Loading..

ব্লগ

রিসেট

১১ আগস্ট, ২০২৬ ০৭:২৫ পূর্বাহ্ণ

এনটিআরসিএ নাকি ম্যানেজিং কমিটি—শিক্ষক নিয়োগে ক্ষমতা কার হাতে থাকা উচিত?

এনটিআরসিএ নাকি ম্যানেজিং কমিটি—শিক্ষক নিয়োগে ক্ষমতা কার হাতে থাকা উচিত?



বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ একজন শিক্ষক শুধু একটি পদে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মী নন; তিনি একটি প্রজন্মের জ্ঞান, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম কারিগর।

সম্প্রতি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রবেশ পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা এনটিআরসিএর পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডির হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানানো হয়েছে। 

তাই বিষয়টিকে কোনো পক্ষের জয়-পরাজয় হিসেবে না দেখে শিক্ষার মান, স্বচ্ছতা, মেধা ও জবাবদিহির দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অতীতের অভিজ্ঞতা কী বলে?

এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিবন্ধন ও নিয়োগ সুপারিশের বর্তমান কাঠামো একদিনে তৈরি হয়নি। ২০০৫ সালে এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠার পর প্রাথমিকভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির ভূমিকা ছিল বেশি। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের পরিবর্তনের মাধ্যমে এনটিআরসিএকে শুধু নিবন্ধন সনদ দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগে সুপারিশ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। 

এই পরিবর্তনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষক নিয়োগে মেধা, যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।

অন্যদিকে, ম্যানেজিং কমিটির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা থাকলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন, বিষয়ভিত্তিক বাস্তবতা এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চাহিদা বিবেচনার সুযোগ বাড়তে পারে—এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই।

অতএব, উভয় ব্যবস্থারই কিছু ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক রয়েছে।

ম্যানেজিং কমিটির হাতে ক্ষমতা গেলে সম্ভাব্য সুবিধা

প্রথমত, একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত প্রয়োজন ম্যানেজিং কমিটি সবচেয়ে ভালোভাবে জানে। কোন বিষয়ে শিক্ষক প্রয়োজন, কোন ধরনের শিক্ষকের প্রয়োজন এবং প্রতিষ্ঠানের পরিবেশের সঙ্গে কে বেশি উপযোগী—এসব বিষয় স্থানীয় পর্যায়ে বিবেচনা করা সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠান নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু অতিরিক্ত মানদণ্ড নির্ধারণ করতে পারে, যদি তা স্বচ্ছ ও আইনসম্মত হয়।

তৃতীয়ত, নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষকদের মধ্যে একটি সরাসরি প্রশাসনিক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।

তবে এসব সুবিধা তখনই কার্যকর হবে, যখন নিয়োগ প্রক্রিয়া হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও রাজনৈতিক/ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত।

ঝুঁকিটাও উপেক্ষা করা যাবে না

অন্যদিকে, ম্যানেজিং কমিটির হাতে সম্পূর্ণ নিয়োগ ক্ষমতা দিলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠতে পারে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে।

স্থানীয় পর্যায়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, প্রভাব, সুপারিশ কিংবা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ যেন কোনোভাবেই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত না করে—এটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

কারণ একজন যোগ্য প্রার্থী যদি মনে করেন যে তাঁর মেধার পরিবর্তে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে শুধু একজন চাকরিপ্রার্থীই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না; ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা।

আবার এনটিআরসিএ ব্যবস্থাও কি নিখুঁত?

এনটিআরসিএভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত বলার সুযোগ নেই। দীর্ঘসূত্রতা, শূন্যপদের সঠিক তথ্য, বিষয়ভিত্তিক চাহিদা, নিয়োগের সময়কাল এবং প্রার্থীদের পছন্দের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের বাস্তব প্রয়োজনের সমন্বয়—এসব ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তাই শুধু “এনটিআরসিএ ভালো” অথবা “ম্যানেজিং কমিটি ভালো”—এমন সরল সিদ্ধান্ত না নিয়ে বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত:

কোন ব্যবস্থায় সবচেয়ে যোগ্য শিক্ষক সবচেয়ে স্বচ্ছ পদ্ধতিতে নিয়োগ পাবেন?

