Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৯ আগস্ট, ২০২৬ ০৫:০৫ পূর্বাহ্ণ

ভালো বন্ধু, ভালো বই ও নির্মল বিবেক - মোঃ মুজিবুর রহমান

ভালো বন্ধু, ভালো বই নির্মল বিবেক

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর

মানুষ একা বাঁচতে পারে না। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে মিশেই মানুষের চিন্তা, চরিত্র জীবনবোধ গড়ে ওঠে। একজন মানুষের জীবনে অনেক সম্পদ থাকতে পারে, কিন্তু ভালো সঙ্গ, সঠিক জ্ঞান জাগ্রত বিবেক না থাকলে সেই সম্পদ তার জীবনকে সত্যিকার অর্থে সুন্দর করতে পারে না। তাই মানুষের আদর্শ জীবন গঠনে ভালো বন্ধু, ভালো বই নির্মল বিবেকএই তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ভালো বন্ধু মানুষকে সৎ পথে সাহিত করে, ভালো বই জ্ঞানের আলো জ্বালায়, আর নির্মল বিবেক সত্য মিথ্যা, ন্যায় অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করতে সাহায্য করে।

ইসলামী জীবনব্যবস্থায়ও সৎ সঙ্গ, উপকারী জ্ঞান, উত্তম চরিত্র আল্লাহভীতি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কুরআন সুন্নাহ মানুষকে সত্যবাদিতা, আমানতদারি, দয়া, ক্ষমা, ন্যায়পরায়ণতা, পরোপকার আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়। ফলে ভালো বন্ধু, ভালো বই নির্মল বিবেককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জীবন শুধু দুনিয়ায় শান্তি কল্যাণ বয়ে আনে না; বরং আখিরাতের সফলতার পথও সুগম করে।

ভালো বন্ধুর প্রয়োজনীয়তা

বন্ধুত্ব মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। একজন ভালো বন্ধু সুখে আনন্দ ভাগ করে নেয়, দুঃখে সান্ত্বনা দেয়, বিপদে পাশে দাঁড়ায় এবং ভুল হলে তা সংশোধনের জন্য আন্তরিকভাবে সতর্ক করে। সুখের দিনে অনেকেই কাছে আসে; কিন্তু দুঃসময়ে যে হাত বাড়িয়ে দেয়, সেই প্রকৃত বন্ধু।

তবে শুধু হাসি-আনন্দ ভাগ করে নেওয়াই বন্ধুত্বের পূর্ণতা নয়। সত্যিকারের বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলোবন্ধু তার বন্ধুর কল্যাণ চায়। সে বন্ধুকে অন্যায় কাজে উৎসাহিত করে না; বরং ভুল থেকে ফিরিয়ে আনে। মিথ্যা বললে সত্য বলতে শেখায়, অন্যের অধিকার নষ্ট করতে চাইলে বাধা দেয়, অহংকার করলে বিনয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং হতাশ হলে সাহস জোগায়।

যে বন্ধু পাপ অন্যায়ের পথে টেনে নেয়, সে বাহ্যিকভাবে যতই আপন হোক, প্রকৃত অর্থে সে কল্যাণকামী বন্ধু নয়। পক্ষান্তরে যে বন্ধু নামাজ, সৎকর্ম, অধ্যয়ন, মা-বাবার সম্মান, মানুষের সেবা নৈতিক জীবনযাপনে উৎসাহিত করে, তার সঙ্গ নিঃসন্দেহে মূল্যবান।

পবিত্র কুরআনে সৎ মানুষের সঙ্গে থাকার প্রতি সাহ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন

হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।
সূরা আত-তাওবা, :১১৯

এই নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, মানুষের চরিত্র গঠনে সঙ্গের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। তাই বন্ধুত্ব করার ক্ষেত্রে বাহ্যিক আকর্ষণ, অর্থ-সম্পদ বা জনপ্রিয়তার চেয়ে চরিত্র, সততা, নৈতিকতা আল্লাহভীতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

সঙ্গের প্রভাব

মানুষ তার চারপাশের পরিবেশ থেকে অনেক কিছু শেখে। ভালো মানুষের সঙ্গে থাকলে ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ে; আর খারাপ সঙ্গ মানুষের চিন্তা আচরণকে ধীরে ধীরে নেতিবাচক করে তুলতে পারে। কারণেই জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলোকাদের সঙ্গে চলব, কার কথা শুনব এবং কাদেরকে নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করব।

