সহকারী অধ্যাপক
১১ আগস্ট, ২০২৬ ০৩:২৩ পূর্বাহ্ণ
জীবন একটি পর্বত -মোঃ মুজিবুর রহমান
জীবন একটি পর্বত
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
ভূমিকা
জীবন একটি দীর্ঘ যাত্রা। এই যাত্রার শুরু আছে, কিন্তু এর প্রতিটি বাঁকের পরিণতি আমরা আগে থেকে জানি না। কখনো পথ মসৃণ, কখনো দুর্গম; কখনো চারপাশে ফুলের সৌরভ, আবার কখনো কাঁটা ও পাথরে ভরা। কখনো আকাশ পরিষ্কার থাকে, কখনো ঘন মেঘে ঢেকে যায় চারদিক। তাই জীবনকে একটি পর্বতের সঙ্গে তুলনা করা যায়। পর্বতের যেমন উঁচু-নিচু ঢাল, পাথুরে পথ, ঝরনা, বন, কুয়াশা ও শিখর আছে, তেমনি মানুষের জীবনেও আছে আনন্দ-বেদনা, সাফল্য-ব্যর্থতা, আশা-হতাশা, প্রাপ্তি-বঞ্চনা এবং সংগ্রাম-সফলতার নানা অধ্যায়।
তবে জীবনের প্রকৃত অর্থ কেবল শিখরে পৌঁছানো নয়। মানুষ অনেক সময় সাফল্যের চূড়াকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য মনে করে। সে ভাবে—বেশি অর্থ, উচ্চ পদ, খ্যাতি, ক্ষমতা বা সামাজিক মর্যাদা অর্জন করতে পারলেই জীবন সফল। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, শিখরে ওঠার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো কোন পথে আমরা শিখরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। অন্যায়, প্রতারণা, অহংকার ও মানুষের অধিকার নষ্ট করে অর্জিত সাফল্য বাহ্যিকভাবে যত বড়ই হোক, তা প্রকৃত সাফল্য নয়। মানুষের জীবনের আসল সার্থকতা হলো সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ, পরিশ্রমী, মানবিক ও আল্লাহভীরু হয়ে জীবনযাপন করা।
জীবনের পথ কখনো সমতল নয়
পৃথিবীর কোনো মানুষের জীবনই সব সময় একই রকম থাকে না। জীবনে যেমন হাসি আছে, তেমনি কান্নাও আছে; যেমন বসন্ত আছে, তেমনি শীতও আছে; যেমন দিনের আলো আছে, তেমনি রাতের অন্ধকারও আছে। আজ যে মানুষ আনন্দে আছে, আগামীকাল তার জীবনে পরীক্ষা আসতে পারে। আবার যে ব্যক্তি আজ দুঃখ ও সংকটে আছে, আগামীকাল তার জীবনে স্বস্তির দরজা খুলে যেতে পারে।
পর্বতের পথও এমনই। কোথাও পথ উঁচু, কোথাও নিচু; কোথাও পাথর, কোথাও সবুজ ঘাস; কোথাও ঝরনার কলধ্বনি, কোথাও গভীর নীরবতা। জীবনও মানুষের সামনে এমন বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে। তাই জীবনে কষ্ট এলে হতাশ হওয়া উচিত নয়। কষ্ট জীবনের শেষ কথা নয়; বরং অনেক সময় কষ্টই মানুষকে পরিণত, ধৈর্যশীল ও জ্ঞানী করে তোলে।
ব্যর্থতা মানুষকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য আসে না; বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুনভাবে শুরু করার সুযোগ দেয়। যে মানুষ একবার পড়ে গিয়ে আর উঠে দাঁড়ায় না, সে নিজের সম্ভাবনাকেই সীমাবদ্ধ করে। কিন্তু যে মানুষ হোঁচট খেয়ে নিজের ভুল বুঝতে পারে, নিজেকে সংশোধন করে এবং আবার এগিয়ে যায়, তার মধ্যেই ভবিষ্যতের সাফল্যের বীজ থাকে।
চূড়া নয়, পথই গুরুত্বপূর্ণ
পর্বতে আরোহণকারী একজন পথিকের চোখে যেমন শুধু শিখর নয়, পুরো যাত্রাটিই গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মানুষের জীবনেও শুধু চূড়ান্ত সাফল্য নয়, সাফল্যের পথে অর্জিত শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, চরিত্র ও কর্মই বেশি মূল্যবান।
