Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৮ আগস্ট, ২০২৬ ০৮:১৫ পূর্বাহ্ণ

ব্যর্থতা নয়, চেষ্টা চাই -মোঃ মুজিবুর রহমান

                                                                                                        ব্যর্থতা নয়, চেষ্টা চাই

মোঃ মুজিবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক

মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

ভূমিকা

মানুষের জীবন কখনোই একটানা মসৃণ পথে চলে না। জীবনের পথে যেমন আনন্দ আসে, তেমনি আসে দুঃখ; যেমন সাফল্য আসে, তেমনি আসে ব্যর্থতা; যেমন আশার আলো জ্বলে, তেমনি কখনো কখনো হতাশার অন্ধকারও ঘিরে ধরে। কিন্তু ব্যর্থতা জীবনের শেষ কথা নয়। বরং অনেক সময় ব্যর্থতাই মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়, নিজের ভুল চিনতে সাহায্য করে এবং সাফল্যের জন্য আরও দৃঢ়ভাবে প্রস্তুত করে। তাই জীবনে ব্যর্থতা আসতেই পারে; কিন্তু ব্যর্থতার কারণে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।

জীবনের প্রকৃত পরাজয় ব্যর্থতায় নয়, বরং চেষ্টা না করার মধ্যে। যে মানুষ পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়ায়, ভুল থেকে শিক্ষা নেয় এবং নতুন উদ্যমে আবার পথ চলতে শুরু করে, প্রকৃত অর্থে সেই মানুষই সফলতার যোগ্য। তাই আমাদের জীবনের মূলমন্ত্র হওয়া উচিতব্যর্থতা নয়, চেষ্টা চাই।

ব্যর্থতা জীবনের স্বাভাবিক অংশ

ব্যর্থতা মানুষের জীবনের একটি স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। কোনো কাজ প্রথমবারেই সফল হবেএমন নিশ্চয়তা নেই। একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল নাও পেতে পারে, একজন কৃষক তার কাঙ্ক্ষিত ফসল নাও পেতে পারেন, একজন ব্যবসায়ী ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন, একজন কর্মজীবী মানুষ কোনো কাজে প্রত্যাশিত সাফল্য নাও অর্জন করতে পারেন। কিন্তু এসব ঘটনা জীবনের সমাপ্তি নয়।

একটি পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়া মানে শিক্ষার্থী অযোগ্য কথা সত্য নয়। বরং কোথায় ভুল হয়েছে, কোন বিষয়টি ভালোভাবে বোঝা হয়নি এবং কীভাবে আরও ভালো প্রস্তুতি নেওয়া যায়তা খুঁজে বের করাই বুদ্ধিমানের কাজ। একইভাবে কোনো কাজে ব্যর্থ হলে নিজেকে ছোট না করে ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করতে হবে।

ব্যর্থতা কখনো কখনো এমন শিক্ষা দেয়, যা সাফল্য সহজে দিতে পারে না। সাফল্য আমাদের আনন্দ দেয়, আর ব্যর্থতা আমাদের আত্মসমালোচনা করতে শেখায়। সাফল্য আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, আর ব্যর্থতা আমাদের দুর্বলতা চিনতে সাহায্য করে। তাই ব্যর্থতাকে কেবল শত্রু হিসেবে দেখলে চলবে না; সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারলে ব্যর্থতা একজন ভালো শিক্ষকের ভূমিকা পালন করতে পারে।

ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে

জীবনে ভুল হবেই। মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তবে ভুল করার পর একই ভুল বারবার করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বুদ্ধিমান মানুষ ভুলকে শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে এবং সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে নিজেকে উন্নত করে।

কেউ যদি একবার ব্যর্থ হয়ে বলে, “আমি আর পারব না, তাহলে সে নিজের সম্ভাবনার দরজা নিজেই বন্ধ করে দেয়। কিন্তু যদি সে বলে, “কোথায় ভুল করেছি, তা খুঁজে বের করব; আবার চেষ্টা করব”—তাহলে ব্যর্থতাই তার উন্নতির সোপান হয়ে ওঠে।

একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করতে না পারলে তার উচিত হতাশ না হয়ে নিজের পড়াশোনার পদ্ধতি পর্যালোচনা করা। সে হয়তো নিয়মিত পড়েনি, সময়ের সঠিক ব্যবহার করেনি, কোনো বিষয় ভালোভাবে বোঝেনি কিংবা পরীক্ষার সময় যথাযথভাবে উত্তর দিতে পারেনি। কারণ চিহ্নিত করে সংশোধনের চেষ্টা করলে পরবর্তী পরীক্ষায় ভালো করার সুযোগ তৈরি হয়।

