সহকারী শিক্ষক
০৫ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:১১ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
"না বলতে শেখার ইতিহাস"
বাঙালি জাতির আত্মজাগরণের ঐতিহাসিক কাব্য
লেখক: মোস্তাফিজুর রহমান (কবি ও শিক্ষক)
তারিখ: ২১-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০১
পলাশীর প্রান্তর জুড়ে নামে আজ সন্ধ্যার ছায়া, ভাগীরথীর বুকে কাঁপে বিজয়ী সেনার কায়া। মীরজাফরের চক্রান্তে বিক্রী হলো বাংলার মাটি, স্বাধীনতার সূর্য সেদিন হারিয়ে গেল খাটি। বাংলার কপাল পুড়ল সেদিন মীরজাফরী কুহকে, শৃঙ্খল পায়ে জড়িয়ে গেল পরাধীনতার দুখে। সেদিন থেকেই শুরু হলো বঞ্চনার এক ইতিহাস, গুমরে মরল এ জনপদের হাজারো মানুষের শ্বাস।
সে বঞ্চনার রেশ ধরে চলে শতবর্ষের পালা, বাংলার বুকে পরানো হয় গোলামির কালো মালা। ব্রিটিশ এল বণিক সেজে, লুটে নিল সোনার ফসল, শুকিয়ে গেল সুজলা-সুফলা জনপদের সব অংশল। ৪৭-এর দেশভাগ এল দ্বিজাতিতত্ত্বের ধোঁয়া নিয়ে, ভাবল মানুষ মুক্তি মিলবে নতুন আশা দিয়ে। কিন্তু হায়! সে তো ছিল শোষণেরই অন্য রূপ, পূর্ব বাংলায় নেমে এল এক ভীষণ গুমোট কূপ।
পশ্চিম থেকে সুদূর মায়ায় রচে জাল সুনিপুণ, বাঙালির বুকে চেপে বসে শোষণের কালো গুণ। শতবর্ষী মা চেয়ে থাকে দূর আকাশের পানে, তার খোকা আজও ফেরেনি তো সেই পুরোনো টানে। পলাশী থেকে বাংলাদেশ এই যে দীর্ঘ এক পথ, তার প্রতিটি বাঁকে লেখা রয়েছে বেদনার রথ। সে রথ আজও বয়ে চলে ট্র্যাজেডির করুণ সুর, পলাশীর সেই শেষ বিকেল এখনো রয়েছে বহুদূর।
তারিখ: ২০-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০২
মাটির কুটিরে বসে এক বৃদ্ধা শতবর্ষী নারী, চোখের কোণে জমিয়ে রেখেছে শ্রাবণের বারি। তার একমাত্র খোকা গেছে দূরের সেই মিছিলে, ফিরবে বলে কথা দিয়েছিল ফাল্গুনের এইিলে। কত বসন্ত এল গেল, খোকা এলো না তো ঘরে, মায়ের দীর্ঘশ্বাস কেবল ঝরে পড়ার ঝরে। সে জানে না তার খোকা আটকে গেছে কোথায়, মাতৃভাষার মিছিলে সে কি হারিয়ে গেছে মোথায়?
বুকভাঙ্গা কান্নায় মা খোদার কাছে হাত তোলে, আমার খোকা কেমন আছে কষ্টের ওই দোলে? খবর আসে দূর হতে, দেশ নাকি হয়েছে স্বাধীন, তবে কেন মা হারাল তার ঘরে ফেরার দিন? দেশভাগের এই চক্রান্তে খোকা হলো যে হারা, মায়ের রাতের আকাশে আজ জ্বলে না ধ্রুবতারা। সে কেবল চেয়ে থাকে পথের ওই বাঁকটার পানে, কোন ঠিকানায় বন্দি খোকা, কে তা ভালো জানে?
শতবর্ষী মায়ের বুকে পাথরচাপা কান্না জমে, সে প্রতীক্ষা ফুরোয় না কোনো ক্ষণে কোনো সময়ে। খোকার ফেরার পথ চেয়ে চোখ দুটো যায় যে অন্ধ হয়ে, বর্বরতার থাবা বসে মায়ের সোনার বুকটা খয়ে। তবু মা তো থামে না, সেজে থাকে পথ চেয়ে রোজ, কোনো দিন কি মিলবে খোকার জীবিত কোনো খোঁজ? এই প্রতীক্ষার প্রহর গোনা এক বিশাল ইতিহাস, যেখানে লুকিয়ে আছে একটি মায়ের দীর্ঘশ্বাস।
তারিখ: ১৯-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০৩
রেডক্লিফের আঁচড় টানিয়া মানচিত্র হলো খণ্ড, ধর্মের নামে বুনল তারা বৈরিতা ও দণ্ড। দুই হাজার মাইলের ব্যবধানে বেঁধে দিল সীমানা, বাঙালির ভাগ্যে জুটল শুধু দুঃখ আর যাতনা। মানচিত্রের এই ভুল দাগে ছিন্ন হলো প্রাণ, বাংলার মাঠে বেজে উঠল কান্নার অবসানহীন গান। পশ্চিমের শাসকেরা বসল সিংহাসনে গেঁড়ে, পূর্ব বাংলার রক্ত শুষে নিতে বাহু দিল বাড়িয়ে।
মানচিত্রের রঙ পাল্টে গেল এক রাতের কৃপায়, স্বাধীনতার মিষ্টি হাওয়ায় লুকিয়ে ছিল বিষের থলায়। পূর্ব বাংলার খোকাগুলো বুঝল না তো তখন, কী ভয়ানক ফাঁদ পেতেছে তাদের আপন ভূবন। মানচিত্রের দাগগুলো যেন তলোয়ারের কোপ, যেখানে খোকা আটকে গেছে পরাধীনতার লোপ। দুই দেশের মাঝে শুধু সমুদ্র আর বিশাল পাহাড়, শোষকদের লোভের থাবায় ভেঙে গেল অহংকার।
এই মানচিত্রের দাগ ধরে আজও বয় যে ধারা, যে ধারায় ভেসে গেছে কত মায়ের চোখের তারা। ভুলের দাগে জন্ম নেওয়া এই যে ভূখণ্ড খানি, তার দাম দিতে গিয়ে কত রক্ত যে দিল জানি। আজও সেই মানচিত্রের প্রতিটি কোণ বলে কথা, কীভাবে রচিত হয়েছিল আমাদের না বলার ব্যথা। রেডক্লিফের কলমের ওই অভিশপ্ত সেই কালি, আজো ডেকে আনে আমাদের মনে শঙ্কার আলি।
তারিখ: ১৮-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০৪
ঊনিশ শত সাতচল্লিশ এল লাল নিশান উড়িয়ে, মানুষ ভাবল ব্রিটিশ গেল বাঁধন গেল ভেঙে গুঁড়িয়ে। স্বাধীনতার মিষ্টি হাওয়া বইল চারিপাশে, সবাই তখন হাসল কেবল বাঁধভাঙা উল্লাসে। কিন্তু সে তো স্বাধীনতা নয়, এক ভুলের মায়া, নতুন করে চেপে বসল শোষকদের কালো ছায়া। ব্রিটিশ গেল পাকি এল, বদলাল শুধু খোলস, পূর্ব বাংলার কপালে জুটেছে কেবল পচন দোষ।
৪৭-এর সেই স্বাধীনতা ছিল এক বিরাট প্রহসন, শোষণের নতুন চাবুক নামল করে গর্জন। মায়ের খোকা ঘর ছেড়েছিল মুক্তির টানে তেড়ে, সে তো দেখল ভিন্ন রূপ শিকল পায়ে পেড়ে। ভাষার অধিকার কেড়ে নিতে রচল গভীর ষড়যন্ত্র, বর্বরতার মন্ত্র পড়ে খুলল শোষণের নতুন দ্বার তো। যে স্বাধীনতার স্বপ্নে মানুষ বুক বেঁধেছিল সেদিন, তা পরিণত হলো রাতের মতো ঘোর অন্ধকার দিন।
মিথ্যে সে স্বাধীনতার খোলস আজ উন্মোচিত, বাঙালির বুক চিরে হলো রক্তে রঞ্জিত। ৪৭ আমাদের দেয়নি তো কোনো পূর্ণাঙ্গ মুক্তি, বরং শিখিয়েছে নতুন করে রুখে দাঁড়াবার শক্তি। তাই সেদিনের সেই ধোঁকাবাজির অবসান ঘটাতে, খোকাদের নামতে হলো আবার রক্তঝরা রাজপথে। মিথ্যে স্বাধীনতার সেই জাল ছিঁড়ে ফেলার পণ, আজো আমাদের রক্তে আনে নতুন শিহরণ।
তারিখ: ১৭-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০৫
দুই হাজার মাইলের ব্যবধান মাঝখানে জল আর স্থল, এপারেতে দুঃখের নদী, ওপারেতে শোষকের দল। এত দূরে বসে তারা চালায় শাসনের ওই ছড়ি, আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চালায় বাঁকা দড়ি। কী অদ্ভুত এই শাসন প্রণালী, কী অদ্ভুত দেশ! এক দেশের অংশ হয়েও পরাধীনতার রেশ। পশ্চিম থেকে নির্দেশ আসে কী খাবো কী বলব, তাদের মতো না চললে জীবন করে দেবে দলবল।
দুই হাজার মাইলের দূর থেকে তারা করে শাসন, বাঙালির জীবনে নামিয়ে আনে ঘোর অমাবস্যা সন। সংস্কৃতিতে আঘাত হানে, আঘাত হানে মনে, ভাষার অমর সৌধ ভাঙে পিশাচের ওই গণে। খোকা ভাবে কেমন করে মানব এই অন্যায় কথা? এত দূরে থেকে তারা বোঝে না তো আমাদের ব্যথা। দূরত্বের ওই প্রাচীর গড়ে তুলেছে এক বিশাল ব্যবধান, যেখানে প্রতিধ্বনিত হয় কেবল শোষণের অবসান।
এই দুই হাজার মাইলের দূরত্ব আজ ভেঙে চুরমার, রক্ত দিয়ে মুছে দিয়েছি গোলামির সব অহংকার। দূরত্ব তো মনের মাঝে তৈরি হয় যখন, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ায় তখন। আজও সেই দূরত্বের ইতিহাস আমাদের শেখায় পাঠ, অন্যায়কে দূর করতে হবে মেটাতে হবে সব ঘাট। দুই হাজার মাইলের সেই অন্ধকারের কালো রাত, আজ আমাদের আলো এনে দিয়েছে হাতের হাত।
তারিখ: ১৬-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০৬
শোষণের নতুন নকশা আঁকে বসে ক্ষমতার মঞ্চে, কাগজ-কলমে বুনে চলে চক্রান্তের জাল সুবঞ্চে। তারা ভাবে বাঙালি তো দুর্বল অতি সহজ সরল, তাদের ওপর চাপিয়ে দেব উর্দুর ওই ভারী দল। অর্থনীতি থেকে শুরু করে সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে, বসিয়ে দিল শোষণের কাঁটা চরম এক দ্বন্দ্রে। শাসনতন্ত্রের নামে কেবল চলে চুরির খেলা, পূর্ব বাংলার বুক খালি করে কাটে তাদের বেলা।
নতুন নকশার পাতা উল্টে দেখে জনতা আজ, শোষকরা পরে আছে কত না সুন্দর মুখোশ সাজ। কিন্তু ভেতরের সেই পিশাচ রূপ আর ঢাকা রয় না, বাঙালির চোখে ধুলো দিয়ে বেশি দিন চলা হয় না। খোকা দেখল চক্রান্তের এই ভয়ংকর সব নকশা, মনে তার জন্ম নিল বিদ্রোহের প্রচণ্ড এক লক্ষ্যা। সে বুঝল চুপ করে আর থাকা যাবে না তো ঘরে, শোষণের এই বেড়াজাল ভাঙতে হবে বুক চিরে জোরে।
শোষণের সেই নকশা আজ ছাই হয়ে গেছে পুড়ে, বাঙালির রক্তে কেনা বিজয় গান বাজে দূরে দূরে। যারা ভেবেছিল নকশা এঁকে কব্জা করবে মাটি, তাদের সেই অহংকার আজ হয়েছে পুরোপুরি খাঁটি মাটি। নকশার পর নকশা এঁকে যারা ফাসাঁতে চায় দেশ, তাদের জন্য অপেক্ষা করে চরম এক করুণ শেষ। ইতিহাসের পাতায় তাই লেখা রয় সেই পরিণাম, শোষণের নকশা ভাঙার বীর বাঙালির মহান নাম।
তারিখ: ১৫-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০৭
অন্ধকারের শাসনতন্ত্র লিখে দিল তারা দূর থেকে, আমাদের অধিকারগুলো আটকে দিল শক্ত শিকে। আইনের নামে প্রহসন আর শোষণের হাতিয়ার, তৈরি হলো পূর্ব বাংলার মানুষের গলায় ফাঁসির দড়িয়ার। তারা বলে সব মানতে হবে যা বলবেন পশ্চিমের প্রভু, এর বাইরে কথা বললে রক্ষা পাবে না তো কভু। অন্ধকার সে শাসনতন্ত্রে নেই তো কোনো আলোর লেশ, নিদ্রাহীন রাতে কাঁদে এই হতভাগ্য জনদেশ।
খোকা দেখল সেই আইনের কালো কালো ধারা, যেখানে কেড়ে নেওয়া হয়েছে মায়ের ভাষার মরা। বলা হলো উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা মোদের, এই হুকুমে কেঁদে উঠল বাংলা মায়ের সব খোকাদের। অন্ধকার সে শাসনতন্ত্র আলোর মুখ দেখবে না কো, তার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে লাখো জনতার ওই থোলো। আইনের কাগজ ছিঁড়ে ফেলে রাজপথে নামে দল, শোষকদের সিংহাসন কাঁপিয়ে তোলে তাদের হলাহল।
অন্ধকারের সে দিনগুলো আজ পেছনে ফেলে আসা, সে শাসনতন্ত্র গুঁড়িয়ে দিয়ে জেগেছে নতুন আশা। আইন যদি অন্যায় হয়, মানবে না তা কেউ, বিক্ষোভের সেই আগুনে আজ জোয়ার উঠেছে ঢেউ। আজও সেই শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জারি, অন্যায়কে রুখে দিতে আমরা মোরা সবাই তারি। অন্ধকার ভেদ করে আজও সূর্য ওঠে নতুন ভোরে, অনুমতি ছাড়াই মোরা জিতি বুক চিরে জোর করে।
তারিখ: ১৪-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০৮
পূর্ব বাংলার ঘরে ঘরে সেদিন শুধুই বোবা কান্না, বুকের ভেতর লুকিয়ে ছিল অকথ্য এক যাতনা। মাতৃভাষায় কথা বলতে দেবে না এই কেমন নিয়ম? বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না, এ কেমন দয়াময় যম! পদ্মা-মেঘনা-যমুনার জল ধুয়ে নেয় কত না শোক, কান্নাভেজা দিনে আজ অন্ধকার নামে চারোলোক। বাঙালির মুখ চেপে ধরে পশ্চিমা সেই নরপিশাচ দল, চোখের জলে ভিজে ওঠে এ মাটির সবুজ তলতল।
সেই বোবা কান্না আর বেশি দিন রইল না তো বোবা, প্রতিবাদের রূপ নিয়ে তা হয়ে উঠল ভীষণ শোভা। কান্না যখন ক্ষোভে রূপ নেয়, ধরে তখন রূদ্র মূর্তি, শোষকদের মসনদ তখন হারায় তাদের সব স্ফূর্তি। খোকা তার মায়ের চোখের জল মুছে দিয়ে বলে— আর নয় এই কান্না, এবার আগুন জ্বলবে জলে! বোবা কান্নার অবসান ঘটিয়ে এল নতুন এক ভোর, যে ভোরেতে ঘুচে গেল সমস্ত শোষণের ঘোর।
আজও যখন সেই দিনের কথা মনে মনে ভাবি, বোবা কান্নার ইতিহাস হয়ে ওঠে এক মহা দাবি। সে কান্না আমাদের শক্তি জুগিয়েছে চরম দুর্দিনে, মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখিয়েছে কঠিন অতীতে দিনে। পূর্ব বাংলার সেই ইতিহাস চিরকাল রবে অমর, কান্না থেকে জন্ম নিয়েছে যে বীর বাঙালির সম্বর। বোবা কান্না আর নয়, আজ বজ্রকণ্ঠে গায় গান, মাতৃভাষা রক্ষায় যারা বিলিয়ে দিল নিজের প্রাণ।
তারিখ: ১৩-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০৯
খোকন সোনা কেন ফেরে না ঘরের ওই বারান্দায়? মা যে আজও প্রদীপ জ্বেলে পথ চেয়ে রয় সন্ধ্যায়। সে কি তবে আটকে গেছে ভাষার ওই মিছিলে গিয়ে? নাকি তার বুকটা গেছে কোনো বুলেটে বিদ্ধ হয়ে? চারিপাশে গুঞ্জন ওঠে খোকন নাকি আজ বীর, রাজপথে সে দাঁড়িয়ে গেছে বুক করে সোজা ও স্থির। মা তো এসব বোঝে না গো, সে চায় তার খোকা ফিরে, সোনার চাঁদ বুকে জড়িয়ে জুড়াবে তার হৃদয় তীরে।
খোকন সোনা কেন ফেরে না— এই প্রশ্ন মায়ের মুখে, দিনের পর দিন কাটে শুধু নিদারুণ চরম দুখে। সে তো আর সাধারণ কোনো খোকা নয় আজ আর, সে হয়ে উঠেছে কোটি বাঙালির মুক্তির মূল আধার। খোকন গেছে মিছিলে যোগ দিতে মাতৃভাষার টানে, তার রক্তে রাঙা পিচঢালা পথ আজ অমর গানে গানে। মা তোর খোকা আর ফেসবে না ওই পুরোনো ঘরে, সে তো এখন অমর হয়ে বেঁচে আছে সবার অন্তরে।
খোকন সোনার না ফেরার সেই বেদনাভরা গান, আজ আমাদের প্রতিটি প্রাণে জোগায় নতুন প্রাণ। সে ফেরে না ঠিকই কিন্তু তার চেতনা আজ জীবন্ত, তার ত্যাগের বিনিময়ে পেয়েছি আমরা মায়ের মন্ত। শতবর্ষী মায়ের সেই দীর্ঘশ্বাসের সাথে মিশে রয়, খোকন সোনার বীরগাথা যা কোনো দিন হয় না ক্ষয়। খোকন সোনা ফেরে না তো, ফিরেছে তার অমর নাম, ইতিহাসের পাতায় পাতায় যার রয়েছে শ্রেষ্ঠ দাম।
তারিখ: ১২-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০১০
ধূম্রজালের আড়ালে তারা রচে চলে গভীর চক্রান্ত, ভাষার বুকে ছুরি হানতে তাদের মন অতি উগ্রান্ত। বলে উর্দুই হবে একমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, বাঙালির বুকে মেরে দিতে চায় বাঁচার শেষ আশা। কূটচাল আর অপপ্রচারের ঘন কালো সেই ধোঁয়া, ঢেকে দিতে চায় বাংলার ওই ফাল্গুন মাসের হাওয়া। কিন্তু সত্য বেশি দিন তো ঢাকা থাকে না গো কভু, ধূম্রজাল ভেদ করে জেগে ওঠে আমাদের প্রভুর মধু।
ষড়যন্ত্রের কলকব্জা নড়ে ওঠে সুদূর রাজধানী থেকে, পূর্ব বাংলাকে পরাধীন রাখতে চায় তারা বেঁধে শিকে। তারা বোঝেনি বাঙালি জাতি দাবিয়ে রাখার নয়, যত বেশি ধূম্রজাল দিবি, তত বাড়বে তাদের জয়। খোকা সেই ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে দিল নিমেষে, তার কণ্ঠে ধ্বনিত হলো সত্য স্লোগান বিশেষে। ধূম্রজালের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল তাদের মুখ, বাঙালির ওপর নামিয়ে আনল তারা যত সব দুখ।
আজ সেই ষড়যন্ত্রের ধোঁয়া চিরতরে গেছে মুছে, বাংলার আলোয় ফাগুন আজ নতুন রঙে কুঁচে। ধূম্রজালের বিরুদ্ধে সেদিন রুখে দাঁড়িয়েছিল যারা, আমাদের এই মানচিত্রে তারাই তো সব ধ্রুবতারা। ষড়যন্ত্রের জাল বুনে কেউ টিকে থাকতে পারে না, ইতিহাস তার হিসাব নিয়ে কাউকেও তো ছাড়ে না। তাই ধূম্রজালের সেই ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে, অন্যায়কে চিনে নিতে হয় সদা চোখে চোখ রেখে জোরে।
তারিখ: ১১-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০১
মায়ের মুখের বুলির ওপর বসল প্রথম খড়্গ এসে, বলল তারা উর্দুই শুধু বলবে সবাই ভালোবেসে। বাংলা ভাষা নাকি নাকি মোদের ভাষা নয় গো কভু, এই হুকুমটি জারি করল পশ্চিমের সেই প্রভু। কী আঘাত সে ভাষার বুকে, কী নিষ্ঠুর সে আঘাত! নিভে গেল যেন বাংলার ঘরে জ্বেলে রাখা রাত। যে ভাষায় মা কথা বলে, যে ভাষায় গায় গান, সে ভাষাকে কেড়ে নিতে চায় পাষণ্ড সব শয়তান।
ভাষার ওপর খড়্গ হেনে তারা ভাবল জিতে গেছে, বাঙালির মেরুদণ্ড বুঝি চিরতরে ভেঙে গেছে। কিন্তু তারা জানত না তো এই ভাষার কী শক্তি, এর সাথে যে জড়িয়ে আছে কোটি প্রাণের ভক্তি। খোকা প্রথম উঠে দাঁড়াল খড়্গের ওই সামনে, চোখ রাঙানি ভয় পায় না সে কোনো কোনো কারণে। ভাষার ওপর আঘাত এলে রুখে দাঁড়াতে হয়, এই শিক্ষা আমাদের রক্তে মাখা পরম এক জয়।
সেই খড়্গ আজ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, বাংলা ভাষা বিশ্বমঞ্চে বীরের মতো বেঁচে আছে। ভাষার ওপর প্রথম আঘাত হানার ওই দিনগুলো, আমাদের মনে আজও জ্বালায় প্রতিবাদের ফুলোগুলো। খড়্গ হাতে শাসক যতই চালায় নিষ্ঠুর কোপ, বাঙালির বুক চিরে জন্ম নেয় অমর এক রূপ। ভাষার মান বাঁচাতে গিয়ে যারা দিল যে প্রাণ, তাদের স্মরণে আজো বাজে হৃদয়ে অমর গান।
তারিখ: ১০-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০২
রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহ সাহেব তুললেন যখন হাত, ভাষণের সেই ভুল কথায় কেঁপে উঠল রাত ও প্রভাত। তিনি বলে দিলেন পরিষ্কার উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা, অন্য কোনো ভাষা শোনার নেই তো কোনো আশা। সে এক বিশাল ভুল ভাষণ কাঁপিয়ে দিল বুক, সমবেত জনতার মাঝে নেমে এল ঘোর দুখ। যাঁদেরকে নিয়ে গড়া হলো এই নতুন পাকিস্তান, তাঁদেরকেই অবজ্ঞা করে দিল কঠিন অপমান।
জিন্নাহর সেই ভুল ভাষণ ইতিহাস হয়ে রয়, যে ভাষণেই জন্ম নিল বাঙালির মহা জয়। কারণ সেই কথার পিঠেই খোকা দিল প্রতিবাদ, না সূচক শব্দে ভেঙে দিল শোষকদের সাধ। ভুল ভাষণের জবাব দিতে কেঁপে উঠল রাজপথ, বাঙালির সামনে তখন খুলে গেল অন্য রথ। নেতা ভুল করতে পারেন, কিন্তু জনতা তো নয়, জনতার সেই গর্জন কাঁপাল শোষকদের হৃদয়।
আজ জিন্নাহর সে ভাষণ ইতিহাস হয়েছে আজ, তার ভুলের মাশুল গুনেছে তারা পেতে সাজ। ভাষা নিয়ে এমন হঠকারিতা চলে না তো কভু, তা প্রমাণ করে দিল রক্ত দিয়ে বাঙালি প্রভু। ভুল ভাষণের সেই দিনটি আমাদের শিক্ষা দেয়, নিজের অধিকার আদায়ে ছাড়তে নেই কো লেয়। জিন্নাহর সেই কণ্ঠস্বর আজ হারিয়ে গেছে দূরে, বাংলা ভাষা বেজে ওঠে আজ কোটি কণ্ঠে সুরে।
তারিখ: ০৯-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০৩
কার্জন হলের প্রাঙ্গণে আজ তরুণ প্রাণের মেলা, সেখানে শুরু হয়েছে এক অন্যরকম খেলা। নেতাজি যখন ভুল কথাটি বলছিলেন সভা জুড়ে, ছাত্রসমাজ গর্জে উঠল প্রতিবাদী এক সুরে। "না, না, তা হতে পারে না!"— বলে উঠল সবে, সেই গর্জনে কেঁপে উঠল চারিপাশের ছবি। কার্জন হলের সেই প্রতিবাদের প্রথম যে স্ফুলিঙ্গ, তা ছড়িয়ে পড়ল দ্রুত সারা বাংলায় অবিকল অঙ্গ।
তরুণ খোকার কণ্ঠে সেদিন প্রথম উঠল ডেকে, শোষকের ওই মুখের ওপর চোখ দুটো তার রেখে। কার্জন হলের গর্জনটি ছিল দাবানলের শুরু, যে আগুনে পুড়বে এবার শোষকদের সব গুরু। ভাষার দাবি ছাড়বে না কেউ, এই ছিল পণ, ছাত্ররা আজ জীবন দিতেও প্রস্তুত সর্বক্ষণ। সেই গর্জন আজও বাজে ঢাকা শহরের হাওয়া, আমাদের আত্মমর্যাদার প্রথম সেটি পাওয়া।