কেউ দ্রুত এগিয়ে যায়, কেউ ধীরে। কেউ অল্প সময়ে সাফল্য পায়, কেউ দীর্ঘ সংগ্রামের পর লক্ষ্যে পৌঁছায়। তাই অন্যের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করা উচিত নয়। প্রত্যেক মানুষের সামর্থ্য, পরিবেশ, দায়িত্ব, সুযোগ ও পরীক্ষার ধরন আলাদা। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মানুষকে বিভিন্ন যোগ্যতা ও সম্ভাবনা দিয়েছেন। কারও জ্ঞান বেশি, কারও কর্মদক্ষতা বেশি, কারও নেতৃত্বের গুণ আছে, কারও সেবার মানসিকতা আছে, আবার কারও মধ্যে আছে অসাধারণ ধৈর্য ও সহমর্মিতা।
অন্যের সাফল্য দেখে হতাশ হওয়ার পরিবর্তে নিজের সামর্থ্যকে চিনতে হবে। নিজের মধ্যে যে প্রতিভা ও যোগ্যতা আছে, তা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। অন্যের পথ নকল করে নয়, নিজের সামর্থ্য ও নৈতিকতার ভিত্তিতে নিজের পথ তৈরি করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ছোট পদক্ষেপেই বড় যাত্রার শুরু
কোনো বড় পর্বতের শিখরে এক লাফে ওঠা যায় না। এক পা, দুই পা করে ধীরে ধীরে এগোতে হয়। জীবনের ক্ষেত্রেও বড় অর্জন ছোট ছোট প্রচেষ্টার সমষ্টি। একজন শিক্ষার্থী প্রতিদিন অল্প অল্প করে পড়ে একদিন জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়। একজন কৃষক প্রতিদিন যত্ন করে ফসল ফলায়। একজন সৎ মানুষ প্রতিদিনের ছোট ছোট ভালো কাজের মাধ্যমে সুন্দর চরিত্র গড়ে তোলে।
তাই কোনো ভালো কাজকে ছোট মনে করা উচিত নয়। একটি সুন্দর কথা কারও মন ভালো করে দিতে পারে। একটি আন্তরিক সহযোগিতা একজন অসহায় মানুষকে নতুন সাহস দিতে পারে। একটি সত্য কথা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি জোগাতে পারে। একটি ক্ষমা দীর্ঘদিনের বিরোধ দূর করতে পারে।
বিন্দু বিন্দু জল যেমন একসময় সাগর পূর্ণ করে, তেমনি ছোট ছোট সৎকর্ম মানুষের জীবনকে মহৎ করে তোলে।
পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের গুরুত্ব
জীবনের পর্বত অতিক্রম করতে হলে পরিশ্রম করতে হয়। শুধু স্বপ্ন দেখলেই সফলতা আসে না। ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন শ্রম, সময়, অধ্যবসায় ও আত্মনিয়ন্ত্রণ।
আলস্য মানুষের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে। যে ব্যক্তি কাজকে আজ থেকে কাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেয়, তার জীবনের মূল্যবান সময় ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। অথচ সময় এমন এক সম্পদ, যা হারিয়ে গেলে আর ফিরে আসে না। গতকাল ফিরে আসে না; আগামীকাল এখনো আমাদের হাতে আসেনি। আমাদের হাতে আছে বর্তমান মুহূর্ত। তাই আজকের গুরুত্বপূর্ণ কাজ আজই সম্পন্ন করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
পরিশ্রমের সঙ্গে সততা যুক্ত না হলে সাফল্য পূর্ণতা পায় না। অন্যায় উপায়ে অর্জিত সম্পদ বা মর্যাদা মানুষের বাহ্যিক অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু অন্তরের শান্তি দিতে পারে না। হালাল উপার্জন, সৎ পরিশ্রম ও ন্যায়সংগত জীবনই প্রকৃত মর্যাদার ভিত্তি।
ব্যর্থতা হলো শিক্ষার নতুন দরজা
মানুষ সাধারণত সফলতাকে ভালোবাসে এবং ব্যর্থতাকে ভয় পায়। কিন্তু ব্যর্থতা সব সময় নেতিবাচক নয়। অনেক সময় ব্যর্থতা মানুষকে এমন শিক্ষা দেয়, যা সাফল্য দিতে পারে না।
একটি ভুল সিদ্ধান্ত মানুষকে ভবিষ্যতে আরও সতর্ক হতে শেখায়। একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা মানুষকে নিজের দুর্বলতা চিনতে সাহায্য করে। একটি কঠিন অভিজ্ঞতা তাকে ধৈর্যশীল করে। তাই ব্যর্থতার পর নিজেকে শেষ মনে করা উচিত নয়। বরং প্রশ্ন করতে হবে—আমি কোথায় ভুল করেছি? কী শিখলাম? পরেরবার কীভাবে আরও ভালোভাবে চেষ্টা করতে পারি?
