সিনিয়র শিক্ষক
০৬ আগস্ট, ২০২৬ ০৫:১২ অপরাহ্ণ
জনসেবা সহজীকরণে এটুআই-এর গতিশীল ভূমিকা ও প্রশাসনিক বিপ্লব
একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ও বিশ্বায়িত বিশ্বে প্রশাসনিক গতিশীলতা এবং তথ্যপ্রযুক্তির সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়াই যেকোনো প্রগতিশীল সরকারের প্রধান লক্ষ্য। বাংলাদেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে সরকারি সেবাকে জনগণের একদম হাতের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে যে প্রতিষ্ঠানটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করে চলেছে, তা হলো ‘এটুআই।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এই বিশেষ উদ্যোগটি দেশের ডিজিটাইজেশন, নাগরিক সেবা সহজীকরণ এবং প্রথাগত প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেতরে উদ্ভাবনী চেতনার জন্ম দিতে এক নীরব অথচ দৃশ্যমান বিপ্লব ঘটিয়ে যাচ্ছে।
কম খরচে, দ্রুততম সময়ে এবং হয়রানিমুক্ত পরিবেশে সেবা প্রদান নিশ্চিত করে ‘এটুআই’ আজ কেবল একটি সরকারি প্রকল্প নয়, বরং এটি প্রশাসনিক সংস্কার ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিতকরণের এক অনন্য জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
এটুআই-এর মূল কাজের পরিধি আধুনিকায়ন ও সেবা ডিজিটাইজেশন: নাগরিক সেবাকে আধুনিক ও গণমুখী করতে এটুআই বহুমুখী কৌশল বাস্তবায়নে কাজ করে থাকে। প্রথাগত লাল ফিতার দৌরাত্ম্য হ্রাস করে দেশের প্রতিটি প্রান্তে সেবার আলো পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের মূল কাজগুলো নিম্নরূপ— সেবা ডিজিটাইজেশন ও সহজীকরণ, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রথাগত কাগজ-কলম নির্ভর এবং জটিল নিয়মকানুন সহজ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করা।
এর মূল লক্ষ্য হলো সেবাপ্রার্থীকে যেন বারবার অফিসে দৌড়াতে না হয়। সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা, দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী করতে এবং এক ছাতার নিচে সব সেবা দিতে ‘মাইগভ’ দ্রুততম সময়ে আর্থিক লেনদেনের জন্য ‘একপে’ এবং বিশ্বের বৃহত্তম ডিজিটাল তথ্যাগারগুলোর অন্যতম ‘জাতীয় তথ্য বাতায়ন’-এর মতো যুগান্তকারী সেবাগুলো পরিচালনা ও নিয়মিত সম্প্রসারণ করা। উদ্ভাবনী মানসিকতা গড়ে তোলা, আমলাতন্ত্র বা সরকারি সেবা খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে প্রাচীন মনোভাব পরিবর্তন করে একটি সেবামুখী, প্রযুক্তিবান্ধব ও উদ্ভাবনী কাজের পরিবেশ ও মনস্তত্ত্ব তৈরি করা।
রূপান্তরের নেপথ্যে, এটুআই কর্মকর্তা ও গবেষকদের বহুমুখী কাজ: একটি প্রতিষ্ঠান তখনই সফল হয় যখন তার মাঠপর্যায়ের কাজ এবং গবেষণা নিখুঁতভাবে পরিচালিত হয়। এটুআই-এর পেছনে কর্মরত বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, কারিগরি দল এবং গবেষকরা প্রতিনিয়ত সরকারি ব্যবস্থার ভেতরের চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করতে কাজ করে যাচ্ছেন।
১. সেবা সহজীকরণ: প্রতিটি সরকারি সেবার পেছনে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি থাকে। এটুআই-এর কর্মকর্তারা প্রতিটি দপ্তরের জটিল ও পুরোনো সেবা গ্রহণ প্রক্রিয়ার ওপর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ চালান। নাগরিকরা সেবা নিতে গিয়ে কোথায় বাধা পাচ্ছেন বা সময় বেশি লাগছে তা চিহ্নিত করে তারা সেবার নতুন ন নকশা বা মানচিত্র তৈরি করেন। ফলে মাসের কাজ দিনে এবং দিনের কাজ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে।