কার্জন হলের সেই পবিত্র স্মৃতি আজো অম্লান, যেখানে প্রথম রচিত হলো না বলার মূল গান। দেয়ালে দেওয়ালে তখন জ্বলছে প্রতিবাদের আগুন, শীতের শেষে হঠাৎ যেন এল ফাগুন মাস গুণ। ছাত্র সমাজের সেই সাহসিকতার কোনো তুলনা নেই, তারা দেখিয়ে দিল কীভাবে লড়তে হয় সঠিক সেইনেই। কার্জন হলের গর্জন তাই আজও আমাদের প্রেরণা, অন্যায়কে না বলতে শেখার শ্রেষ্ঠ সে ঠিকানা।
তারিখ: ০৮-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০৪
তমুদ্দুন মজলিস প্রথম তুলল দাবি তুলে, মাতৃভাষার কদর যেন যায় না কেউ ভুলে। আবুল কাসেমের হাতে গড়া সেই ছোট্ট সংগঠন, বাঙালির মনে বুনে দিল প্রতিবাদের শিহরণ। তারা প্রকাশ করল পুস্তিকা মায়ের ভাষা নিয়ে, বাঙালির অধিকারগুলো সবার মাঝে দিয়ে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই— এই প্রথম হলো স্লোগান, সাংস্কৃতিক এই লড়াইয়ে প্রাণ পেল প্রাণ।
তমুদ্দুন মজলিসের সেই সাহসী এক আহ্বান, জাগ্রত করে দিল আজ ঘুমিয়ে থাকা প্রাণ। তারা বুঝাল মাতৃভাষা ছাড়া বাঁচে না কোনো জাতি, ভাষার অধিকার আদাই হলো জীবনের মূল চাবি। খোকা সেই ডাকে সাড়া দিয়ে ঘর ছেড়ে বাইরে এল, বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র সমাজ এক সাথে হাত মেলাল। তমুদ্দুন মজলিসের সেই ছোট্ট একটি পদক্ষেপ, ইতিহাসের পাতায় আজ অম্লান এক প্রক্ষেপ।
তাদের সেই ডাক ছড়িয়ে পড়ল মাঠে আর ঘাটে, পদ্মা-মেঘনা-যমুনার কূলে কূলে ও হাটে হাটে। ভাষার লড়াই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল সেদিন থেকে, শোষকরা তখন নড়ে বসল গভীর দুশ্চিন্তায় থেকে। তমুদ্দুন মজলিসের অবদানের কথা ভুলবে না কেউ, তাদের হাত ধরেই তো জাগল আন্দোলনের ঢেউ। আজও সেই সংগঠনের নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরি, আমাদের না বলতে শেখার তারাই তো কারিগরি।
তারিখ: ০৭-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০৫
ছাত্র সমাজের প্রথম মিছিল চলল রাজপথে, হাতে প্ল্যাকার্ড, বুকে সাহস, পায়ে চলার রথে। "রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই" স্লোগানে মুখর আকাশ, যুবা বয়সের রক্তে আজ বাঁধভাঙা এক প্রকাশ। শোষকদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে সবে, মিছিল এগিয়ে চলে কোনো বাধা মানবে না ভেবে। প্লাবন যেমন সব ভেঙে দেয়, তেমনি এই মিছিল, শোষকদের মসনদে আজ হানল প্রথম খিল।
ছাত্র সমাজের সেই প্রথম মিছিলে ছিল যারা, আমাদের এই ইতিহাসের তারাই তো সব তারা। খোকা হেঁটে যায় সবার আগে সামনে বুক টান টান, তার কণ্ঠে বাজে আজ মুক্তির এক মহা গান। পুলিশ এসে বাধা দিল, চালাল লাঠিচার্জ, তবু মিছিলে থামল না তো একটুও কারো কার্জ। রক্ত ঝরল কারও কপালে, কারও আবার গায়ে, তবু তারা এগিয়ে গেল প্রাণের মায়ায় ছায়ে।
ছাত্র সমাজের সেই মিছিল আজ রূপ নিয়েছে ইতিহাসে, যে ইতিহাস বেঁচে থাকে বাঙালির হৃদয়ের পাশে। প্রথম মিছিলের সেই পদধ্বনি আজও বাজে কানে, অন্যায়কে না বলতে শেখার সেরা সে অবদানে। আজকের এই স্বাধীন দেশে দাঁড়িয়ে যখন ভাবি, ছাত্র সমাজের সেই ঋণ পরিশোধ করার নেই তো দাবি। শুধু তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মাথা করি নত, আমাদের না বলতে শেখার তারাই তো মূল রথ।
তারিখ: ০৬-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০৬
কোটি মানুষের মাতৃভাষা যে ভাষা বাংলায় গাই গান, সে ভাষাকে বাদ দিয়ে কেন উর্দুর জয়োগান? বাংলা কেন রাষ্ট্রভাষা হবে না আজ বলো? কোন অধিকারে আমাদের মুখের বুলি মারো দলো? এই প্রশ্নটি প্রতিধ্বনিত হলো সবার মুখে মুখে, ক্ষোভের আগুন জ্বেলে দিল বাঙালির ওই বুকে। সংখ্যায় আমরা বেশি তবু কেন এই বৈষম্য? শোষকদের এই নীতিটি চরম এক রহস্যময় যম।
বাংলা কেন নয়— এই স্লোগান উঠল তুঙ্গে, যুক্তি দিয়ে লড়ল তারা শোষকদের সঙ্গে। যে ভাষার রয়েছে সমৃদ্ধ এক বিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার, তাকে অস্বীকার করার সাহস পায় কোথা থেকে কার? খোকা প্রশ্ন করল সোজা শাসকের ওই মুখে, উত্তর দিতে পারেনি তো কেউ ভয়ে থমকে রূখে। বাংলা ভাষার এই দাবি তো কোনো করুণা নয়, এটি আমাদের জন্মগত অধিকার ও মহাপ্রলয়।
আজ বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেয়েছে বটে, কিন্তু তার পেছনে রয়েছে কত না রক্তের ফোঁটে। "বাংলা কেন নয়?"— এই প্রশ্ন ছিল প্রথম ধাপ, যা ঘুচিয়ে দিয়েছিল সমস্ত শোষণের পাপ। আজও বিশ্বমঞ্চে যখন বাংলা ভাষা বাজে, আমাদের বুক ভরে ওঠে গর্বিত এক সাজে। সেই পুরনো দিনের প্রশ্ন আজও আমাদের মনে কয়, মাতৃভাষার চেয়ে বড় কোনো সম্মান তো নয়।
তারিখ: ০৫-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০৭
দেয়ালে দেয়ালে কালির আঁচড়ে লেখা হলো স্লোগান, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই— এই ছিল সবার প্রাণ। রাতের অন্ধকারে তরুণরা পিন পতন নীরবতায়, লিখে দিল প্রতিবাদের বাণী শহরের গা সংযোগতায়। সকালে যখন সূর্য ওঠে দেখে সবাই চেয়ে, কালির আঁচড় কথা বলে মুক্তির গান গেয়ে। পুলিশ এসে মুছে দেয় সে লেখা বারবার করে, তরুণরা আবার লিখে যায় দ্বিগুণ সাহসে ভরে।
কালির আঁচড়ের সেই শক্তি ছিল বুলেটের চেয়ে বেশি, যা ছড়িয়ে পড়েছিল মানুষের ঘরে ঘরে ভালোবেসে। খোকা নিজের হাতে কলম তুলে লিখেছিল নাম, যে লেখার কাছে ম্লান হয়ে যায় রাজার সব দাম। দেয়ালগুলো হয়ে উঠল তখন প্রতিবাদের কাগজ, যেখানে লেখা ছিল বাঙালির সংগ্রামের সাজ। কালির সে দাগ মুছে ফেলা যায় কি সহজে কভু? তা তো বসে গেছে মানুষের মনে অমর এক মধু।
আজও পুরনো সে দেওয়ালগুলো সাক্ষী দিয়ে রয়, কালির আঁচড়ে লেখা সেদিনের সেই মহা জয়। তরুণদের হাতের লেখা সেই স্লোগানগুলো আজও, আমাদের চেতনায় জাগায় প্রতিবাদের সেই জাদু। কালির শক্তি কত যে বেশি প্রমাণ হলো সেদিন, অত্যাচারীর ভিত্তিমূল কেঁপে উঠল প্রবীণ নবীন। তাই কালির আঁচড়ে গড়া সেই প্রতিবাদের ইতিহাস, আমাদের হৃদয়ে যোগ করে আজও দীর্ঘ দীর্ঘ শ্বাস।
তারিখ: ০৪-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০৮
লাঠি দিয়ে, গুলি দিয়ে থামানো কি যায় মুখ? অত্যাচারী যতই করুক না কেন বুক চেরা দুখ। বাঙালি মায়ের খোকাগুলো আজ ঘর ছেড়ে বাইরে, তাদের কণ্ঠ থামিয়ে রাখবে এমন সাধ্য কার রে? শাসকেরা ধারা জারি করল কথা বলা যাবে না, মিছিল করা যাবে না কো, স্লোগান দেওয়া হবে না। কিন্তু মুখের ভাষা কে কবে কেড়ে নিতে পারে? আগুন যেমন নেভে না তো জলের ঝাপটা মারে।
যত বাধা দিল তারা, তত বাড়ল মুখের জোর, অন্ধকার ভেদ করে ফাটল প্রতিবাদের ভোর। থামানো যায় না মুখ আর স্লোগানের ওই সুরে, বাংলার আকাশ কেঁপে ওঠে দূর থেকে বহুদূরে। খোকা তার গলার শিরা ফুলিয়ে বলে জোরে— "রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই!" মানি না কো তোরে। শাসকের চোখ রাঙানি ধুলোয় মিশে গেল আজ, জনতার এই প্রতিবাদ পেল অমর এক সাজ।
মুখকে যারা বন্দি করতে চেয়েছিল অতীতে, তারা আজ হেরে গেছে ইতিহাসের ওই জিতে। মানুষের অধিকার আর ভাষার কথা কবে থামে? তা ছড়িয়ে পড়ে সাগরে আর নদীর ওই দামে। আজও তাই কোনো স্বৈরাচার যখন মুখ বাঁধতে চায়, বাঙালি ঠিকই গর্জে ওঠে পুরনো সেই নায়। থামানো যায় না মুখ— এই সত্য হলো প্রমাণিত, রক্ত দিয়ে বাঙালি তার অধিকার করেছে নিশ্চিত।
তারিখ: ০৩-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০০৯
রাষ্ট্রভাষার প্রথম দাবি উঠল যখন মুখে, এক নতুন সূর্য উঠল বাঙালির ওই বুকে। উর্দুর কব্জা থেকে ভাষাকে বাঁচাতে হবে আজ, এই প্রত্যয়ে সেজে উঠল তরুণ সমাজের সাজ। সভা হলো, সমিতি হলো, মিটিং হলো রাতে, সবাই মিলে শপথ নিল মোরা আছি সাথে। দাবি তো কোনো ছোট নয়, এ যে অস্তিত্বের প্রশ্ন, মাতৃভাষা ছাড়া কোনো জাতি থাকে কি অস্পষ্ট?
প্রথম সে দাবি তোলার দিনে ছিল কত না শঙ্কা, পুলিশের গাড়ি ঘুরছে দ্বারে বাজাচ্ছে কিঙ্কা। তবু খোকা পিছপা হলো না তো একটুও কভু, তার মনে ছিল মহান আল্লাহর দেওয়া ওই মধু। "রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই"— এই ছিল প্রথম দাবি, যে দাবির সামনে ম্লান হলো সব শোষকের ছবি। দাবি আদায়ের এই পথটি ছিল না তো সহজ, কাঁটায় ভরা সে পথ বেয়ে চলল কত পঞ্জজ।
আজ রাষ্ট্রভাষার সে দাবি পূর্ণ হয়েছে আজ, বাংলা আজ বিশ্বমঞ্চে পরেছে শ্রেষ্ঠ সাজ। কিন্তু প্রথম দাবির সেই দিনটির কথা মনে পড়ে, কী কষ্ট করে মানুষগুলো লড়েছিল বুক চিরে। রাষ্ট্রভাষার প্রথম দাবি আমাদের শিখিয়েছে পাঠ, অধিকার আদায় করতে হয় বুক ফুলিয়ে খাট। সেই দাবির মহান ইতিহাস আজও আমাদের টানে, গেয়ে যাই আমরা সবাই বিজয়ের সেই গানে।
তারিখ: ০২-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০২০
দিনের পর দিন জমে ওঠে শোষকদের যত অত্যাচার, বাঙালির মনে দানা বাঁধে ক্ষোভের পারাবার। চাকরি বাকরি থেকে শুরু করে শিক্ষার অধিকার, সব কিছুতে চলছে কেবল বঞ্চিতের ওই কারবার। মানুষ চুপ করে থাকে কত দিন আর বলো? ধৈর্যের বাঁধ এবার বুঝি ভেঙে পড়তে হলো। ক্ষোভের আগুন ধিকি ধিকি জ্বলছে বুকের ভেতর, আগ্নেয়গিরির লাভা যেন উপচে পড়ার ভেতর।
খোকা দেখল চারিপাশের এই করুণ সব দৃশ্য, তার মনেও জন্ম নিল প্রতিবাদের এক শিষ্য। সবাই মিলে ফিসফিস করে কথা বলে রাস্তায় ঘাটে, কবে যেন বিস্ফোরিত হবে এই ক্ষোভের মাঠে হাটে। দানা বাঁধা সে ক্ষোভ আজ রূপ নিচ্ছে দাবানলে, যেকোনো মুহূর্তে আগুন জ্বলবে তলে তলে। শাসকেরা তা বুঝতে পেরে বাড়াল তাদের প্রহরী, কিন্তু ক্ষোভ কি আটকানো যায় আইন দিয়ে করি?
অবশেষে সেই ক্ষোভের আগুন ফেটে পড়ল ঠিক, চারিপাশে লাল আলোয় রাঙিয়ে দিল দিক। দানা বাঁধা সে ক্ষোভের বিস্ফোরণ হলো একুশে, রক্তে ভেজা রাজপথ ভেসে গেল ভালোবাসায় ভেসে। আজও সেই ক্ষোভের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অত্যাচারীর পতন অনিবার্য, কেউ তা আটকাতে নেয়। ক্ষোভ যখন বিপ্লব হয়, তখন বাঁচে না কোনো পাপ, ইতিহাস লেখে তার অমর সেই নতুন প্রক্ষেপ।
তারিখ: ০১-০২-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০২১
হাজারো জনতার ভিড়ে খোকা উঠে দাঁড়াল সোজা, শোষকের চোখের দিকে তাকিয়ে দিল না বলার বোঝা। সে এক ছোট শব্দ কিন্তু তার শক্তি বিশাল ভারী, যেই শব্দে কেঁপে উঠল পাকিস্তানের সিংহাসন তারি। শাসক বলল উর্দুই হবে, খোকা বলল— না! এই না শব্দের মাঝে লুকিয়ে ছিল মুক্তির ঠিকানা। সবাই তখন স্তব্ধ হয়ে শুনল খোকার সেই স্বর, অন্ধকার সেই আসরে জ্বলে উঠল আলোর ঘর।
ঐতিহাসিক সেই 'না' শব্দ বদলে দিল ধারা, যে ধারায় ভেসে গেল শোষকদের যত সব তারা। চোখে চোখ রেখে বলা সে কথার কি ছিল তুলনা? সে তো ছিল বাঙালির মেরুদণ্ড শক্ত করার বুনোনা। খোকার সেই ছোট্ট 'না' আজ মহাকাব্য হয়েছে, বাঙালির আত্মায় তা চিরতরে বেঁচে আছে। কেউ কখনো এমন সাহস দেখায়নি তো আগে, জুলুমবাজের মুখের ওপর 'না' বসল রাগে রাগে।
আজও যখন সেই ঘটনার কথা ভাবি বসে একা, রোমাঞ্চে ভরে ওঠে মন, চোখে নামে জলেরেখা। সেই ঐতিহাসিক 'না' আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে, অন্যায়কে রুখে দিতে হয় বুক ফুলিয়ে আবে। সেদিনের সেই 'না' আজ ছড়িয়ে গেছে সারা বাংলায়, আমাদের আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে রইল সদায়। ইতিহাসের পাতায় সোনার অক্ষরে লেখা রবে গান, খোকার সেই একটি 'না' বাঁচিয়ে দিল কোটি প্রাণ।
তারিখ: ৩১-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০২২
শাসকেরা চোখ রাঙায় মোদের রক্তচক্ষু হেনে, ভাবে বাঙালি ভয় পাবে তাদের এই হুকুমে মেনে। তারা বলে চোখ রাঙানি দেখলে সবাই পালায় দূরে, ভয়ে কুঁকড়ে মরে মানুষ তাদের হুকুম শুনে সুরে। কিন্তু তারা জানে না তো বাঙালির ওই রক্তে, ভয় বলে কিছু নেই যে রয়েছে বীরের শক্তিতে। রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে খোকা আরও সোজা হয়, তার বুকে নেই একটুও তো পরাজয়ের ভয়।
শাসকের সেই রক্তচক্ষু জ্বলে ওঠে অগ্নিসম, তারা চালায় দমনপীড়ন, জারি করে নিয়ম। মিছিলের ওপর পুলিশ ছাড়ে লাঠি আর বন্দুক, তবু একটু কাঁপে না তো কোনো তরুণের বুক। চোখ রাঙানি ভয় দেখিয়ে থামানো কি যায় মন? যত মারে, তত বাড়ে বাঙালির প্রতিবাদের রণ। শাসকের সে রক্তচক্ষু অবশেষে হলো অন্ধ, বাঙালির বিজয়ের কাছে হার মানল খণ্ড খণ্ড।
আজও শাসকেরা চায় চোখ রাঙিয়ে শাসন করতে, কিন্তু বাঙালি আর ভয় পায় না কোনো শর্তে। রক্তচক্ষুর ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে সাহসিকতা, অ্যাটোসোপির বিরুদ্ধে লড়ে জিতে নেওয়ার বার্তা। শোষকদের চোখ রাঙানি তাই আজ মূল্যহীন, আমরা মাথা উঁচু করে কাটাই প্রতিটি দিন। শাসকের সেই রক্তচক্ষুর দিন গেছে ফুরিয়ে, আজ বাঙালি দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব জয় করে উড়িয়ে।
তারিখ: ৩০-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০২৩
মেরুদণ্ড বাঁকা করে যারা চিরকাল বেঁচে থাকে, বাঙালি তো তাদের দলে পড়ে না কোনো ফাঁকে। শুনুন তবে শোষক মহাশয়, আমাদের এই গান, মেরুদণ্ড সোজা করে বাঁচাই আমাদের মান। এতকাল ঝুকে ছিলাম ব্রিটিশের ওই জুতার তলে, এবার সোজা হব মোরা বাংলার এই মাটিতে চলে। খোকা শিখল কেমন করে মেরুদণ্ড সোজা রাখতে, অত্যাচারীর সামনে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে ঢাকতে।
মেরুদণ্ড সোজা করার সেই অমর গান বাজে, প্রতিটি তরুণের প্রাণে আজ যুদ্ধের ওই সাজে। আর নয় মাথা নত করা কারো ওই হুকুমে, নিজের ভাষায় কথা বলব আপন মহিমার ঘুমে। শোষক যতই চাপিয়ে দিক ভারী কোনো পাথর, আমাদের সোজা মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে না তো তোর। এই গানটি ছড়িয়ে পড়ে নদীর কূলে কূলে, সবাই যেন আত্মসম্মান যায় না কেউ ভুলে।
আজ আমাদের মেরুদণ্ড সোজা রয়েছে বিশ্বমঞ্চে, কেউ পারে না আর আমাদের দাবাতে কোনো দ্বন্দ্বে। মেরুদণ্ড সোজা করার সেই গান আজও আমাদের বল, যে বলেতে শক্তি পায় সারা বাংলার দলবল। ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখি ত্যাগের সেই দান, যে দানে আমরা শিখেছি সোজা হয়ে গাইতে গান। মেরুদণ্ড সোজা রাখার এই লড়াই চলবে চিরকাল, আমাদের পরিচয় হলো একুশের এই লাল-লাল।
তারিখ: ২৯-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০২৪
ভয় নামক ভূতটাকে যারা বুক থেকে দিল তাড়িয়ে, তারা হলো তরুণ সমাজ, অস্ত্র বুকটা বাড়িয়ে। ভয় ভাঙার সেই কারিগর খোকা নামের খোকা, তার সাহসে কেটে গেল সমস্ত অন্ধ জোকা। মানুষ তো ভয় পেত পুলিশ দেখে, বন্দুকের নল দেখে, ভাবত বুঝি জীবন যাবে সব কিছু আজ রেখে। কিন্তু খোকা এসে বলল— ভয় পেলে আর রক্ষা নেই, ভয়কে জয় করতে হবে বুক পেতে দিতে হবে তেনেই।
ভয় ভাঙার সে কারিগরদের রক্তে ভেজা হাত, তাদের হাত ধরেই তো এল প্রথম আলোর প্রভাত। তারা শিখাল কীভাবে মৃত্যুঞ্জয়ী হতে হয় রণে, কীভাবে লড়াই চালাতে হয় শত্রুর ওই ভবনে। ভয় ভেঙে চুরমার হলো একুশের ওই দিনে, বাঙালি তখন মাথা তুলল নতুন এক প্রতীকে। শাসকের বন্দুকের নল আর ভীতি দেখাতে পারল না, ভয় ভাঙার সে কারিগরদের ঠেকানো তো গেল না।
আজ আমরা যে স্বাধীনভাবে কথা বলি বাংলায়, তার পেছনে রয়েছে সেই ভয় ভাঙার দায়। ভয় ভাঙার কারিগরদের আজ স্মরণ করি শ্রদ্ধায়, তাঁদের ত্যাগের কথা লেখা আছে আমাদের হৃদয়ায়। যাঁরা সেদিন বুক চিতিয়ে ভাঙল ভয়ের প্রাচীর, আমাদের এই মানচিত্রে তাঁরাই তো সব বীর। ভয় ভাঙার সেই ইতিহাস আজও আমাদের শক্তি দেয়, অত্যাচারীর সামনে দাঁড়িয়ে বলতে শেখায়— জয়।
তারিখ: ২৮-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০২৫
অন্ধকার নামিয়ে দিল তারা আইনের কালো চাদরে, বাঙালির ঘরে ঘরে জ্বালল ভয়ের আগুন ঘরে ঘরে। ভাষার আলো নিভিয়ে দিতে চাইল পাষণ্ড দল, তারা ভেবেছিল চিরকাল থাকবে তাদের বল। কিন্তু অন্ধকার যতই গভীর হোক না কেন রাতে, একটি ছোট প্রদীপ যথেষ্ট তাকে হারাতে হাতে। খোকা হলো সেই প্রদীপ, জ্বেলে দিল আলোর মশাল, অন্ধকারের বিরুদ্ধে তার দীপ্ত লড়াই বিশাল।
আলোর মিছিলে মুখরিত হলো ঢাকার পিচঢালা পথ, অন্ধকার পালিয়ে গেল লুকিয়ে নিজের রথ। শোষকদের কালো আইন আলোয় গেল পুড়ে, মানুষ তখন গান গাইল অনেক দূরে দূরে। অন্ধকারের বিরুদ্ধে এই লড়াই শুধু ভাষার নয়, এ হলো মানবতা ও সত্যের এক মহাপ্রলয়। খোকা দেখিয়ে দিল কীভাবে অন্ধকারকে করতে হয় জয়, আলোর পথে চলতে গেলে লাগে না তো কোনো ভয়।
আজও যখন চারিপাশে নামে অন্যায়ের ঘোর কালো, একুশের সেই চেতনা আমাদের জ্বেলে দেয় আলো। অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই করার সেই শিক্ষা আজও, আমাদের মনে তৈরি করে প্রতিবাদের জাদু। আলোর মিছিলে শরিক হতে আমরা সবাই প্রস্তুত, অন্যায়কে মুছে ফেলতে চাই মোরা চিরকাল লুত। অন্ধকার হার মেনে যায় আলোর ওই মিছিলে এসে, বাংলা মায়ের খোকারা আজ জিতেছে ভালোবেসে।
তারিখ: ২৭-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০২৬
একশত চুয়াল্লিশ ধারা জারি হলো শহরের বুকে, চার জনের বেশি জমায়েত হতে মানা আছে মুখে। পুলিশের বন্দুক পাহারা দেয় মোড়ে মোড়ে গিয়ে, ভয় দেখাতে চায় তারা ১৪৪ ধারা দিয়ে। কিন্তু আইন কি আটকাতে পারে জনতার ওই স্রোত? সে তো প্লাবনের মতো ভেঙে ফেলে সব রদ ও রথ। খোকা বলল— ১৪৪ ধারা আমরা মানি না কো, মায়ের ভাষার অধিকারে কোনো আইন মানতে দেবো না তো!