সুতরাং, ভুলকে ভয় নয়ভুল থেকে শিক্ষা; ব্যর্থতাকে অভিশাপ নয়উন্নতির সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে।

চেষ্টা সাফল্যের প্রথম শর্ত

সাফল্যের কোনো জাদুকরী পথ নেই। সাফল্যের পেছনে থাকে চেষ্টা, শ্রম, অধ্যবসায়, ধৈর্য সঠিক পরিকল্পনা। শুধু স্বপ্ন দেখলেই স্বপ্ন বাস্তব হয় না। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সেই স্বপ্নের সঙ্গে কর্মকে যুক্ত করতে হয়।

একজন কৃষক যদি জমিতে বীজ না বোনেন, তবে ফসলের আশা করা যায় না। একজন নাবিক যদি নৌকার বৈঠা না ধরেন, তবে তিনি তীরে পৌঁছাতে পারবেন না। একজন শিক্ষার্থী যদি বই না খোলেন, তবে জ্ঞান অর্জন করা কঠিন। তেমনি একজন মানুষ যদি নিজের লক্ষ্য অর্জনের জন্য চেষ্টা না করেন, তবে শুধু ইচ্ছা দিয়ে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নয়।

ইচ্ছা মানুষকে স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু চেষ্টা তাকে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। পরিকল্পনা পথ দেখায়, আর পরিশ্রম সেই পথে হাঁটার শক্তি দেয়। তাই জীবনে বড় হতে হলে স্বপ্নের পাশাপাশি কর্মের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

ইসলামে কর্ম প্রচেষ্টার গুরুত্ব

ইসলাম মানুষকে অলসতা, নিষ্ক্রিয়তা কর্মবিমুখতা শেখায় না। ইসলাম মানুষকে সৎ উদ্দেশ্যে কাজ করতে, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করতে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে শিক্ষা দেয়।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন

আর মানুষ যা চেষ্টা করে, তা- তার জন্য।
সূরা আন-নাজম, ৫৩:৩৯

এই আয়াত মানুষের কর্ম প্রচেষ্টার গুরুত্ব স্পষ্ট করে। মানুষ তার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করবে এবং নিজের কর্তব্য পালন করবে। ফলাফল সব সময় তার ইচ্ছামতো নাও হতে পারে; কিন্তু সৎ প্রচেষ্টা কখনোই অর্থহীন নয়।

ইসলামের শিক্ষা হলোমানুষ চেষ্টা করবে, সঠিক পথ অবলম্বন করবে, দোয়া করবে এবং ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেবে। এখানে কর্ম বিশ্বাস পরস্পরের পরিপূরক। শুধু দোয়া করে বসে থাকা যেমন ইসলামের শিক্ষা নয়, তেমনি নিজের শক্তির ওপর অহংকার করে আল্লাহকে ভুলে যাওয়াও মুমিনের পথ নয়।

তাওয়াক্কুল মানে কর্মবিমুখতা নয়

অনেকে মনে করেন, আল্লাহর ওপর ভরসা করলেই আর কোনো চেষ্টা করার প্রয়োজন নেই। এটি তাওয়াক্কুলের সঠিক ধারণা নয়। তাওয়াক্কুল হলোনিজের সাধ্য অনুযায়ী বৈধ সঠিক উপায় অবলম্বন করার পর ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।

প্রচলিত হাদিসের শিক্ষায় এসেছেউটকে আগে বেঁধে তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে। এর মধ্যে অত্যন্ত গভীর শিক্ষা রয়েছে। অর্থাৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে, তারপর আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে হবে।

একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা না করে শুধু দোয়া করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। তাকে পড়তে হবে, অনুশীলন করতে হবে, ভুল সংশোধন করতে হবে এবং তারপর আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে।

একজন কৃষককে জমি প্রস্তুত করতে হবে, বীজ বপন করতে হবে, যত্ন নিতে হবে; এরপর সে আল্লাহর ওপর ভরসা করবে। কারণ ফসলের বৃদ্ধি, বৃষ্টি, আবহাওয়া চূড়ান্ত ফলাফল আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে।

