প্রভাষক
৩১ জুলাই, ২০২৬ ০৯:১০ অপরাহ্ণ
‘বর্গী এলো দেশে’—কারা এই বর্গী
‘খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো/ বর্গী এলো দেশে/ বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/ খাজনা দেবো কিসে…’—এই ছড়াটি আজো অনেক বাড়িতে শিশুদের উৎসুক চোখে ঘুম আনতে সুর করে পড়া হয়। তবে বড় হওয়ার পর অনেকেই ভুলে যায় সেই ঘুম-পাড়ানী ছড়ার কথাগুলো।
কিন্তু, অবচেতন মনে থেকে যায় একটি শব্দ—‘বর্গী’।
ইরান: পারস্য সাম্রাজ্যের গর্বিত উত্তরাধিকার
আরও পড়ুন
ইরান: পারস্য সাম্রাজ্যের গর্বিত উত্তরাধিকার
এখন অনেককেই ‘বর্গী কারা?’—এমন প্রশ্ন করলে সঠিক জবাব পাওয়া যায় না।
তবে বর্গী বলতে যে ‘ভয় জাগানো’ কোনো গোষ্ঠীকে বোঝায় তা সবাই বুঝতে পারেন। তারা বুঝতে পারেন যে— শিশুদের ঘুম পাড়ানো ছড়ায় তুলে ধরা হয় এক ‘ঘুম ওড়ানো নৃশংসতার’ ইতিহাস।
আজকাল যে কোনো অজানা বিষয়ের জবাব পেতে প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হয় এআইয়ের কাছে। এমন বাস্তবতায় ‘এআই মোড’ সূত্রে জানা গেল—‘বর্গী হলো অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলায় আক্রমণ ও লুণ্ঠনকারী মারাঠা অশ্বারোহী সৈন্যদল।’
শব্দটির উৎপত্তি সম্পর্কে জানা যায়—ফারসি ‘বার’ (অর্থ: বোঝা বা ভার) ও ‘গীর’ (অর্থ: গ্রহণকারী বা বহনকারী) শব্দযুগল থেকে এসেছে ‘বারগীর’।
ইনফোগ্রাফিক
রসদ বহনকারী অশ্বারোহীদের বোঝাতে ‘বারগীর’ শব্দটি মোঘল সেনাবাহিনীতে ব্যবহার করা হতো।
শব্দটি মারাঠা বাহিনীতে ব্যবহৃত হতো ‘নিয়োগকর্তার দেওয়া ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করা সৈনিককে’ বোঝাতে।
ঐতিহাসিক সূত্রগুলো বলছে—মারাঠা বাহিনীর সাধারণ সেনাদের একটি অংশকে ‘বরগীর’ বলা হতো। শাসকরা তাদের অস্ত্র ও ঘোড়া দিত। যাদের নিজেদের ঘোড়া ও অস্ত্র থাকতো তারা ‘শিলেদার’ হিসেবে পরিচিত।
২০২৫ সালের ২ মার্চ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) বা সিপিআই (এম) এর পশ্চিমবঙ্গ কমিটির বাংলায় প্রকাশিত মুখপত্র ‘গণশক্তি’র-‘মারাঠা বর্গী হামলা থেকে বাঁচাতে খাল কাটা হয়েছিল কলকাতা ঘিরে’ প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়—মারাঠা সেনাবাহিনীতে শিলেদারদের পদগত অবস্থান ছিল বর্গীদের নিচে।
এ ছাড়া, শিলেদারদের সংখ্যা বর্গীদের তুলনায় কম ছিল বলেও প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়।
তবে অধিকাংশ গবেষকের মত—ফারসি ‘বারগীর’ শব্দটি পরবর্তীতে বাংলায় পরিবর্তিত হয়ে ‘বর্গী’ রূপ নিয়েছে।
কেউ কেউ এই শব্দটির সঙ্গে মারাঠি ভাষার যোগসূত্রের কথাও উল্লেখ করেন।
জানা যায়, ১৭৪২ সালে বাংলায় মারাঠা বা বর্গীদের সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে কলকাতা শহরকে সুরক্ষিত রাখতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরিকল্পনা অনুসারে প্রায় ৩ মাইল দীর্ঘ একটি পরিখা বা খাল খনন করা হয়েছিল।
ইতিহাসে এটি ‘মারাঠা ডিচ’ নামে পরিচিত।
গবেষকরা বলছেন, শেষমেশ বর্গীরা কলকাতায় হামলা না করায় সেখানকার বাসিন্দাদের শ্রমে তৈরি সেই পরিখাটি আর পরিকল্পনা-মাফিক কাটা হয়নি। তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেই পরিখার মাটির ঢিবির ওপর গড়ে উঠে সার্কুলার রোড।
পরে সেই পরিখা ভরাট করা হয়। আজকের কলকাতার ‘মারাঠা ডিচ লেন’ ও খালের খানিক অংশ এখনো বর্গী হামলাকারীদের ইতিহাস বহন করে চলেছে।
