Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৮ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৪৯ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ে গুণগত শিক্ষা বাস্তবায়ন: সম্ভাবনা, বৈষম্য ও উত্তরণের পথ

বাংলাদেশের সার্বিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য মানসম্মত বা মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা অপরিহার্য। যদিও বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার কমেছে এবং ভর্তির হার সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, তবুও শিক্ষা অর্জনের মান বা গুণগত শিক্ষা’ (Quality Education) নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দেশ এখনও বেশ কিছু বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।

 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গুণগত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে প্রধান বাধা, বিদ্যমান বৈষম্য এবং উত্তরণের পথসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:



১. গ্রামীণ ও চরাঞ্চলের বাস্তবায়ন সংকট

বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামীণ ও বিশেষ করে চরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার দূরত্ব অনেক বেশি।



ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও চরাঞ্চলের চিত্র: নদীভাঙন, প্লাবন এবং যাতায়াত ব্যবস্থার সুযোগ না থাকায় চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকার শিশুরা সঠিক সময়ে স্কুলে পৌঁছাতে পারে না। অনেক সময় শিক্ষক সংকট কিংবা নদী পারাপারের ঝুঁকির কারণে শিশুরা বিদ্যালয়মুখী হতে চায় না।

 

অবকাঠামোগত ঘাটতি: শহরের সরকারি-বেসরকারি স্কুলগুলোর তুলনায় গ্রামের ও চরাঞ্চলের স্কুলগুলোতে উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ, বিদ্যুতায়ন, উন্নত স্যানিটেশন ও খেলার মাঠের অভাব প্রবল।

 

২. শহর ও গ্রামীণ/চরাঞ্চলের শিক্ষার বৈষম্য

শহর এবং গ্রামের প্রাথমিক শিক্ষার মধ্যে একটি বড় ধরনের বৈষম্য রেখা তৈরি হয়েছে:



শিক্ষক ও সম্পদের অসম বণ্টন: শহরের মানসম্মত প্রাথমিক ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে অপেক্ষাকৃত দক্ষ শিক্ষক এবং আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক (যেমন: ডিজিটাল কন্টেন্ট বা মাল্টিমিডিয়া) শিক্ষার সুযোগ থাকে। অন্যদিকে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাব থাকে এবং অনেক সময় একজন শিক্ষককেই একাধিক শ্রেণির পাঠদান পরিচালনা করতে হয়।

 

শিক্ষার পরিবেশ: শহরে অভিভাবকদের সচেতনতা এবং কোচিং বা প্রাইভেট টিউটরের সহায়তা প্রাপ্তি সহজ হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বাড়তি সহায়তা পায়, যা প্রান্তিক বা গ্রামের শিশুরা পায় না।

 

৩. দারিদ্র্য ও শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ

মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা এক বিরাট প্রাচীর হিসেবে কাজ করে।



দারিদ্র্যের কষাঘাত: নিম্নআয়ের ও দিনমজুর পরিবারের ক্ষেত্রে শিশুদের শিক্ষার চেয়ে দৈনন্দিন জীবনধারণের ব্যয় মেটানো অগ্রাধিকার পায়। ফলে অনেক শিশু প্রাথমিকেই শিশুশ্রমের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

 

অনাগ্রহ ও ঝরে পড়া: শিক্ষাপদ্ধতি আনন্দদায়ক ও ব্যবহারিক না হওয়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার সুবিধা বুঝতে না পেরে অনেক অভিভাবক ও শিশু প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

 

৪. সচেতনতার অভাব ও সামাজিক উপাদান

অভিভাবকদের অসচেতনতা: প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেক অভিভাবক নিজেই নিরক্ষর বা স্বল্পশিক্ষিত। ফলে সন্তানের পড়াশোনায় বাড়িতে কী ধরনের মানসিক বা পাঠদানগত সাহায্য প্রয়োজন, সে সম্পর্কে তারা অসচেতন থাকেন।

 

কুসংস্কার ও বাল্যবিয়ে: বিশেষ করে চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকায় মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই বাল্যবিয়ে দেওয়ার প্রবণতা এখনও বিদ্যমান।

 

ಗುಣগত শিক্ষা বাস্তবায়নে করণীয় ও সুপারিশ

বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর জন্য সমমানের ও গুণগত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন:

 

সমাধানের ক্ষেত্র

প্রস্তাবিত পদক্ষেপ

শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পদায়ন

চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকার জন্য বিশেষ ভাতা প্রদান করে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ ও নিয়মিত আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতির প্রশিক্ষণ দেওয়া।

অবকাঠামো ও প্রযুক্তি

চরাঞ্চলে ভাসমান/নৌকা স্কুল এবং নমনীয় সময়সূচি চালু করা; সেই সাথে প্রতিটি স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ও বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করা।

সামাজিক উপবৃত্তি ও দুপুরের খাবার

দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ঝরে পড়া রোধে 'স্কুল ফিডিং' (দুপুরের খাবার) কর্মসূচি দেশব্যাপী কার্যকর করা এবং উপবৃত্তির পরিমাণ বৃদ্ধি করা।

সচেতনতা সৃষ্টি

মা-সমাবেশ ও অভিভাবক সভা নিয়মিত আয়োজন করে শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি সুফল ও চাইল্ড কেয়ার সম্পর্কে সচেতন করা।

প্রাথমিক শিক্ষা কেবল বর্ণমালা শেখার বিষয় নয়; এটি একজন শিশুর চিন্তা, সৃষ্টিশীলতা ও নীতিগত ভিত্তি তৈরি করে। গ্রামীণ ও চরাঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং দরিদ্র পরিবারের প্রতি আর্থিক ও সামাজিক সমর্থন বাড়াতে পারলে বাংলাদেশে সর্বজনীন গুণগত প্রাথমিক শিক্ষা’ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

 

 

মন্তব্য করুন