যে মানুষ ব্যর্থতার ভয়কে অতিক্রম করতে পারে, সে জীবনের অনেক কঠিন পাহাড়ও অতিক্রম করতে পারে।
ইসলাম ও সঠিক জীবনপথ
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবন উদ্দেশ্যহীন নয়। মানুষকে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত ও আনুগত্যের জন্য এবং পৃথিবীতে ন্যায়, কল্যাণ ও সৎকর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য। তাই একজন মুমিনের কাছে জীবনের প্রকৃত সাফল্য শুধু পার্থিব অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং আখিরাতে সফল হওয়াই তার সর্বোচ্চ লক্ষ্য।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي كَبَدٍ
অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই আমি মানুষকে কষ্ট-সংগ্রামের মধ্যে সৃষ্টি করেছি।”
—সূরা আল-বালাদ: ৪
এই আয়াত মানুষের জীবনের বাস্তবতার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জীবন সংগ্রামময়। তাই পরীক্ষার সময় ধৈর্য হারিয়ে ফেললে চলবে না। মুমিন জানে, দুঃখ-কষ্টও আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা হতে পারে এবং সেই পরীক্ষায় ধৈর্য ধারণের মধ্যেও রয়েছে কল্যাণ।
আবার আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।”
—সূরা আশ-শরহ: ৫–৬
অতএব কষ্টের সময় হতাশ হওয়ার পরিবর্তে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে এবং সাধ্যমতো সঠিক পথে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
নামাজ, কুরআন ও সুন্নাহ—জীবনের পথপ্রদর্শক
একজন পর্বতারোহীর যেমন সঠিক মানচিত্র ও পথনির্দেশ প্রয়োজন, তেমনি মানুষের জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা। একজন মুসলমানের জন্য কুরআন ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ সেই পথনির্দেশের প্রধান উৎস।
নামাজ মানুষের অন্তরকে আল্লাহর সঙ্গে সংযুক্ত করে। কুরআন মানুষের চিন্তা ও জীবনকে আলোকিত করে। সুন্নাহ মানুষের আচরণ ও চরিত্রকে সুন্দর করে। তাই জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও নামাজকে অবহেলা করা উচিত নয়। কুরআন শুধু তিলাওয়াতের গ্রন্থ নয়; এটি জীবন পরিচালনার পথনির্দেশ। সুন্নাহ শুধু ইতিহাস নয়; এটি উত্তম চরিত্র ও সুন্দর জীবনযাপনের বাস্তব আদর্শ।
যে মানুষ নামাজ, কুরআন, সুন্নাহ, দোয়া ও আল্লাহর স্মরণকে জীবনের অংশ করে নেয়, তার অন্তরে একটি নৈতিক শক্তি তৈরি হয়। সেই শক্তি তাকে বিপদের সময় স্থির থাকতে সাহায্য করে।
সবর ও তাওয়াক্কুল
পর্বতের পথে কখনো ঝড় আসে, কখনো বৃষ্টি নামে, কখনো পথ কঠিন হয়ে ওঠে। তখন পথিককে ধৈর্য ধরতে হয়। জীবনের ক্ষেত্রেও ধৈর্য একটি মহৎ গুণ।
সবর অর্থ শুধু চুপ করে কষ্ট সহ্য করা নয়; বরং আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকা, বিপদে নিজেকে সংযত রাখা এবং অন্যায়ের পথে না গিয়ে সঠিক কাজ চালিয়ে যাওয়া।
এর সঙ্গে প্রয়োজন তাওয়াক্কুল—অর্থাৎ যথাসাধ্য চেষ্টা করার পর আল্লাহর ওপর নির্ভর করা। তাওয়াক্কুল কখনো কর্মবিমুখতার নাম নয়। বরং মুমিন চেষ্টা করে, পরিকল্পনা করে, উপায় গ্রহণ করে এবং ফলাফল আল্লাহর হাতে সমর্পণ করে।
এই বিশ্বাস মানুষের অন্তরে দৃঢ়তা সৃষ্টি করে। সে জানে—আমি আমার কর্তব্য পালন করব; ফলাফল আল্লাহর ইচ্ছাধীন।
অহংকারের শিখর ভঙ্গুর
