সহকারী অধ্যাপক
১১ আগস্ট, ২০২৬ ০৩:৩২ পূর্বাহ্ণ
আপন সঙ্গির উপেক্ষা ও উপহাস
আপন সঙ্গির উপেক্ষা ও উপহাস
মানুষের জীবন কেবল আহার, বস্ত্র, বাসস্থান ও অর্থসম্পদের সমষ্টি নয়। মানুষের হৃদয়েরও কিছু মৌলিক চাহিদা রয়েছে—ভালোবাসা, সম্মান, নিরাপত্তা, আন্তরিকতা, সহমর্মিতা এবং আপনজনের স্নেহময় আচরণ। একজন মানুষ পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের ভিড়ে থেকেও যদি তার সবচেয়ে কাছের মানুষটির কাছ থেকে অবহেলা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, বিদ্রূপ কিংবা উপহাস পেতে থাকে, তবে তার হৃদয়ে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা সহজে কোনো বস্তুগত প্রাপ্তি দিয়ে পূরণ করা যায় না। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর মতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভালোবাসার পরিবর্তে অবজ্ঞা এবং স্নেহের পরিবর্তে উপহাস দীর্ঘদিন চলতে থাকলে দাম্পত্য জীবনের শান্তি, পারস্পরিক আস্থা ও মানসিক স্বস্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা মানুষকে সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের জন্য সৃষ্টি করেছেন। মানুষের একাকিত্ব দূর করার জন্য তিনি পরিবার, আত্মীয়তা ও দাম্পত্য সম্পর্কের ব্যবস্থা করেছেন। কুরআনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়ার সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন—
“আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো; আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।”
—সূরা আর-রূম, ৩০:২১
এই আয়াত দাম্পত্য জীবনের একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেবল সামাজিক চুক্তি নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত ও দায়িত্ব। এই সম্পর্কে ভালোবাসা থাকবে, দয়া থাকবে, পরস্পরের প্রতি সম্মান থাকবে এবং থাকবে একে অন্যের জন্য প্রশান্তির আশ্রয় হওয়ার চেষ্টা। তাই আপন সঙ্গিকে অপমান করা, তার দুর্বলতা নিয়ে হাসাহাসি করা কিংবা তার অনুভূতিকে তুচ্ছ করে দেখা ইসলামী আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আপনজনের উপেক্ষা কেন এত কষ্টদায়ক
অচেনা কোনো মানুষ কঠিন কথা বললে আমরা অনেক সময় তা সহজেই ভুলে যেতে পারি। কারণ তার কথার সঙ্গে আমাদের হৃদয়ের গভীর সম্পর্ক থাকে না। কিন্তু যে মানুষটির কাছে আমরা নিজের কথা বলি, নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করি, নিজের আনন্দ-বেদনা ভাগ করে নিই—সেই মানুষটি যখন আমাদের উপহাসের পাত্র বানায়, তখন কষ্ট অনেক গভীরে গিয়ে আঘাত করে।
আপনজনের একটি মিষ্টি কথা যেমন ক্লান্ত হৃদয়ে প্রশান্তি আনতে পারে, তেমনি একটি অবিবেচনাপ্রসূত কথা দীর্ঘদিনের জন্য মনে দাগ কাটতে পারে। একটি স্নেহময় হাসি সম্পর্ককে কাছে টেনে আনে; আবার একটি বিদ্রূপাত্মক হাসি মানুষকে নিজের কাছেই ছোট মনে করিয়ে দিতে পারে।
তাই কথা বলার আগে ভাবা জরুরি—আমার এই কথাটি কি সামনের মানুষটির হৃদয়কে শক্তি দেবে, নাকি তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দেবে?
