Loading..

ব্লগ

রিসেট

০১ আগস্ট, ২০২৬ ০৭:২৩ পূর্বাহ্ণ

সম্পদ বেশি হওয়া নিজে সম্মানের কারণ নয়।

                                              সম্পদ বেশি হওয়া নিজে সম্মানের কারণ নয়।

 

ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদ বেশি হওয়া নিজে সম্মানের কারণ নয়। সম্মানের প্রকৃত মাপকাঠি হলো ঈমান, তাকওয়া, সৎকর্ম ও আল্লাহর আনুগত্য। ধনী হওয়া আল্লাহর একটি নিয়ামত হতে পারে, আবার এটি কঠিন পরীক্ষাও হতে পারে। একইভাবে দরিদ্রতাও পরীক্ষা হতে পারে।

কুরআনের আলোকে

১. সম্মানের প্রকৃত মানদণ্ড তাকওয়া

"নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।"
(
সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১৩)

এ আয়াত স্পষ্ট করে যে, বংশ, ধন-সম্পদ বা পদমর্যাদা নয়, বরং তাকওয়াই সম্মানের ভিত্তি।

২. ধন-সম্পদ মর্যাদার প্রমাণ নয়

"তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করবে না; তবে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তারা ব্যতিক্রম।"
(
সূরা সাবা ৩৪:৩৭)

৩. সম্পদ পরীক্ষা

"তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষা।"
(
সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:১৫)

৪. সম্পদের অহংকার ধ্বংস ডেকে আনে
কারূন বলেছিল,

"এ সম্পদ আমি আমার জ্ঞানের কারণেই পেয়েছি।"
(
সূরা আল-কাসাস ২৮:৭৮)

অতঃপর আল্লাহ তাকে তার ধন-সম্পদসহ ভূগর্ভে ধসিয়ে দেন।

 

হাদিসের আলোকে

১. আল্লাহ বাহ্যিক সম্পদ দেখেন না
রাসূল বলেছেন:

"আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।"
সহিহ মুসলিম

২. প্রকৃত সম্পদ

"প্রকৃত ধনবান সে নয় যার সম্পদ বেশি; প্রকৃত ধনী সে, যার অন্তর ধনী।"
সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম

৩. কিয়ামতের দিন সম্পদের হিসাব

"বান্দার পা নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে তার সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।"
তিরমিজি

 

সম্পদ নিয়ে ১০টি ঘটনা

১. কারূনের ঘটনা

কারূন ছিল অঢেল সম্পদের মালিক। সে সম্পদের অহংকারে আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাকে ধন-সম্পদসহ মাটিতে ধসিয়ে দেন। এটি প্রমাণ করে যে ধন সম্মানের নিশ্চয়তা নয়।

২. ফিরআউনের রাজত্ব

ফিরআউনের ছিল বিশাল সাম্রাজ্য ও সম্পদ। কিন্তু অহংকার ও কুফরের কারণে সে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্টদের একজন হয়ে যায় এবং সাগরে ডুবে মারা যায়।

৩. নবী সুলাইমান (আ.)-এর সম্পদ

আল্লাহ তাঁকে বিপুল রাজত্ব ও সম্পদ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কখনো অহংকার করেননি। বরং বলতেন,

"এটি আমার রবের অনুগ্রহ, তিনি আমাকে পরীক্ষা করছেন।"
(
সূরা আন-নামল ২৭:৪০)

এটি দেখায়, সম্পদ থাকলেও বিনয়ী হলে তা কল্যাণকর।

৪. রাসূল -এর জীবন

ইচ্ছা করলে আল্লাহ তাঁকে পাহাড়সম সোনা দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করেছেন। কখনো কখনো তাঁর ঘরে কয়েকদিন চুলা জ্বলত না।

৫. আবু বকর (রা.)

তিনি ছিলেন ধনী সাহাবি। নিজের সম্পদ ইসলামের পথে ব্যয় করেছেন। তাবুক অভিযানে প্রায় সব সম্পদ দান করেছিলেন। তাঁর সম্মান এসেছে ঈমান ও ত্যাগের কারণে।

৬. উসমান (রা.)

তিনি ছিলেন ধনী ব্যবসায়ী। তাবুক যুদ্ধে শত শত উট ও বিপুল অর্থ দান করেন। তাঁর সম্পদ তাঁকে সম্মানিত করেনি; বরং সম্পদের সঠিক ব্যবহার তাঁকে মর্যাদাবান করেছে।

৭. আবু লাহাব

সে ছিল কুরাইশের প্রভাবশালী ও ধনী ব্যক্তি। কিন্তু ইসলামবিরোধিতার কারণে কুরআনে তার ধ্বংসের ঘোষণা এসেছে (সূরা আল-মাসাদ)। তার সম্পদ তাকে রক্ষা করতে পারেনি।

৮. বিলাল (রা.)

তিনি ছিলেন দরিদ্র এবং একসময় দাস। কিন্তু ঈমানের দৃঢ়তার কারণে তিনি ইসলামের অন্যতম সম্মানিত সাহাবি হন। রাসূল তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে বহু প্রশংসা করেছেন।

৯. আহলে সুফফা

মসজিদে নববীর পাশে বসবাসকারী দরিদ্র সাহাবিদের অনেকের কাছে পর্যাপ্ত খাবারও ছিল না। তবুও তারা আল্লাহর কাছে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন, কারণ তারা ইলম, ইবাদত ও দ্বীনের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

১০. তিন ব্যক্তির পরীক্ষা (অন্ধ, টাক ও কুষ্ঠরোগী)

রাসূল বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ তিনজনকে সম্পদ দিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন। তাদের মধ্যে একজন কৃতজ্ঞ ছিল, আর দুইজন অকৃতজ্ঞ হয়ে পূর্বের অবস্থা অস্বীকার করেছিল। শেষে আল্লাহ কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে সম্মানিত করেন এবং অকৃতজ্ঞদের নিয়ামত কেড়ে নেন।
(
সহিহ বুখারি)

উপসংহার

ইসলামের শিক্ষা হলো:

  • ধনী হওয়া পাপ নয়।

  • গরিব হওয়াও অসম্মানের বিষয় নয়।

  • সম্পদ আল্লাহর পরীক্ষা।

  • সম্পদ যদি তাকওয়া, দানশীলতা ও আল্লাহর আনুগত্যে ব্যবহৃত হয়, তবে তা কল্যাণের মাধ্যম।

  • কিন্তু সম্পদের অহংকার মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।

সুতরাং, ইসলামের দৃষ্টিতে সম্মানের আসল মানদণ্ড হলো তাকওয়া ও সৎকর্ম, সম্পদের পরিমাণ নয়। আল্লাহ বলেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।"
(
সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩)

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