পর্বতের শিখর যত উঁচুই হোক, তা চিরস্থায়ী নয়। মানুষের সামাজিক মর্যাদা, অর্থ, ক্ষমতা, সৌন্দর্য, জ্ঞান কিংবা পদও চিরস্থায়ী নয়। আজ যে ব্যক্তি ক্ষমতাবান, কাল সে ক্ষমতাহীন হতে পারে। আজ যে ধনী, কাল সে সম্পদ হারাতে পারে। আজ যে সম্মানিত, কাল তার অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে।
তাই মানুষের কোনো অর্জনই তাকে অহংকারী করার কারণ হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে মানুষের সব ক্ষমতা ও সামর্থ্য আল্লাহর দান।
অহংকার মানুষকে সত্য গ্রহণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং অন্য মানুষকে তুচ্ছ করতে শেখায়। পক্ষান্তরে বিনয় মানুষকে মহৎ করে। যে ব্যক্তি নিজের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিনয়ী থাকে, অন্যকে সম্মান করে এবং নিজের সাফল্যের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, সে প্রকৃত অর্থে সম্মানিত।
মানবতার পাশে দাঁড়ানো
জীবন শুধু নিজের জন্য নয়। মানুষ সামাজিক জীব। সে পরিবার, প্রতিবেশী, বন্ধু, শিক্ষক, সহকর্মী ও বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই নিজের উন্নতির পাশাপাশি অন্যের কল্যাণের কথাও ভাবতে হবে।
কেউ অসুস্থ হলে তার পাশে দাঁড়ানো, কেউ বিপদে পড়লে সাহায্য করা, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, অসহায়কে সহযোগিতা করা, দুঃখী মানুষের কথা মন দিয়ে শোনা—এসব মানবিকতার পরিচয়।
বন্ধু যদি ভুল পথে চলে, তাকে অপমান না করে সুন্দরভাবে বোঝাতে হবে। কারও দুর্বলতাকে উপহাস না করে তাকে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে। ক্ষমা, দয়া, সহমর্মিতা ও ভালোবাসা মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমায়।
একটি সমাজ তখনই সুন্দর হয়, যখন মানুষ শুধু নিজের অধিকারের কথা নয়, অন্যের অধিকার ও মর্যাদার কথাও মনে রাখে।
পিতা-মাতা ও শিক্ষকের মর্যাদা
জীবনের পর্বতে মানুষ একা পথ চলতে পারে না। পরিবার তার প্রথম আশ্রয়। পিতা-মাতার ভালোবাসা, ত্যাগ ও দোয়া সন্তানের জীবনের অন্যতম বড় সম্পদ।
পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তাঁদের সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলা, তাঁদের প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা এবং তাঁদের জন্য দোয়া করা সন্তানের দায়িত্ব।
একইভাবে শিক্ষকের মর্যাদাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য দেন না; তিনি জ্ঞান, শৃঙ্খলা, মূল্যবোধ ও সঠিক পথের শিক্ষা দেন। তাই শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা এবং তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান গ্রহণে বিনয়ী হওয়া একজন শিক্ষার্থীর অন্যতম গুণ।
জ্ঞানের আলো
জ্ঞান মানুষের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। অর্থ হারিয়ে গেলে আবার অর্জন করা যায়, কিন্তু অজ্ঞতার কারণে যে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তার ক্ষতি অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী হয়।
শিক্ষা মানুষের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে। জ্ঞান মানুষকে সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় এবং কল্যাণ-অকল্যাণের পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে।
তাই শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়, জীবনকে সুন্দর ও কল্যাণময় করার জন্যও জ্ঞান অর্জন করতে হবে। কলম সত্যের পক্ষে ব্যবহার করতে হবে। জ্ঞানকে মানুষের উপকারে কাজে লাগাতে হবে। নিজের জ্ঞান নিয়ে অহংকার না করে অন্যকে শেখাতে হবে।
