প্রভাষক
০৩ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৩২ অপরাহ্ণ
সুন্দরবনের প্রাণীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে
সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের একটি নদী পার হওয়ার সময় দেখা মেলে দুই বাঘ শাবকের। গত ১৫ জুলাই বিকেলে।
সুন্দরবনে পাঁচটি এলাকায় গত জুলাইয়ে আটটি বাঘের দেখা মিলেছে। হরিণও হাঁটতে দেখা গেছে ঝাঁকে ঝাঁকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টানা দুই মাস বনে সব ধরনের বনজীবী ও পর্যটকের প্রবেশ বন্ধ থাকায় বন্যপ্রাণীদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এ কারণে প্রাণীর বিচরণ ক্ষেত্র বেড়েছে।
২০২৪ সালে বন বিভাগের সর্বশেষ জরিপ বলছে, সুন্দরবনে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে ১২৫টি। আগের বছর ২০২৩ সালে বন বিভাগ ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) জরিপে সুন্দরবনে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টি হরিণ আছে বলে উল্লেখ করা হয়। সুন্দরবনে হরিণের দেখা মিললেও বাঘ সচরাচর দেখা যায় না। এক মাসে এত বাঘ দেখতে পেয়ে বনকর্মীরা উচ্ছ্বসিত।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দুই মাস ‘বনে প্রবেশ বন্ধ’ এবং আষাঢ়-শ্রাবণের পর্যাপ্ত বৃষ্টিতে প্রাণ ফিরেছে প্রকৃতিতে। উজানের নদনদী থেকে আসা বৃষ্টির পানিতে দূর হয়েছে বনের নদী ও খালের লবণাক্ততা। এমন নিস্তব্ধ ও রঙিন পরিবেশে স্বস্তি ফিরেছে বাঘ, হরিণসহ প্রাণিকুলে। স্বাভাবিক বিচরণ করতে দেখা যাচ্ছে তাদের। যা ধরা পড়ছে বনরক্ষী ও বনে স্থাপিত বিভিন্ন ক্যামেরায়।
গত জুলাইয়ে অন্তত পাঁচটি বাঘকে বনের বিভিন্ন স্থানে হেঁটে বেড়াতে বা নদীতে সাঁতরে পার হতে দেখেছেন বনকর্মীরা। ক্যামেরায় ধরা পড়েছে তিনটি বাঘ। এর মধ্যে ১৫ জুলাই বিকেল ৫টা ২১ মিনিটে সুন্দরবন রেঞ্জে একসঙ্গে তিনটি বাঘকে নদী পার হতে দেখেন টহল টিমে থাকা বনকর্মীরা। এর মধ্যে দুটি ছিল বাঘ শাবক।
এর ৯ দিন পরে গত ২৪ জুলাই আন্ধারমানিক বন কার্যালয়ে একটি বাঘকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র থেকে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, নদীপারের দক্ষিণ দিক থেকে এসে বাঘটি কিছুক্ষণ থামে। চারপাশে দেখে আবার উত্তরদিকের জঙ্গলে ঢুকে পড়ে। এটি ছিল পূর্ণবয়স্ক বাঘিনি।
২৬ জুলাই শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্য কেন্দ্রের টাইগার পয়েন্টের পাশে সাঁতার কেটে নদী পার হতে দেখা যায় আরেকটি বাঘ। এরই মধ্যে সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ক্যামেরায় বাঘের ছবি ধারণ করা সাইফুর বলেন, বাঘ দেখার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
সম্প্রতি আন্ধারমানিক ও হাড়বাড়িয়া এলাকায় বনের মধ্যে ক্যামেরা সংযোজন করেছে বন বিভাগ। হরিণ শিকারির ফাঁদে পড়ে অসুস্থ বাঘিনিকে সুস্থ করে বনে ফিরিয়ে দেওয়ার পর তার গতিবিধি নজরে আনতেই এই প্রচেষ্টা। গত ১৩ জুলাই ক্যামেরা স্থাপনের পর ১৪ ও ২৪ জুলাই সেখানে তিনটি বাঘ দেখা গেছে।