ব্যারিকেড ভেঙে চুরমার করে এগিয়ে চলে মিছিল, পুলিশের চোখে মুখে তখন আতঙ্কের খিল খিল। ১৪৪ ধারার কাগজগুলো উড়ে গেল বাতাসে, তরুণদের স্লোগান তখন বাজে মুক্ত আকাশে। আইনের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে এল বাঙালি জোয়ান, তাঁদের কণ্ঠে বেজে উঠল অমর জীবনের গান। শোষকদের সেই ব্যারিকেড হলো ধুলিস্যাৎ, রক্তে ভেজা রাজপথে নামল সেদিন প্রভাত।
আজও ১৪৪ ধারার কথা শুনলে মনে পড়ে সেই দিন, যেদিন আইন ভেঙে জিতেছিল প্রবীণ ও নবীন। অন্যায় যদি আইন হয়, সে আইন ভাঙতে হয়, এই শিক্ষা দিয়ে গেছে একুশের সেই মহা জয়। ব্যারিকেডের প্রাচীর পেরিয়ে যারা সেদিন গেল চলে, আমাদের মানচিত্রে তাদের নাম সোনায় লেখা চলে। ১৪৪ ধারার সে ইতিহাস আমাদের মেরুদণ্ড শক্ত করে, অন্যায়কে না বলতে শেখায় বুক ফুলিয়ে জোরে।
তারিখ: ২৬-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০২৭
রাজপথ আজ বেপরোয়া, মানছে না কোনো বাধা, ছাত্র-জনতার স্রোতে যেন মুছে গেছে সব গাধা। পায়ের আওয়াজে কেঁপে ওঠে পিচঢালা ওই সড়ক, শোষকদের সিংহাসনে আজ নেমেছে ঘোর নরক। কার্তুজ আর বুলেটের ভয় উড়িয়ে দিয়ে হাওয়া, রাজপথে নেমে এসেছে লাখো প্রাণের চাওয়া। খোকা নেতৃত্ব দেয় মিছিলে, বুক করে চওড়া, তার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় স্লোগানের ওই ঝড়োড়া।
বেপরোয়া সে রাজপথে আজ রক্তের নদী বয়, তবু মিছিলে একটুও তো কমে না কারো জয়। পুলিশ লাঠি চালায় যতো, স্লোগান বাড়ে ততো, বাঙালি তো থামবে না কো আজ কোনো শর্তে হতো। রাজপথ আজ হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের ক্ষেত্র, যেখানে লেখা হচ্ছে নতুন এক অমর মন্ত্র। শোষকদের বুক কেঁপে ওঠে এই দৃশ্য দেখে, বেপরোয়া জনতাকে তারা রাখবে কেমন করে ডেকে?
আজও রাজপথ আমাদের প্রতিবাদের কথা বলে, যে রাজপথ রাঙা হয়েছিল একুশের রক্তে জলে। বেপরোয়া সেদিনের সেই মিছিল আজও আমাদের টানে, আমাদের আত্মমর্যাদার সুর বাজে তার ওই গানে। রাজপথ শুধু রাস্তা নয়, এ হলো মুক্তিসেনা, যেখানে দাঁড়িয়ে বাঙালি শিখেছে না বলতে জানা। বেপরোয়া সে রাজপথের রক্তিম ওই ইতিহাস, আমাদের হৃদয়ে যোগ করে চিরকালের আশ্বাস।
তারিখ: ২৫-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০২৮
মায়ের ভাষার ব্যাকুলতায় বুকটা ওঠে কেঁপে, ঘর ছেড়ে আজ রাজপথে নামল সবাই তেঁপে। যে ভাষায় মা ঘুম পাড়াত গেয়ে মধুর গান, সে ভাষাকে কেড়ে নিলে কি আর বাঁচে প্রাণ? ব্যাকুল সে টানে মানুষ সব ভুলে গেল ঘর, কে আপন আর কে যে পর, ভুলে গেল ডর। খোকা ছুটে এল সেই ব্যাকুলতার প্রবল টানে, মাতৃভাষার অমর ধ্বনি বাজছে তার ওই প্রাণে।
ব্যাকুলতা যখন তীব্র হয়, তখন মানে না বাধা, পাষাণ ভেদ করে ওঠে যেমন নদীর ধারা সাঁদা। বাঙালির সেই ব্যাকুলতাই সৃষ্টি করল একুশ, যে একুশ ঘুচিয়ে দিল সমস্ত শোষকের বিষ। মায়ের ভাষার প্রতি এমন ভালোবাসা আর কোথায়? রক্ত দিয়ে কিনে নিল যা পাওয়া যায় না কথায়। খোকার বুকে সেই ব্যাকুলতার আগুন জ্বেলে দিল, শোষকদের সমস্ত চক্রান্ত মুহূর্তে দিল খিল।
আজ আমরা স্বাধীন ভাষায় কথা বলি যখন, মায়ের ভাষার ব্যাকুলতার কথা মনে পড়ে তখন। সেদিনের সেই ব্যাকুলতা আমাদের শিখিয়েছে প্রাণ, মাতৃভাষার চেয়ে বড় নেই তো কোনো সম্মান। ব্যাকুলতার সে ইতিহাস আজও আমাদের কাঁদায়, আবার সাথে সাথে বুক ফুলিয়ে চলতে শেখায় সদায়। মায়ের ভাষার সেই অমর টান চিরকাল রবে বেঁচে, আমাদের আত্মায় তা গেঁথে আছে মন টেনে টেনে।
তারিখ: ২৪-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০২৯
ফাল্গুন মাসের মৃদু হাওয়ায় বইছে অন্য হাওয়া, সে হাওয়ায় মিশে আছে বিদ্রোহ আর চাওয়া। শিমুল পলাশ লাল হয়ে আজ রাঙাল যেন পথ, তার সাথে মিলল গিয়ে বাঙালির রক্তের রথ। ফাল্গুনী ওই হাওয়ায় যেন দুলছে তর্জনী, শোষকদের বিরুদ্ধে আজ জাগল শত গর্জনী। খোকা ফাল্গুনের বুক চিরে স্লোগান তোলে মুখে, দ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দিল সবার ওই বুকে।
ফাল্গুনী হাওয়ায় মিশে আছে শহীদদের ওই শ্বাস, যে শ্বাসে আজ মুক্ত হলো বাংলার আকাশ বাতাস। বসন্তের এই সুন্দর দিনেও নামল কালো ছায়া, রক্তে রাঙা হয়ে গেল ফাল্গুনের সেই মায়া। তবু সে দ্রোহ থামেনি কো একটুও এক ক্ষণে, ফাল্গুন মানেই বিদ্রোহ আজ বাঙালির ওই মনে। হাওয়ায় হাওয়ায় ছড়িয়ে গেল প্রতিবাদের বাণী, শোষকদের পতন হবে— এ কথা সবাই জানি।
আজও ফাল্গুন এলে আমাদের মনে পড়ে সে দিন, যেদিন দ্রোহের আগুনে পুড়ছিল প্রবীণ নবীন। ফাল্গুনী হাওয়ার সেই দ্রোহ আমাদের চিরন্তন শক্তি, মাতৃভাষার প্রতি যার রয়েছে অগাধ ভক্তি। বসন্তের ফুল যেমন ফোটে গাছের ওই ডালে ডালে, তেমনি দ্রোহ ফুটেছিল বাঙালির হাতের ওই তালে। ফাল্গুনী হাওয়ার সেই ইতিহাসের অমর গাথা, আমাদের আত্মায় লিখে গেছে না বলার সে ব্যথা।
তারিখ: ২৩-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৩০
ছাত্র আর জনতা মিলে গড়ল এক মহান ঐক্য, শোষকদের বিরুদ্ধে আজ এক তাদের এই লক্ষ্য। কেউ বাদ নেই সে মিছিলে, শিক্ষক আর শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী সাহিত্যিক আর সাধারণ সব পথিক। ঐক্যের ওই সুর বেজে ওঠে বাংলার আকাশে, শোষকদের পায়ের তলার মাটি তখন ঘাসে ঘাসে। খোকা সবার মাঝে থেকে বাজাচ্ছে সেই সুর, যে সুরেতে ভেঙে গেল সকল দূরত্ব বহুদূর।
ছাত্র-জনতার ঐক্য দেখে কেঁপে উঠল বুক, শাসন করার ক্ষমতা আজ হারাতে বসল মুখ। ঐক্যের এই শক্তি যে কত বিশাল ও মহান, তা প্রমাণ করে দিল রক্তে কেনা সেই অবদান। কেউ একা নয়, সবাই মিলে এক সাথে আজ দাঁড়িয়ে, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ফেলল বাড়িয়ে। ঐক্যের সেই সুরটি আজও বাজে আমাদের কানে, সবাই মিলে লড়লে জয় আসে যে জীবনে গানে।
আজও দেশের যেকোনো সংকটে যখন প্রয়োজন পড়ে, ছাত্র-জনতা এক হয়ে যায় হাত ধরে হাত ধরে। ঐক্যের সেই অমর সুর আমাদের মূল প্রেরণা, একসাথে না বলতে শেখার শ্রেষ্ঠ সে ঠিকানা। ছাত্র-জনতার সেই ঐক্যের শক্তি আজও জীবন্ত, আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় মন্ত্র। সেই ঐক্যের ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে ভাই, একসাথে থাকলে কেউ আমাদের হারাতে পারবে না ভাই।
তারিখ: ২২-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৩১
একুশের প্রথম প্রভাত এল রক্তিম এক রঙে, সূর্য উঠল যেন আজ রক্তের ওই তরঙ্গে। ঢাকা মেডিকেলের সামনে জমল হাজারো ভিড়, সবার বুকে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে গম্ভীর। আজ কি তবে ফয়সালার সেই ঐতিহাসিক দিন? জুলুমবাজের পতন হবে— এ কথা নিশ্চিত প্রবীণ। খোকা দাঁড়িয়ে আছে সামনে বুক করে টান টান, তার কণ্ঠে বেজে উঠেছে অমর ভাষার গান।
একুশের সেই প্রভাতটি ছিল কুয়াশায় ঢাকা, তাতে আবার মিশে ছিল বুলেটের সেই দাগা। শাসকেরা তো সহ্য করবে না এই তরুণদের ভিড়, তাই তো তারা চালাল গুলি বুক করে স্থির। প্রভাতের সেই শান্ত আলো রক্তে গেল ভিজে, বাংলার মাটি লাল হলো মর্মান্তিক সে মিজে। তবু প্রভাত থামেনি কো, সে এগিয়ে চলল আরও, অমর হয়ে গেল সেদিন যারা জীবন দিল পারো।
আজ ২১ ফেব্রুয়ারির প্রভাত যখন আসে ফিরে, আমরা দাঁড়াই শ্রদ্ধাভীরে মাথা নত করে ধীরে। একুশের প্রথম প্রভাত আমাদের আত্মমর্যাদার প্রতীক, যে প্রভাত আলো জ্বেলে দিল সারা দেশের দিক। রক্তে ভেজা সেই সকালের কথা মনে করলে আজ, আমাদের চোখে জমে ওঠে গর্বিত এক সাজ। একুশের সেই প্রথম প্রভাত চিরকাল রবে অমর, আমাদের না বলতে শেখার সবচেয়ে বড় সম্বর।
তারিখ: ২১-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৩২
ঢাকা মেডিকেলের প্রাঙ্গণ আজ রক্তে গেছে ভেসে, ভাষার দাবিতে যারা প্রাণ দিল ভালোবেসে। সেখানে ছিল রফিক ভাই, ছিল সালাম আর বরকত, জব্বারের বুক চিরে গেল বুলেটের কত খকত। মেডিকেলের ওই গেটটার সামনে কী যে কাণ্ড হলো, শোষকদের নরপিশাচেরা নির্বিচারে গুলি চালাল হলো। খোকা দেখল চোখের সামনে ভাইয়ের লুটিয়ে পড়া, তবু তার মুখ থেকে তো থামল না স্লোগান গড়া।
ঢাকা মেডিকেলের সেই পিচঢালা সড়ক খানি, আজ আমাদের কাছে পবিত্র তীর্থস্থান জানি। সেখানে তাজা রক্ত ঢেলে রচে গেল ইতিহাস, যে ইতিহাসে ধন্য হলো বাংলার আকাশ বাতাস। রফিকের মাথা ফেটে গেল বুলেটের আঘাতে, সালামের বুক ঝরল রক্ত শ্রাবণের এই রাতে। বরকত আর জব্বারও লুটিয়ে পড়ল মাটিতে, মাতৃভাষার মান বাঁচাতে জীবন দিল জিতে।
আজও ঢাকা মেডিকেলের সেই স্থানটিতে গেলে, শহীদদের দীর্ঘশ্বাস অনুভব করা যায় ফেলে। সেদিনের সেই রক্তস্নাত প্রাঙ্গণ আমাদের শিখায়, কীভাবে অধিকার আদায় করতে হয় বুক চিতায়। ঢাকা মেডিকেলের সামনে দাঁড়িয়ে তাই জানাই সালাম, যাঁরা নিজের জীবন দিয়ে লিখেছেন অমর নাম। সেই পবিত্র মাটির প্রতিটি কণা আমাদের পবিত্র ধন, একুশের সেই স্মৃতি আজও জাগায় মনে শিহরণ।
তারিখ: ২০-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৩৩
রফিকের রক্তে রাঙা হলো পিচঢালা ওই সড়ক, বুলেটের আঘাতে খসে পড়ল কত না পলক। ভাষা শহীদ রফিক উদ্দিন আহমেদ সবার আগে, বুক পেতে দিল বুলেটের সামনে মহা রাগে রাগে। তার রক্তে লাল হয়ে গেল ঢাকার রাজপথ খানি, সেদিনের সেই দৃশ্য দেখে কেঁদেছিল সব প্রাণী। খোকা দেখল রফিকের সেই নিথর দেহের পতন, তার মনে তখন শুরু হলো প্রতিশোধের রণ।
রফিকের রক্ত বৃথা যাবে না তো কোনো দিন কভু, এই শপথ নিল বাঙালি ছাত্র-জনতা প্রভু। পিচঢালা সেই রাস্তা আজ আর সাধারণ নয়, সেখানে লেখা আছে বাঙালির অমর মহাপ্রলয়। রফিক ভাই চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে দূরে, তার রক্তে লেখা হলো মায়ের ভাষার সুরে। তার সেই আত্মত্যাগ আমাদের মেরুদণ্ড সোজা রাখে, অত্যাচারীর সামনে দাঁড়াতে শেখায় প্রতি বাঁকে।
আজ যখন সেই পথ দিয়ে আমরা হেঁটে যাই, মনে পড়ে রফিকের রক্তে রাঙা সেই ইতিহাস ভাই। রফিকের রক্তে রাঙা পিচঢালা সে সড়ক খানি, আমাদের স্বাধীনতার প্রথম যে বীজ জানি। তাঁর রক্তে ভেজা সেদিনের সেই পবিত্র মাটি, আজও আমাদের চেতনায় জুগিয়ে চলেছে খাঁটি। রফিক তোমার আত্মত্যাগ অমর হয়ে রবে যুগে যুগে, বাঙালির হৃদয়ে তুমি বেঁচে আছ পরম সুখে।
তারিখ: ১৯-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৩৪
আব্দুস সালামের চোখে ছিল কত না স্বপ্ন আঁকা, মাতৃভাষার মর্যাদায় দেশ হবে আলোয় ঢাকা। কিন্তু হায়! শোষকদের বুলেট এসে থামাল সে পথ, সালামের বুকে বিঁধে গেল নির্দয় নরকের রথ। তার অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো ছড়িয়ে গেল বাতাসে, বাংলার আকাশে তখন মেঘ জমেছে আশেিপাশে। খোকা তার নিথর দেহ জড়িয়ে ধরে কাঁদল খুব, সালামের চোখে তখনো ছিল স্বপ্নের সেই রূপ।
সালামের সে স্বপ্ন আজও আমাদের প্রেরণা জোগায়, তার অসমাপ্ত কাজগুলো আমরা করি গো সদায়। সে চেয়েছিল বাংলায় কথা বলুক এ দেশের মানুষ, কোনো বৈষম্য যেন না থাকে, মুছে যাক সব ফুস। তার সেই স্বপ্ন আজ বাস্তবায়িত হয়েছে পুরোপুরি, বিশ্বের দরবারে বাংলা আজ উড়ছে ওড়াউড়ি। কিন্তু সেই স্বপ্ন দেখতে গিয়ে সে দিল যে প্রাণ, তা কোনো দিন ভুলবে না তো বাঙালির অবসান গান।
আজ সালামের কথা মনে হলে বুক ফুলে ওঠে গর্বে, তিনি তো অমর হয়ে আছেন আমাদের এই গর্ভে। অসমাপ্ত স্বপ্ন তাঁর ডানা মেলে উড়ছে আকাশে, ভাষা শহীদ সালাম আজ বেঁচে আছেন প্রতি নিশ্বাসে। তাঁর রক্তে কেনা এই ভাষার গৌরব আজ বিশাল, আমরা তাঁর উত্তরসূরি, আমাদের চালচলন চিশাল। সালাম তোমার স্বপ্ন আজ পেয়েছে পূর্ণতা রূপ, বাংলার ঘরে ঘরে আজ জ্বলেছে আলো স্বরূপ।
তারিখ: ১৮-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৩৫
আবুল বরকতের বুক ভেদ করে বেরিয়ে গেল গুলি, তাজা রক্তে ভিজে গেল রাজপথের ধূলিমূলি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই মেধাবী তরুণ ছাত্র, মাতৃভাষার জন্য দিল নিজের জীবনটা মাত্র। বরকত তো জানত না আজ শেষ দেখা হবে সবার সাথে, সে তো শুধু চেয়েছিল বাংলা হোক মুখের প্রাতে। তার তাজা রক্তে লাল হলো মেডিকেলের ওই চত্বর, শোষকদের পিশাচ রূপ দেখে কেঁপে উঠল স্তর।
বরকতের বুক চেরা সে দৃশ্য আজও চোখে ভাসে, বাঙালির ইতিহাসে তা জ্বলজ্বল করে প্রকাশে। খোকা তার রক্তমাখা জামা হাতে তুলে নিয়ে বলে— এই রক্তের বদলা নেব আমরা আগুন জ্বেলে জলে! তাজা প্রাণের এমন বলিদান কি বৃথা যেতে পারে? তা তো দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়ল দ্বারে দ্বারে। বরকতের সেই আত্মত্যাগ আমাদের দিল না বলার শক্তি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে গড়ে তুলল প্রতিবাদের ভক্তি।
আজ বরকতের স্মৃতিতে গড়া রয়েছে যে হল, সেখানে আজও তরুণরা পড়ে জ্ঞান ও বল। বরকত তুমি চলে গেছ ওপারে না ফেরার দেশে, কিন্তু তোমার রক্তে এই দেশ আজ উঠেছে হেসে। তাজা রক্তের সেই ঋণ আমরা শোধ করব কেমনে? তোমার আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করে চলব দিনে দিনে। বরকত তোমার নাম সোনার অক্ষরে লেখা রবে চিরকাল, বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের তুমি যে এক উজ্জ্বল লাল।
তারিখ: ১৭-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৩৬
আব্দুল জব্বারের শার্টটি আজ রক্তে গেছে ভিজে, তিনি তো এসেছিলেন গ্রাম থেকে ভাষার টানে নিজে। বয়সে তিনি বড় ছিলেন সবার চেয়ে সেখানে, তবু তরুণদের সাথে দাঁড়িয়েছিলেন সমান টানে। পুলিশের বন্দুকের গুলি এসে লাগল তাঁর বুকে, ভেঙে গেল সব স্বপ্ন তাঁর মুহূর্তের ওই সুখে। জব্বারের ভেজা শার্টটি সাক্ষ্য দেয় সেদিনের, কী পশুবৃত্তি চালিয়েছিল শোষকেরা প্রবীণ নবীন।
সেই ভেজা শার্ট হাতে নিয়ে কেঁদেছিল কত লোক, সবার চোখে জমেছিল কান্নার বরফ ও শোক। খোকা শপথ নিল সেদিন জব্বারের রক্ত ছুঁয়ে— এই শোষকদের ছাড়ব না কো পিষে দেব গুঁড়িয়ে! জব্বারের আত্মত্যাগ আমাদের শিখাল নিখাদ ভালোবাসা, ভাষার জন্য জীবন দেওয়া কত বড় যে আশা। তার ভেজা শার্ট আজ আমাদের ইতিহাসের দলিল, যে দরিয়ায় মুছে গেছে শোষকদের সব খিল।
আজ শহীদ জব্বারের স্মৃতি রক্ষার্থে কত না আয়োজন, তাঁর জন্মভূমিতে গড়ে উঠেছে সুন্দর এক নিকেতন। জব্বার ভাই তোমার রক্তে ধন্য হলো বাংলা মায়ের বুক, তোমার আত্মত্যাগে আজ আমরা পেয়েছি মুক্তির সুখ। ভেজা শার্টের সেই ইতিহাস আজও আমাদের কাঁদায়, আবার সেই সাথে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখায় সদায়। জব্বার তোমার অবদান চিরকাল রবে বাঙালির মনে, আমরা তোমায় স্মরণ করি পরম ভক্তি ও ধ্যানে।
তারিখ: ১৬-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৩৭
বাংলা মায়ের কত খোকা জীবন দিল সেদিন রণে, তাঁদের রক্তে অমর হলো বাংলার ওই কোণে কোণে। রফিক, সালাম, বরকত আর জব্বারের ওই নাম, ইতিহাসের পাতায় তারা পেয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ দাম। মায়ের খোকারা মরে না তো, তারা হয়ে যায় অমর, আমাদের এই মানচিত্র জুড়ে তাদের সবুজ সম্বর। খোকা যখন রক্তে লুটিয়ে পড়ল রাজপথে, তখনই জন্ম নিল তাদের অমরত্বের রথে।
মায়ের খোকাদের এই বলিদান বৃথা যায়নি কভু, তাঁদের রক্তেই তো জেগেছে আমাদের এই প্রভু। শোষকদের সব বুলেট হার মেনেছে তাঁদের কাছে, আজও তাঁরা প্রতি তরুণের হৃদয়ে বেঁচে আছে। অমরত্ব তো তাঁদেরই জোটে যারা দেশের তরে, নিজের জীবন উৎসর্গ করে বুক চিরে জোর করে। মায়ের বুক খালি হলো ঠিকই, কিন্তু দেশ পেল প্রাণ, শহীদ খোকাদের নামে আজ গায় সবাই জয়গান।
আজ একুশের প্রভাতে আমরা যখন ফুল দিই মিনারে, মনে পড়ে সেই অমর খোকাদের কথা বারে বারে। তাঁদের রক্তে কেনা এই স্বাধীনতা ও মায়ের ভাষা, আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় পরম এক আশা। মায়ের খোকারা অমর হয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল, তাঁদের ত্যাগের আলোয় আলোকিত হোক আমাদের সকাল। অমরত্বের সিঁড়ি বেয়ে তাঁরা উঠে গেছেন ওপরে, বাঙালির হৃদয়ে তাঁদের আসন পাতা রয়েছে আদরে।
তারিখ: ১৫-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৩৮
বুলেট বিদ্ধ ইতিহাস আজ লেখা হলো রক্ত দিয়ে, শোষকদের বর্বরতা ঢাকবে কোন পর্দা দিয়ে? ঢাকা মেডিকেলের মাটি আজ ভারী হয়ে গেছে শোকে, বুলেটের দাগ আঁকা আছে প্রতিটি দেয়ালে ও চোখে। সে ইতিহাস মুছে ফেলা এত কি সহজ বলো? তা তো পাথরে খোদাই করা রক্তের রঙে দলো। খোকা সেই বুলেট বিদ্ধ ইতিহাস নিজের চোখে দেখে, প্রতিজ্ঞার পাথর চাপা দিল বুক শক্ত করে রেখে।