জ্ঞান যখন নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা সমাজের কল্যাণে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে।
হালাল রিজিক ও সৎ উপার্জন
জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উপার্জন। মানুষের খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, শিক্ষা ও পরিবারের প্রয়োজন পূরণে অর্থের প্রয়োজন হয়। কিন্তু অর্থ উপার্জনের পথ সঠিক হওয়া জরুরি।
হারাম বা অন্যায় উপায়ে অর্জিত সম্পদ বাহ্যিকভাবে লাভজনক মনে হলেও তা মানুষের জীবনে শান্তি ও কল্যাণ আনে না। প্রতারণা, ঘুষ, জালিয়াতি, অন্যের অধিকার হরণ কিংবা অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জন কোনোভাবেই প্রকৃত সফলতার পথ নয়।
হালাল রিজিক হয়তো কখনো পরিমাণে কম মনে হতে পারে, কিন্তু তাতে বরকত থাকে। সৎ উপার্জন মানুষের আত্মমর্যাদা রক্ষা করে এবং পরিবার ও সমাজে বিশ্বাস সৃষ্টি করে।
সময়—জীবনের অমূল্য সম্পদ
পর্বতের পথে একটি ভুল পদক্ষেপ যেমন যাত্রাকে কঠিন করে তুলতে পারে, তেমনি জীবনে সময়ের অপচয় মানুষের সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিতে পারে।
সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি। অর্থ হারালে তা আবার অর্জন করা সম্ভব, কিন্তু চলে যাওয়া সময় আর ফিরে আসে না। তাই সময়কে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করতে হবে।
শিক্ষার্থীর সময় পড়াশোনা, চরিত্রগঠন ও দক্ষতা অর্জনে ব্যয় হওয়া উচিত। কর্মজীবী মানুষের সময় কর্মনিষ্ঠা ও দায়িত্ব পালনে ব্যবহার করা উচিত। পরিবারের জন্য সময় দিতে হবে, ইবাদতের জন্য সময় রাখতে হবে এবং মানুষের কল্যাণে সময় ব্যয় করতে হবে।
অলসতা ধীরে ধীরে মানুষের কর্মশক্তি কমিয়ে দেয়। তাই প্রতিদিনের জীবনকে উদ্দেশ্যপূর্ণ করতে হবে।
প্রকৃতির মধ্যে স্রষ্টার নিদর্শন
একজন পথিক যখন পর্বতের দিকে তাকায়, তখন সে শুধু পাথর ও মাটি দেখে না; সে প্রকৃতির বিশালতা অনুভব করে। আকাশের নীলিমা, নদীর প্রবাহ, সাগরের বিস্তৃতি, সবুজ বন, পাখির গান, ফুলের সৌন্দর্য—সবই মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়।
কুরআন মানুষকে সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তা করতে উৎসাহিত করে। প্রকৃতির সৌন্দর্য আমাদের কৃতজ্ঞ হতে শেখায় এবং স্রষ্টার মহত্ত্ব উপলব্ধির সুযোগ দেয়।
তাই প্রকৃতিকে শুধু ভোগের বস্তু হিসেবে দেখা উচিত নয়। পরিবেশ রক্ষা করা, বৃক্ষরোপণ করা, নদী-জলাশয় দূষণ থেকে রক্ষা করা এবং জীববৈচিত্র্যের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়াও মানুষের কর্তব্য।
পরিবার ও ভালোবাসার মূল্য
মানুষের জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়গুলোর একটি হলো পরিবার। শিশুর হাসি পরিবারে আনন্দ আনে, মায়ের স্নেহ হৃদয়ে নিরাপত্তা সৃষ্টি করে, পিতার শ্রম পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ে এবং পরিবারের পারস্পরিক ভালোবাসা মানুষকে বিপদের সময় সাহস দেয়।
