সহকারী শিক্ষক
০৬ আগস্ট, ২০২৬ ০১:১৩ অপরাহ্ণ
ফ্রি-ফায়ার ও পাবজি ধ্বংস করছে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ
অনলাইন গেমের অন্ধকার জগৎ !
ফ্রি-ফায়ার ও পাবজি কীভাবে ধ্বংস করছে আমাদের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ
মনিরুল হক,
সন্ধ্যা হলেই রাজিবের ঘরে আলো নেভে না তবে সেটা পড়াশোনার আলো নয়। স্মার্টফোনের নীলাভ আলোয় সে ডুবে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কখনো ফ্রি-ফায়ারে শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করছে, কখনো পাবজিতে "চিকেন ডিনার" জেতার স্বপ্নে বিভোর। পরীক্ষার আগের রাতেও সে ঘুমায় না, তবে সেটা পড়ার নেশায় নয়, গেমের নেশায়। রাজিব আজ বাংলাদেশের লাখো শিক্ষার্থীর প্রতিনিধি।
স্মার্টফোনের মূল্য কমে যাওয়া এবং মোবাইল ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। সেই বাস্তবতার মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ হলো কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অনলাইন গেমিং আসক্তির দ্রুত বিস্তার। একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন ধীরে ধীরে একটি ভার্চুয়াল যুদ্ধক্ষেত্রে হারিয়ে যাচ্ছে, তখন সেই বিষয়ে কথা বলার সময় এসেছে স্পষ্ট ও নির্ভীকভাবে।
বাংলাদেশে অনলাইন গেমিংয়ের বিস্তারঃ
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (BTRC) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটির কাছাকাছি। স্বল্পমূল্যের ডেটা প্যাকেজ এবং হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন মিলিয়ে গ্রামের কিশোরের হাতেও এখন উচ্চগতির ইন্টারনেট। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে Garena Freefire ও PUBG Mobile বিনামূল্যে ডাউনলোড করার সুবিধা দিয়ে দেশজুড়ে কোটি কোটি ব্যবহারকারী তৈরি করেছে।
গেম দুটি মূলত ব্যাটেল রয়্যাল ধাঁচের একটি নির্দিষ্ট মানচিত্রে শতাধিক খেলোয়াড় নেমে একে অপরকে হত্যা করে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার প্রতিযোগিতা করে। অস্ত্র, রক্তপাত এবং সহিংস দৃশ্যপটে ভরপুর এই গেমগুলো আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাছে ১৬–১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য অনুপযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত। অথচ বাংলাদেশে এগুলো খেলে মূলত ১০ থেকে ১৭ বছরের শিক্ষার্থীরা, কোনো কার্যকর বয়সসীমা প্রয়োগ ছাড়াই।
শিক্ষাজীবনে বিপর্যয়ঃ
অতিমাত্রায় গেমিংয়ের সবচেয়ে সরাসরি ও দৃশ্যমান শিকার হলো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা প্রায়ই লক্ষ্য করেন, শিক্ষার্থীরা ক্লান্ত চোখে বসে থাকে, মনোযোগ দিতে পারে না এবং বাড়ির কাজ করে আসে না। সমস্যাটির শিকড় প্রায়ই লুকিয়ে থাকে রাতভর গেম খেলার অভ্যাসে।
ক. মনোযোগ শক্তির অবনতিঃ ফ্রি-ফায়ার বা পাবজিতে প্রতি কয়েক সেকেন্ডে পর্দায় নতুন কিছু ঘটে বিস্ফোরণ, গুলির শব্দ, নতুন শত্রু। এই দ্রুত পরিবর্তনশীল উদ্দীপনায় অভ্যস্ত মস্তিষ্ক ধীরলয়ের পাঠ্যবইয়ে মনোযোগ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদী গেমিং আসক্তি শিক্ষার্থীর মনোযোগের স্থায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
খ. পরীক্ষার ফলাফলের অবনতিঃ দেশের একাধিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, গেমে আসক্ত শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফল ধারাবাহিকভাবে খারাপ হতে থাকে। যে শিক্ষার্থী একসময় শ্রেণিতে প্রথম সারিতে থাকত, সে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে এবং পরিবার অনেক সময় বুঝতেই পারে না সমস্যার কারণটা কোথায়।