সমাধান কি মাঝামাঝি কোনো ব্যবস্থায়?

আমার দৃষ্টিতে, আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা এখানেই।

সম্পূর্ণ ক্ষমতা এক পক্ষের হাতে না দিয়ে একটি সমন্বিত নিয়োগ কাঠামো বিবেচনা করা যেতে পারে।

যেমন—

১. এনটিআরসিএ

নিবন্ধন পরীক্ষা, মেধা যাচাই, যোগ্যতা নির্ধারণ ও প্রাথমিক মেধাক্রম তৈরি করবে।

২. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান/ম্যানেজিং কমিটি

প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শূন্যপদ, বিষয়ভিত্তিক প্রয়োজন ও অন্যান্য বৈধ প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদা নির্ধারণ করবে।

৩. নিয়োগের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া

এমন একটি ডিজিটাল ও কেন্দ্রীয় পদ্ধতিতে সম্পন্ন হতে পারে, যেখানে ব্যক্তিগত সুপারিশ বা অনৈতিক প্রভাবের সুযোগ থাকবে না।

৪. অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা

নিয়োগে অনিয়ম হলে দ্রুত ও স্বাধীনভাবে অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

এতে প্রতিষ্ঠানও তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে পারবে, আবার প্রার্থীর মেধা ও যোগ্যতারও সুরক্ষা থাকবে।

প্রধান শিক্ষক নিয়োগের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেওয়া দরকার

২০২৬ সালে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ কয়েকটি নেতৃত্বস্থানীয় পদে এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই ও নিয়োগ সুপারিশের দায়িত্ব দেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। 

এতে বোঝা যায়, শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক, মেধাভিত্তিক ও কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনার দিকে নেওয়ার একটি প্রবণতা রয়েছে।

তাই এখন প্রবেশ পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, সেটি যেন সামগ্রিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—শিক্ষার্থী

এই বিতর্কে আমরা প্রায়ই এনটিআরসিএ, ম্যানেজিং কমিটি, শিক্ষক ও প্রার্থীদের কথা বলি। কিন্তু যার ওপর পুরো ব্যবস্থার প্রভাব পড়ে, সেই শিক্ষার্থীর কথা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

একজন ভালো শিক্ষক একটি শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ বদলে দিতে পারেন। একজন অযোগ্য শিক্ষক আবার একটি প্রজন্মের শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেন।

তাই নিয়োগ পদ্ধতির মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—

“কার হাতে ক্ষমতা থাকবে?” নয়; বরং “কীভাবে সবচেয়ে যোগ্য ও নৈতিক শিক্ষককে নির্বাচন করা যাবে?”

শেষ কথা

শিক্ষক নিয়োগ কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ক্ষমতার বিষয় হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত মেধা, যোগ্যতা, সততা, স্বচ্ছতা ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করার একটি জাতীয় প্রক্রিয়া।

ম্যানেজিং কমিটির হাতে ক্ষমতা দিলে যেমন স্থানীয় প্রয়োজন বিবেচনার সুযোগ বাড়তে পারে, তেমনি যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে স্বজনপ্রীতি বা প্রভাবের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। আবার এনটিআরসিএর কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে, কিন্তু সেখানে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সমন্বয়ের সমস্যা থাকলে সেটিও সংস্কার করা প্রয়োজন।

সুতরাং এনটিআরসিএ বনাম ম্যানেজিং কমিটি—এই দ্বন্দ্বের পরিবর্তে “মেধা বনাম অনিয়ম”কে আলোচনার কেন্দ্রে আনা উচিত।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার স্বার্থে এমন একটি নিয়োগ কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে—

মেধা থাকবে সবার আগে,

স্বচ্ছতা থাকবে পুরো প্রক্রিয়ায়,

প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন থাকবে বিবেচনায়,

আর কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকবে না।

**কারণ শিক্ষক নিয়োগের ভুল সিদ্ধান্তের ক্ষতি শুধু একজন প্রার্থীর নয়—তার প্রভাব পড়ে পুরো প্রজন্মের ওপর।**

মন্তব্য করুন