একজন মালিক আম্বর ও ভাস্কর পণ্ডিত
বর্গী ও বাংলায় বর্গী হামলার প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে ভারতের আজকের মহারাষ্ট্র রাজ্যের তৎকালীন আহমেদনগরের মোঘলবিরোধী সেনাপতি মালিক আম্বর ও বর্গী দস্যুদের প্রধান ভাস্কর পণ্ডিত সম্পর্কে একটু আলোচনা করা যেতে পারে।
সেই আহমেদনগরের নাম বদলিয়ে এখন ‘অহল্যানগর’ করা হয়েছে।
২০২০ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রকাশিত তুরস্কের সরকারি সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘মালিক আম্বর: ইথিওপীয় দাস যিনি ভারতে রাজা-তৈরির কুশীলব হয়ে উঠেছিলেন।’
আহমেদনগরের মোঘলবিরোধী সেনাপতি মালিক আম্বর।
এতে বলা হয়, ১৬ শতকের কোনো এক সময়ে দাস ব্যবসায়ীদের হাতে বন্দি ইথিওপিয়ার হাজারো মানুষের সঙ্গে বন্দি হোন আম্বর। পরে তাকে মধ্যপ্রাচ্যে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
কয়েক দশক পর আম্বর নানা হাত বদলে ভারতে আসেন। নিজের প্রতিভা গুণে সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রতিষ্ঠিত হোন। তিনি এক সময় মোঘলদের ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছিলেন।
হুসাইন তার দাস আম্বরের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাকে প্রশাসন ও হিসাবনিকাশে পারদর্শী করে তোলেন।
আম্বর ২২ বছর বয়সে আসেন দক্ষিণ ভারতের সুলতান নিজাম শাহীর আহমেদনগরে। ১৬০০ সালে আম্বর গুরুত্বপূর্ণ সেনানায়ক হয়ে উঠেন। তার দক্ষতায় ১৬০১ সালে দিল্লির মোঘল সম্রাট আকবরের বিশাল বাহিনী আহমেদনগর আক্রমণ করে ব্যর্থ হয়।
আম্বরের রণকৌশলের কারণে পরে আকবরের ছেলে জাহাঙ্গীরও আহমেদনগরে হামলা চালিয়ে পরাজিত হোন।
১৬২৬ সালে আম্বর মারা যান। মহারাষ্ট্রে আজো তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
গত ২৯ মে ভারতের ‘টাইম অ্যান্ড টাইড’ পডকাস্টে ইতিহাস গবেষক দীপাঞ্জন ঘোষ জানান, মালিক আম্বর অল্প সংখ্যক সৈনিক নিয়ে ছোট ছোট বাহিনী করে বিশাল মোঘল বাহিনীকে আচমকা আক্রমণ করে দ্রুত পালিয়ে যেতেন। তার এমন গেরিলা হামলায় মোঘলরা বারবার পরাস্ত হয়।
ভারতের খুলদাবাদে মালিক আম্বরের সমাধি। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
ভারতের মহারাষ্ট্রের খুলদাবাদে মালিক আম্বরের সমাধি। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
সেই রণকৌশল পরবর্তীতে মারাঠা বাহিনী গ্রহণ করে। সেই সব ছোট ছোট বাহিনীর সৈনিকরা ‘বারগীর’ নামে পরিচিত ছিল। পরে সেই বাহিনী একই কৌশলে বাংলায় হামলা চালায়। তারা বাংলায় ‘বর্গী’ নামে পরিচিত হয়।
এখন আসা যাক বর্গী দস্যুদের নেতা ভাস্কর পণ্ডিত প্রসঙ্গে।
২০১৪ সালের ১ অক্টোবর ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘ভাস্কর পণ্ডিতের পুজো সাক্ষ্য দিচ্ছে ভাঙা প্রাচীর’।
দাঁইহাট শহর পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়ার কাছে ভাগীরথী নদীর তীরে একটি প্রাচীন জনপদ। কাঁসা-পিতল ও হস্তশিল্পের জন্য এই শহরের খ্যাতি আছে।
বর্গীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যা-লুটের অভিযোগের পাশাপাশি ধর্মপ্রতিষ্ঠান বিশেষ করে হিন্দু মন্দিরে হামলার অভিযোগ আছে। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁইহাটে বর্গী দস্যুদের প্রধান ভাস্কর পণ্ডিতের দুর্গা পূজায় অংশগ্রহণের কথাও বলা হয়।