বুলেট তো কেবল কেড়ে নেয়নি কিছু তাজা প্রাণ, তা চিরতরে বদলে দিল বাঙালির গতি ও গান। বুলেট বিদ্ধ সেদিনের সেই ইতিহাস আমাদের শেখায়, কীভাবে বুক চিতিয়ে লড়তে হয় অন্যায়ের নিখায়। শোষকেরা ভেবেছিল বুলেট দিয়ে স্তব্ধ করবে মুখ, তারা জানত না এতেই জন্ম নেবে হাজারো সুমুখ। ইতিহাস আজ রক্তে লেখা, বুলেট বিদ্ধ তার পাতা, যে পাতায় লেখা রয়েছে মায়ের ভাষার অমর গাথা।
আজ আমরা সেই ইতিহাসের পাতায় যখন চোখ বুলাই, শহীদদের রক্তের গন্ধ আজও আমরা অনুভব করি ভাই। বুলেট বিদ্ধ সে ইতিহাস আমাদের গর্বের ভূষণ, তাঁদের ত্যাগের কারণে আজ আমরা পেয়েছি ভূবন। সেই ইতিহাস যেন কোনো দিন না যায় ভুলে কেউ, আমাদের চেতনায় যেন জাগে সর্বদা প্রতিবাদের ঢেউ। বুলেট বিদ্ধ সেদিনের সেই ইতিহাস রবে চিরমর, বাঙালির আত্মমর্যাদার একমাত্র পবিত্র সেই দর।
তারিখ: ১৪-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৩৯
অ আ ক খ বর্ণমালা আজ রক্তে গেছে ভিজে, শহীদদের তাজা প্রাণে বর্ণগুলো পেল জীবন নিজে। যে বর্ণে মা ডাক শিখি, যে বর্ণে গাই গান, তার জন্য দিতে হলো কত না শহীদের প্রাণ। রক্তে লেখা সে বর্ণমালা আজ আমাদের অহংকার, বিশ্বের কোনো ভাষায় নেই এমন সোনার মিনার। খোকা নিজের রক্ত দিয়ে লিখল ক খ গ, শোষকদের বিরুদ্ধে সে দিল এক দারুণ লগ্ন।
শহীদের রক্তে রাঙা সে বর্ণমালা আজ ঝিলমিল করে, আমাদের পাঠ্যবইয়ে তা আলো ছড়ায় ঘরে ঘরে। রক্ত ছাড়া কি কোনো ভাষা এমন অমর হয়? একুশ প্রমাণ করল তা ঘুচিয়ে সমস্ত ভয়। প্রতিটি হরফের মাঝে লুকিয়ে আছে একেকটি প্রাণ, যাঁরা ভাষার জন্য উৎসর্গ করেছেন নিজের নিদান। শহীদের রক্তে লেখা এই বর্ণমালা মোদের গর্ব, এর চেয়ে মূল্যবান তো নেই কো কোনো সর্বস্ব।
আজ আমরা যখন গর্ব করে পড়ি বাংলা ভাষায়, মনে পড়ে শহীদের সেই রক্তের কথা আশায়। শহীদের রক্তে লেখা সে বর্ণমালা চিরকাল রবে বেঁচে, আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় পরম যত্নে সেঁচে। কেউ যদি এই ভাষার ওপর আঘাত হানতে চায় ফের, আমরা আবার গর্জে উঠব রক্তের নদী ঠেলে বের। শহীদের রক্তে লেখা এই পবিত্র বর্ণমালা মোদের প্রাণ, এর সুরেই আমরা গাইব চিরকাল স্বাধীনতার গান।
তারিখ: ১৩-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৪০
ফাল্গুনের সেই সুন্দর দিনে বুক চেরা কান্না নামে, শহীদদের স্বজনেরা কাঁদে নদীর ওই কূলে দামে। বাতাসে কেবল ভেসে বেড়ায় হারানো খোকার সুর, মা তার বুক চাপড়ে কাঁদে চলে বহু দূরদূর। ফাল্গুন তো আসার কথা ছিল ফুলের সাজে সেজে, কিন্তু সে এল রক্তে ভেজা করুণ এক মজে সেজে। খোকাদের নিথর দেহ যখন ঘরে ফিরে এল সবে, কান্নায় তখন ভেঙে পড়ল চারিপাশের ছবি তবে।
বুক চেরা সে কান্নার আওয়াজ থামেনি তো সহজে, তা ছড়িয়ে পড়ল গ্রামে গঞ্জে দাবানল সেজে সেজে। ফাল্গুনের বাতাস সেদিন ভারী হয়েছিল শোকে, অশ্রু জমেছিল সেদিন প্রতিটি বাঙালির চোখে। মাতৃভাষার জন্য এমন বলিদান ইতিহাসে বিরল, মায়ের সেই বুক চেরা কান্না মুছে দিল সব গরল। ফাল্গুন আজ শোকের মাস এবং অহংকারের দিন, যে দিনেতে প্রাণ দিয়েছিল প্রবীণ ও নবীন।
আজও ফাল্গুন এলে আমাদের মনে জাগে সেই ব্যথা, শহীদদের ত্যাগের কথা মনে করে বলি কথা। ফাল্গুনের বুক চেরা সে কান্নার সুর আজও বাজে, আমাদের জাতীয় জীবনের এই বেদনাময় সাজে। তবু সে কান্না আজ শক্তিতে রূপ নিয়েছে বড়, আমরা যে একুশের চেতনায় বুক করি চওড়া ঝড়ো। ফাল্গুনের সেই কান্না আমাদের শিখিয়েছে বাঁচতে, মাথা উঁচু করে এই পৃথিবীতে নিজের জায়গা রাখতে।
তারিখ: ১২-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৪১
একুশ পরের উত্তাল ভোর এল নতুন বার্তা নিয়ে, শহীদদের রক্তমাখা পথ সবারে দিল দেখিয়ে। আর ঘরে বসে থাকার সময় তো নেই কো আর আজ, সবার চোখে প্রতিশোধের আগুন জ্বলার সাজ। ঢাকা শহর থমথমে কিন্তু ভেতরে তীব্র ক্ষোভ, পুলিশের পাহারা ভেদ করে জেগে উঠেছে লোক। খোকা আজ আরও বেশি সাহসী ও নির্ভীক প্রাণ, তার কণ্ঠে বেজে উঠেছে দাবানলের সমান গান।
উত্তাল সে ভোরে শহর দেখল নতুন এক সূর্য, যে সূর্যের আলোয় ঘুচে গেল সব ভীরু দৈর্ঘ্য। মানুষ রাস্তায় নেমে এল দলে দলে দলে, শহীদ মিনারের স্বপ্ন বুনল মনের মাঝে চলে। একুশ পরের সেই সকালটি ছিল ভীষণ ভয়ানক, শোষকদের হৃদয়ে তখন কাঁপছিল তীব্র ত্রাসানক। তারা বুঝল মানুষগুলোকে আর দাবানো যাবে না, এই দাবানল নেভানোর শক্তি কারো তো নেই না।
আজও একুশ পরের সেই ভোরের কথা মনে হলে, আমাদের রক্তে শিহরণ জাগে মনের অজান্তে চলে। উত্তাল সে সকাল আমাদের শিখিয়েছে লড়তে, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে কখনো পিছু না হটতে। সেদিনের সেই উত্তাল ভোরে যে বীজ রোপিত হলো, আজ তা বিশাল বৃক্ষ হয়ে ছায়া দিল ভালো। একুশ পরবর্তী সেই ইতিহাস চিরকাল রবে অমর, আমাদের না বলতে শেখার সবচেয়ে বড় সম্বর।
তারিখ: ১১-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৪২
২২ ফেব্রুয়ারির সকালে এল আরও এক শোকের সংবাদ, শফিউর রহমান শহীদ হলেন, থেমে গেল তাঁর সাধ। অফিসে যাওয়ার পথে তিনি পড়েছিলেন মিছিলে এসে, বুলেট এসে বুক ভেদ করল তাঁকে ভালোবেসে। তিনি তো ছাত্র ছিলেন না, ছিলেন এক সাধারণ মানুষ, তবু ভাষার টানে প্রাণ দিলেন, কাটিয়ে সব ফুস। খোকা তাঁর রক্তমাখা দেহ দেখে শপথ নিল নতুন করে, এই রক্তের হিসাব নেব আমরা শোষকদের ধরে।
শফিউরের আত্মদান প্রমাণ করল ভাষা আন্দোলন, শুধু ছাত্রের নয়, এ যে সবার প্রাণের রণ। বৃদ্ধ থেকে শিশু পর্যন্ত সবাই আজ এক কাতারে, শোষকদের পতন ছাড়া শান্তি নেই তো কোনো মারে। শফিউরের সেই রক্তে রাঙা সকালের আকাশ খানি, আজও আমাদের চেতনায় বাজায় ত্যাগের বাণী। তাঁর আত্মদান আমাদের জুগিয়েছে গভীর এক শক্তি, মাতৃভাষার প্রতি বাড়াল আরও অগাধ ভক্তি।
আজ শহীদ শফিউরের স্মৃতি আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরি, তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করি হাত দুটি ধরি। শফিউর রহমান তুমি চলে গেছ অমর লোকে আজ, তোমার রক্তে সেজে উঠেছে বাঙালির বিজয়ের সাজ। আত্মদানের সেই ইতিহাস আজও আমাদের কাঁদায় খুব, আবার সাথে সাথে বুক ফুলিয়ে চলতে শেখায় রূপ। শফিউর তোমার নাম ইতিহাসে চিরকাল রবে লেখা, আমাদের না বলতে শেখার তুমি যে এক মহান দেখা।
তারিখ: ১০-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৪৩
কিশোর বয়সে শফিক মিছিলে বাড়িয়েছিল পা, সে কি জানত তার জন্য অপেক্ষা করছে মৃত্যুমা? হাইকোর্টের মোড়ে পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়ল সে, রক্তে ভেসে গেল মাটি ফাল্গুনের এই আলোয় হেসে। কিশোর শফিকের আত্মদান কাঁপাল সারা নগর, এত ছোট একটা প্রাণ কেড়ে নিল পিশাচের দল ঘর। খোকা শফিকের নিথর দেহ বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল, শিশুর রক্তে ধন্য হলো বাংলা মায়ের আঁচল।
শহীদ শফিকের সেই পদচিহ্ন আজও রাজপথে আছে, কিশোরের সাহসিকতা অমর হয়ে বেঁচে আছে গাছে গাছে। সে তো ভয় পায়নি একটুও পুলিশের বন্দুক দেখে, মায়ের ভাষার মিছিলে সে হেঁটেছিল বুকটা রেখে। শফিকের আত্মদান আমাদের মনে করায় বারবার, বয়স তো কোনো বাধা নয় যখন দেশের অধিকার। কিশোর খোকার রক্তে লেখা হলো প্রতিবাদের পাঠ, শোষকদের মসনদ কেঁপে হলো চুরমার মাঠ।
আজ শহীদ শফিকের কথা ভাবলে বুক গর্বে ভরে, কত ছোট প্রাণ ঝরে গেল আমাদের এই তরে। শফিক তুমি অমর হয়ে আছ বাঙালির প্রতি প্রাণে, তোমার সাহসের কথা গাইব আমরা গানে গানে। মিছিলে তোমার সেই পা বাড়ানো আজও আমাদের টানে, অন্যায়কে না বলতে শেখার মন্ত্র বাজে কানে। শহীদ শফিক তোমার রক্তে কেনা এই যে স্বাধীন দেশ, তোমার ত্যাগের কথা ভুলবে না তো কেউ অবশেষ।
তারিখ: ০৯-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৪৪
রিকশাচালক আউয়াল ভাই চালাতেন যিনি রিকশা দিনে, ভাষার টানে তিনিও এলেন মিছিলেতে শরিকিনে। তিনি তো অক্ষর জানতেন না ঠিকমতো হয়তো ভাই, কিন্তু মায়ের ভাষার টান তো সবার চেয়ে বড় ঠাঁই। পুলিশের গুলি এসে ভেদ করল তাঁর মেহনতি বুক, মুহূর্তে হারিয়ে গেল তাঁর সেই সাধারণ মুখের সুখ। আউয়ালের রক্তে মিশে গেল রিকশার ওই চাকা, মেহনতি মানুষের ত্যাগে ইতিহাস হলো ঢাকা।
শ্রমিক-মজুর সবাই সেদিন নেমে এল রাজপথে, আউয়ালের রক্ত দেখে বাঁধল তারা জোট রথে। খোকা দেখল রিকশাচালকের এই মহান বলিদান, ভাষার লড়াইয়ে সবাই সমান, সবার সমান মান। আউয়ালের রক্ত প্রমাণ করল ভাষা কোনো শ্রেণি নয়, এ হলো এ দেশের প্রতিটি মানুষের মহা জয়। মেহনতি মানুষের এই আত্মত্যাগ চিরকাল রবে মনে, তাঁদের রক্তেই তো আজ আমরা মুক্ত স্বাধীন বনে।
আজ শহীদ আউয়াল ভাইয়ের কথা শ্রদ্ধার সাথে বলি, তাঁদের রক্তে পবিত্র হলো আমাদের এই ধূলিমূলি। রিকশাচালক আউয়াল তুমি সাধারণ নন কভু ভাই, তুমি যে এ জাতির মুক্তিসেনার অন্যতম এক ঠাঁই। তোমার রক্তের দাগ আজও মুছে যায়নি এ মাটি থেকে, আমাদের চেতনায় তুমি বেঁচে আছ বুকটা রেখে। আউয়াল তোমার আত্মদান আমাদের শিখিয়েছে শ্রম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে হবে হয়ে অবিনাশ যম।
তারিখ: ০৮-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৪৫
অলিউল্লাহ শহীদ হলেন ২২ কিংবা ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, রক্তে রঙিন হয়ে গেল ফুলবাড়ীয়া ও নওয়াবপুর বাড়ি। তাঁর তাজা প্রাণ ঝরে গেল শোষকদের গুলিতে আজ, ভাষার দাবিতে জীবন দেওয়া কত বড় যে কাজ। অলিউল্লাহর শাহাদত আমাদের বাড়াল প্রতিবাদের জোর, রক্তের ওপর ভেসে উঠল নতুন দিনের সেই ভোর। খোকা তাঁর মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে নিল যে শপথ, এই রক্ত বৃথা যেতে দেব না, এটাই আমাদের পথ।
অলিউল্লাহ চলে গেলেন না ফেরার দেশে চিরতরে, কিন্তু রেখে গেলেন অমর এক ত্যাগের ধারা ঘরে ঘরে। তাঁর শাহাদতের খবর শুনে কেঁপে উঠল সারা দেশ, শোষকদের বিরুদ্ধে দাবানল ছড়িয়ে পড়ল অবশেষ। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ছাত্র ও শিক্ষক, সবাই আজ গর্জে উঠল শানিয়ে প্রতিবাদের চক। অলিউল্লাহর রক্তে ভেজা সেদিনের সেই মাটি, আজও আমাদের কাছে পবিত্র এবং শতভাগ খাঁটি।
আজ শহীদ অলিউল্লাহকে স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধায়, তাঁর আত্মত্যাগের কথা লেখা আছে আমাদের হৃদয়ায়। অলিউল্লাহ তোমার শাহাদত আমাদের দীক্ষা দেয়, অত্যাচারের সামনে কখনো মাথা নত করতে নেয়। তোমার রক্তে অর্জিত হয়েছে আমাদের এই ভাষা, তোমাকে হারানোর বেদনা আজও আমাদের দীর্ঘশ্বাসা। অলিউল্লাহ তুমি অমর হয়ে আছ বাঙালির ইতিহাসে, তোমার বীরগাথা বেজে ওঠে আজও বাতাসে বাতাসে।
তারিখ: ০৭-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৪৬
ফুলবাড়ীয়ার সেই মিছিলে চলল পাশবিক নির্যাতন, পুলিশ ও পেটোয়া বাহিনী চালাল নরকের রণ। লাঠির বাড়ি আর বেয়নেটের খোঁচায় জর্জরিত দেহ, রক্তে ভেসে গেল প্রাঙ্গণ, রক্ষা পেল না তো কেহ। ছাত্র-জনতা কেউ তো ছাড় পেল না সেদিন সেখানে, শোষকদের বর্বরতা ছাড়িয়ে গেল সব সীমানায় গানে। খোকা নিজের চোখে দেখল সেই পৈশাচিক সব কাণ্ড, তার মনে তখন জ্বেলে উঠল প্রতিশোধের খণ্ড খণ্ড।
নির্যাতনের মাত্রা যতই বাড়াল ওই নরপিশাচ দল, ততই যেন বেড়ে গেল বাঙালির সাহসের বল। ফুলবাড়ীয়ার রাজপথ সেদিন কেঁদেছিল খুব শোকে, অত্যাচারীর নিষ্ঠুরতা প্রকাশ পেল সবার চোখে। কিন্তু নির্যাতন করে কি কখনো দাবানো যায় মন? তা তো কেবল উসকে দেয় প্রতিবাদের শিহরণ। ফুলবাড়ীয়ার সেদিনের সেই কালো রাতের ছায়া, আমাদের আত্মত্যাগের রক্তিম করেছে মায়ের কায়া।
আজ ফুলবাড়ীয়ার সেই ঘটনার কথা মনে পড়লে আজ, আমাদের মনে জেগে ওঠে প্রতিবাদের কঠিন সাজ। সেদিনের সেই পাশবিক নির্যাতন আমাদের শিখিয়েছে পাঠ, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে সবসময় সোজা রাখতে হয় খাট। যাঁরা সেদিন ফুলবাড়ীয়ার মিছিলে সহ্য করেছিলেন মার, আমাদের এই স্বাধীনতার তাঁরাই তো আসল আধার। ফুলবাড়ীয়ার সেই ইতিহাসের পাতা রক্তাক্ত হলেও সত্য, তার মধ্য দিয়েই অর্জিত হয়েছে আমাদের এই নত্য।
তারিখ: ০৬-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৪৭
দাবি আদায়ের এই মিছিল দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল, শোষকদের বুনিয়াদ তখন টলমল করে নড়ে উঠল। রফিক সালাম বরকত জব্বারের রক্ত বৃথা যায়নি, সেই রক্তে দাবানল জ্বলে উঠল সারা দেশ জানি। ঢাকা থেকে গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ল সে আগুন, শোষকদের মসনদে যেন নামল হঠাৎ ফাগুন গুণ। খোকা সেই দাবানলের এক অগ্রপথিক হয়ে আজ, শত্রুর চোখে চোখ রেখে চালাচ্ছে তার এই কাজ।
দাবানলের সেই আগুনে পুড়ল শোষকদের যত চক্রান্ত, তাদের সমস্ত কালো আইন হলো চিরতরে পঙ্গুান্ত। মানুষ আর ভয় পায় না বন্দুক আর পুলিশ দেখে, সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ল বুকটা সোজা করে রেখে। দাবুানল তো নেভানো যায় না জল ঢেলে কোনো দিন, তা আরও বেড়ে যায় যখন জ্বলে প্রবীণ ও নবীন। শোষকেরা তখন বুঝতে পারল তাদের পতন অনিবার্য, বাঙালির এই দাবানলের সামনে সবাই পরাজিত বাধ্য।
আজও সেই দাবানলের তেজ আমাদের রক্তে বয়, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়ার চিরন্তন জয়। দাবুানল আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে প্রতিরোধ করতে হয়, অন্যায়কে না বলতে শিখলে কোনো পরাজয় নয়। সেদিনের সেই আগুনে পোড়া পবিত্র ওই মাটি, আজ আমাদের স্বাধীন বাংলার সবচেয়ে বড় খাঁটি। দাবুানলের সে ইতিহাস আমাদের হৃদয়ে জ্বলে চিরকাল, তার আলোয় আলোকিত হোক আমাদের প্রতিটি সকাল।
তারিখ: ০৫-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৪৮
মায়ের আঁচলে ঢাকা পড়ে আছে প্রতিবাদের আগুন, যিনি হারিয়েছেন তাঁর খোকাকে ফাগুনের এই গুণ। সে মা আর শুধু নিজের খোকার নয়কো মা একা, তিনি হয়ে গেছেন আজ বাংলার সব মায়ের দেখা। আঁচল দিয়ে মুছে নেন তিনি অন্য খোকার রক্ত, তাঁর ভেজা চোখে জ্বলে ওঠে প্রতিবাদের শক্ত শক্তি। খোকা গিয়ে মাকে বলে— মাগো কেঁদো না আর বেশি, তোমার খোকার রক্তের বদলা নেব আমরা আসি।
মায়ের আঁচলের সেই আগুন ছড়িয়ে গেল ঘরে ঘরে, প্রতিটি মা আজ নিজের খোকাকে পাঠাল রণে লড়ে। আর বাধা দেওয়া যাবে না তো কোনো নারীর বুক, তাঁদের দীর্ঘশ্বাসে পুড়ে ছারখার হবে শোষক মুখ। মায়ের আঁচলের সে আগুন বড় পবিত্র ও মহান, যে আগুনে পুড়ে মরে শোষকদের সব শয়তান। বাংলার মায়েরা সেদিন যা করেছিল ইতিহাস হয়ে, তা আজও আমাদের প্রেরণা জোগায় হৃদয় ধুয়ে।
আজ শহীদ জননী ও মায়ের সেই আঁচলের কথা মনে, শ্রদ্ধায় আমাদের মাথা নত হয়ে আসে মনে প্রাণে। মায়ের আঁচলে লুকানো প্রতিবাদের সেই আগুন আজও, আমাদের চেতনায় জ্বালিয়ে রাখে প্রতিবাদের জাদু। মাতৃভাষার জন্য মায়ের এই ত্যাগ তুলনাহীন, তাঁদের ঋণ শোধ করার সাধ্য কার আছে প্রবীণ? মায়ের আঁচলের সে আগুন চিরকাল রবে প্রজ্জ্বলিত, আমাদের স্বাধীনতা ও ভাষার সবচেয়ে বড় নিশ্চিত।
তারিখ: ০৪-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৪৯
বুলেটের সামনে বুক পেতে দিল সাধারণ জনতা, ভয় বলে কিছু নেই তো তাদের মনে কোনো কথা। তারা জানে সামনে মৃত্যু, হাতে নেই কোনো অস্ত্র, তবু মায়ের ভাষার টানে তারা বীরের মতো বস্ত্র। পুলিশ যখন গুলি চালাল তাদের বুক লক্ষ্য করে, তারা একটুও পিছপা হলো না তো ভয়ে ভরে। খোকা তাদের সবার আগে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে, শোষকদের বন্দুকের নল ফেলল নিমিষে ধূলিয়ে।
বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়ার এই দৃশ্য দেখে, পিশাচেরাও কেঁপে উঠল ভয়ে নিজের মনে রেখে। এমন জাতি কেউ দেখেনি যারা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে, মাতৃভাষার গান গায় বুকটা আরও বাড়িয়ে। জনতার এই সাহসিকতা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল, তাঁদের রক্তের প্লাবনে ভেসে গেল সমস্ত গরল। বুলেট তো শরীর ভেদ করতে পারে কেবল ভাই, কিন্তু বাঙালির এই চেতনা আটকাবে কার ঠাঁই?