একজন ছাত্র যদি অধ্যয়নশীল, বিনয়ী দায়িত্বশীল বন্ধুদের সঙ্গে চলাফেরা করে, তবে তার মধ্যেও পড়াশোনা ভালো কাজের আগ্রহ বাড়তে পারে। অন্যদিকে অলসতা, মিথ্যা, প্রতারণা, অশালীনতা বা দায়িত্বহীনতাকে স্বাভাবিক মনে করে এমন সঙ্গ মানুষের স্বভাব ভবিষ্যতের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই বন্ধুত্ব হবে এমন, যেখানে ভালোবাসা থাকবে কিন্তু অন্ধ পক্ষপাত থাকবে না; আন্তরিকতা থাকবে কিন্তু অন্যায়ের সমর্থন থাকবে না; হাসি-আনন্দ থাকবে কিন্তু নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করা হবে না।

ভালো বন্ধু সে-, যে তোমাকে শুধু খুশি করে না; প্রয়োজনে তোমাকে সংশোধনও করে।

ভালো বইজ্ঞানের নীরব শিক্ষক

বই মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সঙ্গী। একজন মানুষ একা বসে একটি বইয়ের মাধ্যমে বহু মানুষের চিন্তা, অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। বই কথা বলে না, কিন্তু তার পাতায় পাতায় জ্ঞানের দরজা খুলে যায়।

ভালো বই মানুষের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে। এটি অজানাকে জানতে সাহায্য করে, প্রশ্ন করতে শেখায়, যুক্তিবোধ বাড়ায়, ইতিহাস সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করায় এবং জীবন সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়। একটি ভালো বই কখনো কখনো মানুষের চিন্তার ধারা জীবনদৃষ্টিও পরিবর্তন করে দিতে পারে।

বই শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার উপকরণ নয়; বই মানুষ গড়ারও মাধ্যম। ইতিহাসের বই অতীত থেকে শিক্ষা নিতে শেখায়, বিজ্ঞানবিষয়ক বই প্রকৃতি সৃষ্টিজগতের রহস্য সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে, সাহিত্য মানুষের অনুভূতি কল্পনাশক্তিকে সমৃদ্ধ করে, আর নৈতিক ধর্মীয় গ্রন্থ মানুষকে সৎ জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়।

তবে বই অনেক হলেই হবে না; বই হতে হবে ভালো উপকারী। যে বই জ্ঞান, নৈতিকতা, মানবতা, সত্য, ন্যায় সুন্দর জীবনযাপনের প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করে, সেই বই পাঠ মানুষের জন্য কল্যাণকর।

কুরআনহেদায়েতের আলো

একজন মুসলিমের জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ পথনির্দেশনার গ্রন্থ হলো পবিত্র কুরআন। এটি মানুষের বিশ্বাস, ইবাদত, নৈতিকতা, পারিবারিক জীবন, সামাজিক দায়িত্ব এবং আখিরাত সম্পর্কে পথনির্দেশনা দেয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন

নিশ্চয়ই এই কুরআন এমন পথ দেখায়, যা সবচেয়ে সরল সঠিক।
সূরা আল-ইসরা, ১৭:

কুরআন মানুষকে একদিকে আল্লাহর পরিচয় তাঁর প্রতি আনুগত্যের শিক্ষা দেয়, অন্যদিকে সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার, দয়া, ক্ষমা, ধৈর্য, আমানতদারি মানুষের অধিকার রক্ষার শিক্ষা দেয়। তাই কুরআন শুধু তিলাওয়াতের গ্রন্থ নয়; এর শিক্ষা বুঝে জীবনে বাস্তবায়ন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হাদিস সুন্নাহ কুরআনের শিক্ষাকে জীবনে প্রয়োগের পথ দেখায়। রাসুলুল্লাহ -এর জীবন সত্যবাদিতা, আমানতদারি, দয়া, বিনয়, ক্ষমা উত্তম আচরণের উজ্জ্বল আদর্শ। তাই একজন মুসলিমের জ্ঞানচর্চা এমন হওয়া উচিত, যা তাকে ভালো মানুষ আল্লাহর অনুগত বানায়।