তাই চেষ্টা মানুষের কর্তব্য, ফলাফল আল্লাহর ইখতিয়ারএই ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্বাসই মুমিনের জীবনকে সুন্দর করে।

সবর বা ধৈর্য: সফলতার শক্তি

চেষ্টা করলেই সব সময় দ্রুত ফল পাওয়া যায় না। কখনো কখনো দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কখনো বারবার চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না। তখন মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় সবরের।

সবর মানে নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে থাকা নয়। বরং কঠিন পরিস্থিতিতেও সঠিক পথে অবিচল থাকা, অন্যায় পথে না যাওয়া, হতাশ না হওয়া এবং আল্লাহর ওপর আস্থা রেখে বৈধ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই সবরের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

রাত যত দীর্ঘই হোক, ভোর আসে। মেঘ যত ঘনই হোক, একসময় আকাশ পরিষ্কার হয়। শীতের পর বসন্ত আসে। প্রকৃতির এই পরিবর্তন আমাদের শেখায়কঠিন সময় চিরস্থায়ী নয়।

তাই সাময়িক ব্যর্থতা দেখে জীবনের প্রতি হতাশ হওয়া উচিত নয়। আজ যে কাজ কঠিন মনে হচ্ছে, ধারাবাহিক চেষ্টা ধৈর্যের মাধ্যমে আগামী দিনে সেটিই সহজ হয়ে উঠতে পারে।

সময়ের মূল্য অলসতার ক্ষতি

চেষ্টার অন্যতম শত্রু হলো অলসতা। অলস মানুষ অনেক স্বপ্ন দেখে, অনেক পরিকল্পনা করে, কিন্তু কাজ শুরু করতে চায় না। সে বলে—“আজ নয়, কাল থেকে শুরু করব। এভাবে একদিন, দুইদিন, এক সপ্তাহ, এক মাস করে সময় চলে যায়।

কিন্তু সময় একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। তাই জীবনে উন্নতি করতে হলে সময়ের মূল্য বুঝতে হবে।

আজকের কাজ আজই করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। একজন শিক্ষার্থী প্রতিদিন কয়েক পৃষ্ঠা পড়লে বছরের শেষে অনেক কিছু শিখতে পারে। একজন লেখক প্রতিদিন কিছু লিখলে ধীরে ধীরে একটি বড় কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। একজন মানুষ প্রতিদিন নিজের একটি খারাপ অভ্যাস সংশোধনের চেষ্টা করলে সময়ের সঙ্গে তার চরিত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

বড় সাফল্য অনেক সময় বড় কোনো একক কাজের ফল নয়; বরং অসংখ্য ছোট ছোট সৎ প্রচেষ্টার সমষ্টি।

ছোট প্রচেষ্টার বড় ফল

এক ফোঁটা পানি একা নদী নয়, কিন্তু অসংখ্য ফোঁটা মিলে নদী সৃষ্টি করে। একটি বীজ একা বিশাল বৃক্ষ নয়, কিন্তু যত্ন পেলে সেই বীজই একদিন বড় বৃক্ষে পরিণত হয়।

তেমনি প্রতিদিনের ছোট ছোট প্রচেষ্টা একদিন বড় সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করে।

আজ একটি পৃষ্ঠা পড়া, একটি ভুল সংশোধন করা, একটি নতুন বিষয় শেখা, একটি ভালো কাজ করা, একটি খারাপ অভ্যাস থেকে নিজেকে একটু দূরে রাখাএসব ছোট কাজকে কখনো তুচ্ছ মনে করা উচিত নয়।

যে মানুষ প্রতিদিন নিজেকে গতকালের চেয়ে একটু ভালো করার চেষ্টা করে, সে ধীরে ধীরে উন্নতির পথে এগিয়ে যায়।

প্রকৃতি আমাদের চেষ্টা শেখায়

প্রকৃতির দিকে তাকালেও আমরা অধ্যবসায়ের অসংখ্য শিক্ষা পাই।

একটি বীজ মাটির অন্ধকারে চাপা পড়ে থেকেও একসময় মাটি ভেদ করে আলোয় উঠে আসে। নদী পথে পাথর পেলে থেমে যায় না; প্রয়োজনে পথ পরিবর্তন করে সামনে এগিয়ে চলে। ছোট্ট চারা ঝড়-বৃষ্টি সহ্য করে ধীরে ধীরে শক্ত বৃক্ষে পরিণত হয়।