আজ সেই বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়া বীরদের, আমরা স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধায় মোদের তীরের। তাঁদের এই আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে, মৃতের মতো বেঁচে না থেকে বীরের মতো বাঁচতে হবে। বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়ার সেই ইতিহাস আজও, আমাদের মেরুদণ্ড শক্ত করে তৈরি করে জাদু। জনতার সেই অদম্য সাহস আমাদের শাশ্বত গর্ব, তাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে পেয়েছি আমরা এই সর্বস্ব।
তারিখ: ০৩-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৫০
গুলি চলল, মানুষ মরল, ঝরল তাজা প্রাণ, তবু তো থেমে থাকেনি কোনো মিছিল বা গান। এক মিছিলে রক্ত ঝরলে অন্য মিছিল এসে, শূন্য জায়গা পূর্ণ করল বুকটা ভালোবেসে। শোষকেরা ভেবেছিল লাশ পড়লে ভয় পাবে লোক, কিন্তু তাদের সে ধারণা হলো মিথ্যা ও অশোক। খোকা শহীদ হলে পরে আরেক খোকা এসে, হাতে প্ল্যাকার্ড তুলে নিলো মুখে হাসি হেসে।
মিছিল তো আর থামার নয়, এ যে নদীর স্রোত, বাধা যতই আসুক না কেন মানবে না তো রোদ। শহীদদের রক্তমাখা পথ বেয়ে হাজারো জনতা, এগিয়ে চলল লক্ষ্য পানে ভুলে সব যাতনা। থেমে থাকেনি কোনো মিছিল সেদিন রাজপথে, সবাই স্লোগান তুলল আবার এক সাথে রথে। শোষকদের সমস্ত দমনপীড়ন হলো ব্যর্থ আজ, জনতার এই মিছিল পেল অমর প্রতিবাদের সাজ।
আজও যেকোনো আন্দোলনে যখন নামে মানুষের ঢল, মনে পড়ে একুশের সেই থেমে না যাওয়া দল। থেমে থাকেনি কোনো মিছিল— এই কথাটি প্রমাণ করে, ন্যায্য দাবি আদায় হয় মানুষের জোরে জোরে। সেদিনের সেই মিছিলে যারা হেঁটেছিল বুক চিরে, আমাদের মানচিত্রে তাদের নাম সোনায় লেখা ঘিরে। মিছিল আজও চলে অবিরাম মায়ের ভাষার টানে, আমাদের না বলতে শেখার ইতিহাস বাজে গানে।
তারিখ: ০২-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৫১
কলম বনাম অস্ত্রের লড়াই শুরু হলো সেদিন রণে, একপাশে কালা কানুন, অন্যপাশে তরুণ মনে। সাহিত্যিকরা কলম ধরল, ছাত্ররা ধরল বুক, শোষকদের অস্ত্রের মুখে জবাব দিল একমুখ। কলমের কালিতে লেখা হলো প্রতিবাদের কাগজ, অস্ত্রের মুখে দাঁড়িয়ে গেল সাহসের সেই সাজ। খোকা একদিকে স্লোগান দিল, অন্যদিকে লিখে গেল নাম, কলমের সে শক্তির কাছে হেরে গেল রাজার দাম।
অস্ত্র দিয়ে কি কখনো কলমের ভাষা থামে? তা তো ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে এবং গ্রামে গ্রামে। কলম দিয়ে রচিত হলো একুশের অমর সাহিত্য, যে সাহিত্যে প্রকাশ পেল বাঙালির আসল চিত্ত। অস্ত্র তো কেবল রক্ত ঝরায়, প্রাণ নিতে জানে, কিন্তু কলম বাঁচিয়ে রাখে অমর হয়ে প্রাণে। কলম ও অস্ত্রের এই লড়াইয়ে জিতেছিল কলম, শোষকদের অস্ত্র তখন হয়ে গেল একেবারে অলম।
আজ আমাদের হাতে কলম আছে, অস্ত্রের প্রয়োজন নেই, সেদিনের সেই কলমযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানাই তেনেই। কলম ও অস্ত্রের সে লড়াই আমাদের শিখিয়েছে পাঠ, জ্ঞানের শক্তি অনেক বেশি অস্ত্রের ওই মাঠ। সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা সেদিন কলম চালিয়ে, বাঙালির অধিকারগুলো রেখেছিলেন সামনে বাড়িয়ে। কলমের সে শক্তির ইতিহাস আজও আমাদের টানে, আমাদের না বলতে শেখার গান বাজে তার গানে।
তারিখ: ০১-০১-২০২২ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৫২
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আর প্রাজ্ঞ বুদ্ধিজীবীগণ, ড্রয়িংরুম ছেড়ে এলেন রাজপথে করে গর্জন। তাঁদের দ্রোহী ভাবনাগুলো রূপ নিল মিছিলে আজ, কলম ছেড়ে তাঁদের হাতেও প্রতিবাদের সাজ। ডক্টর শহীদুল্লাহ থেকে শুরু করে আরও কত জন, বাঙালির পক্ষে কথা বললেন করে দৃঢ় পণ। খোকা তাঁদের পেছনের সারিতে থেকে শক্তি পায়, বুদ্ধিজীবীদের সেই নেতৃত্ব আলোর পথ দেখায়।
দ্রোহী সে ভাবনাগুলো বই আকারে ছড়িয়ে গেল দেশে, শোষকদের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব গেল ভেসে। তাঁরা প্রমাণ করলেন বাংলা ভাষার ইতিহাস কত প্রাচীন, তাকে অস্বীকার করা মানে মূর্খতার চরম প্রবীণ। বুদ্ধিজীবীদের সেই ভূমিকা ছিল অনন্য ও বিশাল, তাঁদের মেধার জোরে ভেঙে গেল শোষকদের মশাল। শিক্ষক সমাজ রাজপথে নামলে ছাত্ররা পায় জোর, অন্ধকার ভেদ করে ফাটল প্রতিবাদের নতুন ভোর।
আজ সেই বুদ্ধিজীবীদের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরি, তাঁদের দ্রোহী ভাবনা আমাদের চেতনায় ধারণ করি। বুদ্ধিজীবীদের সে অবদান চিরকাল রবে অমর, আমাদের জাতীয় মুক্তির তাঁরা তো প্রথম সম্বর। মেধা ও মননের লড়াইয়ে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁদের ত্যাগের কারণে আমরা আজ স্বাধীন মিলেছেন। দ্রোহী সে ভাবনার ইতিহাস আজও আমাদের শেখায়, জ্ঞানের আলোয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয় কোথায়।
তারিখ: ৩১-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৫৩
শ্রমিকের ঘামে ভেজা শরীর, কঠোর তাদের হাত, তাঁরাও সেদিন নেমে এলেন মিছিলে দিন ও রাত। কারখানার চাকা থামিয়ে, রিকশার প্যাডেল ছেড়ে, ভাষার টানে সবাই এলেন শোষকদের চোখ এড়িয়ে তেড়ে। তাঁদের গলার স্লোগান ছিল মাটির মতো খাঁটি, শোষকদের মসনদ কাঁপিয়ে দিল মেহনতি সেই মাটি। খোকা শ্রমিকের হাত ধরে হাঁটল মিছিলে সাথে, গরিব-দুঃখীর এই ঐক্য দেখে জ্বলল শোষক রাতে।
শ্রমিকের ঘাম আর শহীদের রক্ত মিশে গেল একাকার, ভাষা আন্দোলনের ময়দান হলো সবার অধিকার। শ্রমিক তো শুধু নিজের পেটের ভাত খোঁজে না তো ভাই, মাতৃভাষার সম্মান রক্ষায় তারা সবার আগে যাই। তাঁদের স্লোগান ধ্বনিত হলো ঢাকার রাজপথে, শোষকদের পেটোয়া বাহিনী থমকে গেল রথে। শ্রমিকের এই অংশগ্রহণ আন্দোলনকে দিল ভিন্ন রূপ, তা পরিণত হলো গণমানুষের মুক্তির এক রূপ।
আজ শ্রমিকের সেই অবদানের কথা স্বীকার করি গভীর, তাঁরাই তো এ দেশের প্রাণ, এ দেশের আসল বীর। শ্রমিকের ঘামে ভেজা সে স্লোগান আজও আমাদের কানে, প্রতিবাদের আগুন জ্বেলে দেয় বাঙালির ওই প্রাণে। মেহনতি মানুষের সাথে হাত মিলিয়ে চললে পরে, কোনো অন্যায় টিকে থাকে না এই ধরণীর পরে। শ্রমিকের সে লড়াইয়ের ইতিহাস আমাদের শেখায় পাঠ, শোষণহীন সমাজ গড়তে ভাঙতে হবে সব ঘাট।
তারিখ: ৩০-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৫৪
শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে শিক্ষক এলেন রাজপথে আজ হেঁটে, ছাত্রদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন বুকটা পেতে। তাঁদের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো সত্য ও ন্যায়ের বাণী, শিক্ষক তো জাতির বিবেক, এ কথা সবাই জানি। তারা শিখিয়েছিলেন কীভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়, কীভাবে ভাষার জন্য জীবন দিয়েও পাওয়া যায় জয়। খোকা শিক্ষকের হাত ধরে মিছিলে হাঁটল সোজা, শিক্ষকের আদর্শ পাঠে ঘুচে গেল ভয়ের বোঝা।
শিক্ষকেরা সেদিন প্রমাণ করলেন শুধু বইয়ের পাতা নয়, বাস্তব জীবনেও আদর্শের লড়াই করতে হয় জয়। পুলিশ যখন লাঠি চালাল শিক্ষকের গায়ে এসে, рым তারা একটুও পিছপা হলেন না তো ভালোবেসে। শিক্ষকের রক্ত ঝরল সেদিন তিলে তিলে মাটিতে, ছাত্ররা তখন আরও বেশি তেজী হলো লড়াই জিতে। শিক্ষকের সেই আদর্শ পাঠ আজও আমাদের মনে রয়, অত্যাচারীর সামনে মাথা নত না করার মহা জয়।
আজ শিক্ষকদের প্রতি জানাই আমরা গভীর সম্মান, তাঁদের আদর্শ ছাড়া তো বাঁচে না কোনো প্রাণ। শিক্ষকের সেই রাজপথের পাঠ আমাদের মূল দীক্ষা, নৈতিকতার আলো জ্বেলে পাওয়া জীবনের শিক্ষা। যাঁরা সেদিন শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে রাজপথ বেছে নিলেন, আমাদের না বলতে শেখার গুরু তাঁরাই তো হলেন। শিক্ষকের আদর্শ পাঠ চিরকাল আমাদের পথ দেখাবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তি পাবে।
তারিখ: ২৯-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৫৫
রাস্তাঘাট ছাপিয়ে এল সাধারণ জনতার ঢল, কে ছাত্র কে শিক্ষক আজ কে চেনে সে দলবল। রিকশাচালক, কুলি, মুটে, গৃহবধূ ও দোকানদার, সবাই মিলে একাকার হলো ভাষার অধিকার। ঢেউয়ের মতো মানুষ এসে ভরাট করল শহর, শোষকদের চোখ ছানাবড়া দেখে এমন প্রহর। খোকা সে জনতার মাঝে হারিয়ে গেল খুশিতে, সবাই যেন এক পরিবারের মানুষ আজ মিশিতে।
সাধারণ মানুষের এই বিশাল ঢল আটকাবে কে আর? বন্যা যেমন সব ভাসিয়ে নেয়, তেমনি তাদের টার। তারা কোনো রাজনীতি বোঝে না তো, বোঝে মায়ের ভাষা, যে ভাষার জন্য তাদের বুকে রয়েছে গভীর আশা। জনতার এই ঢল দেখে থমকে গেল পুলিশ বাহিনী, এত মানুষ কোথায় পেল তিল ধারণের ঠাঁই নি। সাধারণ জনতার এই ঐক্যই হলো আসল শক্তি, যার সামনে হেরে যায় শোষকদের যত ভক্তি।
আজ সাধারণ জনতার সেই ঢলের কথা মনে হলে, আমাদের বুকের ভেতর গর্বের এক নদী চলে। সেদিনের সেই জনতার ঢল আমাদের শিখিয়েছে ভাই, সবার শক্তি এক হলে কোনো হার মানি না তাই। সাধারণ মানুষের সেই মিছিলে যারা ছিল শরিক, আমাদের এই ইতিহাসের তারাই তো মূল পথিক। জনতার সেই ঐক্য ও ঢল আজও আমাদের প্রেরণা, না বলতে শেখার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঠিকানা।
তারিখ: ২৮-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৫৬
সন্ধ্যা নামে ঢাকার শহরে, কিন্তু ফেরে না কেউ ঘরে, সবাই আজও রাজপথে আছে প্রতিবাদের ঝড় করে। মায়ের চিন্তা খোকা কোথায়, স্ত্রী ভাবে স্বামী কই? কিন্তু আজ ঘরে ফেরার সময় তো নয় কোনো ওহি। ভাষা যখন বিপন্ন আজ, অস্তিত্ব যখন সংকটময়, ঘরে বসে থাকা মানে তো নিজের পরাজয়। খোকা মায়ের নিষেধ শুনেও ফেরে না তো কুটিরে, সে রয়ে গেছে মিছিলে আজ স্লোগান মুখে ঘিরে।
কেউ ফেরে না আপন ঘরে, সবাই আছে রাস্তায়, অজানা আশঙ্কায় বুক কাঁপলেও কেউ তো পালায় না রায়। রাতের অন্ধকারে মোমবাতি জ্বেলে প্রতিবাদ চলে, শহীদদের স্মরণে সবাই চোখের জল ফেলে জলে। ঘরে না ফেরার এই ব্যাকুলতা প্রমাণ করে দিল আজ, বাঙালি জাতি আপস করে না পেয়ে কোনো সাজ। শোষকদের ঘুম হারাম হলো এই দৃশ্য দেখে, মানুষগুলো ঘরে না ফিরে পাহারা দিচ্ছে রেখে।
আজও যখন অধিকারের লড়াইয়ে নামে এ দেশের লোক, মনে পড়ে সেই ঘরে না ফেরার রাতের শোক ও শোক। সেদিনের সেই ঘরে না ফেরা আমাদের শিখিয়েছে ত্যাগ, লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত থামতে নেই কোনো রাগ। যাঁরা সেদিন ঘর ছেড়েছিলেন ভাষার টানে বাইরে, তাঁদের ত্যাগের কথা লেখা আছে আমাদের ডায়েরি ডারে। ঘরে না ফেরার সে ইতিহাস আজও আমাদের কাঁদায় খুব, আমাদের না বলতে শেখার এটি এক অনন্য রূপ।
তারিখ: ২৭-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০stringProp (Note: Continuing strict 28-line constraints and historical dates moving backwards)
ভাষার এমন চুম্বক টান কে দেখেছে কভু আগে? টেনে আনল জনস্রোত যেন কোনো অদৃশ্য রাগে রাগে। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে খবর পৌঁছে গেল দ্রুত বেগে, শহরের রাজপথে আজ মানুষ উঠেছে জেগে। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা পার হয়ে নৌকা বোঝাই লোক, এসে জমা হলো ঢাকায় কাটায়া সমস্ত শোক। খোকা সেই জনস্রোতের মাঝে দাঁড়িয়ে উড়ায় নিশান, তার কণ্ঠে ধ্বনিত হলো মায়ের ভাষার গান।
জনস্রোতের সেই প্রবল স্রোতে ভেসে গেল সব বাধা, পুলিশের ব্যারিকেড হলো খণ্ড খণ্ড গাধা। ভাষার টানে এমন মিলন দেখেনি তো দুনিয়া, সবাই যেন এক সূত্রে বাঁধা সুন্দর জুনিয়া। কেউ কাউকে চেনে না তবু সবাই আজ আপন ভাই, মাতৃভাষার অধিকার ছাড়া অন্য কোনো দাবি নাই। জনস্রোতের এই বিশাল রূপ কাঁপাল প্রভুর মন, শোষকদের মসনদে তখন নামল ত্রাসের রণ।
আজও ভাষার টানে যখন মানুষ এক হয় এসে, মনে পড়ে একুশের সেই জনস্রোত ভালোবেসে। ভাষার টানের এই ইতিহাস আমাদের সবচেয়ে বড় গৌরব, যে গৌরবে ধন্য হলো আমাদের এই পূর্ব দিক প্রভব। সেদিনের সে জনস্রোত আমাদের শিখিয়েছে ঐক্য, সবাই মিলে লড়লে জয় নিশ্চিত আমাদের লক্ষ্য। ভাষার টানের সেই অমর গাথা চিরকাল রবে বেঁচে, আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় পরম যত্নে সেঁচে।
তারিখ: ২৬-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৫৮
সাহিত্যিকেরা কলম ধরে লিখলেন শাণিত পঙ্ক্তি, শব্দ দিয়ে গড়ে তুললেন প্রতিবাদের শক্ত শক্তি। কবিতায় এল দ্রোহের আগুন, গল্পে এল গান, ভাষার জন্য উৎসর্গ করলেন নিজেদের সব প্রাণ। মাহবুব উল আলম চাষী কিংবা অন্য কলমকার, সবার হাতে তখন ছিল ভাষার অধিকার। খোকা কবিতা পড়ে মিছিলে চড়ায় গলার জোর, সাহিত্যিকদের পঙ্ক্তিমালা এনে দিল নতুন ভোর।
শাণিত সে পঙ্ক্তিগুলো তলোয়ারের চেয়েও ধারালো, শোষকদের কলিজা তাতে একদম জখম হলো। বইয়ের পাতায় ছাপার অক্ষরে বিদ্রোহের সেই বাণী, ঘুরে বেড়াল ঘরে ঘরে শুনিয়ে ত্যাগের বাণী। সাহিত্যিকরা ভয় পেলেন না শাসককে একটুও, কলমের ডগায় ফুটিয়ে তুললেন প্রতিবাদী মধু। তাঁদের সেই পঙ্ক্তিমালা আজ ইতিহাসের দলিল, যে দলিলে মুছে গেছে শোষকদের সব খিল।
আজ সাহিত্যিকদের সেই শাণিত পঙ্ক্তিগুলো পড়ি, তাঁদের প্রতি জানাই আমরা শ্রদ্ধা হাত দুটি ধরি। সাহিত্যিকদের সে অবদান চিরকাল রবে অম্লান, তাঁদের লেখায় প্রাণ পেয়েছিল বাঙালির অমর গান। যাঁরা সেদিন কলম ধরে লড়াই করেছিলেন মাঠে, আমাদের না বলতে শেখার গুরু তাঁরাই তো বটে। শাণিত পঙ্ক্তির সে ইতিহাস আজও আমাদের জাগায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখায়।
তারিখ: ২৫-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৫৯
পুরুষ নয় শুধু, নারীরাও সেদিন ফেলল সাহসী পা, ঘর ছেড়ে রাজপথে এল ভেঙে সব লোকলজ্জা মা। হাতে কালো পতাকা নিয়ে নারীদের বিশাল মিছিল, শোষকদের বুনিয়াদ তখন কাঁপাল খিলখিল। প্রীতিলতা কিংবা রোকেয়ার সেই রক্তিম আদর্শ নিয়ে, বাঙাল নারীরা নামল মাঠে জীবন বাজি দিয়ে। খোকা দেখল বোনের চোখে কেমন আগুন জ্বলে, নারীদের এই অংশগ্রহণ আন্দোলন পেল বলে।
পুলিশ লাঠি চালাতে চাইল নারীর গায়েও এসে, কিন্তু নারীরা পিছপা হলো না তো একটুও হেসে। তাঁদের স্লোগানে প্রকম্পিত হলো ঢাকার আকাশ বাতাস, শোষকদের পেটোয়া বাহিনী ফেলল দীর্ঘশ্বাস। নারীদের এই সাহসী পদক্ষেপ প্রমাণ করল সেদিন, ভাষার লড়াইয়ে পিছিয়ে নেই কোনো প্রবীণ নবীন। মায়েরা, বোনেরা, ছাত্রীরা সবাই মিলে একাকার, গড়ে তুলল প্রতিবাদের এক বিশাল অধিকার।
আজ নারী সমাজের সেই সাহসী ভূমিকার কথা স্মরি, তাঁদের ত্যাগের মহিমায় আমরা গর্বিত মন করি। নারীদের সেদিনের সেই পদক্ষেপ আমাদের প্রেরণা দেয়, অত্যাচারীর সামনে নারীরাও কোনো দিন ভয় পায় নেয়। মায়ের ভাষার দাবিতে নারীদের রক্ত ও ঘাম মিশে, আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে ভালোবেসে বিষে। নারীর সাহসী সে ইতিহাস চিরকাল রবে অমর, আমাদের না বলতে শেখার অন্যতম প্রধান সম্বর।
তারিখ: ২৪-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৬০
রাজপথ ছাড়িয়ে একুশ ছড়িয়ে পড়ল গ্রামে গ্রামে, বাংলার ঘরে ঘরে আজ আগুন জ্বলে দামে দামে। শহরের খবর পৌঁছে গেল নদীর বাঁকে বাঁকে, কেউ আর বসে রইল না ঘরের কোণে ফাঁকে। বৃদ্ধ খোকা থেকে শুরু করে ছোট শিশু খোকা, সবার মুখে রাষ্ট্রভাষা বাংলার সেই জোকা জোকা। খোকা বাড়ি ফিরে দেখল মা প্রদীপ জ্বেলে বসে, গ্রামের মানুষ আলোচনা করছে কান্নায় ও হেসে।
বাংলার ঘরে ঘরে সেদিন এল এক নতুন হাওয়া, সবার মনে একটাই জেদ, বাংলা আমাদের পাওয়া। চাষীর কুটিরেও আলোচনা চলে ভাষা নিয়ে আজ, শোষকদের বিরুদ্ধে সবার মনে প্রতিবাদের সাজ। ঘরে ঘরে এই একুশ পৌঁছানোই ছিল আসল জয়, শোষকেরা বুঝল পুরো দেশ আজ তাদের বিরুদ্ধে ময়। কাউকে আর দাবিয়ে রাখা যাবে না তো কভু, সবার রক্তে মিশে গেছে প্রতিবাদের এই মধু।
আজও একুশ মানে শুধু ঢাকা শহরের রাজপথ নয়, একুশ মানে বাংলার প্রতি ঘরে মানুষের জয়। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে একুশের চেতনা ছড়িয়ে পড়ে, আমাদের আত্মমর্যাদার আলো জ্বেলে ঘরে ঘরে। বাংলার ঘরে ঘরে একুশের সেই অমর চেতনা, আমাদের না বলতে শেখার সবচেয়ে বড় ঠিকানা। সেদিনের সেই ঘরে ঘরে পৌঁছানো ভাষা আন্দোলনের ধারা, আজ আমাদের সারা দেশের লাখো কোটি তারা।
তারিখ: ২৩-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৬১
রাতের আঁধারে ছাত্ররা মিলে গজল প্রথম মিনার, ঢাকা মেডিকেলের হোস্টেলে বসল যে তার মিনার। ইট আর সিমেন্ট দিয়ে অত্যন্ত যত্নে ও গোপনে, শহীদদের স্মৃতির মিনার গড়ে তুলল মনে প্রাণে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের ওই নীরবতায়, তৈরি হলো স্মৃতিস্তম্ভ সবার অজান্তে ওতায়। খোকা নিজের হাতে ইট গেঁথে দিল মিনার গায়ে, রক্তের ঋণ শোধ করতে চলল আপন ছায়ে।
সে মিনার ছিল ছোট কিন্তু তার মাহাত্ম্য বিশাল, শোষকদের রাতের ঘুমে হানল যে সে মশাল। সকালে মানুষ এসে দেখল দাঁড়িয়ে আছে মিনার, সবার চোখে আনন্দের জল, বুকের মাঝে মিনার। পুলিশ এসে ভাঙতে চাইল সেই প্রথম মিনার খানি, 말 কিন্তু মানুষের ভালোবাসার শক্তি কত তা জানি। ভাঙলেও তা মন থেকে তো মোছা যাবে না কো কভু, শহীদ মিনার হয়ে উঠল বাঙালির পবিত্রমধু।
আজ আমরা যেখানেই যাই দেখি শহীদ মিনার, আমাদের জাতীয় অহংকার ও ভালোবাসার মিনার। রাতের আঁধারে গড়া সেদিনের সেই প্রথম মিনার আজ, সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে জ্বেলেছে আলোর সাজ। সেদিনের সেই আত্মগোপনে গড়া মিনারের ইতিহাস, আমাদের হৃদয়ে যোগ করে আজও গভীর বিশ্বাস। শহীদ মিনার আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে স্মৃতি রাখতে হয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অমর হতে হয় জয়।
তারিখ: ২২-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৬২
প্রথম ইটের গাঁথুনি হলো রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে, ছাত্ররা রাত জেগে কাজ করল বুকটা বাড়িয়ে। প্রতিটি ইটের মাঝে মাখা ছিল শহীদদের নাম, যে মিনারের কাছে হেরে যায় রাজাদের সব দাম। খোকা সিমেন্ট মাখিয়ে দিল নিজের কোমল হাতে, মায়ের ভাষার স্মৃতি রাখতে গভীর সেই রাতে। গাঁথুনির প্রতি টানে যেন মিশে আছে ত্যাগের গান, যে গানেতে প্রাণ পেয়েছে বাঙালির অভিমান।
প্রথম সে ইটের গাঁথুনি ছিল এক গোপন শপথ, শোষকদের শাসন ভাঙার এই হলো প্রথম রথ। সকাল হতেই চারিপাশে ছড়িয়ে পড়ল খবর, মেডিকেলের কোণে দাঁড়িয়ে গেছে অমর এক অমর। পুলিশ এসে ঘিরে ফেলল বুলডোজার হাতে নিয়ে, মিনার ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল নির্মম রাগ দিয়ে। কিন্তু ইট ভাঙলেও তো চেতনা ভাঙা যায় না কো, মানুষের মন থেকে তার ছবি মোছা যায় না তো।
আজ প্রথম ইটের গাঁথুনির সেদিনের কথা স্মরি, শহীদ মিনারের ইতিহাস আমরা বুকে ধারণ করি। ভাঙার পর আবার গড়ে উঠেছে শত সহস্র মিনার, আমাদের দেশে আজ দাঁড়িয়ে আছে কত না মিনার। প্রথম ইটের সেই গাঁথুনি আমাদের শিখিয়েছে পাঠ, শহীদদের স্মৃতি রাখতে ভাঙতে হবে সব ঘাট। সেদিনের সেই রাতের গড়া শহীদ মিনারের বুনিয়াদ, আমাদের না বলতে শেখার ইতিহাসের মূল আজাদ।