মানুষের মুখের কথা তীরের মতো। তীরের আঘাতের চিহ্ন একসময় মুছে যায়, কিন্তু কথার আঘাত অনেক সময় স্মৃতির গভীরে থেকে যায়। বিশেষ করে দাম্পত্য জীবনে একই ধরনের তুচ্ছতাচ্ছিল্য বারবার ঘটতে থাকলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়, যোগাযোগ কমে যায় এবং পারস্পরিক বিশ্বাস দুর্বল হতে থাকে।
উপহাস কখনো ভালোবাসার ভাষা হতে পারে না
অনেক সময় মানুষ নিজের কথাকে ‘মজা’ বলে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু মজা তখনই সুন্দর, যখন তাতে উভয়ের আনন্দ থাকে। একজন হাসছে আর অন্যজন ভেতরে ভেতরে কষ্ট পাচ্ছে—এটি প্রকৃত অর্থে আনন্দ নয়; এটি সম্পর্কের প্রতি অসতর্কতা।
কারও চেহারা, কথা বলার ধরন, আর্থিক অবস্থা, পারিবারিক দুর্বলতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কিংবা ব্যক্তিগত ভুল নিয়ে বারবার হাসাহাসি করা কখনোই সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ নয়। ইসলামী নৈতিকতা মানুষকে অন্যকে হেয় করা থেকে বিরত থাকতে শিক্ষা দেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“হে মুমিনগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম।”
—সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১১
এই শিক্ষা কেবল সমাজের বাইরের মানুষের জন্য নয়; পরিবার ও আপনজনের ক্ষেত্রেও এর গভীর তাৎপর্য রয়েছে। যাকে আমরা ভালোবাসি, তার মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ মানুষের প্রকৃত চরিত্র অনেক সময় প্রকাশ পায় সে তার সবচেয়ে কাছের মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তার মাধ্যমে।
কোমল ভাষা ইসলামের সৌন্দর্য
ইসলাম শুধু নামাজ, রোজা ও ইবাদতের শিক্ষা দেয় না; ইসলাম মানুষের চরিত্র, আচরণ ও ভাষাকেও সুন্দর করতে চায়। একজন মুসলিমের মুখ থেকে এমন কথা বের হওয়া উচিত, যা সত্য, কল্যাণকর ও হৃদয়গ্রাহী।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“আর আমার বান্দাদের বলে দিন, তারা যেন উত্তম কথা বলে।”
—সূরা আল-ইসরা, ১৭:৫৩
কথার সৌন্দর্য মানুষের চরিত্রের সৌন্দর্যের পরিচয়। কঠিন সত্যও সুন্দরভাবে বলা যায়। ভুল ধরিয়ে দেওয়া যায় অপমান না করে। অসন্তোষ প্রকাশ করা যায় বিদ্রূপ না করে। সংশোধন করা যায় ভালোবাসার সঙ্গে। মতের অমিল থাকলেও সম্মান বজায় রাখা যায়।
একজন স্বামী যদি স্ত্রীর কোনো ভুল দেখেন, তিনি অপমান না করে শান্তভাবে বুঝিয়ে বলতে পারেন। একজন স্ত্রীও স্বামীর ভুল নিয়ে অন্যের সামনে হাসাহাসি না করে একান্তে সম্মানের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। এতে সমস্যাও সমাধান হয়, সম্পর্কের মর্যাদাও অক্ষুণ্ণ থাকে।
দাম্পত্য জীবনে সম্মান কেন অপরিহার্য
ভালোবাসা দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্য, আর সম্মান তার ভিত্তি। ভালোবাসা থাকলেও সম্মান না থাকলে সম্পর্ক ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ মানুষ চায় তার আপনজন অন্তত তাকে একজন মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করুক।
স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের পোশাকস্বরূপ—কুরআনে এই সম্পর্কের চমৎকার উপমা এসেছে:
“তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।”
—সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৭
পোশাক যেমন মানুষকে আচ্ছাদিত করে, সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং রক্ষা করে, তেমনি স্বামী-স্ত্রীরও উচিত পরস্পরের দোষ-ত্রুটি আড়াল করা, মর্যাদা রক্ষা করা এবং বিপদের সময় একে অন্যের পাশে দাঁড়ানো।
যে স্বামী স্ত্রীর ব্যক্তিগত দুর্বলতা অন্যের সামনে প্রকাশ করেন, কিংবা যে স্ত্রী স্বামীর সীমাবদ্ধতা নিয়ে বন্ধু-স্বজনের সামনে হাসাহাসি করেন, তারা আসলে নিজেদের সম্পর্কের গোপনীয়তা ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেন। দাম্পত্য জীবনের অনেক কথা ব্যক্তিগত; তা জনসমক্ষে আলোচনার বিষয় নয়।
উপেক্ষা সম্পর্ককে নীরবে দুর্বল করে
অপমান অনেক সময় প্রকাশ্য; কিন্তু উপেক্ষা নীরব। আর এই নীরব উপেক্ষাই কখনো কখনো সম্পর্কের ভিতকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়।
কেউ কথা বলছে, অথচ তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। কেউ নিজের কষ্টের কথা জানাচ্ছে, অথচ তার অনুভূতিকে ‘এগুলো কিছুই না’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কেউ ভালো কিছু করেছে, অথচ তার কোনো প্রশংসা নেই। কেউ পাশে থাকতে চাইছে, অথচ তাকে বারবার দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে—এসব আচরণ মানুষের মনে গভীর একাকিত্ব তৈরি করতে পারে।
তাই পরিবারের সদস্যদের শুধু একই ঘরে থাকা যথেষ্ট নয়; একে অন্যের অনুভূতির কাছেও থাকতে হয়।
স্বামী-স্ত্রীর উচিত পরস্পরের কথা মন দিয়ে শোনা। প্রতিটি সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান না দিতে পারলেও মনোযোগ দিয়ে শোনা যায়। অনেক সময় মানুষ সমাধানের চেয়ে বোঝাপড়া বেশি চায়। একটি বাক্য—‘আমি তোমার কথা বুঝতে চেষ্টা করছি’—একটি ক্লান্ত হৃদয়ের জন্য অনেক বড় সান্ত্বনা হতে পারে।
রাগের সময় নীরবতা, কিন্তু সম্পর্কের সময় নয়
দাম্পত্য জীবনে মতের অমিল থাকবেই। দুইজন মানুষ একই পরিবেশে বড় হয় না, তাদের চিন্তা ও অভিজ্ঞতাও এক নয়। তাই মতপার্থক্য হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু মতপার্থক্য যেন অসম্মানে পরিণত না হয়।
রাগের মুহূর্তে মানুষ এমন কথা বলে ফেলতে পারে, যা পরে সে নিজেই অনুতপ্ত হয়। তাই উত্তেজিত অবস্থায় কিছুক্ষণ নীরব থাকা, স্থান পরিবর্তন করা, নিজেকে শান্ত করা এবং পরে কথা বলা অনেক সময় উত্তম পন্থা।
তবে নীরবতা যেন প্রতিশোধের অস্ত্র না হয়। দিনের পর দিন কথা না বলা, ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করা কিংবা অপরজনকে মানসিকভাবে শাস্তি দেওয়া সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। সমস্যাকে চেপে না রেখে উপযুক্ত সময়ে শান্তভাবে আলোচনা করা উচিত।
ক্ষমা সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখে
মানুষ ভুল করবে—এটাই স্বাভাবিক। স্বামী ভুল করতে পারেন, স্ত্রীও ভুল করতে পারেন। কোনো সম্পর্কেই দুইজন মানুষ সব সময় নিখুঁত হতে পারে না। তাই ক্ষমা, ধৈর্য ও সংশোধনের সুযোগ দাম্পত্য জীবনের অপরিহার্য গুণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে; আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।”
—সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩৪
ক্ষমা মানে অন্যায়কে সঠিক বলে মেনে নেওয়া নয়। ক্ষমা মানে প্রতিশোধের পথ ছেড়ে সংশোধনের পথ বেছে নেওয়া। যদি কোনো আচরণ বারবার কষ্ট দেয়, তাহলে তা শান্তভাবে জানাতে হবে এবং প্রয়োজনে বিশ্বস্ত, বিচক্ষণ ও ন্যায়পরায়ণ পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ বা উপযুক্ত ব্যক্তির সহায়তা নিতে হবে। কিন্তু অপমানের জবাবে অপমান করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করা উচিত নয়।
কষ্টের সময় সবর ও তাওয়াক্কুল
জীবনে এমন সময় আসতে পারে, যখন মানুষ নিজের আপনজনের কাছ থেকেই কষ্ট পায়। তখন মনে হতে পারে—কেউ বুঝছে না, কেউ পাশে নেই। কিন্তু একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর দরজা কখনো বন্ধ হয় না।
আল্লাহ বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।”
—সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৩
সবর মানে অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করা নয়। সবর মানে আবেগের বশে ভুল সিদ্ধান্ত না নিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সঠিক ও ন্যায়সংগত পথে থাকা। প্রয়োজন হলে নিজের মর্যাদা রক্ষা করা, স্পষ্টভাবে সীমারেখা নির্ধারণ করা এবং সমস্যার সমাধানের জন্য বৈধ ও কল্যাণকর পদক্ষেপ নেওয়াও সবরের অংশ।
তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং যথাসাধ্য চেষ্টা করে ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।
সন্তানদের সামনে কেমন আচরণ করা উচিত
পরিবার একটি শিশুর প্রথম বিদ্যালয়। শিশু শুধু বাবা-মায়ের মুখের উপদেশ শুনে শেখে না; তারা বাবা-মায়ের আচরণ দেখেও শেখে।
যদি একটি শিশু প্রতিদিন দেখে, পরিবারের সদস্যরা পরস্পরকে সম্মান করে, ধৈর্য ধরে কথা বলে, ভুল হলে ক্ষমা চায় এবং কষ্ট পেলে সুন্দরভাবে তা প্রকাশ করে, তবে শিশুর মধ্যেও সহমর্মিতা ও ভদ্রতার গুণ বিকশিত হয়।
অন্যদিকে যদি শিশু প্রতিনিয়ত উপহাস, অপমান, চিৎকার ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য দেখতে থাকে, তাহলে তার সামাজিক ও মানসিক আচরণেও তার প্রভাব পড়তে পারে। তাই সন্তানের সামনে বাবা-মায়ের পারস্পরিক সম্মান শুধু দাম্পত্য সম্পর্ক রক্ষার বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চরিত্র গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একটি সুন্দর বাক্য জীবনকে বদলে দিতে পারে
মানুষের জীবনে কিছু কথা দীর্ঘদিন মনে থাকে। কোনো শিক্ষক বলেছেন—‘তুমি পারবে’; কোনো মা বলেছেন—‘আমি তোমার ওপর বিশ্বাস করি’; কোনো বাবা বলেছেন—‘ভুল হয়েছে, আবার চেষ্টা করো’; কোনো জীবনসঙ্গী বলেছেন—‘আমি তোমার পাশে আছি’—এসব বাক্য একজন মানুষকে নতুন শক্তি দিতে পারে।
তাই আমরা যদি কথা বলতেই হয়, এমন কথা বলি যা মানুষকে গড়ে। সংশোধন করতে হলে এমনভাবে করি যাতে সে নিজেকে ধ্বংসপ্রাপ্ত নয়, বরং সংশোধনের যোগ্য মনে করে।
একটি ভালো কথা হয়তো অর্থ ব্যয় করে না, কিন্তু তার মূল্য অনেক। আবার একটি অপমানজনক কথা বলতেও কোনো অর্থ লাগে না, কিন্তু তার ক্ষতি অনেক বড় হতে পারে।
জীবনসঙ্গী প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযাত্রী
দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে প্রতিযোগিতার সম্পর্ক বানানো উচিত নয়। কে বেশি উপার্জন করেন, কে বেশি কাজ করেন, কার কথা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কার সিদ্ধান্ত শেষ কথা—এসব নিয়ে অহংকার ও প্রতিযোগিতা সম্পর্কের সৌন্দর্য নষ্ট করতে পারে।
বরং ভাবতে হবে—আমরা একই জীবনের দুই সহযাত্রী। একজনের সাফল্যে অন্যজন আনন্দিত হবে, একজনের ব্যর্থতায় অন্যজন সাহস দেবে, একজনের দুর্বলতায় অন্যজন শক্তি দেবে।
একটি সংসার তখনই সুন্দর হয়, যখন সেখানে ‘আমি’ ধীরে ধীরে ‘আমরা’-তে পরিণত হয়।
উপহাসের পরিবর্তে উৎসাহ
জীবনসঙ্গী কোনো কাজে ব্যর্থ হলে তাকে উপহাস না করে উৎসাহ দেওয়া উচিত। সে ভুল করলে ভুলটি নিয়ে হাসাহাসি না করে সমাধানের পথ দেখানো উচিত। সে ক্লান্ত হলে তার ক্লান্তিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সে ভালো কিছু করলে তার প্রশংসা করা উচিত।
প্রশংসা অহংকার সৃষ্টি করার জন্য নয়; বরং ভালো কাজের প্রতি উৎসাহ দেওয়ার জন্য। একটি আন্তরিক প্রশংসা সম্পর্কের মধ্যে উষ্ণতা বাড়ায় এবং মানুষকে আরও ভালো হতে অনুপ্রাণিত করে।
ইসলামী পরিবার কেমন হওয়া উচিত
একটি আদর্শ ইসলামী পরিবার এমন পরিবার, যেখানে আল্লাহর স্মরণ আছে, ইবাদতের পরিবেশ আছে, সত্যবাদিতা আছে, পারস্পরিক সম্মান আছে, পর্দা ও শালীনতা আছে, অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা আছে এবং ভুল হলে সংশোধনের সুযোগ আছে।
সেখানে স্বামী স্ত্রীর ওপর জুলুম করবেন না, স্ত্রীও স্বামীর প্রতি অন্যায় করবেন না। কেউ কারও দুর্বলতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে না। একে অন্যের গোপনীয়তা রক্ষা করবে। সন্তানদের স্নেহ করবে এবং শিষ্টাচার শেখাবে। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করবে এবং ছোটদের প্রতি দয়া দেখাবে।
এমন পরিবারই সমাজে শান্তির ভিত্তি তৈরি করে।
কষ্ট পেলেও নিজের মর্যাদা ভুলে নয়
আপনজনের আচরণে কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কষ্টের কারণে নিজের মূল্য ভুলে যাওয়া উচিত নয়। একজন মানুষের মর্যাদা অন্যের উপহাসে কমে যায় না। কেউ যদি অন্যায়ভাবে তুচ্ছ করে, তাতে সেই ব্যক্তির প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় না।
একজন মুমিনের প্রকৃত মর্যাদা আল্লাহর কাছে। তাই মানুষের প্রশংসায় অতিরিক্ত আনন্দিত কিংবা মানুষের অবজ্ঞায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার পরিবর্তে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য করা উচিত।
তবে এর অর্থ এই নয় যে অন্যায় আচরণকে চুপচাপ সহ্য করতেই হবে। প্রয়োজন হলে শান্তভাবে বলতে হবে—‘এই কথাটি আমাকে কষ্ট দিয়েছে’, ‘এভাবে কথা বললে আমি অসম্মানিত বোধ করি’, ‘আমরা কি শান্তভাবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে পারি?’ স্পষ্ট অথচ ভদ্র যোগাযোগ অনেক ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটাতে পারে।
সম্পর্ক রক্ষার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি
দাম্পত্য ও পারিবারিক সম্পর্ককে সুন্দর রাখতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—
প্রথমত, কথা বলার আগে ভাবতে হবে।
কথাটি সত্য হলেও তা কীভাবে বলা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, একান্ত বিষয় জনসমক্ষে বলা যাবে না।