তাই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা উচিত। শুধু অর্থ উপার্জন করাই পরিবারের দায়িত্ব নয়; ভালোবাসা, সময়, সম্মান, সহযোগিতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়াও পরিবারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সুন্দর পরিবার একটি সুন্দর সমাজের ভিত্তি। পরিবারে যদি সত্য, ভালোবাসা, শৃঙ্খলা, দয়া ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা থাকে, তাহলে সেখান থেকেই সুন্দর মানুষ তৈরি হয়।
সন্তুষ্টি ও সংযম
অতিরিক্ত লোভ মানুষের মনকে অস্থির করে। যত বেশি পায়, তত বেশি চায়। ফলে তার জীবনে শান্তির পরিবর্তে অস্থিরতা বাড়তে থাকে।
ইসলাম মানুষকে হালাল পথে উপার্জন করতে এবং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ হতে শিক্ষা দেয়। সন্তুষ্টি মানে উন্নতির চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং বৈধ উপায়ে চেষ্টা করার পাশাপাশি আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকা।
যে মানুষ অন্যের সম্পদের দিকে লোভের দৃষ্টিতে না তাকিয়ে নিজের প্রাপ্তির জন্য কৃতজ্ঞ থাকে, তার অন্তরে শান্তি জন্মায়।
দান, দয়া ও সেবা
মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব শুধু সে কত সম্পদ অর্জন করেছে, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং সে কত মানুষের উপকার করেছে, তার ওপরও নির্ভর করে।
অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, দরিদ্রকে সাহায্য করা, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, বিপদগ্রস্তকে সহযোগিতা করা এবং সমাজের দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষা করা মহৎ কাজ।
দান শুধু অর্থ দিয়ে হয় না। ভালো কথা, সময়, শ্রম, জ্ঞান, পরামর্শ ও সহানুভূতিও দানের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। অনেক সময় একজন বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাও তার জন্য বড় সহায়তা হয়ে ওঠে।
ভালোবাসা ও ক্ষমার শক্তি
ঘৃণা মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়, আর ভালোবাসা মানুষকে কাছে আনে। রাগের মুহূর্তে কঠিন কথা বলা সহজ, কিন্তু নিজেকে সংযত রেখে ক্ষমা করা কঠিন। সেই কঠিন কাজটিই চরিত্রের সৌন্দর্য প্রকাশ করে।
ক্ষমা মানে অন্যায়কে সমর্থন করা নয়। বরং যেখানে সংশোধন ও শান্তির সুযোগ আছে, সেখানে প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা ও সৌহার্দ্যের পথ বেছে নেওয়া মহৎ গুণ।
সমাজে অনেক বিরোধ ছোট ভুল বোঝাবুঝি থেকে তৈরি হয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংযত ভাষা, সত্যনিষ্ঠা ও ক্ষমাশীলতা এসব বিরোধ কমাতে পারে।
আখিরাতের চূড়ান্ত হিসাব
পার্থিব জীবনের পর রয়েছে আখিরাত। পৃথিবীর জীবনের কোনো অর্জনই চিরস্থায়ী নয়। মানুষ যত সম্পদ, পদ, খ্যাতি বা ক্ষমতা অর্জন করুক, একদিন তাকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে।
তখন তার সঙ্গে যাবে না তার প্রাসাদ, ব্যাংকের অর্থ, পদমর্যাদা কিংবা বাহ্যিক সম্মান। সঙ্গে থাকবে তার ঈমান ও আমল।
তাই একজন মুমিনের কাছে পৃথিবীর জীবন একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র। এখানে যে সুযোগ, সম্পদ, জ্ঞান, সময় ও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার করতে হবে।
এই উপলব্ধি মানুষকে দায়িত্বশীল করে। সে বুঝতে পারে—আমার প্রতিটি কাজের মূল্য আছে, প্রতিটি কথার হিসাব আছে, মানুষের অধিকার নষ্ট করার পরিণতি আছে এবং সৎকর্মেরও মূল্য আছে।
জীবনের প্রকৃত সাফল্য