গ. বিদ্যালয়-বিমুখতা ও ঝরে পড়ার ঝুঁকিঃ রাতভর গেম খেলার কারণে সকালে ঘুম থেকে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে, বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি বাড়ে। ধীরে ধীরে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে বিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় যা বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের ইতিমধ্যে বিদ্যমান ঝরে পড়ার সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।
ঘ. সৃজনশীলতার মৃত্যুঃ পড়াশোনার বাইরে যে সময়টায় শিক্ষার্থীরা ছবি আঁকত, গান শিখত, বই পড়ত বা মাঠে খেলত সেই মূল্যবান সময়টা এখন গেমিং গ্রাস করে নিয়েছে। মৌলিক চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ তাই দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে।
মানসিক স্বাস্থ্যের উপর ভয়াবহ প্রভাবঃ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০১৯ সালে "গেমিং ডিসঅর্ডার"-কে একটি স্বীকৃত মানসিক রোগ হিসেবে রোগের আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিভাগে (ICD-11) অন্তর্ভুক্ত করেছে। কিশোর বয়সে মস্তিষ্ক যখন বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে থাকে, তখন গেমিং আসক্তি এই বিকাশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
ক. আগ্রাসী মানসিকতাঃ ফ্রি-ফায়ার ও পাবজির মূল বিষয়বস্তু হলো গুলি করে প্রতিপক্ষকে হত্যা করা। এই সহিংস দৃশ্যের বারবার সংস্পর্শে এলে কিশোর মস্তিষ্কে সহিংসতার প্রতি সংবেদনশীলতা ধীরে ধীরে কমে যায়। বাস্তব জীবনে ছোট বিষয়েও অস্বাভাবিক রাগ, অস্থিরতা এবং আগ্রাসী আচরণ প্রকাশ পায়।
খ. হতাশা ও বিষণ্নতাঃ গেম না খেলতে পারলে বা খেলায় হেরে গেলে শিক্ষার্থীর মধ্যে তীব্র হতাশা, খিটখিটে মেজাজ এবং বিষণ্নতার লক্ষণ দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এই বিষণ্নতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয় এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
গ. বাস্তব ও ভার্চুয়াল জগতের বিভ্রান্তিঃ অতিরিক্ত গেমিং কিশোরদের মধ্যে বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি করতে পারে। গেমের মধ্যে সে যে ক্ষমতাবান নায়ক, বাস্তবে সে অসহায় এই বৈপরীত্য মানসিক ভারসাম্যহীনতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ঘ. সামাজিক উদ্বেগ ও একাকীত্বঃ অনলাইনে গেমিং সঙ্গী থাকলেও বাস্তব জীবনে মুখোমুখি যোগাযোগ করতে গেলে এই শিক্ষার্থীরা গভীর অস্বস্তি বোধ করে। সভা-সেমিনারে কথা বলতে, মানুষের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করতে ভয় পায় যা পরবর্তী জীবনে পেশাগত ও সামাজিক ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ঙ. ঘুমের ব্যাধিঃ গভীর রাত পর্যন্ত স্ক্রিনের নীল আলো (Blue Light) মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ ব্যাহত করে। ফলে ঘুম আসতে দেরি হয়, ঘুমের গভীরতা কমে যায় এবং সকালে ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হয়। দীর্ঘমেয়াদী ঘুমের ঘাটতি নিজেই একের পর এক মানসিক ও শারীরিক সমস্যার দরজা খুলে দেয়।
শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতিঃ
শরীর ও মন পরস্পর অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। মানসিক ক্ষতির পাশাপাশি অতিমাত্রায় গেমিং শিক্ষার্থীর শরীরেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতির চিহ্ন রেখে যায়।
ক. দৃষ্টিশক্তির সমস্যাঃ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছোট স্ক্রিনের দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকলে চোখের পেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে। চোখ জ্বালা করা, ঝাপসা দেখা, আলোর প্রতি অতিসংবেদনশীলতা এবং অকালে ক্ষীণদৃষ্টির (Myopia) সমস্যা এখন কিশোরদের মধ্যে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
খ. ঘাড়-পিঠ-মেরুদণ্ডের ব্যথাঃ একই ভঙ্গিতে দীর্ঘ সময় মাথা নামিয়ে বা বাঁকা হয়ে বসে থাকার কারণে মেরুদণ্ডে অস্বাভাবিক চাপ পড়ে। ঘাড়-কাঁধ-পিঠের ব্যথা এবং "টেক নেক" সমস্যা, যা আগে কর্মজীবী বয়স্কদের রোগ বলে মনে হতো, তা এখন স্কুলপড়ুয়াদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।
