সহকারী শিক্ষক
০৯ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৩২ অপরাহ্ণ
শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতা: ইউরোপ-আমেরিকার অন্ধ অনুকরণ নয়, চাই এশীয় অভিজ্ঞতার আত্মীকরণ
একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে প্রতিদিন ক্লাসরুমে শিশুদের নিষ্পাপ মুখগুলোর দিকে তাকালে একটি কথা বারবার মনে হয়—এই কোমলমতি শিশুদের শিক্ষার যে স্বপ্ন আমরা দেখাচ্ছি, তা কতটা আমাদের নিজেদের মাটি ও জীবনের সাথে সম্পর্কিত?
বিশ্বায়নের এই যুগে শিক্ষা কোনো একক ভৌগোলিক সীমানায় আটকে নেই। শিক্ষায় আন্তর্জাতিক ধারণা, দৃষ্টিভঙ্গি ও সেরা চর্চাগুলো গ্রহণ করা নিশ্চয়ই ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা 'আন্তর্জাতিকীকরণ' বলতে ঠিক কী বুঝছি? আমাদের পলিসি মেকার থেকে শুরু করে শিক্ষাবিদদের অনেকের মধ্যেই একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়—আন্তর্জাতিক বলতেই আমরা চোখ বন্ধ করে ফিনল্যান্ড, যুক্তরাজ্য বা আমেরিকার শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকাই। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই পশ্চিমা মডেল হুবহু অনুকরণ করা কতটা যুক্তিসঙ্গত?
পশ্চিমা মডেল ও বাংলাদেশের বৈপরীত্য
ইউরোপ বা আমেরিকার শিক্ষাব্যবস্থার নিজস্ব কিছু সৌন্দর্য ও সাফল্য রয়েছে, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে তাদের সামাজিক কাঠামো, মাথাপিছু আয়, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী-শিক্ষকের অনুপাত এবং প্রযুক্তির সুবিধা আমাদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা: ইউরোপে একটি ক্লাসরুমে ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী থাকে, যেখানে আমাদের দেশের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক একটি শ্রেণিকক্ষে ৫০ থেকে ৬০ জন বা তারও বেশি শিক্ষার্থী পড়ালেখা করে।
আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট: সেখানকার শিক্ষার্থীদের পারিবারিক ও অর্থনৈতিক জীবনধারা আমাদের গ্রামীণ বা প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মতো নয়।
এই অবস্থায় পশ্চিমা কোনো আধুনিক শিক্ষাক্রম বা মূল্যায়নের পদ্ধতিকে যদি আমরা হুবহু ‘কপি-পেস্ট’ করে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় চাপিয়ে দিই, তবে তা উপকারের চেয়ে বিভ্রান্তিই বেশি সৃষ্টি করে। কেবল নামকাওয়াস্তে আধুনিক হতে গিয়ে আমরা যেন শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়ি।
চোখ ফেরাতে হবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে
আমরা যদি শিক্ষা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিষয়গুলো অনুধাবন করতে চাই, তবে ইউরোপ-আমেরিকার বাইরে এসে আমাদের নজর দেওয়া উচিত আমাদের নিজস্ব অঞ্চল—অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দিকে। এই দেশগুলোর সাথে আমাদের সামাজিক গঠন, পারিবারিক মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং জনসংখ্যার ঘনত্বের দারুণ মিল রয়েছে।
১. ভিয়েতনামের শিক্ষা বিপ্লব
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ভিয়েতনাম প্রাথমিক শিক্ষায় যে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে, তা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। সীমিত বাজেট এবং বিশাল জনসংখ্যার চাপ থাকা সত্ত্বেও তারা প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের মৌলিক পড়া, লেখা ও গণিতের দক্ষতায় (FLN - Foundational Literacy & Numeracy) অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। তাদের শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা এবং শিক্ষণ কৌশল আমাদের জন্য অত্যন্ত বাস্তবসম্মত এক দৃষ্টান্ত।