জীবনের প্রকৃত সাফল্য কেবল কত ওপরে উঠলাম, তা নয়; বরং ওঠার সময় কতটা সৎ থাকলাম, কতজনের উপকার করলাম, কতটা ন্যায় প্রতিষ্ঠা করলাম এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি কতটা অর্জন করতে পারলাম—সেটিই আসল প্রশ্ন।
একজন মানুষ হয়তো খুব ধনী নয়, কিন্তু সে সৎ; হয়তো তার পদ খুব বড় নয়, কিন্তু সে মানুষের উপকার করে; হয়তো তার নাম খুব পরিচিত নয়, কিন্তু সে পরিবার ও সমাজের জন্য কল্যাণকর—এমন মানুষও প্রকৃত অর্থে সফল হতে পারে।
অন্যদিকে কেউ বাহ্যিকভাবে অনেক বড় হলেও যদি তার জীবনে অন্যায়, অহংকার, প্রতারণা ও মানুষের অধিকার হরণের আধিক্য থাকে, তবে সেই বাহ্যিক সাফল্য প্রকৃত সফলতা নয়।
উপসংহার
জীবন সত্যিই একটি পর্বত। এই পর্বতের পথ কখনো কঠিন, কখনো সুন্দর; কখনো কণ্টকাকীর্ণ, কখনো ফুলে ভরা। কখনো আমাদের সামনে থাকবে উঁচু শিখর, কখনো নামতে হবে গভীর উপত্যকায়। কখনো আমরা সফল হব, কখনো ব্যর্থ হব। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সঠিক পথ হারানো যাবে না।
চূড়ায় ওঠা জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়; সঠিক পথে চলাই জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য ও সার্থকতা। কারণ ভুল পথে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার চেয়ে সঠিক পথে ধীরে এগিয়ে যাওয়া অনেক শ্রেয়।
তাই জীবনের প্রতিটি ধাপকে শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে, সাফল্যে বিনয়ী হতে হবে, বিপদে সবর করতে হবে, চেষ্টা শেষে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে হবে। নামাজকে জীবনের সঙ্গী, কুরআনকে পথের আলো এবং সুন্নাহকে চরিত্রের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। হালাল রিজিক উপার্জন করতে হবে, পিতা-মাতার সেবা করতে হবে, শিক্ষকের সম্মান করতে হবে, মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হবে, অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং জ্ঞান ও মানবতার আলো ছড়িয়ে দিতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে—পর্বতের শিখর যত উঁচুই হোক, তা একদিন পেছনে পড়ে যায়; কিন্তু পথে রেখে যাওয়া ভালো কাজ মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। একটি সৎ কথা, একটি দয়া, একটি সহযোগিতা, একটি ক্ষমা, একটি জ্ঞানদান এবং একটি মানুষের জীবনে কল্যাণের কারণ হয়ে ওঠা—এসবই জীবনের প্রকৃত সম্পদ।
অতএব, জীবনের পর্বতে আমরা সবাই পথিক। কারও পথ ছোট, কারও পথ দীর্ঘ; কারও পথ সহজ, কারও পথ কঠিন। কিন্তু সবার জন্যই শ্রেষ্ঠ পথ হলো সত্য, ন্যায়, তাকওয়া, মানবতা ও আল্লাহর আনুগত্যের পথ।
চূড়া নয়, সৎপথই হোক আমাদের লক্ষ্য।
সম্পদ নয়, সৎকর্ম হোক আমাদের পরিচয়।
অহংকার নয়, বিনয় হোক আমাদের অলংকার।
হতাশা নয়, আশা হোক আমাদের শক্তি।
আর মানুষের প্রশংসা নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টিই হোক আমাদের জীবনের চূড়ান্ত অর্জন।
জীবনের এই পর্বতপথে আমরা যেন সত্যের আলো হাতে নিয়ে এগিয়ে চলি, কষ্টে ধৈর্য ধারণ করি, সাফল্যে বিনয়ী থাকি এবং প্রতিটি পদক্ষেপকে কল্যাণের কাজে পরিণত করি। তাহলেই আমাদের জীবন শুধু দীর্ঘ হবে না—হবে অর্থবহ, সুন্দর, মর্যাদাপূর্ণ ও কল্যাণময়।
জীবন একটি পর্বত;
তার শিখর সাময়িক,
কিন্তু সৎপথের পদচিহ্ন চিরস্মরণীয়।
আর আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে অতিক্রান্ত জীবনই
প্রকৃত সফল জীবন।
১৩
১৮ মন্তব্য