ইলম আমলের সম্পর্ক

জ্ঞান মানুষের জন্য বড় সম্পদ। কিন্তু জ্ঞান যদি মানুষের চরিত্র কাজে পরিবর্তন না আনে, তবে সেই জ্ঞানের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয় না। সত্যিকারের জ্ঞান মানুষের মধ্যে বিনয়, দায়িত্ববোধ নৈতিকতা সৃষ্টি করে।

শুধু মুখস্থ করে জ্ঞানী হওয়া যায়, কিন্তু জ্ঞানকে জীবনে প্রয়োগ না করলে প্রকৃত জ্ঞানী হওয়া যায় না। কেউ যদি সততার গুরুত্ব জানে, অথচ কাজে অসৎ হয়; আমানতদারির কথা জানে, অথচ আমানত রক্ষা করে না; মানুষের অধিকার সম্পর্কে জানে, অথচ অন্যের অধিকার নষ্ট করেতাহলে তার জ্ঞান তার চরিত্রকে যথেষ্ট আলোকিত করতে পারেনি।

তাই শিক্ষা হবে এমন, যা মানুষের মাথাকে জ্ঞানী, হৃদয়কে কোমল এবং চরিত্রকে সুন্দর করে। জ্ঞান আমলের সমন্বয়েই মানুষের জীবন পরিপূর্ণতা লাভ করে।

নির্মল বিবেকঅন্তরের প্রহরী

মানুষের বাহ্যিক জীবনে যেমন একজন প্রহরী নিরাপত্তা রক্ষা করে, তেমনি অন্তরের জগতে বিবেক মানুষকে ভালো-মন্দের ব্যাপারে সতর্ক করে। বিবেক মানুষকে নিজের কাজ নিয়ে ভাবতে শেখায়। অন্যায় করলে অনুশোচনা জাগে, কারও প্রতি অবিচার করলে অন্তরে অস্বস্তি সৃষ্টি হয়, আর ভালো কাজ করলে মনে প্রশান্তি আসেএগুলো বিবেকের জাগ্রত অবস্থার লক্ষণ।

নির্মল বিবেক মানে এই নয় যে মানুষ কখনো ভুল করবে না। মানুষ ভুল করতে পারে। ভুল মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতা। কিন্তু ভুল বুঝতে পারা, ভুল স্বীকার করা, সংশোধনের চেষ্টা করা এবং ভবিষ্যতে তা এড়িয়ে চলাই হলো সুস্থ জাগ্রত বিবেকের পরিচয়।

ইসলামে তওবার গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষ ভুল করলে আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে পারে। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের নিরাশ না হয়ে তাঁর রহমতের দিকে ফিরে আসতে বলেছেন। তাই কোনো ভুলের পর হতাশ হয়ে না থেকে আন্তরিকভাবে তওবা, সংশোধন সৎকর্মের পথে ফিরে আসা উচিত।

বিবেক কেন ঘুমিয়ে পড়ে?

লোভ, হিংসা, অহংকার, মিথ্যা, প্রতারণা, অন্যায় পাপের প্রতি অভ্যাস মানুষের বিবেককে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিতে পারে। প্রথমবার অন্যায় করলে অন্তরে যে অস্বস্তি হয়, একই অন্যায় বারবার করতে থাকলে সেই অনুভূতি অনেক সময় কমে যায়। এভাবেই মানুষ অন্যায়কে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করতে পারে।

তাই নিজের বিবেককে জাগ্রত রাখতে নিয়মিত আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে

আজ আমি কি সত্য কথা বলেছি?
কাউকে কি অন্যায়ভাবে কষ্ট দিয়েছি?
কারও অধিকার কি নষ্ট করেছি?
কোনো আমানতের ব্যাপারে কি অবহেলা করেছি?
আমার কোনো আচরণ কি অন্যের জন্য ক্ষতির কারণ হয়েছে?
আমি কি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মতো কোনো ভুল করেছি?