এগুলো আমাদের শেখায়বাধা আসা মানেই পথ শেষ হয়ে যাওয়া নয়।

পথে পাহাড় থাকলে পথ খুঁজতে হবে, নদী থাকলে সেতু বা পারাপারের ব্যবস্থা করতে হবে, বাধা থাকলে পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হবে। কিন্তু সৎ লক্ষ্য ত্যাগ করা যাবে না।

ভয়কে জয় করতে হবে

অনেক মানুষ ব্যর্থতার চেয়ে ব্যর্থ হওয়ার ভয়েই বেশি পিছিয়ে যায়। তারা মনে মনে ভাবে—“যদি না পারি?”, “যদি সবাই হাসে?”, “যদি আবার ব্যর্থ হই?”

এই ভয় মানুষকে চেষ্টা করার আগেই থামিয়ে দেয়।

কিন্তু ভবিষ্যৎ কী হবে তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তাই ভয়ের কারণে সুযোগ নষ্ট করা উচিত নয়। নিজের সাধ্য অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়ে ভাবে চেষ্টা করতে হবে।

ভয় যদি বলে, “তুমি পারবে না, তখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে হবেআমি অন্তত চেষ্টা করব।

চেষ্টা করলে সফলতার সম্ভাবনা তৈরি হয়; কিন্তু চেষ্টা না করলে সাফল্যের সম্ভাবনাই তৈরি হয় না।

শিক্ষার্থীদের জীবনে চেষ্টা অধ্যবসায়

শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পড়াশোনায় সবাই একই গতিতে শেখে না। কেউ দ্রুত বোঝে, কেউ একটু বেশি সময় নিয়ে বোঝে। কেউ প্রথমবারেই ভালো ফল করে, আবার কেউ কয়েকবার চেষ্টা করার পর কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করে।

তাই অন্যের ফলাফলের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করা উচিত নয়। নিজের গতিতে এগিয়ে যেতে হবে।

কোনো বিষয়ে দুর্বল হলে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। বরং দুর্বল বিষয়টিকে চিহ্নিত করে নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে। আজ যে বিষয় কঠিন মনে হচ্ছে, আগামী দিনে সেটিই পরিচিত সহজ হয়ে উঠতে পারে।

একটি পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়া জীবনের শেষ নয়। ভুল বিশ্লেষণ করে নতুনভাবে প্রস্তুতি নেওয়াই হলো প্রকৃত শিক্ষার্থীর পরিচয়।

অন্যের সাফল্য থেকে অনুপ্রেরণা নিতে হবে

মানুষের জীবনের গতি এক নয়। কেউ আগে সফল হয়, কেউ পরে। কারও পথ সহজ মনে হয়, আবার কারও পথ দীর্ঘ কঠিন হয়।

তাই অন্যের সাফল্য দেখে হিংসা করা উচিত নয়। বরং সাফল্যবান মানুষের ভালো গুণগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে। তার পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, সময় ব্যবস্থাপনা, জ্ঞানচর্চা অধ্যবসায় থেকে অনুপ্রেরণা নিতে হবে।

নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে গতকালের নিজের সঙ্গে তুলনা করা ভালো। প্রশ্ন করা উচিতআজ আমি কি গতকালের চেয়ে একটু ভালো? আজ কি আমি নতুন কিছু শিখেছি? আজ কি আমি কোনো ভুল সংশোধন করেছি?

এই আত্মউন্নতির মনোভাব মানুষকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যায়।

সাফল্যে অহংকার নয়, শুকরিয়া

চেষ্টা করে যখন সাফল্য আসে, তখন মানুষকে সতর্ক থাকতে হয়। সাফল্যের সময় অহংকার করা উচিত নয়। কারণ মানুষের জ্ঞান, শক্তি, সামর্থ্য, সুযোগ প্রতিভাসবই আল্লাহর দান।

সাফল্য পেলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে। নিজের পরিশ্রমকে স্বীকার করার পাশাপাশি মনে রাখতে হবে, সেই পরিশ্রম করার শক্তি এবং সুযোগও আল্লাহ দিয়েছেন।

সত্যিকারের সফল মানুষ নিজের সাফল্যে অহংকার করে অন্যকে ছোট করে না; বরং বিনয়ী হয় এবং অন্যদেরও উৎসাহিত করে।

