সহকারী শিক্ষক
৩১ জুলাই, ২০২৬ ০৫:৪৩ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
একজন শিক্ষার্থী সফলতার পেছনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের মধ্যকার সম্পর্কটি ভালোবাসা, স্নেহ কিংবা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তবে বর্তমানে প্রায়ই দেখা যায়, কিছু অভিভাবক নিজের দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে গিয়ে সকল দোষ শিক্ষকের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না।
ভিডিও টির ঘটনা এর একটি উৎকৃষ্ট কিন্তু হতাশাজনক উদাহরণ—একজন শিক্ষার্থী পরপর ৫ দিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত। অথচ তার পিতা শিক্ষকের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এই বলে যে, শিক্ষক কেন তাঁর বাড়িতে ‘হোম ভিজিট’ করেননি! এই ধরনের মনোভাব কেবল অযৌক্তিক নয়, বরং একজন শিক্ষকের আত্মসম্মান ও শিক্ষকতা পেশার প্রতি চরম অবমাননাকর। একজন সন্তান কেন ৫ দিন বিদ্যালয়ে গেল না, তা জানার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব অভিভাবকের। সন্তান সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে স্কুলে যাচ্ছে কি না, অথবা অসুস্থ থাকলে বিদ্যালয়ে তা জানানো অভিভাবকের নৈতিক ও মৌলিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। নিজের সন্তান কোথায় আছে, কী করছে—সেই খোঁজ না রেখে পাঁচ দিন পর স্কুলে এসে শিক্ষককে অভিযুক্ত করা অভিভাবকের চরম গাফিলতি ও উদাসীনতাকেই প্রকাশ করে। এমন মনোভাব কেবল দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও সুবিধাবাদী অভিভাবকত্ব প্রকাশ পায়।
শিক্ষক হলেন একজন পাঠদানকারী ও পথপ্রদর্শক, তিনি কোনো সার্বক্ষণিক পারিবারিক নজরদারি কর্মকর্তা নন। একজন শিক্ষকের পক্ষে শ্রেণিকক্ষের বহু শিক্ষার্থীকে সামলানোর পর প্রতিটি অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেওয়া বাস্তবে অসম্ভব ও অবাস্তব একটি প্রত্যাশা। নিজের অভিভাবকত্বের ব্যর্থতা লুকাতে শিক্ষকের ওপর দায় চাপানোর এই অপচেষ্টা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এ যেন নিজের ঘরের চাবি হারিয়ে প্রতিবেশীকে দোষ দেওয়ার মতো হাস্যকর ও লজ্জাজনক আচরণ! বাংলাদেশে অভিভাবকরা প্রায়ই নিজেদের ভুল ঢাকা বা শিক্ষককে অযথা হেনস্থা করার সুযোগ পান। কিন্তু যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার দেশে এই ধরনের আচরণ ও গাফিলতি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। সন্তান টানা ৫ দিন বিনানুমতিতে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সরাসরি স্থানীয় কাউন্সিলকে অবহিত করে। অভিভাবককে কোনো ছাড় না দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানা করা হয়।
সাধারণত প্রতি শিশুর জন্য £৮০ থেকে £১৬০ পর্যন্ত জরিমানা করা হয়। শিক্ষার অধিকার থেকে সন্তানকে বঞ্চিত করার অপরাধে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে ওই অভিভাবকের সর্বোচ্চ £২,৫০০ (প্রায় ৩ লক্ষাধিক টাকা) পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। অথবা ৩ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। শিক্ষকের সঙ্গে অসদাচরণের শাস্তি
যুক্তরাজ্যে শিক্ষকদের ওপর অন্যায়ভাবে চড়াও হওয়া বা মিথ্যা অভিযোগ তোলার কোনো সুযোগ নেই। শিক্ষক বা স্কুল স্টাফদের সাথে অশালীন আচরণ করলে ওই অভিভাবককে স্কুলে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, এমনকি এটি 'Anti-social Behavior' হিসেবে গণ্য করে পুলিশের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
আপনি আশা করবেন উন্নত দেশের শিক্ষা আর শিক্ষকদের সাথে আচরণ করবেন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের চেয়েও খারাপ। শিক্ষকদের সাথে অভিভাবকদের আচরণ হবে অভিযুক্ত কর, ধর -মার, লাঞ্চিত কর। তা কেবল হাস্যকর।
শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি গড়ে ওঠে পরিবার থেকেই। অভিভাবক যখন নিজের সন্তানকে নিয়মানুবর্তিতা শেখানোর বদলে নিজের গাফিলতির দায় শিক্ষকের ওপর চাপান, তখন তিনি কেবল শিক্ষককেই অপমান করেন না, বরং নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎকেও হুমকির মুখে ঠেলে দেন।
শিক্ষকদের সম্মান বজায় রাখা এবং নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রতিটি অভিভাবকের আবশ্যিক কর্তব্য। যুক্তরাজ্যের মতো আমাদের সমাজেও যদি দায়িত্বজ্ঞানহীন অভিভাবকত্বের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ ও আইনের প্রয়োগ থাকত, তবে শিক্ষকরা এমন অযৌক্তিক ক্ষোভ ও হেনস্থার শিকার হতেন না। শিক্ষামন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এ ব্যাপারে যত্নশীল হবেন আশা।
১
১ মন্তব্য