জীবনসঙ্গীর দুর্বলতা অন্যের সামনে প্রকাশ করা সম্পর্কের মর্যাদা নষ্ট করে।
তৃতীয়ত, ভুল হলে ক্ষমা চাইতে হবে।
‘আমি স্বামী’, ‘আমি স্ত্রী’, ‘আমি বড়’—এই অহংকার ক্ষমা চাওয়ার পথে বাধা হওয়া উচিত নয়।
চতুর্থত, অপরজনের ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে হবে।
কৃতজ্ঞতা ভালোবাসাকে গভীর করে।
পঞ্চমত, রাগের সময় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
আবেগ কমে গেলে অনেক সমস্যাকেই ভিন্নভাবে দেখা যায়।
ষষ্ঠত, সমস্যা হলে আলোচনা করতে হবে।
নীরব অভিমান জমিয়ে রাখলে দূরত্ব বাড়ে।
সপ্তমত, আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে।
কারণ মানুষের হৃদয় আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। তিনি চাইলে কঠিন হৃদয়েও কোমলতা সৃষ্টি করতে পারেন।
উপসংহার
আপন সঙ্গির উপেক্ষা ও উপহাস সত্যিই গভীর কষ্টের কারণ হতে পারে। কারণ মানুষ অপরিচিতের কাছ থেকে যতটা ভালোবাসা আশা করে, তার চেয়ে অনেক বেশি ভালোবাসা ও নিরাপত্তা আশা করে আপনজনের কাছ থেকে। তাই জীবনসঙ্গীর প্রতি অবজ্ঞা, বিদ্রূপ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য কিংবা ইচ্ছাকৃত উপেক্ষা কোনোভাবেই সুস্থ দাম্পত্য জীবনের লক্ষণ নয়।
একটি সুন্দর সংসার গড়ে ওঠে বড় বড় সম্পদ দিয়ে নয়; বরং ছোট ছোট ভালো আচরণ দিয়ে। একটি কোমল কথা, একটি আন্তরিক হাসি, একটি ধৈর্যশীল উত্তর, একটি ক্ষমা, একটি উৎসাহ, একটি কৃতজ্ঞতা—এসবই একটি ঘরকে শান্তির নীড়ে পরিণত করতে পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে—মানুষ শুধু খাদ্যের জন্য বাঁচে না; সে সম্মান চায়, ভালোবাসা চায়, আপনজনের আন্তরিকতা চায়। তাই যে মানুষটি আমাদের জীবনের সঙ্গী, তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযাত্রী হিসেবে দেখতে হবে; তার দুর্বলতাকে উপহাস নয়, আড়াল করতে হবে; তার কষ্টকে তুচ্ছ নয়, অনুভব করতে হবে; তার ভুলকে অপমান নয়, সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে।
আসুন, আমরা ঘর থেকেই মানবতার শিক্ষা শুরু করি। কটু বাক্যের পরিবর্তে কোমল ভাষা ব্যবহার করি, উপহাসের পরিবর্তে উৎসাহ দিই, উপেক্ষার পরিবর্তে মর্যাদা দিই, রাগের পরিবর্তে সংযম অবলম্বন করি এবং প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমাকে বেছে নিই।
আল্লাহ আমাদের হৃদয়কে কোমল করুন, জিহ্বাকে সংযত করুন, পরিবারে ভালোবাসা ও দয়া বৃদ্ধি করুন এবং আমাদের ঘরগুলোকে ঈমান, শান্তি, সম্মান, মমতা ও পারস্পরিক সহযোগিতায় পরিপূর্ণ করুন।
হে আল্লাহ! আমাদের আপনজনদের প্রতি সদয় হতে শেখান। আমাদের মুখ থেকে এমন কোনো কথা বের হতে দেবেন না, যা কারও হৃদয় অকারণে ভেঙে দেয়। উপেক্ষা, বিদ্রূপ, অহংকার ও কটু বাক্য থেকে আমাদের রক্ষা করুন। আমাদের দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবনকে ভালোবাসা, দয়া, বিশ্বস্ততা, সম্মান ও তাকওয়ার আলোয় আলোকিত করুন। আমাদের ঘরগুলোকে এমন শান্তির নীড়ে পরিণত করুন, যেখানে আপনার স্মরণ থাকবে, পরস্পরের প্রতি মমতা থাকবে এবং আপনার সন্তুষ্টিই হবে আমাদের জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য। আমিন।
১
১ মন্তব্য