্কার আন্দোলন নয়, বরং হাটের মোল্লার দরদাম। আমি যদি তাদের সামর্থ্যের প্রশংসা করি, তবে কেবল অঙ্কবিদ্যায়—তারা ঠিকই বের করেছেন ৮০,০০০ × ৩৫০ = ২,৮০,০০,০০০। কিন্তু এই হিসাবের মধ্যে তাঁরা ভুলে গেছেন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গুণনীয়ক—মানুষের মূল্যবোধ। সেই গুণনীয়ক শূন্য হলে ফলাফলও শূন্য।

আমার মনের চোখে দেখতে পাই, প্রাচীন ভারতের গুরু-শিষ্য পরম্পরায় গুরুজিরা শিষ্যের কাছ থেকে দক্ষিণা নিতেন, কিন্তু কখনো তার ফেরত দাবি করতেন না—দক্ষিণা ছিল শ্রদ্ধার বিনিময়, কেনাবেচার নয়। আজকের এই শিক্ষকমণ্ডলী কি তবে সেই গুরুঐতিহ্যের অধঃপতন? নাকি তাঁরা ধারণা করেন, রাষ্ট্রের কাছে তাঁদের শ্রদ্ধা বিকিয়ে দিতে গিয়ে ঠকে গেছেন? আমি আমার সাতশত টাকাকে ঠিক সেই দক্ষিণার মতোই মনে করি—যা শ্রদ্ধার সাথে নিবেদন করা হয়েছে, ফেরত পাওয়ার বস্তু নয়।

একথা সত্য, নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল হওয়ায় অনেকের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে, সময় নষ্ট হয়েছে। দুঃখটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দুঃখকে ঘিরে যদি ঘনীভূত হয় কেবলমাত্র মুদ্রার লোভ, তবে তা তো রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’র সেই ক্ষুদ্র কৃপণচেতনার মতো—যেখানে গানই ছিল প্রকৃত সম্পদ, অথচ আমরা মরি টাকার পিছনে। শিক্ষকজীবন তো এক গান; তার সুরের মূলে রয়েছে আদর্শ, নিষ্ঠা ও মহত্ত্ব। সেই গানে যদি ৩৫০ টাকার কর্কশ শব্দ মিশে যায়, তবে তা কর্ণকটু ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি যে সাতশত টাকা দিয়েছি, সে গানের সুরে মিশিয়েছি নিজের আশা—তা ফিরে পেতে আমি অপেক্ষা করছি না, কারণ অপেক্ষা তো কেবল তাদের, যাদের কাছে গানটির মূল্যই কেবল টাকার ওজন।

আমার আশ্চর্য লাগে, যখন দেখি এই শিক্ষকরাই আবার ছাত্রদের পড়ান ‘বড়ো চিন্তা করো’, ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষী হও’—কিন্তু নিজেরা যখন ছোট্ট একটি ফি-র জন্য রাস্তায় নামেন, তখন তাদের ‘বড়ো চিন্তা’ কোথায় উধাও হয়? নীতিকথার সেই বেজি আর কুমিরের গল্প মনে পড়ে—বেজি কুমিরের পেটে ঢুকে খায়, কিন্তু বেরোতে ভুলে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ডুবে মরে। শিক্ষকরাও যেন সেই বেজি—রাষ্ট্রীয় কোষাগারের পেটে ঢুকে ৩৫০ টাকার পিছু ছুটতে গিয়ে নিজের মর্যাদাকেই ডুবিয়ে ফেলছেন।

এখন যদি সরকার এই টাকা ফেরতও দেয়, তবুও কী আর ফিরবে শিক্ষকশ্রেণির হারানো মহিমা? যে টাকা কোষাগারে জমা ছিল, সেই টাকা ফেরত দিতে গেলে আরও বিপুল প্রশাসনিক খরচ হবে—তার হিসাব কি শিক্ষকেরা করেছেন? হয়তো করবেন না, কারণ তাঁদের দৃষ্টি কেবলমাত্র সেই ২ কোটি ৮০ লাখের দিকে, যা তারা কল্পনায় নিজেদের অধিকার বলে ভাবতে শুরু করেছেন। অথচ এই অর্থ দেশের পরিকাঠামো, পুস্তক, বৃত্তি বা কোনো দরিদ্র মেধাবীর খাবারে লেগে থাকতে পারত। আমি নিজের সে সাতশত টাকাটা যদি দেশের কোনও গরিব মেধাবীর বই কিনতে লাগে, তবে আমি নিজেকে ধন্য মনে করব। কিন্তু শিক্ষকদের উচিত ছিল বলাটা—‘আমাদের টাকা নয়, ওই টাকা দেশের কাজে লাগুক’—তাহলে তাঁদের মাথায় সত্যিই প্রশস্ত হতো শিক্ষকের মুকুট। আমি অন্তত আমার পক্ষ থেকে সেই কথাটিই বলছি।