এই আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে নিজের ভুল চিনতে এবং নিজেকে সংশোধন করতে সাহায্য করে।

আল্লাহর জবাবদিহির বিশ্বাস

মানুষের চোখ এড়িয়ে কোনো কাজ করা সম্ভব হলেও আল্লাহর জ্ঞান থেকে কোনো কিছু গোপন করা সম্ভব নয়। একজন মুমিনের অন্তরে এই বিশ্বাস থাকা উচিত যে, তার প্রকাশ্য গোপন সব কাজ আল্লাহ জানেন।

এই বিশ্বাস মানুষের বিবেককে শক্তিশালী করে। যখন মানুষ জানে যে তার প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে, তখন সে একাকীত্বেও অন্যায় থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে। মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালো কাজ করাই তখন জীবনের উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে।

কারণেই প্রকৃত নৈতিকতা হলোমানুষ দেখছে বলে ভালো থাকা নয়; আল্লাহ দেখছেনএই বিশ্বাসে ভালো থাকা।

আদর্শ জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য

আদর্শ জীবন শুধু ধন-সম্পদ, বড় বাড়ি, উচ্চ পদ বা বাহ্যিক সাফল্যের নাম নয়। একজন মানুষ অনেক সম্পদের মালিক হয়েও যদি অসৎ, অহংকারী, নিষ্ঠুর অন্যায়কারী হয়, তবে তার জীবন প্রকৃত অর্থে সুন্দর নয়।

আদর্শ জীবন হলো এমন জীবন, যেখানে ঈমান আছে, নৈতিকতা আছে, জ্ঞান আছে, দায়িত্ববোধ আছে, মানুষের প্রতি মমতা আছে এবং নিজের ভুল সংশোধনের মানসিকতা আছে।

অল্পে তুষ্ট থাকা, আল্লাহর নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা, বৈধ উপায়ে উপার্জন করা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা, মা-বাবাকে সম্মান করা, প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ করা, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করাএসবই সুন্দর জীবনের বৈশিষ্ট্য।

বন্ধুত্ব, বই বিবেকতিনের সমন্বয়

ভালো বন্ধু মানুষকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করে। ভালো বই মানুষকে জ্ঞান দেয়। আর নির্মল বিবেক সেই জ্ঞান পরামর্শকে যাচাই করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

বন্ধু যদি ভালো হয় কিন্তু জ্ঞানচর্চা না থাকে, তবে চিন্তার পরিসর সীমিত হতে পারে। বই যদি অনেক পড়া হয় কিন্তু বিবেক জাগ্রত না থাকে, তবে জ্ঞান যথাযথভাবে কাজে নাও লাগতে পারে। আবার বিবেকের কথা শুনলেও যদি সঠিক জ্ঞান না থাকে, তবে সব বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হতে পারে।

তাই

ভালো বন্ধু দেবে সৎ সাহস,
ভালো বই দেবে জ্ঞানের আলো,
নির্মল বিবেক দেখাবে ন্যায়ের পথ।

এই তিনের সঙ্গে যদি ঈমান, তাকওয়া নেক আমল যুক্ত হয়, তাহলে মানুষের জীবন আরও সুন্দর, ভারসাম্যপূর্ণ কল্যাণময় হয়ে উঠতে পারে।

শিক্ষার্থীদের জীবনে এর গুরুত্ব

শিক্ষার্থীদের জীবনে ভালো বন্ধু, ভালো বই নির্মল বিবেকের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ এই সময়েই মানুষের চিন্তা, অভ্যাস চরিত্রের ভিত্তি শক্ত হয়।

শিক্ষার্থীদের উচিত জ্ঞানী, পরিশ্রমী, ভদ্র নৈতিক বন্ধু নির্বাচন করা। নিয়মিত পাঠ্যবই পড়ার পাশাপাশি উপকারী জ্ঞানমূলক নৈতিক বই পড়া দরকার। একই সঙ্গে নিজের কাজ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং ভুল হলে তা সংশোধনের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য নয়। শিক্ষা মানুষের চিন্তাকে আলোকিত করবে, চরিত্রকে সুন্দর করবে এবং সমাজের জন্য দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবেএটাই শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য।

পরিবার সমাজে এর প্রভাব

একজন ভালো মানুষ শুধু নিজের জীবনকে সুন্দর করে না; তার ভালো আচরণ পরিবার সমাজেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। একজন সৎ বন্ধু যেমন বন্ধুকে ভালো পথে পরিচালিত করতে পারে, তেমনি একজন শিক্ষিত নৈতিক মানুষ তার পরিবার, কর্মক্ষেত্র সমাজে সততা মানবতার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে।

সমাজে যদি মানুষ অন্যের অধিকারকে সম্মান করে, মিথ্যা প্রতারণা পরিহার করে, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ায় এবং ন্যায় সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়, তাহলে সমাজে শান্তি পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি পাবে।