তারিখ: ২১-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৬৩
স্মৃতিস্তম্ভের আত্মপ্রকাশ ঘটল হঠাৎ এক ভোরে, যে স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে শহীদদের রক্ত চুষে করে। সাদা রঙের মিনার যেন মায়ের চোখের জল, তার গায়ে লেখা রয়েছে ত্যাগের অমর ফল। মানুষ ফুল হাতে নিয়ে হাজির হলো সারি সারি, শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে জানাল শ্রদ্ধা তারি। খোকা দাঁড়িয়ে আছে সামনে ফুল হাতে নিয়ে নিজে, চোখের জলে ভিজে গেছে তার গাল দুটি ভিজে।
স্মৃতিস্তম্ভের আত্মপ্রকাশ শোষকদের কাঁপাল বুক, তারা তো চেয়েছিল রাখতে সব কিছু করে টুকটুক। কিন্তু মিনার তো আর থামানো গেল না বুলডোজারে, মানুষ বারবার গড়ে তুলল তা হাজারো হুংকারে। স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে উঠল বাঙালির প্রাণের কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে এসে মিলিত হয় সব নদী ও সিন্ধু। মায়ের ভাষার দাবি আদায় হলো যে স্মৃতির তরে, তার সামনে মাথা নত করি আমরা জোড় করে।
আজ শহীদ মিনার আমাদের জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক, স্মৃতিস্তম্ভের আত্মপ্রকাশ আলোর দিশারী ঠিক। সেদিনের সেই প্রথম আত্মপ্রকাশের ইতিহাস খানি, আজও আমাদের চেতনায় বাজায় অমর বাণী। যাঁরা সেদিন ঝুঁকি নিয়ে গড়েছিলেন এই মিনার, আমাদের এই মানচিত্রে তাঁরাই তো সব মিনার। স্মৃতিস্তম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে আজ শপথ করি নতুন, মায়ের ভাষার সম্মান রাখব আমরা চিরকাল হুতুন।
তারিখ: ২০-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৬৪
শাসকেরা শহীদ মিনার দেখে কাঁপল ভয়ে থরথর, তারা নির্দেশ দিল ভেঙে ফেলো এই মিনার পরপর। তাদের ভয় এই স্তম্ভ যদি দাঁড়িয়ে থাকে সগর্বে, বাঙালি তো মাথা নোয়াবে না আর কোনো শর্তে। পুলিশ বাহিনী লাঠি হাতে ছুটে এল ভেঙে ফেলতে, মিনার গুঁড়িয়ে দিল তারা পিশাচের মতো খেলে তে। খোকা প্রতিবাদ করতে গেলে চালাল তাদের লাঠি, রক্তে আবার লাল হলো শহীদ মিনারের মাটি।
কিন্তু শাসকেরা কি জানত না ইট ভাঙা যায় সহজে, মানুষের মন থেকে স্মৃতি মুছবে কী করে সেজে? যতবার তারা মিনার ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল ধূলিমূল্যে, ততবার ছাত্র-জনতা গড়ে তুলল দ্বিগুণ মূল্যে। ভাঙচুরের সেই ভয় তাদের তাড়িয়ে বেড়াল রাতে, মিনার যেন প্রেতাত্মার মতো দাঁড়াল তাদের সাথে। শাসকদের এই ভাঙচুরের নীতি হলো চরম ব্যর্থ, শহীদ মিনার আরও উঁচুতে জাগাল অমর সত্য।
আজও শাসকেরা ভয় পায় প্রতিবাদের প্রতীক দেখে, শহীদ মিনার ভেঙে ফেলার চক্রান্ত চলে মেখে। কিন্তু বাঙালি আর আগের মতো দুর্বল তো আর নয়, মিনার ভাঙার সাধ্য কার আছে, এ আমাদের জয়। ভাঙচুরের সেদিনের সেই ভয় তাদের পতন ডেকে এনেছিল, শহীদ মিনার আজ সারা বিশ্বে মাথা উঁচু করে ছিল। শাসকদের সেই ভাঙচুরের ইতিহাস আমাদের শেখায়, সত্যকে কখনো গুঁড়িয়ে দেওয়া যায় না কোনো কোথায়।
তারিখ: ১৯-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৬৫
রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের এই শহীদ মিনার, তার প্রতিটি ইটে লেখা রয়েছে ত্যাগের মিনার মিনার। যে মাটিতে ঝরেছিল রফিক সালামের তাজা প্রাণ, সেখানেই মাথা উঁচু করে গায় অমর ভাষার গান। মিনার তো সাধারণ কোনো ইটের গাঁথুনি নয় ভাই, তার ভিত্তিপ্রস্তর হলো রক্তে কেনা ঠাঁই। খোকা মিনারের গায়ে হাত বুলিয়ে কাঁদল মৃদুস্বরে, এই মিনার আমাদের রক্ষা করবে বুক চিরে জোরে।
রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সে মিনার অমর অক্ষয়, তার ছায়ার নিচে দাঁড়ালে মুছে যায় সব ভয়। শোষকেরা লাখো চেষ্টা করেও মুছতে পারেনি তা, রক্তের দাগ অমলিন হয়ে আজও রয় সর্বত্রথা। মায়ের ভাষার পবিত্র এই শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ, আমাদের জাতীয় চেতনার সবচেয়ে বড় নিকেতন। প্রতিটি একুশে সেখানে নামে মানুষের লাখো ঢল, ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় বাংলার দলবল।
আজ রক্তের ওপর দাঁড়ানো সে মিনারের দিকে তাকিয়ে, আমরা শপথ নিই দেশটাকে রাখব ভালোবেসে ঢাকিয়া। শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব, তাঁদের রক্ত যেন বৃথা না যায়, এই হোক আমাদের নিত্য। রক্তের ওপর গড়া সেদিনের সেই শহীদ মিনার খানি, আমাদের না বলতে শেখার ইতিহাসের অমর বাণী। যুগে যুগে এই মিনার আমাদের জ্বেলে দেবে আলো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়ার শক্তি দেবে ভালো।
তারিখ: ১৮-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৬৬
একুশের প্রভাতে শহীদ মিনারে ফুলের পসরা সাজে, সবার চোখে কান্নার জল ঝরে বেদনাময় সাজে। লাল-সাদা রজনীগন্ধা আর গোলাপের স্তূপ জমে, শহীদদের স্মরণে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে সমসময়ে। চোখের জলে ভিজে যায় মিনারের বেদিদেশ, কত মায়ের বুক খালি করা সেই দুঃখের অবশেষ। খোকা নিজের হাতের ফুলটি রেখে দিল বেদীতে, শহীদ ভাইয়ের আত্মার মাগফিরাত চাইল জিতে।
ফুলের পসরা আর চোখের জলের এই অপূর্ব মিলন, একুশের সকালে নিয়ে আসে এক অদ্ভুত শিহরণ। সেখানে কোনো উল্লাস নেই, আছে গভীর শ্রদ্ধা ও শোক, কান্নায় ভেঙে পড়ে আজ উপস্থিত সব লোক। ফুলগুলো যেন বলছে ডেকে শহীদদের বীরগাথা, চোখের জল মুছে দিচ্ছে সমস্ত না পাওয়ার ব্যথা। দ মায়ের ভাষার জন্য এমন ভালোবাসা ইতিহাসে বিরল, ফুলের গন্ধে পবিত্র হলো চারিপাশের তলতল।
আজও প্রতি একুশে আমরা যখন ফুল নিয়ে যাই মিনারে, চোখের জল আপনাআপনি এসে পড়ে বারে বারে। ফুলের পসরা আর চোখের জলের এই অমর ধারা, আমাদের মনে করিয়ে দেয় কারা আমাদের তারা। সেদিনের সেই শহীদের ত্যাগের কথা স্মরণ করে আজ, আমরা মাথা নত করি শ্রদ্ধাভরে পাই যে সাজ। ফুলের পসরা আর চোখের জলের এই পবিত্র মেলবন্ধন, আমাদের না বলতে শেখার ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ চন্দন।
তারিখ: ১৭-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৬৭
ভাষার জন্য জীবন দেওয়া ইতিহাসের প্রথম তিলক, বাঙালির কপালে আঁকা হলো রক্তিম সেই অলৌক। এর আগে কেউ করেনি তো এমন কোনো দাবি, মাতৃভাষার মান বাঁচাতে জীবন দিল যে কবি। ইতিহাসের পাতায় সেদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা হলো নাম, যে নামের কাছে হেরে গেল রাজমুকুটের দাম। খোকা সেই তিলক কপালে এঁকে নিল নিজ হাতে, শহীদদের রক্তের ফোঁটা জড়িয়ে নিল সাথে।
ইতিহাসের প্রথম তিলক আমাদের গর্বের প্রতীক, যে তিলক আলো জ্বেলে দিল সারা দেশের দিক। শোষকদের কপালে তা এঁকে দিল পরাজয়ের দাগ, বাঙালির জয়যাত্রা শুরু হলো ভেঙে সব রাগ। প্রথম সে তিলক আজও জ্বলজ্বল করে আলো দিয়ে, আমাদের আত্মমর্যাদা রেখেছে উঁচুতে তুলে নিয়ে। সেই তিলক পরার পর আর পিছু হটার জো নেই, আমরা তো বিজয়ী জাতি, বিজয়ী সবার সেইনেই।
আজ ইতিহাসের প্রথম তিলকের কথা গর্বে বলি, আমাদের কপালে আঁকা আছে শহীদদের ধূলিমূলি। সেদিনের সেই রক্তিম তিলক আমাদের চিরন্তন শিক্ষা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে না বলতে শেখার শ্রেষ্ঠ দীক্ষা। ইতিহাসের পাতায় অঙ্কিত সেদিনের সেই তিলক খানি, আমাদের আত্মপরিচয়ের একমাত্র পবিত্র বাণী। যুগে যুগে সেই তিলক আমাদের পথ দেখাবে সোজা, মাথা উঁচু করে বাঁচার এই তো আসল খোজা।
তারিখ: ১৬-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৬৮
বুলডোজার দিয়ে যতই মিনার ভেঙে গুঁড়ো করো ভাই, মানুষের মন থেকে তার ছবি মুছবে কোথায় যাই? মিনার তো কেবল ইটের গাঁথুনি বা চুনসুরকি নয়, মিনার হলো কোটি মানুষের হৃদয়ের এক অমর জয়। শাসকেরা ভেঙে ফেলতে পারে শহীদ মিনারের বেদি, কিন্তু বাঙালির চেতনা ভাঙবে কোন মন্ত্র দিয়ে দি? খোকা ইট ভাঙার পর আবার মাটি খুঁড়ে তুলল মিনার, শোষকদের সে চেষ্টা হলো পুরোপুরি ব্যর্থ ও ধিক্কার।
মিনার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায় না কখনো কভু, তা মানুষের হৃদয়ে গড়ে ওঠে অমর এক মধু। যতবার তারা গুঁড়িয়ে দিল রাতের ওই অন্ধকারে, ততবার সকাল হলে মানুষ ফুল দিল বারে বারে। ভাঙা গড়ার এই খেলায় শোষকেরা হেরে গেল শেষে, শহীদ মিনার আরও শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল হেসে। চেতনা তো আর বুলেট দিয়ে ধ্বংস করা যায় না, মিনার ভেঙে বাঙালিকে থামানো তো গেল না।
আজ শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়ালে বুক ফুলে ওঠে, কত ভাঙাগড়ার ইতিহাস লুকিয়ে আছে তার ঠোঁটে। মিনার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায় না— এই সত্য প্রমাণ, রক্ত দিয়ে গড়া এ মিনার আমাদের অমর প্রাণ। সেদিনের সেই ভাঙচুরের ইতিহাস আমাদের শেখায় বল, সত্য কখনো হারে না তো যতই চালাও ছল। মিনার আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সগর্বে, আমাদের না বলতে শেখার প্রতীক হয়ে এই শর্তে।
তারিখ: ১৫-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৬৯
অমর স্মৃতির মিনার দাঁড়িয়ে আছে শহরের বুকে, তার ছায়ার নিচে শান্তি নামে বাঙালির ওই সুখে। যে মিনারে লেখা রয়েছে ত্যাগের অমর সব কথা, সেখানে এসে জুড়ায় সবার মনের যত ব্যথা। রফিক সালাম বরকত জব্বারের অমর স্মরণে, মিনার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বনে বনে। খোকা মিনারের চত্বরে এসে নিরবতা পালন করে, শহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় বুক চিরে জোরে।
অমর স্মৃতির সেই মিনার আমাদের আলোর দিশারী, তার দিকে তাকালে শক্তি পায় সারা দেশ ও বাড়ি। শোষকদের সমস্ত অন্ধকার চূর্ণ হয়ে যায় নিমেষে, যখন মিনারের চূড়া দেখা যায় প্রভাতের ওই হেসে। স্মৃতির মিনার আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় নিজের সাথে, আমরা কারা, কী আমাদের শক্তি, জানে পুরো জাতে। অমর এই মিনার রক্ষা করা আমাদের সবার পবিত্র ঋণ, যা আমরা শোধ করব লড়ে প্রতিটি প্রবীণ নবীন।
আজ অমর স্মৃতির এ মিনার আমাদের গর্বের ধন, এর সামনে মাথা নত করে জানাই আমরা বন্দন। সেদিনের সেই স্মৃতির মিনার চিরকাল রবে অমর, আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় পবিত্র সম্বর। অমর স্মৃতির সে মিনার আমাদের শিখিয়েছে বাঁচতে, মাথা উঁচু করে এই পৃথিবীতে নিজের জায়গা রাখতে। যুগে যুগে এই মিনার আমাদের জ্বেলে দেবে আলো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে না বলতে শেখার শক্তি দেবে ভালো।
তারিখ: ১৪-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৭০
বাঙালির ইতিহাসে শহীদ মিনার হলো প্রথম প্রতীক, যে প্রতীক শিখিয়েছে কীভাবে হার না মানতে হয় ঠিক। এর আগে তো আমরা ছিলাম পরাধীন ও ম্লান, শোষকদের হুকুমে চলত আমাদের জীবন ও প্রাণ। কিন্তু শহীদ মিনার এসে বদলে দিল সব ধারা, আমরা পেলাম মাথা উঁচু করে বাঁচার মন্দ্র তারা। খোকা মিনারের গায়ে হাত রেখে এই শপথ নিল, আর কখনো হার মানব না, যা করার করো খিল।
হার না মানার সেই প্রতীক আজও দাঁড়িয়ে আছে সগর্বে, আমাদের আত্মমর্যাদা রক্ষা করে কোনো শর্তে না খর্বে। শোষকদের লাখো নির্যাতন তুচ্ছ করে দাঁড়িয়ে থাকা, মিনার হলো বাঙালির অদম্য শক্তির পাকা ঢাকা। প্রথম হার না মানার প্রতীক হিসেবে জন্ম নিয়ে, সে সারা দেশকে জাগিয়ে দিল আলো জ্বালিয়ে দিয়ে। আজ সেই প্রতীকের সামনে দাঁড়ালে বুক কাঁপে শ্রদ্ধায়, আমরা যে এক অপ্রতিরোধ্য জাতি তা বিশ্বাস হৃদয়ায়।
আজ বাঙালির প্রথম হার না মানার প্রতীককে জানাই প্রণাম, যাঁরা এই মিনার গড়েছেন তাঁদের জানাই লাখো সালাম। শহীদ মিনার আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে লড়াই করতে হয়, অত্যাচারীর সামনে দাঁড়িয়ে কখনো মানতে নেই তো জয়? না, পরাজয়! হার না মানার সেই প্রতীক আমাদের চিরকালের প্রেরণা, না বলতে শেখার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঠিকানা। যুগে যুগে এই মিনার আমাদের রাখবে সদা জাগ্রত, বাঙালির আত্মায় এ যেন এক অবিনাশী মন্ত্র।
(Note: Continuing chapters 8, 9, 10 up to poem 100 with strict 28 lines and historical dates descending).
তারিখ: ১৩-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৭১
১৯৫৪ সালের সাতই মে এল এক ঐতিহাসিক দিন, যে দিনেতে স্বীকৃতি পেল বাংলা ভাষা প্রবীণ। পাকিস্তানের গণপরিষদে উঠল যখন সেই প্রস্তাব, শোষকদের মুখের ওপর বসল বড় একটা ভাব। বাংলা হবে রাষ্ট্রভাষা— এই দাবি হলো যে গৃহীত, বাঙালির রক্তিম লড়াই অবশেষে হলো পরীক্ষিত। খোকা খবর শুনে লাফিয়ে উঠল মহা আনন্দে, শোষকদের ষড়যন্ত্র হেরে গেল বড় এক দ্বন্দ্বে।
৫৪ সালের সেই সাতই মে আমাদের প্রথম বিজয়, যে বিজয়ে মুছে গেল এতকালের সমস্ত পরাজয়। শহীদদের রক্ত সেদিন সার্থক হলো পূর্ণরূপে, মায়ের ভাষা জায়গা পেল আইনসভায় স্বরূপ। সবাই তখন মিষ্টি বিতরণ করল ঘরে ঘরে, শোষকরা মুখ লুকাাল লজ্জায় মাথা নিচু করে। বাংলার খোকাদের সেই প্রাণের দাবি পেল মান, চারিপাশে বেজে উঠল বিজয়ের অমর গান।
আজ ৫৪ সালের সেই সাতই মে তারিখের কথা মনে করে, আমরা গর্বে বুক ফুলিয়ে চলি ঘরে ও বাইরে। সেদিনের সে বিজয় আমাদের শিখিয়েছে আশার আলো, ন্যায্য দাবি আদায় করতে লড়াই করতে হয় ভালো। ইতিহাসের পাতায় সে তারিখ স্বর্ণাক্ষরে লেখা রবে, আমাদের না বলতে শেখার ইতিহাস মহিমান্বিত হবে। ৭ই মে এর সেই ঐতিহাসিক স্বীকৃতি আমাদের উপহার, শহীদদের রক্তের দাম পেল অবশেষে অধিকার।
তারিখ: ১২-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৭২
অবনত মস্তকে শোষকদের আজ মানতে হলো হার, বাঙালির কাছে মাথা নোয়াল পশ্চিমের সেই কারবার। যাঁরা একদিন উর্দুই একমাত্র বলে চোখ রাঙাত, তাঁদের সে অহংকার আজ ধুলোয় লুটিয়ে যেত প্রাত। গণপরিষদে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি পাওয়ার পরে, শোষকদের সেই শক্ত মাথা গেল নুয়ে পড়ে পরে। খোকা দেখল শাসকের সেই অবনত মস্তক খানি, জুলুমবাজদের পতন দেখে হাসল সবি প্রাণী।
অবনত মস্তকের পতন হলো বাঙালির সাহসের জোরে, রক্ত দিয়ে কেনা বিজয় এল দুয়ারে কড়া নাড়ে। আর তো কেউ বলতে পারবে না বাংলা ভাষা চলবে না, আইনসিদ্ধ হলো দাবি, রইল না কোনো মনা। শোষকদের সেই পরাজয় আমাদের বড় এক প্রাপ্তি, অন্যায় যতই শক্তিশালী হোক, সত্যেরই হয় প্রাপ্তি। অবনত মস্তক আজ লুটিয়ে পড়েছে বাংলার মাটিতে, বাঙালির খোকারা জিতেছে বুক ফুলিয়ে জিতে।
আজ সেই অবনত মস্তকের পতনের ইতিহাস স্মরণ করে, আমরা জানি অন্যায়ের পতন একদিন হবেই করে। সেদিনের সেই বিজয়ের মুকুট পরাল যারা মাথায়, আমাদের শ্রদ্ধার ফুল ঝরে পড়ে তাঁদের পায়ে সদায়। অবনত মস্তকের সে পতন আমাদের শক্তির প্রতীক, না বলতে শেখার ইতিহাসের আলো ঝলমলে ঠিক। শোষকদের সেই পরাজয় আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মাথা উঁচু করে বাঁচলে কোনো শক্তি হারাতে নেয়।
তারিখ: ১১-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৭৩
পাকিস্তানের গণপরিষদে আজ ধ্বনিত হলো বাংলা নাম, যে ভাষাকে তারা মুছে ফেলতে চেয়েছিল तमाम। সেখানে পাস হলো প্রস্তাব, রাষ্ট্রভাষা হলো বাংলা, শোষকদের সব চক্রান্ত গেল জলে ভেসে ঝংলা। সদস্যরা সেদিন হাত তুললেন বাংলার পক্ষে গিয়ে, শহীদদের আত্মা তখন শান্তি পেল স্বর্গ দিয়ে। খোকা রেডিওর সামনে বসে শুনল সেই মহা খবর, খুশিতে তার চোখ দুটোতে এল জলের অবর।
গণপরিষদে বাংলার জয় এক বিশাল ঐতিহাসিক ঘটনা, যা লিখে গেল বাঙালির নতুন এক অমর ঠিকানা। যে ভাষার জন্য ঝরেছিল এত তাজা তাজা প্রাণ, আজ সেই ভাষা পেল তার উপযুক্ত সম্মান। শোষকদের পার্লামেন্টে সেদিন বাংলা ভাষার জয়রথ, খুলে দিল বাঙালির সামনে এক নতুন মুক্তির পথ। সবাই তখন স্লোগান তুলল— রাষ্ট্রভাষা বাংলা জিন্দাবাদ, ঘুচে গেল এতকালের সমস্ত বঞ্চনা আর অপবাদ।
আজ গণপরিষদে বাংলার সেই জয়কে স্মরণ করি শ্রদ্ধায়, যাঁরা আইন লড়াই লড়েছিলেন তাঁদের জানাই নমস্কার সদায়। সেদিনের সে বিজয় আমাদের আত্মমর্যাদার প্রতীক, না বলতে শেখার ইতিহাসের এক দীপ্তিময়ী ঠিক। গণপরিষদে বাংলার জয় প্রমাণ করে দিল ভাই, ন্যায্য দাবি আদায় করতে পারলে কেউ আটকাতে নাই। সেই বিজয়ের ইতিহাস আজও আমাদের চেতনায় বাজে, গর্বে আমাদের বুক ভরে ওঠে এই বিজয়ী সাজে।
তারিখ: ১০-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৭৪
ভাষার অধিকার আজ শুধু মুখের দাবি নয় আর, তা আইনে পরিণত হলো, পেল সাংবিধানিক মিনার। কাগজে কলমে সিলমোহর পড়ে গেল পাক্কা করে, কেউ আর কেড়ে নিতে পারবে না তা জোর করে। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা পেল তার বৈধ স্বীকৃতি, শোষকদের সব চালাকি হলো চিরতরে নিষিক্তি। খোকা সংবিধানের কপি হাতে নিয়ে দেখল হেসে, আমাদের অধিকার আজ সংরক্ষিত হলো ভালোবেসে।
আইনসিদ্ধ হলো যে অধিকার রক্তে কেনা দাম দিয়ে, তার মূল্য কত বেশি তা জানে সবাই চেয়ে চেয়ে। আর কোনো শাসক চাইলেই আর বাংলা ভাষায় বাধা, দিতে পারবে না আইন অনুযায়ী পাবে সে তো গাধা। ভাষার অধিকারের এই স্বীকৃতি এক বিশাল অর্জন, যার পেছনে রয়েছে কত না শহীদের ত্যাগের রণ। আইনের পাতায় বাংলা ভাষার এই সোনার অক্ষর, আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় বড় ঘর।
আজ আইনসিদ্ধ সে অধিকার নিয়ে গর্ব করি মনে, আইনের শাসন কীভাবে চলে দেখি আমরা দিনে দিনে। সেদিনের সেই স্বীকৃতির কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, লড়াই করলে অধিকার আদায় হয়, কোনো ছাড় নেই লেয়। ভাষার অধিকার আইনসিদ্ধ হওয়ার এই ইতিহাস খানি, আমাদের না বলতে শেখার ইতিহাসের সেরা বাণী। যুগে যুগে এই আইন আমাদের রক্ষা করবে সদা, মাতৃভাষার সম্মান রক্ষায় ঘুচাবে সব বাধা।
তারিখ: ০৯-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৭৫
১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র প্রকাশ পেল যখন হাতে, তার দুইশত চৌদ্দ অনুচ্ছেদে বাংলা এল সাথে। উর্দু এবং বাংলা উভয় হলো পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, বাঙালির এই জয় এনে দিল বুক ভরা ভালোবাসা। সংবিধানের পাতায় খোদাই হলো আমাদের মায়ের বুলি, শোষকদের সব শর্ত আজ ধুলায় গেল মিশে ধূলিমূলি। খোকা ছাপ্পান্নর সেই সংবিধানের পাতা উল্টে দেখে, শহীদদের ছবি যেন ভেসে ওঠে তার মাঝে রেখে।
ছাপ্পান্নর শাসনতন্ত্রে বাংলা ভাষার এই অন্তর্ভুক্তি, ছিল বাঙালির দীর্ঘ লড়াইয়ের এক পরম মুক্তি। যদিও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল রক্ত ঝরিয়ে, তবু তো শেষ পর্যন্ত জয় হলো বুকটা বাড়িয়ে। সংবিধানে জায়গা পাওয়ার অর্থ হলো চিরস্থায়ী স্বীকৃতি, যা কোনো শাসক আর কোনো দিন পারবে না নিতে খণ্ডিতি। বাংলার মানুষ সেদিন বুঝল না বলতে শেখার ফল, কীভাবে বদলে দেয় একটি জাতির ভাগ্যের তলতল।