বন বিভাগ যা বলছে
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, জুন থেকে আগস্ট– এই তিন মাস সুন্দরবনের নদী-খালের মাছের প্রজনন মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। এ ছাড়া এই সময় বন্যপ্রাণীদেরও প্রজনন মৌসুম। তিন মাস বনে প্রবেশ বন্ধ রাখতে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছিল। ২০২০ সালের ২৮ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা জারি হয়। ২০২১ সালের ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশ বন্ধ থাকে। এবারও বন্ধ রয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বনের যে স্থানে হরিণ বেশি থাকবে, সেখানে বাঘও থাকবে। গত এক বছরে বনে ফুট ট্রেইল (হেঁটে বন পাহারার ব্যবস্থা) বাড়ানোয় বিপুল পরিমাণ হরিণ শিকারের ফাঁদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মালা ফাঁদই উদ্ধার হয়েছে এক লাখ ১৪ হাজার ফুট। হরিণের চলাচল বাড়ায় বাঘের বিচরণও বেড়েছে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, বন্যপ্রাণীরা মানুষ থেকে দূরে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। মানুষের কোলাহল, নৌযানের শব্দ– এসব কারণে প্রাণীরা আড়ালে চলে যায়। দুই মাস বনের ভেতরে পর্যটক, লঞ্চ, বনজীবীদের প্রবেশ বন্ধ থাকায় তাদের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তিবোধ হচ্ছে। এজন্য দৃশ্যমান জায়গায় প্রাণীদের দেখা মিলছে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. এম এ আজিজ বলেন, দীর্ঘদিন বন বন্ধ থাকায় এর বাহ্যিক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে বনকে বিশ্রাম দিতে হবে। একটি নির্দিষ্ট সময় সুন্দরবন বন্ধ রাখা অব্যাহত রাখতে হবে।
করোনা অতিমারির উদাহরণ টেনে এই প্রাণী বিশেষজ্ঞ বলেন, ওই সময় সুন্দরবনসহ সারাবিশ্বেই বন্যপ্রাণীর সংখ্যা ও বিচরণ বেড়ে গিয়েছিল। এজন্য বর্ষাকালসহ নির্দিষ্ট কয়েক মাস বনে মানুষের প্রবেশ বন্ধের পরামর্শ দেওয়া হয়।
বাঘ বিশেষজ্ঞ ও গবেষক খসরু চৌধুরী বলেন, বনে বাঘের বিচরণ স্বাভাবিক বিষয়। নানা কারণে বাঘ তার আবাস এলাকা পরিবর্তন করে। দেখা যায়, বাচ্চা বাঘগুলো বড় হলে মা তাদের নিজের এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেয়, তখন তারা নিজেদের জন্য নতুন আবাস এলাকা খুঁজতে বের হয়। বয়স বেড়ে গেলে বাঘ অন্য শক্তিশালী বাঘের সঙ্গে লড়াইয়ে হেরে যায় এবং টিকে থাকার জন্য কম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বা নতুন এলাকা বেছে নেয়। আবার শিকারের পরিমাণ কমে গেলে বাঘ খাবারের খোঁজে অন্য এলাকায় যায়। আগে বন বিভাগের কাছে আধুনিক নৌযান ও ক্যামেরা ছিল না। এখন সুযোগ-সুবিধা বাড়ায় দ্রুত তা সামাজিক মাধ্যমে চলে আসছে।
তিনি বলেন, বনে বাঘসহ সব প্রাণীর স্বস্তিদায়ক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সুন্দরবনের আশপাশে বসবাসকারী গ্রামবাসীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। যাতে তারা বনে যাওয়া বন্ধ করে।
৭
৬ মন্তব্য