অন্যদিকে স্বার্থপরতা, প্রতারণা, হিংসা, মিথ্যা অন্যায়ের বিস্তার ঘটলে মানুষের মধ্যে বিশ্বাস নষ্ট হয়। তাই সুন্দর সমাজ গঠনের শুরু হতে হবে ব্যক্তির নিজের চরিত্র থেকে।

প্রতিদিনের আত্মশুদ্ধির অনুশীলন

নিজেকে সুন্দর করার জন্য বড় কোনো কাজের অপেক্ষা করা প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন ছোট ছোট কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা যায়

  • সত্য কথা বলা।

  • ভালো বন্ধু নির্বাচন করা।

  • নিয়মিত উপকারী বই পড়া।

  • কুরআন তিলাওয়াত এর শিক্ষা বোঝার চেষ্টা করা।

  • রাসুলুল্লাহ -এর সুন্নাহ অনুসরণ করা।

  • মা-বাবার প্রতি সম্মান সদাচরণ করা।

  • অন্যের অধিকার রক্ষা করা।

  • আমানত যথাযথভাবে পালন করা।

  • ভুল হলে দ্রুত স্বীকার সংশোধন করা।

  • কারও প্রতি অহেতুক বিদ্বেষ না রাখা।

  • গীবত, মিথ্যা অপমানজনক কথা থেকে বিরত থাকা।

  • প্রতিদিন নিজের কাজের হিসাব নেওয়া।

  • আল্লাহর কাছে ক্ষমা হেদায়েত প্রার্থনা করা।

এসব অভ্যাস ধীরে ধীরে মানুষের চরিত্রকে সুন্দর করে এবং বিবেককে জাগ্রত রাখে।

উপসংহার

মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য তার পোশাকে নয়, সম্পদে নয়, ক্ষমতায় নয়; তার চরিত্র, জ্ঞান, বিবেক মানবিকতায় জীবনে ভালো বন্ধু থাকলে মানুষ সৎ পথে চলার অনুপ্রেরণা পায়। ভালো বই থাকলে জ্ঞানের জগ প্রসারিত হয়। আর নির্মল বিবেক থাকলে মানুষ নিজের ভুল বুঝতে পারে, অন্যায় থেকে ফিরে আসতে পারে এবং সত্য ন্যায়ের পথে অবিচল থাকতে পারে।

তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত জীবনে এমন বন্ধু নির্বাচন করা, যে ভালো কাজে উৎসাহ দেবে; এমন বই পড়া, যা জ্ঞান চরিত্র বৃদ্ধি করবে; এবং এমনভাবে জীবনযাপন করা, যাতে বিবেক সবসময় জাগ্রত থাকে।

আমাদের বন্ধু হোক সত্যের সাথি, বই হোক জ্ঞানের দ্বার, বিবেক হোক ন্যায়ের প্রহরী। আমাদের জ্ঞান যেন আমলে রূপ নেয়, আমল যেন চরিত্রকে সুন্দর করে এবং চরিত্র যেন মানুষের কল্যাণে কাজে লাগে। কুরআনের আলো, সুন্নাহর শিক্ষা, সৎ সঙ্গ, উপকারী জ্ঞান, নেক আমল নির্মল বিবেককে জীবনের পথপ্রদর্শক করে আমরা যদি এগিয়ে চলি, তবে ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন সামাজিক জীবনসব ক্ষেত্রেই কল্যাণের পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব।

দুনিয়ার সম্পদ একদিন রেখে যেতে হবে; কিন্তু সুন্দর চরিত্র, সৎকর্ম মানুষের জন্য করা কল্যাণকর কাজ মানুষের জীবনে স্থায়ী মূল্য রেখে যায়। তাই আমাদের জীবনের লক্ষ্য হোকসত্যকে ভালোবাসা, জ্ঞানকে ধারণ করা, ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করা, মানুষের কল্যাণে কাজ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।

ভালো বন্ধু পাশে থাক, ভালো বই থাক হাতে;
নির্মল বিবেক জেগে থাক জীবনের প্রতিটি রাতে।
ঈমান, ইলম, আমল হোক জীবনের পরিচয়
দুনিয়ায় শান্তি, আখিরাতে নাজাত হোক আমাদের পরম প্রত্যাশা।

 

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