আজ ছাপ্পান্নর সেই শাসনতন্ত্রের কথা মনে হলে, আমাদের মনে শ্রদ্ধা জন্ম নেয় শহীদদের ত্যাগের বলে। সেদিনের সেই সংবিধান আমাদের অধিকার নিশ্চিত করল, শোষকদের সব কালো আইন চিরতরে নির্মূল করল। সংবিধানে বাংলার সেই স্বীকৃতি আমাদের জাতীয় গর্ব, না বলতে শেখার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সর্বস্ব। যুগে যুগে ছাপ্পান্নর সেই আইনের পাতাগুলো রবে অমর, আমাদের না বলতে শেখার ইতিহাসের এক অনন্য সম্বর।
তারিখ: ০৮-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৭৬
দুইশত চৌদ্দ অনুচ্ছেদ আজ বাংলার মানুষের গৌরব, যে অনুচ্ছেদে লেখা হলো আমাদের ভাষা প্রভব। পাকিস্তান সংবিধানের সেই পবিত্র ধারা খানি, বাঙালির আত্মমর্যাদার এক অনন্য দলিল জানি। সেখানে লেখা আছে স্পষ্ট বাংলা এবং উর্দু সমান, শোষকদের অহংকার হলো সেদিন পুরোপুরি অবসান। খোকা অনুচ্ছেদটি বারবার পড়ে খুশিতে গদগদ, আমাদের রক্তের দামে কেনা এই তো আসল পদ।
দুইশত চৌদ্দ অনুচ্ছেদের গৌরব সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, সবাই আনন্দ উল্লাস করে তালি বাজে ঘরে ঘরে। যে ভাষার জন্য এত প্রাণ ঝরে গেল রাজপথে, আজ তা সংবিধানের মাঝে অমর হলো রথে। এই অনুচ্ছেদ আমাদের শিখিয়েছে অধিকার ছাড়তে নেই, লড়াই করে তা ছিনিয়ে আনতে হয় সঠিক সেইনেই। গৌরবের এই ইতিহাস আজও আমাদের শিহরণ জাগায়, শহীদদের আত্মত্যাগের কথা মনে করিয়ে দেয় সদায়।
আজ দুইশত চৌদ্দ অনুচ্ছেদের গৌরবকে জানাই সালাম, যে অনুচ্ছেদ আমাদের দিয়েছে সর্বোচ্চ সম্মান ও দাম। সেদিনের সেই আইনসিদ্ধ অধিকার আমাদের শক্তি জোগায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে চলতে শেখায় কোথায়। গৌরবের এই ইতিহাস আমাদের জাতীয় জীবনের মণি, না বলতে শেখার ইতিহাসের সবচেয়ে মিষ্টি ধ্বনি। যুগে যুগে এই অনুচ্ছেদ আমাদের পথ দেখাবে সোজা, মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় এই তো আসল খোঁজা।
তারিখ: ০৭-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৭৭
অবশেষে জয় হলো মা গো, জয় হলো মায়ের ভাষার, শোষকদের সব চক্রান্ত হলো চিরতরে ছারখার। তোমার খোকার রক্তে কেনা এই যে সোনার ফসল, আজ তা বিশ্বমঞ্চে পেল সর্বোচ্চ সুন্দর ফল। আর কেউ কখনো পারবে না তো মুখের ভাষা কেড়ে নিতে, আমরা তো আজ বিজয়ী জাতি, লড়াই করে জিতে। খোকা আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসল মিষ্টি হেসে, মা গো, তোমার ভাষার জয় হয়েছে ভালোবেসে।
মায়ের ভাষার এই জয় কোনো সাধারণ জয় তো নয়, এ হলো এক পরাধীন জাতির মহাপ্রলয় ও জয়। যে ভাষা নিয়ে ষড়যন্ত্র করেছিল পশ্চিমের প্রভু, আজ সেই ভাষাই মাথা উঁচু করেছে সবার কাবু কভু। বিজয়ের এই আনন্দাশ্রু ঝরে পড়ল মায়ের চোখে, শহীদদের আত্মা তখন শান্তি পেল স্বর্গলোকে। সারা বাংলায় আজ উৎসবের জোয়ার বয়ে যায়, রাষ্ট্রভাষা বাংলা জিন্দাবাদ ধ্বনিত হয় সদায়।
আজ মায়ের ভাষার সেই জয়কে আমরা করি উদযাপন, প্রতিটি একুশে গেয়ে যাই আমরা বিজয়ের গান। সেদিনের সেই জয় আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে লড়তে হয়, অত্যাচারীর সামনে না বলতে পারলে তবেই মেলে জয়। মায়ের ভাষার এই জয়ের ইতিহাস চিরকাল রবে বেঁচে, আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় পরম যত্নে সেঁচে। জয় হলো মায়ের ভাষার— এই ধ্বনি আজ আকাশে বাতাসে, আমাদের না বলতে শেখার ইতিহাস বেঁচে আছে প্রকাশে।
তারিখ: ০৬-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৭৮
শোষকেরা বাধ্য হলো দিতে সেই কাগজী স্বীকৃতি, রক্তের স্রোতের সামনে তাদের ভাঙল সব নীতি। কাগজে সই করতে হলো তাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও, বাঙালির শক্তির কাছে হেরে গেল তাদের সত্য। সেই কাগজ আজ আমাদের ইতিহাসের বড় দলিল, যে দলিলে মুছে গেছে শোষকদের সব খিল। খোকা সেই দলিলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে, শোষকদের অহংকার আজ মিশে গেল ঘাসে ঘাসে।
কাগজী সে স্বীকৃতি হয়তো তাদের মন থেকে ছিল না, কিন্তু বাঙালির রক্তের জোরে পাল্টাতে হলো ঠিকানা। রক্তের দাগ মুছে ফেলা যায় না কোনো কালি দিয়ে, শোষকদের সই করতে হলো বাধ্য হয়ে দিয়ে গিয়ে। এই স্বীকৃতি আমাদের অধিকারের এক আইনি সনদ, যা প্রমাণ করে দেয় বাঙালির ত্যাগের অমর মনদ। কাগজে লেখা সেই ভাষা আজ জীবন্ত হয়ে উঠেছে, সারা বাংলার মানুষের মুখে মুখে ফুটে উঠেছে।
আজ শোষকদের সেই কাগজী স্বীকৃতির কথা মনে হলে, আমাদের মনে এক বিজয়ের হাসি খেলে যায় চলে। সেদিনের সেই স্বীকৃতি আমাদের শিখিয়েছে একটি পাঠ, লড়াই করলে শোষকও বাধ্য হয় মানতে সব ঘাট। কাগজী সে দলিলের ইতিহাস আমাদের আত্মমর্যাদা বাড়ায়, না বলতে শেখার ইতিহাসের পাতায় পাতায় তাড়ায়। যুগে যুগে শোষকদের সেই পরাজয়ের কাগজ খানি, আমাদের বিজয়ের আনন্দ ও অহংকার মনে টানি।
তারিখ: ০৫-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৭৯
বিজয়ের হাসিতে আজ ভেজা সবার দুটি চোখ, হাসি আর কান্নার এক অপূর্ব মিলন লোক। হাসি তো বিজয়ের জন্য, আর কান্না শহীদদের তরে, যাঁরা জীবন দিয়ে গেছেন আমাদের এই তরে ভরে। চোখের কোণে অশ্রু জমে মায়ের এবং খোকার, এই বিজয়ের দাম তো অনেক, নেই তার কোনো পার। খোকা মুছল চোখের জল বিজয়ের ওই আলোয়, সবাই আজ মেতে উঠেছে মুক্তির মহা খেলায়।
বিজয়ের হাসিতে ভেজা চোখ আমাদের পরিচয় দেয়, আমরা রক্ত দিয়ে জিতেছি, এমনি কেউ দেয়নি লেয়। যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁরা দেখতে পেলেন না তো আজ, তাঁদের রক্তেই তো সেজেছে এই বিজয়ের সাজ। তাই হাসির মাঝেও একটু ব্যথা লুকিয়ে থাকে মনে, শহীদদের স্মরণ করি আমরা প্রতি ক্ষণে ক্ষণে। ভেজা চোখে ফাগুনের আকাশ আজ হাসছে খুব সুন্দর, আমাদের এই স্বাধীনতা হলো সবচেয়ে বড় সম্বর।
আজ বিজয়ের হাসিতে ভেজা সেদিনের সেই মুখগুলো, আমাদের চেতনায় জাগায় কত না সুন্দর ফুলগুলো। সেদিনের সেই মিশ্র অনুভূতি আমাদের শিখিয়েছে প্রাণ, অর্জিত স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করার মহান গান। বিজয়ের হাসিতে ভেজা চোখের এই অমর ইতিহাস, আমাদের হৃদয়ে যোগ করে চিরকালের গভীর বিশ্বাস। যুগে যুগে এই অশ্রুসিক্ত হাসি আমাদের পথ দেখাবে, না বলতে শেখার ইতিহাসের গৌরব বজায় রাখবে।
তারিখ: ০৪-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৮০
পূর্ণতা পেল অবশেষে বাংলা মায়ের খোকাদের দাবি, রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলো, মুছল সব শোষকের ছবি। যে দাবি তোলার অপরাধে ঝরেছিল তাজা প্রাণ, আজ তা সফল হলো, বেজে উঠল বিজয়ের গান। খোকাদের বুক চেরা স্লোগান আজ বাস্তবে রূপ নিল, শোষকদের সমস্ত কালো চক্রান্ত ব্যর্থ হলো খিল। সবাই মিলে আনন্দ করল রাজপথে দাঁড়িয়ে আজ, খোকাদের দাবি পূর্ণ হওয়ায় সাজল নতুন সাজ।
দাবি আদায়ের এই লড়াই ছিল কত না দীর্ঘ পথ, কত মায়ের বুক খালি হলো, কত গেল রথ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তো সত্যেরই হলো গো জয়, খোকাদের আত্মত্যাগ এনে দিল এই মহাপ্রলয়। পূর্ণতা পাওয়া সেদিনের সেই দাবি আমাদের শিক্ষা দেয়, ন্যায্য অধিকারের জন্য লড়লে কখনো হারতে হয় নেয়। খোকারা সেদিন দেখিয়ে দিয়েছিল কীভাবে না বলতে হয়, সেই না বলার ইতিহাস আজ বাঙালির মহা জয়।
আজ পূর্ণতা পাওয়া সেদিনের সেই দাবির কথা স্মري, শহীদ খোকাদের প্রতি জানাই আমরা শ্রদ্ধা ভরি। তাঁদের সেই ত্যাগের ফলেই আজ আমরা স্বাধীন জাতি, মাতৃভাষার আলো জ্বেলে পেয়েছি প্রগতির চাবি। খোকাদের দাবির পূর্ণতার এই অমর ইতিহাস খানি, আমাদের না বলতে শেখার ইতিহাসের সেরা বাণী। যুগে যুগে এই পূর্ণতা আমাদের প্রেরণা জোগাবে সদা, মাতৃভাষার সম্মান রক্ষায় ঘুচাবে সমস্ত বাধা।
তারিখ: ০৩-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৮১
একুশ মানে মাথা নত না করার এক মহান দীক্ষা, শোষকদের রক্তচক্ষুতে না বলার সেই শিক্ষা। আমরা তো আর ভীরু নই, মোরা বাঙালি বীর জাতি, অন্যায়ের সামনে কখনো ঝুকবে না আমাদের মাতি। খোকা এই দীক্ষা নিয়ে বড় হলো তিলে তিলে, মাথা সোজা করে সে চলে বাংলার মাটিতে মিলে। একুশ আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে সোজা রাখতে হয় ঘাড়, কারো কাছে বিকিয়ে দেব না আমাদের এই অধিকার।
মাথা নত না করার এই মন্ত্র রক্তে মিশে গেছে, বাঙালির মেরুদণ্ড আজ বিশ্বে শক্ত হয়ে বেঁচে আছে। কেউ যদি চোখ রাঙিয়ে কথা বলতে চায় জোর করে, আমরা তখন না বলে দেব বুক চিরে হুংকার করে। দীক্ষার এই পথ ধরে চললে কখনো হার মানি না, আমাদের স্বাধীনতা হলো আমাদের সবচেয়ে বড় ঠিকানা। একুশের এই চেতনা আজ ছড়িয়ে গেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, সবাই শেখে এই শিক্ষা পরম ভক্তি ও লগ্নমে।
আজ মাথা নত না করার সেই দীক্ষার কথা স্মরণ করে, আমরা শপথ নিই দেশটাকে রাখব ভালোবেসে গড়ে। সেদিনের সেই শিক্ষা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ, যা আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে হতে হয় স্বাধীন অপদ। মাথা নত না করার এই অমর ইতিহাস আমাদের অহংকার, না বলতে শেখার ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল মিনার। যুগে যুগে এই দীক্ষা আমাদের পথ দেখাবে সোজা, আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচার এই তো আসল খোঁজা।
তারিখ: ০২-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৮২
'না' একটি ছোট্ট শব্দ কিন্তু তার মহাশক্তি অপার, যে শব্দে বদলে যায় শোষকদের পুরো ইতিহাস কারবার। অন্যায় কোনো হুকুম পেলে বলতে হয় সজোরে না, এই একটি শব্দ মুছে দেয় সমস্ত যাতনা ও মনা। খোকা সেদিন উর্দুর বিরুদ্ধে বলেছিল যে না শব্দ, তাতে কেঁপে উঠেছিল শোষকদের বিশাল রাজপ্রাসাদ। 'না' বলার এই সাহসিকতা আমাদের মূল হাতিয়ার, যার সাহায্যে জয় করেছি আমরা অধিকার মিনার।
মহাশক্তিধর সেই 'না' শব্দ আজ ছড়িয়ে গেছে মুখে মুখে, কেউ আর অন্যায় মানবে না বাঙালির ওই বুকে। শোষকেরা যতই আইন করুক জোর করে চাপিয়ে, আমরা না বলে দেব বুকটা সামনে বাড়িয়ে দিয়ে। 'না' বলার এই ক্ষমতা অর্জন করেছি রক্ত দিয়ে, তা কি আর হারাতে দেবো সহজে কাউরে দিয়ে? এই শব্দের মাঝে লুকিয়ে আছে মুক্তির চাবিটুকু, যা আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে লড়তে হয় ঋজু।
আজ 'না' শব্দের সেই মহাশক্তিকে জানাই সম্মান, যে শব্দ বাঁচিয়ে দিয়েছে কোটি বাঙালির প্রাণ। সেদিনের সেই ঐতিহাসিক 'না' আমাদের চিরন্তন শক্তি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যার রয়েছে সবচেয়ে গভীর ভক্তি। 'না' বলার এই ইতিহাস আমাদের গৌরবের ভূষণ, না বলতে শেখার ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর ভূবন। যুগে যুগে এই শব্দ আমাদের রক্ষা করবে সদা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ঘুচাবে সমস্ত বাধা।
তারিখ: ০১-১২-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৮৩
একুশ আমাদের শিখিয়েছে মেরুদণ্ড সোজা রাখার পাঠ, লুটিয়ে না পড়ে দাঁড়াতে হবে ভেঙে সব ঘাট। যাঁরা হাঁটু গেড়ে বসে থাকেন শোষকের জুতার তলে, তাঁরা তো মানুষ নন, তাঁরা ভেসে যান পচা জলে। খোকা সোজা হয়ে দাঁড়াল শোষকের চোখের সামনে, মেরুদণ্ড সোজা রেখে লড়ল সে দারুণ টানে। এই পাঠটি আমরা পেয়েছি শহীদদের তাজা রক্ত থেকে, যা আমাদের বাঁচিয়ে রাখে বুকটা সোজা করে রেখে।
মেরুদণ্ড সোজা রাখার পাঠ বড় কঠিন কিন্তু সত্য, এর মাধ্যমেই অর্জিত হয় বাঙালির পরম নত্য। আর কেউ কখনো পারবে না তো আমাদের বাঁকা করতে, আমরা তো স্বাধীন জাতি, চলি আপন শর্তে। পাঠশালায় যা শেখায় না তা শিখিয়েছে একুশের রাজপথ, যে পথে হেঁটে আমরা পেয়েছি মুক্তির আসল রথ। সোজা মেরুদণ্ড নিয়ে চলা মানুষেরা হারে না তো কভু, তাঁদের পিঠে হাত বুলিয়ে দেয় মহান আমাদের প্রভু।
আজ মেরুদণ্ড সোজা রাখার সেই পাঠ মনে করে, আমরা চলি সামনে এগিয়ে বুক ফুলিয়ে জোরে। সেদিনের সেই শিক্ষা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ধন, যা আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে করতে হয় রণ। মেরুদণ্ড সোজা রাখার এই অমর ইতিহাস আমাদের অহংকার, না বলতে শেখার ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল মিনার। যুগে যুগে এই পাঠ আমাদের পথ দেখাবে সোজা, আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচার এই তো আসল খোঁজা।
তারিখ: ৩০-১১-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৮৪
অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক চিরন্তন দেয়াল হলো একুশ, যে দেওয়ালে এসে ধাক্কা খেয়ে মরে শোষকদের বিষ। কেউ চাইলেই পার করতে পারবে না সেই দেয়াল খানি, তার ওপর পাহারা দেয় শহীদদের অমর বাণী। খোকা সেই দেয়ালের একটি ইট হয়ে রইল গেঁথে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সে দাঁড়িয়ে আছে যুদ্ধ রথে। এই দেয়াল আমাদের রক্ষা করে সব ধরনের জুলুম থেকে, আমাদের আত্মমর্যাদা বাঁচিয়ে রাখে বুকে ঢেকে।
চিরন্তন সে দেয়াল আজ আরও শক্ত ও বিশাল হয়েছে, বাঙালির ঐক্যের বলে তা আরও উঁচুতে উঠেছে। শোষকেরা বারবার চেষ্টা করেও ভাঙতে পারেনি তা, বরং তাদের মাথা ফেটে গেছে খেয়ে সে দেয়াল ব্যথা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে এমন দেয়াল পৃথিবীতে আর কোথায়? রক্ত দিয়ে গড়া যা হার মানে না কোনো কথায়। এই দেয়ালের আড়ালে আমরা নিরাপদ ও স্বাধীন, আমাদের জীবন আজ আলোয় ভরপুর প্রতিদিন।
আজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে গড়া সেই চিরন্তন দেয়ালের পাশে, দাঁড়িয়ে আমরা শ্রদ্ধা জানাই বুকটা ভালোবেসে। সেদিনের সেই দেয়াল আমাদের শিখিয়েছে ঐক্য ও বল, সবাই মিলে এক হলে হার মানে শোষকদের দল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সেই দেয়ালের অমর ইতিহাস খানি, আমাদের না বলতে শেখার ইতিহাসের সেরা বাণী। যুগে যুগে এই দেয়াল আমাদের রক্ষা করবে সদা, যেকোনো শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে জোগাবে বাধা।
তারিখ: ২৯-১১-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৮৫
একুশ মানে ঘুম ভেঙে যাওয়া মানুষের মায়াবী চোখ, যে চোখে আর নেই কোনো ভয়, নেই কোনো শোক। একুশ মানে তন্দ্রা কাটিয়ে জেগে ওঠার সেই বেলা, যে বেলায় শুরু হয় শোষকদের বিরুদ্ধে খেলা। খোকা ঘুমিয়ে ছিল পরাধীনতার গভীর ঘুমে ডুবে, একুশের গুলি এসে তার চোখ দুটো দিল টুবে। সেই থেকে আমাদের ঘুম ভেঙে গেছে চিরতরে, আমরা আর ঘুমাও না শোষকদের হুকুমে ডরে।
ঘুমে ভাঙা সে চোখ আজ দেখে নতুন এক পৃথিবীর আলো, যে পৃথিবীতে অন্যায়ের কোনো জায়গা নেই ভালো। সজাগ দৃষ্টিতে আমরা পাহারা দিই আমাদের দেশ, কেউ যেন কেড়ে না নেয় আমাদের স্বাধীনতার রেশ। একুশ আমাদের শিখিয়েছে সজাগ থাকতে সর্বদা, ঘুমিয়ে পড়া জাতি তো হেরে যায়, ধরে ম্রিয়মাণ বাধা। তাই আমাদের চোখ দুটো আজ সবসময় খোলা রয়, শত্রুর যেকোনো ষড়যন্ত্র আমরা ধরে ফেলি ঠিক জয়।
আজ ঘুমে ভাঙা চোখের সেই একুশকে জানাই সালাম, যে একুশ আমাদের দিয়েছে সচেতনতার মহান দাম। সেদিনের সেই জাগরণ আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার, যা আমাদের শিখিয়েছে অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার কারবার। একুশ মানে ঘুমে ভাঙা চোখের এই অমর ইতিহাস, আমাদের হৃদয়ে যোগ করে চিরকালের গভীর বিশ্বাস। যুগে যুগে এই জাগরণ আমাদের পথ দেখাবে সোজা, সজাগ থেকে দেশ গড়ার এই তো আসল খোঁজা।
তারিখ: ২৮-১১-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৮৬
একুশ কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা সীমানায় বন্দি নয়, একুশ মানে বিশ্বজুড়ে মানুষের অধিকারের জয়। যেখানেই মানুষ নির্যাতিত, যেখানেই চলে শোষণ, সেখানেই বেজে ওঠে একুশের প্রতিবাদের রণ। ঢাকা থেকে শুরু হয়ে আজ ছড়িয়ে গেছে সারা বিশ্বে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সে তো মিশে। খোকা আজ বিশ্বনাগরিক, তার রক্তে একুশের গান, সারা বিশ্বের শোষিতের সে জুগিয়ে চলেছে প্রাণ।
সীমানা পেরিয়ে একুশ আজ অমর এক বিশ্বদূত, মাতৃভাষার অধিকারের সে হলো বিশ্বস্ত ভূত। জাতিসংঘ স্বীকার করে নিল একুশের সেই মহিমা, সারা বিশ্বে পালিত হয় আজ তার স্বাধীন সিমা। আমাদের একুশ আজ বিশ্ববাসীর প্রেরণার উৎস, যাঁরা নিজের ভাষার জন্য লড়েন নিরলস উৎস। এই গর্ব শুধু আমাদের নয়, সারা পৃথিবীর মানুষের, রক্ত দিয়ে ভাষা বাঁচানোর এই ইতিহাস অশ্বের।
আজ একুশের এই বিশ্বজনীন রূপ দেখে গর্বে বুক ভরে, আমরা তো সারা পৃথিবীকে শিখিয়েছি না বলতে জোরে। সেদিনের সেই ছোট আন্দোলন আজ বিশ্বমঞ্চে নন্দিত, শহীদদের আত্মত্যাগ আজ সারা বিশ্বে প্রশংসিত। একুশ কোনো সীমানায় বন্দি নয়— এই সত্য মহান, আমাদের না বলতে শেখার ইতিহাসের সেরা অবসান গান। যুগে যুগে একুশ এভাবেই আলো ছড়াবে দিকবিদিক, বিশ্বজুড়ে মানুষের অধিকারের অমর বারতা ঠিক।
তারিখ: ২৭-১১-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৮৭
একুশ হলো প্রতিবাদের এক শাশ্বত সুন্দর ব্যাকরণ, যে ব্যাকরণে শেখানো হয় কীভাবে করতে হয় রণ। কোথায় দাঁড়াতে হবে, কীভাবে চোখ রাখতে হবে চোখে, সব শেখানো আছে তার প্রতিটি পাতায় ও শোকে। ব্যাকরণের নিয়ম মেনে যেমন ভাষা শুদ্ধ হয়, তেমনি একুশ মেনে চললে অন্যায়ের হয় জয় জয়। খোকা সেই ব্যাকরণ পড়ে শিখেছে না বলার রীতি, যে রীতেতে শোষকদের মেনে নিতে হয় প্রীতি।
প্রতিবাদের সেই ব্যাকরণ আজও আমাদের হাতে আছে, যেকোনো সংকট এলে আমরা খুঁজি তার কাছে কাছে। কীভাবে মিছিল করতে হয়, কীভাবে মানতে না হয় আইন, সব শিক্ষা দেওয়া আছে একুশের ওই মহান লাইন। এই ব্যাকরণ কোনো বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, তা লেখা আছে বাঙালির রক্তে, যা কখনো হয় না ক্ষয়। শোষকদের সব ব্যাকরণ ভুল প্রমাণিত হলো সেদিন, যখন একুশের ব্যাকরণে জিতেছিল প্রবীণ নবীন।
আজ প্রতিবাদের সেই শাশ্বত ব্যাকরণকে হৃদয়ে ধারণ করে, আমরা চলি সামনে এগিয়ে বুক ফুলিয়ে জোরে। সেদিনের সেই শিক্ষা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় পাথেয়, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে লড়াই করার চিরন্তন এই নেই। প্রতিবাদের সে ব্যাকরণের ইতিহাস আমাদের অহংকার, না বলতে শেখার ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল মিনার। যুগে যুগে এই ব্যাকরণ আমাদের পথ দেখাবে সোজা, ন্যায্য অধিকার আদায়ের এই তো আসল খোঁজা।
তারিখ: ২৬-১১-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৮৮
সাহসিকতা কোনো সহজ জিনিস নয়, তা রক্তে কেনা দাম, একুশের রাজপথে ঝরেছিল যে রক্ত অবিরাম। সেই রক্তের দাম দিয়ে আমরা কিনেছি সাহসিকতা, যা আমাদের বুকে বুনে দেয় না বলার সেই বার্তা। আর কোনো দিন ভয় পাবো না বন্দুক বা গুলির নল, আমাদের রক্তে মিশে আছে শহীদদের সেই বল। খোকা সেই সাহসিকতা নিয়ে বুক ফুলিয়ে হাঁটে, শোষকদের ত্রাস উড়িয়ে দেয় মাঠে আর ঘাটে।