গ. স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাঃ যে শিক্ষার্থী একসময় মাঠে ফুটবল খেলত বা সাইকেল চালাত, সে এখন সেই সময় ও শক্তি গেমে ঢেলে দিচ্ছে। শারীরিক কার্যকলাপের ঘাটতি, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকা মিলিয়ে শিশু ও কিশোর স্থূলতার সমস্যাকে প্রকট করে তুলছে।
ঘ. হাত-আঙুলের প্রদাহঃ অনবরত একই আঙুলের নড়াচড়ায় হাতের রগ-পেশিতে প্রদাহ (Repetitive Strain Injury) হতে পারে। এটি দীর্ঘমেয়াদে কার্পাল টানেল সিন্ড্রোমে রূপ নিতে পারে, যা কেবল বেদনাদায়কই নয়, ভবিষ্যৎ লেখালেখি ও কাজকর্মেও বাধা দেয়।
পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের অবক্ষয়ঃ
গেমিং আসক্তি কেবল ব্যক্তির ক্ষতি করে না এটি পুরো পরিবার ও সমাজের সম্পর্কের কাঠামোতে ধীরে ধীরে ফাটল ধরায়।
ক. অভিভাবকের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতিঃ গেম খেলতে বাধা দিলে অনেক শিক্ষার্থী বাবা-মায়ের সঙ্গে তীব্র ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ে, কখনো বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দেয়, এমনকি শারীরিক আক্রমণের ঘটনাও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। পারিবারিক আলোচনায় অংশ নেওয়া কমে, একসঙ্গে খাওয়া বা গল্প করার অভ্যাস নষ্ট হয়।
খ. বাস্তব বন্ধুত্বের ক্ষয়ঃ অনলাইনে গেমিং সঙ্গী থাকলেও বাস্তব জীবনে বন্ধুত্বের গভীরতা কমে যায়। মাঠে খেলা, আড্ডা দেওয়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এসব থেকে সরে যাওয়া শিক্ষার্থীকে ধীরে ধীরে সামাজিকভাবে একা করে দেয়।
গ. মিথ্যাচার ও বিশ্বাসভঙ্গঃ গেম খেলার সুযোগ বের করতে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই মিথ্যার আশ্রয় নেয় — পড়াশোনার নাম করে ফোন হাতে নেওয়া, কোথাও যাওয়ার মিথ্যা অজুহাত দেওয়া। এই অভ্যাস ধীরে ধীরে তার সামগ্রিক চারিত্রিক গঠনে নেতিবাচক ছাপ ফেলে।
আর্থিক ক্ষতি ও অপরাধমূলক কার্যকলাপঃ
ফ্রি-ফায়ার ও পাবজি ডাউনলোড করতে পয়সা না লাগলেও এগুলোর ভেতরে রয়েছে "ইন-অ্যাপ পার্চেজ"-এর সুচতুর ফাঁদ। ডায়মন্ড, UC (আনকোয়েন্ড ক্যাশ), স্পেশাল স্কিন, উইপন আপগ্রেড এই সুবিধাগুলো পেতে বাস্তব টাকা লাগে এবং গেমের ভেতরে এগুলো না কিনলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হয়।
ক. পারিবারিক অর্থ অপচয়ঃ অনেক শিক্ষার্থী বই কেনার টাকা, টিফিনের পয়সা, এমনকি পরিবারের সঞ্চয় থেকে গোপনে টাকা নিয়ে ডায়মন্ড বা UC কিনছে। বাংলাদেশে এমন বহু পরিবারের কাহিনি রয়েছে যেখানে শিক্ষার্থী মাসের পর মাস মিথ্যা বলে হাজার হাজার টাকা গেমে ব্যয় করেছে।
খ. চুরি ও অপরাধঃ গেমের আসক্তি মেটাতে টাকার প্রয়োজন হলে কেউ কেউ বাড়ি থেকে চুরি করে, বন্ধুর কাছ থেকে ধার নিয়ে পরিশোধ করে না, এমনকি বাইরে ছোটখাটো অপরাধেও জড়িয়ে পড়ে। পত্রিকায় এরকম একাধিক ঘটনা ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে।
গ. সাইবার জালিয়াতির শিকারঃ সস্তায় ডায়মন্ড বা UC পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অনলাইন প্রতারক চক্র শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিকাশ বা নগদ অ্যাকাউন্টের তথ্য নিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বহু ঘটনা ঘটেছে। অনভিজ্ঞ কিশোররা এই ফাঁদে সহজেই পা দেয়।
সাংস্কৃতিক পরিচয় ও নৈতিক মূল্যবোধের সংকটঃ
বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দেশ। লোকসংগীত, কবিতা, নাটক, যাত্রা, হাডুডু-কাবাডি এই সংস্কৃতিগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান। কিন্তু যে কিশোর দিনের বেশিরভাগ সময় গেমের মধ্যে ডুবে থাকে, সে এই সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলে।
লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের সৃষ্টিসম্পদ বা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের চেয়ে ফ্রি-ফায়ারের "গান" বা পাবজির "ম্যাপ" তার কাছে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে। এই সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা জাতির দীর্ঘমেয়াদী পরিচয় সংকটের বীজ বপন করছে। পাশাপাশি, গেমের মধ্যে বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রাধান্য মাতৃভাষার প্রতি শিক্ষার্থীর আগ্রহ কমাচ্ছে।
আসক্তির লক্ষণঃ অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্যঃ
নিচের লক্ষণগুলো দেখলে বুঝবেন শিক্ষার্থী গেমিং আসক্তিতে পড়েছে কি না—
১. গেম না খেলতে পারলে অস্থির, খিটখিটে বা তীব্র রাগান্বিত হয়ে যাওয়া
২. গেম খেলার সময় ক্রমশ বাড়তে থাকা এবং নিজে নিজে থামাতে না পারা
৩. পড়াশোনা, পরিবার ও সামাজিক দায়িত্ব বারবার উপেক্ষা করা
৪. গেম নিয়ে মিথ্যা বলা বা লুকিয়ে খেলা
৫. খাওয়া-ঘুমের অনিয়ম এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের দৃশ্যমান অবনতি
৬. গেমিং থেকে সরানোর চেষ্টা করলে হিংস্র আচরণ বা চরম মানসিক ভেঙে পড়া
৭. বাস্তব জীবনের বন্ধু, পরিবার ও কার্যক্রমের প্রতি ক্রমাগত আগ্রহ হারানো
করণীয় কি?
সমস্যার গভীরতা যতটা, সমাধানের পথও ততটাই সুচিন্তিত ও সমন্বিত হওয়া দরকার। কেবল ফোন কেড়ে নেওয়া বা বকাঝকা করা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
পরিবারের করণীয়ঃ
ক. ফোন ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করুন, পড়ার সময় ও রাত ১০টার পর ফোন বন্ধ রাখার অভ্যাস তৈরি করুন।
খ. সন্তানের সঙ্গে মুক্ত আলোচনা করুন, শাসন নয়, বোঝাপড়ার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করুন।
গ. বিকল্প আনন্দদায়ক কার্যক্রমে যুক্ত করুন, খেলাধুলা, সংগীত, বাগান করা বা সামাজিক স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ।
ঘ. প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে দ্বিধা করবেন না।
শিক্ষকদের করণীয়ঃ
ক. শ্রেণিকক্ষে গেমিং আসক্তির ক্ষতি নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক আলোচনা করুন।
খ. আচরণ পরিবর্তনের লক্ষণ দেখলে ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলুন এবং অভিভাবককে অবহিত করুন।
গ. পাঠকে আনন্দদায়ক ও সক্রিয়-অংশগ্রহণমূলক করে তুললে শিক্ষার্থী পড়াশোনায় বেশি মনোযোগ দেবে।
রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের করণীয়ঃ
ক. অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ক্ষতিকর গেম ব্যবহারে বয়সসীমা নির্ধারণ ও কার্যকরভাবে তা প্রয়োগ করা।
খ. বিটিআরসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় সচেতনতা প্রচারণা পরিচালনা করা।
গ. বিদ্যালয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ সেবা চালু করা।
ঘ. মাঠ, খেলার মাঠ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, যাতে কিশোরেরা স্বাস্থ্যকর বিকল্পে সময় কাটাতে পারে।
প্রযুক্তি নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা হলো প্রযুক্তির অপব্যবহার। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এগুলো শিক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। কিন্তু ফ্রি-ফায়ার বা পাবজির মতো অতিমাত্রায় সহিংস ও আসক্তিমূলক গেম কিশোর-কিশোরীদের মানসিক, শারীরিক, শিক্ষাগত ও সামাজিক জীবনকে একে একে ভেঙে দিচ্ছে এই কঠিন সত্যটি আমাদের সকলকে স্বীকার করতে হবে।
একটি স্বাস্থ্যকর, মেধাবী ও স্বপ্নশীল প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্ব পরিবার, শিক্ষক, সমাজ ও রাষ্ট্র তথা সবার। আমাদের শিক্ষার্থীরা বিজয়ী হোক বাস্তব জীবনের যুদ্ধে, কোনো ভার্চুয়াল মানচিত্রে নয়। আজই সচেতন না হলে আগামীকালের মূল্য আমাদের অনেক বেশি দিতে হবে।
কলমেঃ
মোঃ মনিরুল হক
সহকারী শিক্ষক
আমলাবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়
খোকসা,কুষ্টিয়া।
০১৭২২ ২৭৩২৭২
৬৪
১০০ মন্তব্য