২. প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও কারিগরি সমন্বয়: শুধু পরিকল্পনা করলেই হয় না, তার জন্য দরকার শক্তিশালী সফটওয়্যার ও নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম। এটুআই-এর প্রযুক্তি দল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও বিভিন্ন কারিগরি দলের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে নাগরিকবান্ধব অনলাইন পোর্টাল, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন এবং আধুনিক সফটওয়্যার তৈরি ও তার আপডেট নিশ্চিত করে। এর ফলে যেকোনো সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই স্মার্টফোনের মাধ্যমে সরকারি আবেদনের সার্বিক তদারকি ও সেবা গ্রহণ করতে পারছেন।
৩. দক্ষতা বৃদ্ধি ও সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ: ডিজিটাল অবকাঠামো যত উন্নতই হোক না কেন, তা পরিচালনাকারী কর্মকর্তা ও ব্যবহারকারী জনগণ যদি দক্ষ না হন, তবে ইতিবাচক ফল পাওয়া অসম্ভব। এজন্য এটুআই নিয়মিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে পারদর্শী করতে ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করে। একই সাথে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত তথ্যকেন্দ্রগুলোর কর্মীদের কারিগরিভাবে দক্ষ করে গড়ে তুলে নাগরিক সেবার মানবসম্পদ বৃদ্ধি করছে।
৪. গবেষণা, সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও তদারকি: সরকারি সেবা প্রদানে কোথায় জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে বা নতুন কোনো ডিজিটাইজেশন কার্যক্রমে নাগরিকরা সমস্যায় পড়ছেন কি না তা নিয়ে এটুআই নিয়মিত তথ্যকেন্দ্রিক গবেষণা চালায়। মাঠপর্যায়ে কোনো নতুন উদ্ভাবনী সেবা বাস্তবে কতটুকু সুফল দিচ্ছে, তা কঠোর মনিটরিং ও ফিল্ড ডাটা সংগ্রহের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়। এই গবেষণালব্ধ তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই পরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়।
সামষ্টিক অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক প্রভাব: সমসাময়িক বাস্তবতায় এটুআই-এর এসব কার্যক্রমের ফলে দেশের অর্থনৈতিক গতি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নাগরিক জীবনে এক স্বস্তির আমেজ তৈরি হয়েছে। পূর্বে যে সনদ, লাইসেন্স বা সরকারি ভাতার জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে জেলা শহর বা রাজধানীতে ছুটতে হতো, তা এখন ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে অল্প সময়ে ও সামান্য খরচে মেটানো সম্ভব হচ্ছে।
‘একপে’-এর মতো উদ্ভাবনী পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে সরকারি যেকোনো ফি জমা দেয়া সহজ হওয়ায় একদিকে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে রাজস্ব সংগ্রহের প্রক্রিয়া হয়েছে ত্বরান্বিত। দুর্নীতি হ্রাস করা এবং স্বজনপ্রীতি কিংবা দালাল চক্রের হাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমানোর ক্ষেত্রে এই ডিজিটাল রূপান্তর একটি বিশাল প্রতিরক্ষা দেয়াল গঠন করেছে।
ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও চূড়ান্ত বার্তা: একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক সমাজ বাস্তবায়নের মূল শর্তই হলো সরকারি চালিকাশক্তিকে প্রযুক্তিমুখী করা। এটুআই সেই লক্ষ্যেই গত এক দশক ধরে নিরলসভাবে কাজ করে দেশের প্রশাসনিক কাঠামোকে এক আধুনিক মাত্রা প্রদান করেছে। নাগরিক সেবাকে দ্রুত, সময়োপযোগী ও কম খরচভিত্তিক করার যে ধারা তারা তৈরি করেছে, তা আগামীতে আরও বিস্তৃত হবে এমনটাই প্রত্যাশা। গবেষণালব্ধ জ্ঞান, সঠিক তদারকি এবং প্রতিনিয়ত প্রযুক্তির আধুনিকায়নের মাধ্যমে এটুআই বাংলাদেশকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার ন্যায্য অধিকার ও সরকারি সেবা পাওয়ার নিশ্চয়তা লাভ করবে পরম সহজে।
৭
৬ মন্তব্য