ব্যর্থতার সময় আত্মবিশ্বাস হারানো যাবে না

ব্যর্থতার সময় মানুষ নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে। একটি ভুলের কারণে মনে হতে পারে—“আমি কিছুই পারি না। কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়।

একটি কাজের ব্যর্থতা একজন মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। মানুষ তার ভুলের চেয়ে বড়। একটি পরীক্ষার ফলাফল, একটি প্রতিযোগিতায় পরাজয় কিংবা একটি পরিকল্পনার ব্যর্থতা মানুষের সামগ্রিক সামর্থ্য নির্ধারণ করে না।

তাই ব্যর্থ হলে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবেকী শিখলাম? কোথায় ভুল হলো? এবার কীভাবে আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়া যায়?

এই প্রশ্নগুলো ব্যর্থতাকে উন্নতির পথে পরিণত করতে সাহায্য করে।

সৎ পথে চেষ্টা করতে হবে

সাফল্য অর্জনের জন্য চেষ্টা অবশ্যই করতে হবে; কিন্তু সেই চেষ্টা হতে হবে বৈধ, সৎ ন্যায়সংগত পথে।

অন্যায়, প্রতারণা, দুর্নীতি, মিথ্যা কিংবা হারাম উপায়ে অর্জিত সাফল্য প্রকৃত সাফল্য নয়। কারণ সাফল্যের মূল্য শুধু ফলাফলে নয়, তার অর্জনের পদ্ধতিতেও নিহিত।

অন্যায় পথে বড় অর্জনের চেয়ে সৎ পথে ছোট অর্জন অনেক বেশি সম্মানের। একজন মানুষ সামান্য উপার্জন করেও যদি তা হালাল সৎ পথে অর্জন করেন, তবে সেটি তার জন্য মর্যাদার বিষয়।

ইসলামী জীবনদর্শনে লক্ষ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি লক্ষ্য অর্জনের পথও গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের নীতি হওয়া উচিতসাফল্য চাই, তবে সৎ পথে; অর্জন চাই, তবে ন্যায়ের সীমার মধ্যে।

সততা, শ্রম নৈতিকতার সমন্বয়

শুধু পরিশ্রমী হলেই মানুষ আদর্শ মানুষ হয় না। পরিশ্রমের সঙ্গে সততা, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা মানবিকতা যুক্ত হতে হয়।

একজন মানুষ অনেক পরিশ্রম করতে পারেন, কিন্তু যদি তিনি প্রতারণা করেন, অন্যের অধিকার নষ্ট করেন কিংবা অন্যায় পথে চলেন, তবে তার সাফল্য সমাজের জন্য কল্যাণকর নয়।

তাই আমাদের জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিতজ্ঞান অর্জন, সৎ কর্ম, নৈতিক চরিত্র, মানুষের উপকার এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।

তরুণ সমাজ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ

আজকের শিক্ষার্থী তরুণরাই আগামী দিনের সমাজ রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেবে। তাদের জ্ঞান, চরিত্র, শ্রম, সততা নৈতিকতার ওপর ভবিষ্যৎ সমাজের অনেক কিছু নির্ভর করে।

তরুণরা যদি অলসতা পরিহার করে, জ্ঞানচর্চা করে, প্রযুক্তি দক্ষতা অর্জন করে, নৈতিক চরিত্র গড়ে তোলে এবং দেশের মানুষের কল্যাণে নিজেদের প্রস্তুত করে, তাহলে একটি সুন্দর, জ্ঞানভিত্তিক মানবিক বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।

দেশকে ভালোবাসা শুধু কথায় নয়; দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়া, সৎভাবে কাজ করা, অন্যের অধিকার সম্মান করা, দুর্নীতি অন্যায় থেকে দূরে থাকা এবং নিজের যোগ্যতা দিয়ে সমাজের উপকার করাও দেশপ্রেমের অংশ।

সাফল্যের প্রকৃত অর্থ

সাফল্য মানেই অর্থ, পদ, খ্যাতি বা বাহ্যিক অর্জন নয়। এগুলো জীবনের কিছু অর্জন হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত সাফল্য আরও গভীর।

যে মানুষ প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্যকে আঁকড়ে ধরে, যে ব্যর্থতার মধ্যেও আশা হারায় না, যে অন্যায় পথে না গিয়ে সৎ পথে এগিয়ে যায়, যে জ্ঞান অর্জন করে, মানুষের উপকার করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করেপ্রকৃত অর্থে সেই সফল।

