প্রধান শিক্ষক
৩১ জুলাই, ২০২৬ ১১:১১ পূর্বাহ্ণ
প্রধান শিক্ষক
আমরা কি সন্তানদের শুধু পরীক্ষায় সফল হতে শেখাচ্ছি, নাকি একটি সুন্দর সমাজ গড়ার উপযোগী মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করছি?
একটি শিশুর জন্ম পরিবারে, কিন্তু তার সামাজিক জীবনের প্রকৃত সূচনা বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয় শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের স্থান নয়; এটি একটি ক্ষুদ্র সমাজ, যেখানে একজন শিক্ষার্থী সহাবস্থান, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ, সহযোগিতা, গণতান্ত্রিক আচরণ এবং মানবিক মূল্যবোধ শেখে। তাই শিক্ষা সমাজবিজ্ঞানীরা বিদ্যালয়কে "সমাজের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ (Miniature Society)" বলে অভিহিত করেছেন।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। বিদ্যালয়ের পরিবর্তে কোচিং সেন্টারকেন্দ্রিক শিক্ষার বিস্তার কি আমাদের সন্তানদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দিচ্ছে? পরীক্ষার ফলের প্রতিযোগিতায় আমরা কি শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যকে হারিয়ে ফেলছি?
বিদ্যালয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী?
শিক্ষাবিদ
জন ডিউই (John Dewey) বলেছেন— "School is primarily a social
institution."
অর্থাৎ বিদ্যালয় মূলত একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা UNESCO-এর মতে, শিক্ষার চারটি মৌলিক স্তম্ভ হলো—
লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এই চারটির মধ্যে কেবল একটি পরীক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত; বাকি তিনটি মানুষের সামাজিক ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের সঙ্গে জড়িত।
গবেষণা কী বলছে?
১. OECD (Organisation for Economic Co-operation and Development)
OECD-এর PISA গবেষণায় দেখা গেছে— বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগিতা, দলগত কাজ, সমস্যা সমাধান এবং সামাজিক দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
২. UNESCO Global Education Monitoring Report
এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— বিদ্যালয়ে সহশিক্ষা কার্যক্রম, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও দলগত অংশগ্রহণ শিক্ষার্থীদের সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং নাগরিক চেতনা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩. CASEL (Collaborative for Academic, Social, and Emotional Learning)
দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে— যেসব শিক্ষার্থী সামাজিক ও আবেগীয় শিক্ষা (SEL)-তে অংশ নেয়—
৪. World Bank বিশ্বব্যাংক শিক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে—
বর্তমান বিশ্বে কেবল পরীক্ষার নম্বর নয়, বরং Soft Skills—যেমন যোগাযোগ, দলগত কাজ, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতাই ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের মূল ভিত্তি।
এসব দক্ষতা কোচিং সেন্টারে নয়; বিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশেই সবচেয়ে কার্যকরভাবে গড়ে ওঠে।
কোচিং সেন্টার কী দেয়, আর কী দিতে পারে না?
কোচিং সেন্টারের মূল লক্ষ্য সাধারণত—
কিন্তু একটি কোচিং সেন্টার সাধারণত দিতে পারে না—
অর্থাৎ, কোচিং পরীক্ষার প্রস্তুতি দিতে পারে; কিন্তু মানুষ গড়ার পরিবেশ তৈরি করতে পারে না।
সামাজিকীকরণ কেন অপরিহার্য?
সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম (Émile Durkheim) মনে করতেন— বিদ্যালয় সমাজের মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের মধ্যে স্থানান্তর করে।
অন্যদিকে লেভ ভিগোৎস্কি (Lev Vygotsky) দেখিয়েছেন— শিশুর শেখার বড় অংশই ঘটে অন্যদের সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে।
অর্থাৎ সহপাঠী, শিক্ষক, দলগত কাজ এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশ শেখার একটি অপরিহার্য অংশ।
বাংলাদেশে কী ঘটছে?
বাংলাদেশে বিভিন্ন গবেষণা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে— অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে সীমিত সময় কাটিয়ে দিনের বড় অংশ কোচিং সেন্টারে ব্যয় করছে।
এর ফলে—
যদিও কোচিংয়ের প্রয়োজনীয়তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করা যায় না, তবে বিদ্যালয়ের বিকল্প হিসেবে এটি কখনোই বিবেচিত হতে পারে না।
আমরা কি শিক্ষার মূল দর্শন ভুলে যাচ্ছি?
আজকের সমাজে একটি প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে— আমরা কি সন্তানকে শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছি, নাকি একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য?
যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তবে বিদ্যালয়কে শুধু পাঠদান কেন্দ্র হিসেবে নয়, একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে হবে।
কী করা যেতে পারে?
একটি বিদ্যালয় কেবল পাঠ্যবই শেখায় না; শেখায় মানুষ হয়ে বাঁচতে। সেখানে একজন শিশু প্রথম শিখে কীভাবে অন্যকে সম্মান করতে হয়, কীভাবে দলবদ্ধভাবে কাজ করতে হয়, কীভাবে নিয়ম মেনে চলতে হয় এবং কীভাবে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হতে হয়।
তাই শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য যদি হয় সামাজিকীকরণ, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং একটি সুসংগঠিত সমাজ গঠন, তবে বিদ্যালয়ের বিকল্প কোনো কোচিং সেন্টার হতে পারে না। কোচিং সহায়ক হতে পারে, কিন্তু মানুষ গড়ার প্রধান প্রতিষ্ঠান আজও বিদ্যালয়—এবং ভবিষ্যতেও তাই থাকা উচিত।
প্রশ্নটি তাই আমাদের সবার জন্য—
আমরা কি সন্তানদের শুধু পরীক্ষায় সফল হতে
শেখাচ্ছি, নাকি একটি সুন্দর সমাজ গড়ার উপযোগী মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করছি?
লেখকঃ খুরশীদুজ্জামান আহমেদ, প্রধান শিক্ষক, কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, শিক্ষাঞ্চল কালীগঞ্জ, লালমনিরহাট।
১
১ মন্তব্য