কিন্তু হায়! তারা বরং গণমাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, এমনকি চায়ের দোকানেও উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করছেন—‘আমরা ঠকেছি, প্রতারণা হয়েছে!’ যেন এই ৩৫০ টাকাই তাঁদের জীবনের সর্বস্ব। আমি বলতে চাই, যদি সত্যিই শিক্ষকতা পেশাকে ভালোবাসেন, তবে এই ক্ষুদ্র অর্থের চেয়েও বড়ো কথা হলো—বাতিল বিজ্ঞপ্তির কারণে যে স্বচ্ছতার অভাব তা নিয়ে প্রশ্ন করুন, নিয়োগ নীতির সংশোধন দাবি করুন। কিন্তু ৩৫০ টাকা ফেরত চাওয়ার আবদারটি যেন এক কৃপণের ক্রন্দনের মতো শোনায়, যে গঙ্গার জলেও পয়সা বাঁচাতে চায়। আমি যেহেতু সেই কৃপণের দলে নেই, তাই আমার সাতশত টাকাকে আমি আত্মমর্যাদার মূল্য হিসেবে রেখে দিতে পারি—যে মূল্যে কেনা যায় না কোনো চাকরি, কেনা যায় কেবল নিজের সততা।

শেষ পর্যন্ত, আমার বিস্ময় আপন জায়গায় মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। আমি দেখি, শিক্ষকেরা নিজেদের পেটে গ্যাস জমিয়েছেন, অথচ সেটা তারা দেশের কোষাগারের নামে চাপাচ্ছেন। যেন সরকারি অর্থ কোনো অজীর্ণ খাদ্য, যা হজম হবে না—হজম হবে কেবল তাদের আক্রোশ। কিন্তু আমার নিজের পেট তো শান্ত, কারণ আমি সেই অর্থকে হজম করিনি, বরং তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি দেশের নামে। আহারে শিক্ষকের রুচিবোধ! 

আপনারা যারা জাতির মেরুদণ্ড, এই ছোট্ট ৩৫০ টাকা নিয়ে অস্থিরতা দেখে মনে হয়, হয়তো আপনাদেরই প্রথম পাঠ নেওয়া দরকার ‘আত্মমর্যাদার’ অঙ্ক—যেখানে ৩৫০ টাকার বদলে বসে আছে অসীমের মান, আর সেই অসীমের সামনে এই ক্ষুদ্র অর্থ ধূলিসম। ধূলোকে যদি মুঠোয় ধরে রাখতে চাও, তবে হাত ফাঁকা থেকে যায়—আর যদি ফেলে দাও, তবে হাত খুলে যায় নতুন কিছু ধরাড়ার জন্য। সেই নতুন কিছু হতে পারে একটি উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, একটি মর্যাদাশীল পেশা, আর একটি সত্যিকারের শিক্ষকের হৃদয়। আমি নিজেও সেই পথের পথিক—ফেরত চাই না, ফিরে পেতে চাই নিজের পেশার মহিমা।

তাই ক্ষান্ত হোক এই ফিরে-পাওয়ার হাহাকার। কোষাগার রাষ্ট্রের, টাকা রাষ্ট্রের, আর শিক্ষক যদি রাষ্ট্রের প্রাণপ্রতীক হন, তবে প্রাণের সঙ্গে টাকার এই লেনদেন দূরস্ত নয়। বরং হোক তাঁর দৃষ্টি উচ্চে—ছাত্রের প্রতি, জ্ঞানের প্রতি, ভবিষ্যতের প্রতি। আর ৩৫০ বা ৭০০ টাকা? তা হোক রাষ্ট্রীয় কল্যাণের অবিচ্ছিন্ন একটি পরমাণু—যা শিক্ষকের উদারতার আগুনে পুড়ে মিশে যাক উন্নতির গন্ধে।

আমি অন্তত আমার সাতশত টাকাকে সেই আগুনেই পুড়িয়ে দিলাম—এখন দেখি, অন্যরা কি সেই আগুনে নিজেদের কৃপণতাও পোড়াতে পারে?

তবেই না, আহারে শিক্ষক, তোমার রুচি জাগ্রত হবে!


মুফিদুল আলম 

৩১ জুলাই ২০২৬



মন্তব্য করুন