ইসলামী দৃষ্টিতে দুনিয়ার সাফল্যের পাশাপাশি আখিরাতের সফলতাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের চেষ্টা শুধু পার্থিব উন্নতির জন্য নয়; বরং এমন জীবন গড়ার জন্য হওয়া উচিত, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে।

চেষ্টা, দোয়া আত্মশুদ্ধি

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবেসৎ চেষ্টা, দোয়া এবং আত্মশুদ্ধি।

সৎ চেষ্টা আমাদের কর্মের দায়িত্ব শেখায়। দোয়া আমাদের আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে। আর আত্মশুদ্ধি আমাদের অহংকার, হিংসা, অলসতা, অন্যায় অসৎ প্রবৃত্তি থেকে ূরে রাখে।

চেষ্টা করতে হবে যেন আমরা নিজেদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য ব্যবহার করি। দোয়া করতে হবে যেন আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করেন। আর আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে যেন আমাদের অর্জন নৈতিক কল্যাণকর হয়।

উপসংহার

জীবন একটি দীর্ঘ যাত্রা। এই যাত্রায় সাফল্য যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে ব্যর্থতা। কখনো আমরা জয়ী হব, কখনো ভুল করব; কখনো প্রশংসা পাব, কখনো সমালোচনার মুখোমুখি হব। কিন্তু এসবের কোনোটিই আমাদের থামিয়ে দিতে পারবে না, যদি আমাদের হৃদয়ে থাকে দৃঢ় সংকল্প, সৎ উদ্দেশ্য, পরিশ্রম, সবর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল।

ব্যর্থতা আমাদের থামানোর জন্য নয়; বরং আমাদের শেখানোর জন্য আসতে পারে। ভুল আমাদের ধ্বংস করার জন্য নয়; বরং নিজেদের সংশোধনের সুযোগ দিতে পারে। বাধা আমাদের পথ বন্ধ করার জন্য নয়; বরং আমাদের আরও বিচক্ষণ শক্তিশালী করে তুলতে পারে।

তাই ব্যর্থ হলে হতাশ হওয়া নয়কারণ খুঁজতে হবে। পড়ে গেলে বসে থাকা নয়উঠে দাঁড়াতে হবে। ভুল হলে নিজেকে শেষ মনে করা নয়ভুল সংশোধন করতে হবে। স্বপ্ন দেখলে শুধু স্বপ্নের মধ্যে থাকা নয়সেই স্বপ্নকে কর্মে রূপ দিতে হবে।

আমাদের জীবনের অঙ্গীকার হোক

ব্যর্থতা এলে শিক্ষা নেব,
বাধা এলে পথ খুঁজব,
ভুল হলে নিজেকে সংশোধন করব,
ক্লান্ত হলে সাময়িক বিশ্রাম নিয়ে আবার চলব,
সাফল্য এলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করব,
আর প্রতিটি অবস্থায় সৎ ন্যায়ের পথে থাকব।

কারণ জীবনের প্রকৃত শক্তি কেবল কখনো না পড়ার মধ্যে নয়; বরং পড়ে গিয়েও আবার উঠে দাঁড়ানোর মধ্যে। প্রকৃত সাহস হলো ভয় থাকা সত্ত্বেও সঠিক কাজ করা। প্রকৃত তাওয়াক্কুল হলো সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে আল্লাহর ওপর ভরসা করা। আর প্রকৃত সাফল্য হলোসৎ পথে অবিচল থেকে নিজের কর্তব্য পালন করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।

সুতরাং আমাদের হৃদয়ের দৃঢ় অঙ্গীকার হোক

ব্যর্থতা নয়, চেষ্টা চাই।
হতাশা নয়, আশা চাই।
অলসতা নয়, কর্ম চাই।
অন্যায় নয়, ন্যায় চাই।
অহংকার নয়, শুকরিয়া চাই।
অস্থিরতা নয়, সবর চাই।
কর্মহীনতা নয়, তাওয়াক্কুলসহ সৎ প্রচেষ্টা চাই।
আর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে চাই আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ।

ব্যর্থতা শেষ কথা নয়; সৎ চেষ্টা, অধ্যবসায়, সবর তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে মানুষ আবারও উঠে দাঁড়াতে পারে। তাইহার মানা নয়, চেষ্টা চাই; থেমে যাওয়া নয়, এগিয়ে চলাই চাই।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