২. জাপানের 'তোকুকাতু' ও মানবিক মূল্যবোধ
জাপানের প্রাথমিক শিক্ষায় শৈশবে কেবল পুঁথিগত বিদ্যা না শিখিয়ে আত্মনির্ভরশীলতা, সহমর্মিতা এবং শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার রাখার মতো আচরণগত শিক্ষা দেওয়া হয়। এশীয় সংস্কৃতিতে পরিবার ও সমাজের প্রতি যে দায়িত্ববোধের চর্চা রয়েছে, তার সাথে এই ব্যবস্থা অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ।
৩. শ্রীলঙ্কার প্রাথমিক শিক্ষার স্থায়িত্ব
দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা তাদের সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা এবং স্থানীয় ভাষার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে যে সুসংহত ভিত্তি তৈরি করেছে, তা থেকেও আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।
‘অনুকরণ’ নয়, প্রয়োজন ‘আত্মীকরণ’
অন্য দেশ থেকে ভালো কিছু নেওয়ার অর্থ এই নয় যে তাদের পদ্ধতি অন্ধভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এখানে মূল শব্দটি হলো ‘আত্মীকরণ’ (Assimilation)।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যেসব দেশে সীমিত সম্পদে প্রাথমিক শিক্ষা সফল হয়েছে, তাদের কৌশলগুলো আমাদের বুঝতে হবে। তারপর সেগুলোকে বাংলাদেশের নিজস্ব কালচার, বাজেট, গ্রামীণ ও শহরের বিদ্যালয়ের পরিবেশের সাথে মানানসই করে ঢেলে সাজাতে হবে।
একটি কথা মনে রাখা জরুরি: বাইরের পলিমাটি দিয়ে নিজেদের টব সাজানো যায়, কিন্তু বটবৃক্ষ তৈরি করতে হলে স্থানীয় মাটির ভেতরেই মূল ছড়াতে হয়।
বাস্তবসম্মত কিছু প্রস্তাবনা
একজন প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে আমি মনে করি, আন্তর্জাতিক শিক্ষার ভালো দিকগুলো কাজে লাগাতে আমাদের নিচের ক্ষেত্রগুলোতে নজর দেওয়া উচিত:
স্বল্পমূল্যের শিক্ষাসামগ্রী (Low-cost/No-cost Teaching Aids): পশ্চিমা দেশগুলোর মতো ব্যয়বহুল ডিজিটাল ল্যাব না থাকলেও আমাদের হাতের কাছে থাকা সহজলভ্য ও প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে কীভাবে কার্যকর শিক্ষা দেওয়া যায়, তা এশীয় অনেক দেশ সফলভাবে করছে।
কমিউনিটি ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা: আমাদের শিক্ষা প্রক্রিয়ায় অভিভাবক ও স্থানীয় সমাজকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিকভাবে বন্ধনপ্রবণ সংস্কৃতিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিবেশ উন্নত করা সম্ভব।
মৌলিক দক্ষতায় জোর দেওয়া: জটিল কোনো পশ্চিমা থিওরি অনুসরণ না করে প্রাথমিক স্তরে শিশুরা যেন ঠিকভাবে মাতৃভাষা পড়তে, লিখতে এবং মৌলিক গণিত বুঝতে পারে—এই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
শিক্ষকের পেশাগত সম্মান ও দক্ষতা: শিক্ষা ব্যবস্থার আসল চালিকাশক্তি শিক্ষক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মতো শিক্ষকদের স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও পেশাগত স্বাধীনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
শেষ কথা
শিক্ষা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী নিয়ে ভাবার সময় আমাদের আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। ইউরোপ-আমেরিকার ঝলমলে মডেল দেখে নিজেদের হীনমন্যতায় ভোগার কোনো কারণ নেই। আমাদের সমাজ বাস্তবতার সাথে খাপ খায় এমন এশীয় কলাকৌশল ও অভিজ্ঞতাকে আপন করে নিয়ে, নিজস্ব সংস্কৃতির ওপর দাঁড়িয়েই আমরা আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাকে বিশ্বমানের করে তুলতে পারি। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, শিকড়কে শক্ত রেখে আন্তর্জাতিক জ্ঞানকে কাজে লাগানোই হবে আমাদের শিক্ষার সঠিক পথ।
১৩
১৮ মন্তব্য