প্রতিবেদন অনুসারে, প্রায় ১২০ বর্গফুটের একটা ভাঙা পাঁচিল ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। আড়াই শ বছরের পুরোনো সেই পাঁচিলের সঙ্গে দুর্গা পূজার ইতিহাসও জড়িয়ে আছে।
এতে আরও বলা হয়, ‘এলাকার প্রবীণদের দাবি, ভাঙা পাঁচিলটি বাংলায় বর্গী হামলার অন্যতম নিদর্শন। মারাঠা দস্যু ভাস্কর পণ্ডিতের হাতে শুরু হয়েছিল এই পুজো। তারপর থেকে দাঁইহাটের সমাজবাটি পাড়ার ওই দুর্গা পুজো ভাস্কর পণ্ডিতের পুজো বলে খ্যাত।’ দীর্ঘ বছর ধরে সমাজবাটি পাড়ার বাসিন্দারা ওই ভাঙা পাঁচিলকে ঘিরেই দুর্গাপূজা করে আসছেন।
ভাঙা পাঁচিলের গায়েই দুর্গামণ্ডপ। নিজস্ব চিত্র।
সেই ভাঙা প্রাচীর। ছবি: সংগৃহীত
স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও দাঁইহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক স্বপনকুমার ঠাকুর সংবাদমাধ্যমটিকে জানান, ১৭৪২ সালের এপ্রিলে চৌথ বা কর আদায়ের উদ্দেশে ২২ জন মারাঠা সরদার ও ২০ হাজার বর্গী সেনা সুবে বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের দিকে রওনা দেন। নবাব আলিবর্দী খান ওড়িশার বিদ্রোহ দমন করে বর্ধমানের রানিসায়রের কাছে তাঁবু খাটিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সেই সময় গোপনে ভাস্কর পণ্ডিত হামলা চালান।
তিনি আরও জানান, নবাব আলিবর্দী ৩ দিন অবরুদ্ধ থাকার পর কাটোয়া হয়ে মুর্শিদাবাদে চলে যান। সেই সময় দাঁইহাটে ঘাঁটি গেড়ে রাঢ়বঙ্গে তথা বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক লুটপাট করে ভাস্কর পণ্ডিতের বর্গী সেনারা।
স্থানীয় ইতিহাসবিদের ভাষ্য—বর্ধমানের মহারাজা গঙ্গাস্নানের জন্য দাঁইহাটে গঙ্গার তীরে বাড়ি বানিয়েছিলেন। দস্যুপ্রধান ভাস্কর পণ্ডিত সেই বাড়ি দখল করে নিয়েছিলেন।
আনন্দবাজারের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়—‘কথিত আছে, বর্গী হামলার ওই নায়ক ভেবেছিলেন দুর্গাপুজো ও দশেরা উৎসব একসঙ্গে হবে। সে জন্যই বর্ধমানের মহারাজাদের ওই বাড়িতে দুর্গোৎসব শুরু করেন তিনি। কিন্তু, নবমীর দিন আলিবর্দী খানের দলবল নদীয়ার প্রান্ত থেকে কামানের গোলা দাগাতে আরম্ভ করে। শাঁখাই ঘাট পেরিয়ে অতর্কিত আক্রমণ চালান নবাব। আর তাতেই দিশেহারা হয়ে পুজো ছেড়ে পালিয়ে যান ওই মারাঠি দস্যু।’
বাংলার নবাব নবাব আলিবর্দী খান।
বাংলার নবাব নবাব আলিবর্দী খান। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স
তবে পডকাস্টার দীপাঞ্জন ঘোষ বলেন, ভাস্কর পণ্ডিতকে ধরার জন্য আলিবর্দী খানের সেই হামলাটি হয়েছিল অষ্টমীতে।
তার মতে, মালিক আম্বরের রণকৌশল পরবর্তী শতকগুলোয় মারাঠা সেনারা মেনে চলেছে এবং তা আরও নিখুঁত করেছে। সেই রণকৌশল অনুসরণ করে মারাঠারা আরও দুর্ধর্ষ ও অপরাজেয় হয়ে উঠে। তারা মোঘল সেনাদের বিপর্যস্ত করার পাশাপাশি মোঘল রণকৌশল মেনে চলা বাংলার নবাবের বাহিনীকেও অস্থির করে তুলেছিল।
নবাব আলিবর্দী খান ও একদল বর্গী
ব্রিটিশ ও ব্রিটিশ-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে মারাঠাদের, বিশেষ করে মারাঠাশ্রেষ্ঠ ছত্রপতি শিবাজী মহারাজার বন্দনা করা হলেও বাংলাপিডিয়ার ‘মারাঠা হামলা’ অংশে বলা হয়—‘আঠারো শতকে বাংলায় মারাঠারা এক অভিশাপরূপে আবির্ভূত হয়। তারা সারাদেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং জনজীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা।’
১৪
২৪ মন্তব্য