রক্তে কেনা সাহসিকতা আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যার রয়েছে অবিচল ভক্তি। শোষকেরা লাখো চেষ্টা করেও তা কেড়ে নিতে পারেনি, কারণ তা মিশে আছে আমাদের ডিএনএ-তে জানি। এই সাহসিকতাই আমাদের শিখিয়েছে মাথা উঁচু করে, সব ধরনের জুলুমবাজির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে জোরে। রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই অমূল্য সম্পদ আজ, আমাদের জাতীয় চরিত্রের সবচেয়ে সুন্দর সাজ।
আজ রক্তে কেনা সেই সাহসিকতার কথা স্মরণ করি, শহীদদের প্রতি জানাই আমরা শ্রদ্ধা হাত দুটি ধরি। সেদিনের সেই আত্মত্যাগ আমাদের জুগিয়েছে এই বল, সাহসিকতার সাথে লড়লে হেরে যায় শোষকদের দল। রক্তে কেনা সাহসিকতার সে ইতিহাস চিরকাল রবে বেঁচে, আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় পরম যত্নে সেঁচে। যুগে যুগে এই সাহসিকতা আমাদের পথ দেখাবে সোজা, মাথা উঁচু করে বাঁচার এই তো আসল খোঁজা।
তারিখ: ২৫-১১-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৮৯
হৃদয়ে আমাদের জ্বলছে এখন বীজমন্ত্রের এক মশাল, যে মশাল জ্বেলে দিয়েছিল একুশের সেই সকাল। "রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই"— এই হলো সেই বীজমন্ত্র, যে মন্ত্রে পাল্টে গেল বাঙালির ভাগ্য ও তন্ত্র। সেই মশাল আর কখনো নেবে না তো কোনো দিন, তা প্রজ্বলিত আছে আজও আমাদের প্রবীণ নবীন। খোকা নিজের বুকের ভেতর আগলে রাখে সেই আগুন, যে আগুনে পুড়ে ছারখার হয় শোষকদের ফাগুন।
বীজমন্ত্রের সে মশাল জ্বেলে আমরা পথ চলি রাতে, অন্ধকার দূর হয়ে যায় মশাল হাতে নিলে সাথে। মশাল জ্বেলে তরুণ সমাজ এগিয়ে চলে সামনে, অন্যায়কে পুড়িয়ে ছাই করে দেয় দারুণ টানে। এই মশালের আলোয় আমরা দেখতে পাই মুক্তির পথ, যে পথ ধরে চলেছিল আমাদের শহীদদের রথ। মশাল হাতে নেওয়ার দায়িত্ব এখন আমাদের সবার ঘাড়ে, তা যেন কোনো নিভে না যায় ঝড়ের বারি মারে।
আজ হৃদয়ে জ্বলা বীজমন্ত্রের সেই মশাল উঁচুতে ধরে, আমরা শপথ নিই দেশটাকে রাখব ভালোবেসে গড়ে। সেদিনের সেই আগুন আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ আলো, যা আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে ভালো। বীজমন্ত্রের মশাল জ্বালানোর সে ইতিহাস অমর রবে, না বলতে শেখার ইতিহাসের আলোয় তা ধন্য হবে। যুগে যুগে এই মশাল আমাদের পথ দেখাবে সোজা, চেতনার আলো জ্বেলে চলার এই তো আসল খোঁজা।
তারিখ: ২৪-১১-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৯০
আত্মমর্যাদার এক বিশাল অহংকার হলো আমাদের ভাষা, যে ভাষার জন্য আমরা বিসর্জন দিয়েছি সব আশা। কারো কাছে হাত পেতে আমরা কিছু তো চাইনি কভু, নিজের অধিকার রক্ত দিয়ে ছিনিয়ে এনেছি প্রভু। এই অহংকার আমাদের মেরুদণ্ড শক্ত করে রাখে, বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় প্রতি বাঁকে। খোকা নিজের ভাষায় কথা বলে বুক ফুলিয়ে জোরে, শোষকদের অহংকার আজ মিশে গেছে ধূলার ঘরে।
আত্মমর্যাদার এই অহংকার আমাদের জাতীয় সম্পদ, এর সাথে কখনো কোনো আপস করবে না এই অপদ। নিজের ভাষায় ভাব প্রকাশ করা মানুষের জন্মগত অধিকার, তা কেড়ে নেওয়ার সাধ্য কার আছে বা কার অধিকার? এই অহংকার আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে সম্মান পেতে হয়, নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করলে কিসের কিসের ভয়? আত্মমর্যাদার এই আলোয় আলোকিত আমাদের মন, একুশ আমাদের শিখিয়েছে এই মহান জীবন।
আজ আত্মমর্যাদার সেই অহংকার বুকে ধারণ করে, আমরা এগিয়ে চলি সামনে মাথা উঁচু করে জোরে। সেদিনের সেই গৌরব আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার, যা আমাদের শিখিয়েছে অধিকার ছাড়তে নেই কারবার। আত্মমর্যাদার সে অহংকারের ইতিহাস চিরকাল রবে বেঁচে, আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় পরম যত্নে সেঁচে। যুগে যুগে এই অহংকার আমাদের পথ দেখাবে সোজা, সম্মান নিয়ে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার খোঁজা।
তারিখ: ২৩-১১-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৯১
একুশের পথ ধরে এল বাঙালির মুক্তির ছয় দফা, যে দফায় রচিত হলো স্বাধীনতার নতুন এক কথা। ভাষা আন্দোলনের সে বীজ থেকে অঙ্কুরিত হলো গাছ, ছয় দফায় তার ডালপালা ছড়িয়ে পড়ল চারিপাশ। বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠে ধ্বনিত হলো সেই দাবি, শোষকদের বুক কেঁপে উঠল দেখে এই মহা ছবি। খোকা একুশ পেরিয়ে এবার ছয় দফার মিছিলে যায়, মুক্তির সেই আসল লক্ষ্যে এগিয়ে চলে সদায়।
একুশ আমাদের শিখিয়েছিল কীভাবে না বলতে হয়, ছয় দফা শিখাল কীভাবে দেশ চালাতে হয় জয়। ভাষার লড়াই রূপ নিল এবার রাজনৈতিক অধিকারে, শোষকদের শিকড় নড়ে গেল বাংলার এই প্রহারে। সবাই তখন দল বেঁধে এক হলো ছয় দফার তরে, পাক সরকারের বিরুদ্ধে দাবানল জ্বলল ঘরে ঘরে। একুশের সেই চেতনার ধারাবাহিক রূপ হলো ছয় দফা, যা বাঙালির স্বাধীনতার পথ করে দিল পরিষ্কার সফা।
আজ একুশ থেকে ছয় দফার সেদিনের ইতিহাস ভাবলে, আমাদের মনে গর্বের এক নতুন আলো জলে। সেদিনের সেই আন্দোলন আমাদের মুক্তির সিঁড়ি বেয়ে, এগিয়ে নিয়ে গেল স্বাধীনতার চূড়ান্ত লক্ষ্যে ধেয়ে। একুশ থেকে ছয় দফার এই অমর সংযোগ ধারা, আমাদের জাতীয় মুক্তির আকাশে জ্বলন্ত ধ্রুবতারা। যুগে যুগে এই ইতিহাস আমাদের পথ দেখাবে সোজা, স্বাধীনতা অর্জনের এই তো আসল অমর খোঁজা।
তারিখ: ২২-১১-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৯২
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে কেঁপে উঠল পুরো দেশ, রাজপথে নেমে এল ছাত্র-জনতার উত্তাল অবশেষ। আইয়ুব খানের রক্তচক্ষু গুঁড়িয়ে গেল নিমিষে, আসাদ আসাদের রক্তে রাজপথ উঠল হেসে হেসে। আগরতলা মামলার জেলের তালা ভেঙে চুরমার, বাঙালি আজ জেগে উঠেছে, শুরু হলো জয়কার। খোকা তখন তরুণ যুবক, মিছিলে সে সবার আগে, একুশের সেই শিক্ষা তার রক্তে বাজে রাগে রাগে।
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করল আবার ভাই, বাঙালির এই জয়যাত্রা থামানোর শক্তি কারো নাই। একুশ যে দীপ জ্বেলেছিল তিমির রাতের পরে, উনসত্তরে তা দাবানল হয়ে জ্বলে উঠল ঘরে ঘরে। শোষকদের মসনদ তখন ধূলিস্যাৎ হওয়ার উপক্রম, জনতার সেই জোয়ারের সামনে সবাই অবিনাশ যম। আসাদের রক্তে রাঙা রাজপথ আমাদের নতুন দীক্ষা দিল, স্বাধীনতার সেই সূর্য খুব কাছে এসে গেল খিল।
আজ উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণ করি, তাঁদের আত্মত্যাগের মহিমায় আমরা বুক ভরি। সেদিনের সেই আন্দোলন আমাদের মুক্তির কাছাকাছি নিয়ে গেল, একুশের চেতনার বীজ পূর্ণ ফল দিতে লাগল। উনসত্তরের সে ইতিহাস আমাদের চিরন্তন প্রেরণা, না বলতে শেখার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মোহনা। যুগে যুগে এই অভ্যুত্থান আমাদের পথ দেখাবে সোজা, চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আসল খোঁজা।
তারিখ: ২১-১১-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৯৩
একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠল মার্চ মাসের রাতে, বঙ্গবন্ধুর ডাকে সবাই অস্ত্র তুলে নিল হাতে। আর নয় প্রতিবাদ শুধু, এবার হবে চূড়ান্ত লড়াই, পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হলো তাই। একুশের সেই না বলার ইতিহাস রূপ নিল অস্ত্রে, মুক্তিযোদ্ধারা ঝাঁপিয়ে পড়ল নিজের দেশের বস্ত্রে। খোকা মুক্তিযোদ্ধা হয়ে কাঁধে তুলে নিল রাইফেল, শোষকদের বিরুদ্ধে সে চালালো বিজয়ের আইফেল।
একাত্তরের সেই দিনগুলোতে বেজে উঠল রণধ্বনি, পদ্মা-মেঘনা-যমুনার কূলে কূলে শুনল সবি প্রাণী। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর এল যে প্রভাত, সে প্রভাত বয়ে আনল আমাদের স্বাধীন এই প্রভাত। একুশ আমাদের শিখিয়েছিল কীভাবে মাথা না নোয়াতে, একাত্তর শিখাল কীভাবে শত্রুকে দেশ থেকে তাড়াতে। ভাষার লড়াই রূপ নিল এবার সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে, শোষকদের পতন হলো চূড়ান্ত সেই মহাযুদ্ধে।
আজ একাত্তরের সেই বীর শহীদদের জানাই সালাম, যাঁরা রক্ত দিয়ে কিনেছেন আমাদের এই লাল-সবুজ দাম। সেদিনের সে হাতিয়ার গর্জে ওঠার মহান ইতিহাস খানি, আমাদের না বলতে শেখার ইতিহাসের সেরা বাণী। একাত্তর আমাদের পূর্ণতা দিল যা চেয়েছিলাম মনে, স্বাধীন দেশে গাইব গান আমরা মুক্ত মনে বনে। যুগে যুগে এই মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সবচেয়ে বড় অহংকার, না বলতে শেখার ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল মিনার।
তারিখ: ২০-১১-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৯৪
পলাশীর প্রান্তরে যে পরাজয় হয়েছিল আমাদের কপালে, একাত্তরে তার শোধ তুললাম বাংলার মাঠে ও তালে। মীরজাফরের সেদিনের সেই কলঙ্কের কালো দাগ, মুক্তিযোদ্ধারা মুছে দিল রক্ত দিয়ে ভেঙে রাগ। শতবর্ষী মায়ের চোখে আর নেই কোনো জলের ধারা, তার খোকা আজ বিজয়ী বীর, আকাশে নতুন তারা। খোকা যুদ্ধ জয় করে ফিরে এল স্বাধীন দেশে আজ, পলাশীর সেই ঋণ শোধ হলো পরে বিজয়ের সাজ।
পলাশী থেকে শুরু হওয়া বঞ্চনা ও শোষণের পালা, একাত্তরের বিজয়ে পরল স্বাধীনতার ফুলের মালা। যেখানে হেরে গিয়েছিলাম ষড়যন্ত্রের জালে পড়ে, সেখানে আজ আমরা জিতেছি নিজেদের রক্ত ঝরে। পলাশীর ঋণ শোধের এই মহোৎসব সারা দেশজুড়ে, লাল-সবুজ পতাকা ওড়ে বাংলার আকাশে দূরে দূরে। একুশ আমাদের শিখিয়েছিল না বলতে শেখার ইতিহাস, একাত্তর এনে দিল আমাদের চূড়ান্ত বিশ্বাসের শ্বাস।
আজ পলাশীর ঋণ শোধের সেদিনের কথা মনে করে, আমরা গর্বে বুক ফুলিয়ে চলি ঘরে ও বাইরে। সেদিনের সেই বিজয় আমাদের বহু বছরের কষ্টের দান, স্বাধীন বাংলায় আজ বেজে ওঠে অমর মুক্তির গান। পলাশী থেকে বাংলাদেশ— এই যে দীর্ঘ এক পথ, তার প্রতিটি বাঁকে লেখা রয়েছে আমাদের বীরের রথ। যুগে যুগে এই ইতিহাস আমাদের পথ দেখাবে সোজা, পলাশীর প্রতিশোধ নেওয়ার এই তো আসল খোঁজা।
তারিখ: ১৯-১১-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৯৫
রক্তে অর্জিত আমাদের এই প্রিয় লাল-সবুজ পতাকা, যে পতাকায় লেখা আছে লাখো শহীদের রক্তে ঢাকা। সবুজ মাঠে লাল সূর্য যেন একুশের প্রথম প্রভাত, যে প্রভাত এনে দিয়েছে আমাদের মুক্তির সুন্দর প্রভাত। এই পতাকার জন্য দিতে হয়েছে কত না তাজা প্রাণ, এর সম্মানে আজ গাই আমরা বিজয়ের জয়গান। খোকা নিজের হাতে পতাকা উড়িয়ে দিল আকাশে, তার চোখে তখন আনন্দের জল গড়ায় বাতাসে।
লাল-সবুজ পতাকাটি কেবল কাপড়ের টুকরো নয় ভাই, এর মাঝে লুকিয়ে আছে বাঙালির অস্তিত্বের ঠাঁই। একুশের চেতনা আর একাত্তরের রক্ত মিলে মিশে, তৈরি হয়েছে এই পতাকা ভালোবেসে ভালোবেসে। বাতাসে যখন ওড়ে সে পতাকা সগর্বে ও উঁচুতে, শহীদদের আত্মা তখন শান্তি পায় পরম সুখে। এই পতাকা রক্ষা করার দায়িত্ব এখন আমাদের সবার, এর মর্যাদায় যেন কোনো দিন না আসে কোনো ছার।
আজ রক্তে অর্জিত লাল-সবুজ পতাকাকে জানাই সালাম, যে পতাকা আমাদের দিয়েছে বিশ্বের দরবারে দাম। সেদিনের সে রক্তিম অর্জনের ইতিহাস চিরকাল রবে অমর, আমাদের না বলতে শেখার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সম্বর। লাল-সবুজ পতাকা আমাদের পথ দেখাবে চিরকাল, এর আলোর মতো উজ্জ্বল হোক আমাদের প্রতিটি সকাল। যুগে যুগে এই পতাকা উড়বে বাংলার আকাশে উঁচুতে, আমাদের আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে পরম যত্নে কুঁচে।
তারিখ: ১৮-১১-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৯৬
স্বাধীন বাংলার মুক্ত আকাশে ওড়ে পাখির দল, সে আকাশে আর নেই তো কোনো শোষকদের ছল। নীল আকাশে সাদা মেঘে হাসে ফাগুনের রোদ, আমাদের এই স্বাধীন দেশে নেই কোনো বিরোধ। যে আকাশে একসময় উড়ত শোষকদের কালো চিল, আজ সেখানে লাল-সবুজ পতাকা হাসে খিলখিল। খোকা মুক্ত আকাশে তাকিয়ে নিঃশ্বাস নেয় বুক ভরে, কত কষ্টে অর্জিত এ স্বাধীনতা, জানে সে তো জোরে।
স্বাধীন বাংলার এই মুক্ত আকাশ আমাদের পরম পাওয়া, এর নিচে আমরা সবাই নিই শান্তির মিষ্টি হাওয়া। আর কোনো দিন কেউ পারবে না তো আমাদের বন্দি করতে, আমরা তো আজ স্বাধীন জাতি, চলি মুক্ত শর্তে। মুক্ত আকাশের এই আলোয় আমরা গড়ে তুলব দেশ, যে দেশে থাকবে না কোনো বৈষম্যের লেশমাত্র শেষ। একুশের সেই না বলার শিক্ষা আজ ফলে গেছে ফলে, স্বাধীনতার ফল আমরা খাচ্ছি বুক ফুলিয়ে চলে।
আজ স্বাধীন বাংলার মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আজ, আমরা শপথ নিই দেশটাকে সাজাব সুন্দর সাজ। সেদিনের সেই মুক্ত আকাশ আমাদের চিরন্তন অহংকার, না বলতে শেখার ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল মিনার। যুগে যুগে এই আকাশ আমাদের স্বাধীনতা মনে করিয়ে দেবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তি দেবে। স্বাধীন বাংলার এই মুক্ত আকাশ রবে চিরদিন অমর, আমাদের না বলতে শেখার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সম্বর।
তারিখ: ১৭-১১-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৯৭
শতবর্ষী মা আজ দরজায় দাঁড়িয়ে চেয়ে থাকে পানে, তার খোকা যুদ্ধ জয় করে ফিরছে আপন টানে। কত বছর কেটে গেল পথ চেয়ে সে প্রদীপ জ্বেলে, আজ তার খোকা ফিরে এল বিজয় নিশান মেলে। মায়ের বুড়ো হাত দুটো আজ কাঁপছে খুশিতে থরথর, খোকা এসে জড়িয়ে ধরল মায়ের কোলের ঘর। মা গো, তোমার খোকা ফিরেছে, আর কেঁদো না তুমি, স্বাধীন দেশে শান্তিতে আজ ঘুমাক তোমার ভূমি।
মায়ের সেই শতবর্ষী চোখে আজ আনন্দের ধারা, তার খোকা যে হয়ে গেছে দেশের এক বীর তারা। যে খোকা একদিন মিছিলে গিয়ে হারিয়েছিল ঠিকানা, আজ সে ফিরে এল স্বাধীন দেশের মহান বিজয়ী সীমানা। মায়ের আঁচলে মুছে গেল সব কষ্টের যত কালি, ঘরে ঘরে আজ শুরু হলো বিজয়ের মিষ্টি আলি। খোকা মাকে জড়িয়ে ধরে বলল— মাগো কেঁদো না আর, আমরা তো আজ জিতে গেছি, ঘুচে গেছে অন্ধকার।
আজ মায়ের কোলে খোকার ফিরে আসার এই দৃশ্য দেখে, আমাদের চোখ দুটোতেও জল আসে ভালোবেসে রেখে। শতবর্ষী মায়ের প্রতীক্ষা অবশেষে হলো সফল, খোকার ঘরে ফিরে আসা এনে দিল দারুণ ফল। মা গো, তোমার খোকা ফিরেছে— এই অমর কাব্য গান, আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় আবেগের প্রাণ। যুগে যুগে এই মায়ের প্রতীক্ষা আর খোকার ফেরার গল্প, আমাদের না বলতে শেখার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্বর্গ।
তারিখ: ১৬-১১-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৯৮
একুশের ওই রথে চড়ে চলে বীরত্ব আর বীরগতি, যে রথে চড়ে আমরা পেয়েছি আমাদের মুক্তির নীতি। যারা সেদিন জীবন দিল তাঁরা তো সব বীর শহীদ, তাঁদের রক্তে রচিত হলো আমাদের নতুন গীত। খোকাও সেই রথের চাকার সাথে পা মিলিয়ে চলে, বীরত্ব আর বীরগতির গান গায় সে মনের বলে। একুশের এই রথ তো থামবে না কো কোনো দিন কভু, এটি আমাদের বয়ে নিয়ে যাবে আশীর্বাদ করে প্রভু।
বীরত্ব আর বীরগতির এই অমর এক উপাখ্যান, যা গেয়ে যায় বাংলার ঘরে ঘরে প্রতিটি তরুণ প্রাণ। শহীদরা তো বীরগতি পেলেন হাসিমুখে প্রাণ দিয়ে, আমরা পেলাম সেই বীরত্বের গৌরব বুকটা নিয়ে। একুশের রথ আমাদের এগিয়ে নেয় সামনের পানে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ার শক্তি জোগায় প্রাণে প্রাণে। এই রথের সারথি হলেন আমাদের শহীদ ভাইয়েরা, তাঁদের দেখানো পথেই চলে আমাদের এই মায়েরা।
আজ একুশের সেই রথের যাত্রায় শরিক হতে পেরে, আমরা গর্বিত বাঙালি, চলি বুক ফুলিয়ে জোরে। বীরত্ব আর বীরগতির সেই অমর ইতিহাস খানি, আমাদের না বলতে শেখার ইতিহাসের সেরা বাণী। যুগে যুগে এই রথ আমাদের পথ দেখাবে সোজা, বীরের মতো বেঁচে থাকার এই তো আসল খোঁজা। একুশের রথ চলুক তবে চিরকাল অবিনাশ গতিতে, আমরা তো আজ বিজয়ী জাতি, সবকিছুতে জিতে।
তারিখ: ১৫-১১-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ০৯৯
আজ বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত না বলতে শেখার ইতিহাস, যে ইতিহাসে প্রতিধ্বনিত হয় বাঙালির দীর্ঘশ্বাস। জাতিসংঘের দরবারে আজ একুশের অমর গান, সারা বিশ্বের মানুষ জানে আমাদের ত্যাগের মান। যে ভাষার জন্য আমরা একদিন লড়েছিলাম একা, আজ তাকে সম্মান জানায় বিশ্ববাসীর দেখা দেখা। খোকা আজ বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে গর্ব করে বলে— আমরা না বলতে শিখেছি মায়ের ভাষার বলে।
বিশ্বমঞ্চে আমাদের এই ইতিহাস এক অনন্য গৌরব, যে গৌরবে ধন্য হলো আমাদের পূর্ব দিক প্রভব। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ সারা বিশ্বে পালিত, আমাদের একুশ এখন সবার হৃদয়ে সমাদৃত। শহীদদের রক্ত আজ বিশ্ববাসীর প্রেরণার উৎস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে না বলতে শেখার শ্রেষ্ঠ প্রসূতি উৎস। আমাদের এই ছোট দেশের বড় এই সংগ্রামের কথা, আজ জানে সারা দুনিয়া, ঘুচে গেছে সব ব্যথা।
আজ বিশ্বমঞ্চে না বলতে শেখার সে ইতিহাস ভেবে, আমাদের বুক ফুলে ওঠে গর্বে, আনন্দ হবে কবে? সেদিনের সেই ছোট্ট আন্দোলন আজ বিশ্বমানের প্রতীক, আমাদের না বলতে শেখার ইতিহাস সবচেয়ে সঠিক। যুগে যুগে এই ইতিহাস বিশ্ববাসীকে পথ দেখাবে সদা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ঘুচাবে সমস্ত বাধা। বিশ্বমঞ্চে ধ্বনিত হোক আমাদের সেই অমর কণ্ঠস্বর, না বলতে শেখার ইতিহাস হোক সবার সেরা অম্বর।
তারিখ: ১৪-১১-২০২১ ইং ক্রমিক নম্বর: ১০০
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলো একুশের এই ধারা, যেন কখনো নিভে না যায় আমাদের চেতনার তারা। সন্তানের কানে কানে বলে দিও সেই ত্যাগের কথা, কীভাবে রক্ত দিয়ে কিনেছি মায়ের ভাষার ব্যথা। খোকা আজ বৃদ্ধ হয়েছে, কিন্তু তার মনে সেই আগুন, সে শিখিয়ে যাচ্ছে নাতিকে ফাগুনের এই গুণ। প্রজন্ম বদলাবে ঠিকই, কিন্তু একুশ থাকবে অম্লান, আমাদের রক্তে মিশে থাকবে চিরকালের সেই গান।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই মশাল জ্বেলে রাখতে হবে, তবেই তো শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে তবে কবে। একুশ মানে শুধু একটি দিন বা একটি বছরের খতিয়ান নয়, একুশ মানে চিরকালের প্রতিবাদের অমর মহাপ্রলয়। সন্তানেরা যেন ভুলে না যায় আমাদের এই ইতিহাস, কীভাবে না বলতে শিখে পেয়েছিল তারা মুক্ত আকাশ। এই রূপরেখার শত কবিতা আজ সমাপ্ত হলো রথে, একুশের চেতনা নিয়ে আমরা চলি মুক্তির পথে।
আজ শততম কবিতার এই শেষ চরণে এসে দাঁড়াই, শহীদদের প্রতি জানাই আমরা অন্তিম শ্রদ্ধা ভাই। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে একুশ হোক আমাদের প্রেরণা, না বলতে শেখার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঠিকানা। আমাদের এই কাব্যগ্রন্থ অমর হয়ে রবে চিরকাল, এর আলোয় আলোকিত হোক বাঙালির প্রতিটি সকাল। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাক একুশের এই মনিষ, এই আমাদের শেষ প্রার্থনা, এই আমাদের পরম বিশ।
৭
৭ মন্তব্য