প্রভাষক
১০ আগস্ট, ২০২৬ ০৯:৫৯ অপরাহ্ণ
Screen কি হাতের লেখার সঙ্গে মস্তিষ্কের দূরত্ব তৈরি করছে
মস্তিষ্কের সঙ্গে হৃদয়ের কোনও বিরোধ বা দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে কি বয়ঃসন্ধির জীবনে, যেখানে কোথাও মনে হচ্ছে মানবিক অনুভূতি বোঝার ক্ষেত্রে এবং এক এক রকম অনুভূতি বুঝে (‘process’ করে) রিঅ্যাক্ট করার ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধির সামাজিক আচরণ (social behaviour)-কে প্রভাবিত করছে স্ক্রিন? একজন মানুষ যখন সামনাসামনি অন্য কারও সঙ্গে কথা বলে, তখন সেটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ সামাজিক অভিজ্ঞতা। কারণ তখন শুধু কথাই নয়, আমরা অন্য মানুষের মুখের অভিব্যক্তি, চোখের ভাষা, শরীরের ভঙ্গি, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা, কোথায় সে থামছে, কী ভাবে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে — এই সবকিছু থেকেই তার অনুভূতি বুঝতে পারি।
এই ধরনের মুখোমুখি যোগাযোগ যত বেশি হয়, ততই আমাদের সামাজিক বিচারবোধ (Social Judgement) এবং অন্যের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা বা Empathy ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। কিন্তু সমস্যাটা হয় যখন যোগাযোগের বড় অংশটাই স্ক্রিনের মাধ্যমে হয়।
আমি হয়তো একটি টেক্সট মেসেজ পাঠালাম, একটি ইমোজি দিলাম অথবা হঠাৎ করেই আবেগের বশে একটি রিপ্লাই করে ফেললাম। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমি তো অন্য মানুষটির মুখের অভিব্যক্তি বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখতে পাচ্ছি না। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ Social Cues বা সামাজিক সঙ্কেত আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। আর এই সঙ্কেতগুলোই বাস্তব জীবনের যোগাযোগকে গভীর ও অর্থবহ করে তোলে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সোশ্যাল মিডিয়ার বাস্তবতা। সাধারণত আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের জীবনের ভালো দিকগুলোই তুলে ধরি। খুব কম মানুষই নিজের ব্যর্থতা, কষ্ট বা দুর্বলতার মুহূর্তগুলো নিয়মিত প্রকাশ করেন। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক সময় এমন একটি ‘কিউরেটেড হাইলাইট’ তৈরি হয়, যেখানে মনে হয় অন্য সবার জীবন খুব সুন্দর, সফল এবং সুখী। এর ফলেই অনেকের মধ্যে Fear of Missing Out (FOMO) তৈরি হয়। ধীরে ধীরে নিজের জীবনকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা বাড়ে এবং মনে হতে পারে — ‘সবাই ভালো আছে, শুধু আমি পিছিয়ে আছি।’ স্ক্রিন যে সব সময় এমপ্যাথিকে কমায়, তা কিন্তু নয়। কোভিড-১৯ মহামারির সময় আমরা দেখেছি, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অসংখ্য সাপোর্ট গ্রুপ তৈরি হয়েছিল। ডিমেনশিয়া, স্নায়বিক সমস্যা, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা বা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা বহু অনলাইন কমিউনিটি একে- অন্যকে তথ্য, মানসিক সমর্থন এবং প্রয়োজনীয় সাহায্য করেছে।
একই ভাবে, অনেক প্রবীণ মানুষের ক্ষেত্রেও ভিডিয়ো কল পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তাই অনলাইন যোগাযোগ সবসময় খারাপ — এমন বলা ঠিক হবে না। তবে এটাও সত্যি যে, অনলাইন যোগাযোগ কখনওই মুখোমুখি যোগাযোগের সম্পূর্ণ বিকল্প হতে পারে না। কারণ আমি যখন একটি ইমোজি পাঠাই, তখন সেটি আমার অনুভূতির একটি Symbol মাত্র।
কিন্তু আমার চোখের ভাষা, মুখের অভিব্যক্তি, হাসি, দ্বিধা, আওয়াজের পরিবর্তন কিংবা শরীরের অঙ্গভঙ্গি — এই সবকিছু ইমোজি বা শুধু একটি টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এমনকী আমি যদি আপনাকে একটি ভয়েস নোটও পাঠাই, তা হলেও আপনি আমার অনুভূতির কেবল একটি অংশই বুঝতে পারবেন। কিন্তু যদি আপনি আমাকে সামনাসামনি দেখতে পেতেন, তা হলে আমার মুখভঙ্গি, চোখের অভিব্যক্তি এবং শরীরের ভাষা মিলিয়ে আপনার মস্তিষ্ক অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও নির্ভুল তথ্য পেত। তাই মানুষের সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে মুখোমুখি উপস্থিতির যে গভীরতা, সেটিকে এখনও কোনও ডিজিটাল মাধ্যম পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারেনি।
স্ক্রিন তো আমাদের জীবনের অংশ। এটা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। It’s a necessary evil. তাই এখন প্রয়োজন হলো কন্ট্রোলটা ফিরিয়ে আনা। আর সেই কন্ট্রোল যদি আমি কারও উপর জোর করে চাপিয়ে দিই, তা হলে হবে না। বয়ঃসন্ধিকালে যিনি আছেন, তাঁকেই সেই কন্ট্রোলটা নিজের হাতে ফিরিয়ে আনতে হবে।
এটাকে আমরা সংক্ষেপে ‘5 S’ বলি—
১. Sleep (ঘুম)
২. Schedule (সময়সূচি)
৩. Screen-free Space (স্ক্রিন-মুক্ত জায়গা)
৪. Substitution (বিকল্প ব্যবস্থা)
৫. Self-monitoring (স্ব-পর্যবেক্ষণ)
Sleep — ঘুমোনোর সময়ে স্ক্রিন বন্ধ রাখতে হবে। এতে মনোযোগ ভালো থাকে, ইমোশনাল রেগুলেশনও ভালো হয়।
Schedule — স্ক্রিন ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময় থাকতে হবে। আন্তর্জাতিক সুপারিশ অনুযায়ী, বয়ঃসন্ধিকালে দিনে প্রায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা স্ক্রিন টাইমের সীমা রাখা উচিত।
Screen-free Space — যেখানে পড়াশোনা হচ্ছে, ডাইনিং টেবিল, বেড বা বেডরুম —এই জায়গাগুলো স্ক্রিন-ফ্রি জ়োন হওয়া উচিত। সেখানে শুধু বাচ্চারা নয়, বড়রাও স্ক্রিন ব্যবহার করবেন না।
৬৪
১০০ মন্তব্য